somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রসগল্প : গুড মর্নিংয়ের গুঁতো

২৮ শে এপ্রিল, ২০১৯ সকাল ১১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"পাগলাদোচা ঘাটের মড়া, রোজ সকালে উঠে গুড মর্নিং মারাচ্ছে, শালা নেকুষষ্ঠী..."
চা খেতে খেতে মেসেঞ্জারে আসা মেসেজটা পড়ে এমন চমকে উঠলেন রমাপদবাবু যে হাতে ধরা কাপ থেকে খানিকটা চা ছলকে পাঞ্জাবিতে পড়ল!
.
বছর দেড়েক আগে চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছেন নিঃসন্তান রমাপদবাবু। অবসর নেওয়ার পর প্রথম কদিন ভালই লাগছিল বেশ। ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ানো নেই। ধীরেসুস্থে হেলে-দুলে প্রভাতী কাজকম্মো... চা খাওয়া, বাজার করা ইত্যাদি।
কিন্তু কদিন পরেই হাঁপিয়ে উঠলেন। বাজার-দোকান করে দেওয়ার পর আর কিছু করার নেই। সময় কাটতেই চায় না। কাঁহাতক আর খবরের কাগজে মুখ চিপকে বসে থাকা যায়!
এই সময় তাঁর জীবনে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটল। তাঁর ভাগ্নে এসেছিল সপরিবারে বেড়াতে। রমাপদবাবুকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিয়ে ফেসবুক একাউন্ট করে দিল। দিন দশেক ছিল। হাত ধরে মোটামুটি সব শিখিয়ে দিল।
.
এক নতুন জগতে প্রবেশ করলেন রমাপদবাবু। ফেসবুক। হুড়হুড়িয়ে গাদাখানেক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এল। তিনি অ্যাকসেপ্ট করে নিলেন। দেড়শোর ওপর বন্ধু হয়ে গেল। তাঁদের কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে সকালে 'গুড মর্নিং' মেসেজ পাঠাতে লাগল। তিনিও তাঁদেরকে গোলাপ ফুলের ওপর লাট খেতে থাকা 'সুপ্রভাত' ফেরত দিতে লাগলেন। ব্যাপারটা রমাপদবাবুর বেশ মনে ধরল।
অতঃপর তিনিও সকালে উঠে ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা দেড়শো জনকে 'গুড মর্নিং' পাঠানো শুরু করলেন। সন্ধ্যেবেলায় 'গুড ইভিনিং' আর রাত্রে শয্যাগ্রহণের আগে 'গুড নাইট।'
অল্প কিছু মেসেজের রিপ্লাই আসে। তাদেরকে আবার একটা করে স্মাইলি পাঠান রমাপদবাবু।
মাঝে মাঝে ভুলও হয়ে যায়। সকালে 'সুপ্রভাত'এর জায়গায় 'শুভ রাত্রি' পাঠানো হয়ে যায়। তখন আবার ডবল কাজ। সবাইকে 'সরি' বলে ফের 'সুপ্রভাত' পাঠাতে হয়।
আর একঘেঁয়েমি নেই, সারাদিন হুদুম ব্যস্ততার মধ্যে কেটে যেতে লাগল রমাপদবাবুর দিন।
.
যত সময় গেল রমাপদবাবু দেখলেন বন্ধু কমতে লাগল। বুঝলেন বেশির ভাগ লোকই এইসব মেসেজ পছন্দ করে না। হয় তাঁকে ব্লক করে দিল বা আনফ্রেন্ড করে দিতে লাগল। তাতেও দমলেন না রমাপদবাবু। কিছু নতুন বন্ধুও হল। তিনি যথারীতি সবাইকে অতীব নিষ্ঠার সঙ্গে মেসেজ পাঠিয়ে যেতে লাগলেন।
.
আজও সকালে ঘুম থেকে উঠে একশো বাইশ জনকে কালো প্রজাপতির ওপর লাল ধোঁয়ার 'গুড মর্নিং' পাঠিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। চা খাচ্ছেন এমন সময় মেসেঞ্জার পিং করল। জবাবি 'সুপ্রভাত' এল বোধহয়।
মেসেজ পড়ে চোখ কপালে উঠল!
"পাগলাদোচা ঘাটের মড়া, রোজ সকালে উঠে গুড মর্নিং মারাচ্ছে, শালা নেকুষষ্ঠী..."
প্রথমে দুঃখ তারপরে খুব রাগ হল রমাপদবাবুর। গুড মর্নিংই তো পাঠিয়েছেন! তাতেও মানুষের এত আপত্তি!
কিন্তু মেসেজ পাঠানো তিনি বন্ধ করবেন না। কালও পাঠাবেন সবাইকে, আর হ্যাঁ শুধু ভার্চুয়াল জগতে নয়, কাল থেকে বাস্তব জীবনেও এটা ফলো করবেন। যার সঙ্গেই সকালবেলায় দেখা হবে 'গুড মর্নিং' জানাবেন।
.
পরদিন ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে দৌড়তে দৌড়তে বউকে বললেন, "সুপ্রভাত।"
বউ ধূপ জ্বালাচ্ছিল। বলল, "ঢং!"
কাজের মেয়ে বারান্দা মুছছিল। তাকে বললেন, "গুড মর্নিং গঙ্গা।"
গঙ্গা ফিক করে হেসে লজ্জায় মুখ নামিয়ে বলল, "বৌদি শুনতে পাবে যে দাদাবাবু!"
বৌদি শুনতে পেলে কী হবে বুঝতে পারলেন না রমাপদবাবু। ভাবলেন বাথরুম সেরে জেনে নেবেন, যদিও বাথরুম থেকে বেরোনোর পর ভুলে গেলেন সেকথা।
চা খেয়ে ফেসবুকে সবাইকে 'সুপ্রভাত' মেসেজ পাঠিয়ে বাজারে চললেন।
একটা টোটোকে দাঁড় করিয়ে বললেন, "গুড মর্নিং ভাই। বাজার যাবে?"
টোটোওয়ালা বলল, "দশ টাকা খুচরো দিতে হবে। একশো টাকার নোট ধরিয়ে দিলে আমি কিন্তু নব্বই টাকা ফেরত দিতে পারব না। সে আপনি যতই ওই সব বলুন।"
বাজারে প্রথমে গেলেন মাছ বাজারে। কানাই খুব ভাল মৌরলা নিয়ে এসেছে। বললেন, "গুড মর্নিং কানাই।"
কানাই এক খদ্দেরের মাছ ওজন করছিল, তাঁর দিকে না তাকিয়েই বলল, "পাঁচশোর থেকে এক টাকাও কমে মৌরলা দিতে পারব না কিন্তু।"
রমাপদবাবু অবাক হয়ে বললেন, "আমি কমে দিতে বলিনি তো কানাই?"
একটা ব্যঙ্গের হাসি দিয়ে কানাই বলল, "কুড়ি বছর মাছ নিয়ে বসছি। খদ্দের হঠাৎ করে তেলালে পরের কথাটা কী বলবে
বুঝতে পেরে যাই!"
মাছ বাজারেই এক প্রতিবেশিনীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভদ্রমহিলা টিচার। স্বামী বাইরে থাকে। কিছুদিন হল তাঁদের পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন।
তাঁর পথ আটকে সামান্য হেসে রমাপদবাবু বললেন, "সুপ্রভাত।"
ভদ্রমহিলা এদিক-ওদিক চাইলেন তারপর তাঁকেই বলা হয়েছে বুঝতে পেরে বললেন, "কিছু মনে করবেন না, অই সবার সঙ্গে খেজুরে গপ্পো করার জন্য আমি বাজারে আসি না।"
রমাপদবাবু বুঝতে পারলেন না, কী হচ্ছে! যাকে 'গুড মর্নিং' জানাচ্ছেন সেই অন্য মানে করছে।
বন্ধু সমীরের সঙ্গে এরপর দেখা হল। ছোটবেলার বন্ধু, কাছাকাছিই থাকে। তাকেও বললেন, "গুড মর্নিং সমীর।"
সমীরবাবু থমকে গেলেন। আপাদমাথা রমাপদবাবুকে ভাল করে দেখলেন। তারপরে বললেন, "তুই রাত্রে একটা করে অ্যালজোলাম বা দরকার হলে আরও কড়া কিছু খা। ঘুম না হলে শুধু তো মাথা খারাপ না স্ট্রোক-ফোকও হয়ে যেতে পারে।"
রমাপদবাবু অবাক হয়ে বললেন, "শুধু মাথা খারাপ মানে? কী বলতে চাইছিস তুই? আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে তাই তোকে গুড মর্নিং বলেছি?"
এই সময় পাশ দিয়ে রমাপদবাবুর পরিচিত এক আনাজওয়ালি মাথায় আনাজ নিয়ে যাচ্ছিল, তাকেও "সুপ্রভাত" বললেন রমাপদবাবু। আনাজওয়ালির বাজারে আসতে দেরি হয়ে গেছে বলে দৌড়াচ্ছিল। সে কী বুঝল কে জানে, থমকে দাঁড়িয়ে এক হাতে মাথার বোঝা ধরে আর এক হাতে বুক থেকে নেমে যাওয়া আলুথালু ময়লা শাড়ি ঠিক করে, আঁচলে ভাল করে সারা গা ঢেকে আবার দৌড় দিল।
সমীরবাবু সব দেখলেন। বললেন, "গরমটা হঠাৎ করে খুব পড়েছে। এই সময় ঘুম না হলে একটু মেন্টাল প্রবলেম হতে পারে। তুই বাজার করে বাড়ি যা। আমি সন্ধেবেলায় যাব। বৌদির সঙ্গে একটু কথা বলতে হবে।"
.
বাড়ি ফিরে রমাপদবাবু মেসেঞ্জার খুলে সেই গাল পাড়া মেসেজটা আর একবার পড়লেন। তারপর রিপ্লাই লিখলেন, "হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেন আমি পাগলাদোচা আমি নেকুষষ্ঠী তাই গুড মর্নিং মেসেজ পাঠাতাম।"
মেসেঞ্জার আন-ইনস্টল করে বউকে বললেন, "বেশ কড়া করে এক কাপ চা দাও তো..."
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে এপ্রিল, ২০১৯ সকাল ১১:৫৭
৭টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জিন্নাহকে আমরা আসলে কেন ভালোবাসি—জীবনাচারের জন্য, নাকি পাকিস্তানের জন্য?

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬

ইতিহাসের কিছু চরিত্রকে আমরা ভালোবাসি না তাঁদের পুরো জীবনকে বুঝে; বরং তাঁদের ঘিরে তৈরি হওয়া একটি রাজনৈতিক প্রতীকের জন্য। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

জিন্নাহ ছিলেন নিঃসন্দেহে অসাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অটো কে বন্ধ করা যাবে না।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫১




অনেক দিন আগের কথা। ২০১৫ সালের ঘটনা। তখন আমি মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় থাকি এবং অনার্সে পড়াশোনা করি। পড়তাম পাশের উপজেলা সোনারগাঁওয়ের সোনারগাঁও সরকারি কলেজে। প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা ব্যারাজের ডিজাইনার : খাল বাবা স্বয়ং

লিখেছেন অপলক , ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৮

আসন্ন বিসিএস পরীক্ষার কমন প্রশ্ন ফাঁস করে দিলাম। পদ্মা ব্যারাজের ডিজাইনার মহাপ্রতিভাবান খাম্বা/খাল বাবা। তিনি HSC ডিগ্রীধারী হলেও তার প্রতিভা আকাশচুম্বী। রবিঠাকুর বা নজরুলের সাথে তার কোন তুলনা হয় না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ ডেভেলপমেন্টে করণীয় কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬



গত কয়েক বছর ধরে সামহোয়্যারইন ব্লগ সহ দেশের সকল পত্রিকা ও টিভি চ্যানলে রাজনৈতিক লেখা বেশি আসছে যা সকলের কাছে ভালো লাগার বিষয় না। রাজনীতি ভালো লাগবে শুধুমাত্র জেনজি’দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন নেই! আপনি কি মনে করেন?

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪



বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে স্থানীয় সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর লক্ষ্য অনুযায়ী আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×