somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্য : লকডাউন, আমার বৌ ও বোলতা

০২ রা মে, ২০২০ রাত ১:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমাব না পণ করেছি। এই তো আর কদিন পরেই লকডাউন উঠে যাবে। তখন চূড়ান্ত সমস্যায় পড়ব। ঢুলতে ঢুলতে অফিসের টেবিলে মাথা-ফাথা ঠুকে কেলেঙ্কারিয়াস কাণ্ড হবে।
বউ রান্নাঘরে বাসন মাজছে। লকডাউনের দুপুরে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। দূরে কোনো বাড়িতে টিভিতে পুরানো সিরিয়াল চলছে।
হঠাৎ "বাঁচাও বাঁচাও" চিৎকার! বউয়ের গলা না? নির্ঘাত বিপদ হয়েছে কিছু! ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল।
দৌড়ে রান্নাঘরে গেলাম। দেখলাম বউ দুলে দুলে বাসন মাজছে আর গাইছে, "বাঁচাও কে আছ মরেছি যে প্রেম করে..."
বাব্বা ধড়ে প্রাণ এল!
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, '"বাঁচাও বাঁচাও' বলে চেঁচাচ্ছিলে কেন?"
বউ বাসনে সাবান ঘষতে ঘষতে বলল, "এই গানটার শুরুটা এইরকমই, সেদিন সারেগামায় গৌরব গাইল!"
আমি বললাম, "উফফ ভয় খাইয়ে দিয়েছিলে!"
বউ বলল, "এত ভয় খাওয়ার কী আছে? শুধু ভয়েই মরে যাচ্ছে!"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "'বাঁচাও বাঁচাও' বলে চিৎকার করলে ভয় পাব না?"
বউ গান গাওয়া থামিয়ে বলল, "সবসময় এত ভয়ে ভয়ে থাকো কেন? ভীতুর ডিম!"
.
ফিরে এসে গল্পের বই খুলে বসলাম।
কিছুক্ষণ পরে আবার বউয়ের চিৎকার 'বাঁচাও বাঁচাও' শুনতে পেলাম।
উরিব্বাস আজ তাহলে দারুণ মুডে আছে। গান গেয়ে গেয়ে বাসন মাজছে!
একটু পরে আবার 'বাঁচাও বাঁচাও' চিৎকার।
ওহ্ ভাল শুরু করেছে তো আজকে! কাউকে এমন পিলে চমকে দিয়ে গান করতে শুনিনি কখনো!
বউয়ের 'বাঁচাও বাঁচাও' চিৎকারে খান খান হয়ে যাচ্ছে নিস্তব্ধ দুপুর। নাহ্ এটা খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। বারণ করে দিয়ে আসি।
.
গিয়ে যা দেখলাম তাতে হতবাক হয়ে গেলাম। বউ রান্নাঘরের মেঝেতে শুয়ে আছে লম্বা হয়ে।
আমাকে দেখতে পেয়েই বলল, "কখন থেকে চেঁচাচ্ছি গ্রাহ্যই করে না! কেমন মানুষ তুমি?"
আমি বললাম, "আমি তো ভাবলাম তুমি গান করছ..."
বউ আমার কথা থামিয়ে দিয়ে বলল, "শুয়ে পড়ো শুয়ে পড়ো। একটা বিরাট বোলতা এসেছে।"
দেখলাম একটা পেল্লাই বোলতা বোঁ করে রান্নাঘরের মধ্যে ঘুরছে। আমি দৌড়ে গিয়ে একটা চারশো পাতার উপন্যাস নিয়ে এসে সেটা দিয়ে চাপড়ে বোলতাটাকে নিকেশ করলাম। মোটা বইগুলো সংসারের আটপৌরে ক্রিয়াকাণ্ডে মায় বিপদে-আপদেও কাজে আসে। একবার ঘাড়ের সমস্যায় ডাক্তারবাবু বলেছিলেন মোটা বালিশ ব্যবহার করতে। তখন হাজার পাতার 'পূর্ব পশ্চিম' বইটা খুব কাজে লেগেছিল।
.
ওঠার পর দেখা গেল বউয়ের হাঁটু ফুলে বেলুন হয়ে গেছে। দড়াম করে শুতে গিয়ে হাঁটুতে আঘাত লেগেছে। হাঁটতে পারছে না। ধরে ধরে ঘরে নিয়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে দিয়ে বললাম, "এখন শুয়ে শুয়ে হাঁটুতে লাগাও।"
.
ঠিক এমন সময় জোরে দরজায় ধাক্কার আওয়াজ।
দরজা খুলে দেখলাম পাড়ার সব মাতব্বরেরা হাজির। এখন একসঙ্গে এতজন কেন? নিশ্চই সিরিয়াস কিছু। বগলাকাকু, মন্টুকাকু, ভুতুদা ভজহরিদা সবাই আছে।
বগলাকাকু মাস্কের মধ্যে থেকে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, "বউমা কোথায়? কী হয়েছে বউমার?"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "কী হবে আবার? শুয়ে আছে।"
ভুতুদা বলল, "হাইলি সাসপিসাস বুঝলেন বগলাকাকু! এসবই হল লকডাউনের এফেক্ট। কালকেই বিবিসিতে দেখছিলাম ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স কত্ত বেড়ে গেছে!""
ভজহরিদা বলল, "রাখ তো তোর বিবিসি। ওতে মদের দোকান কবে খুলবে কিছু বলেছে? সারাক্ষণ বিবিসি দেখাচ্ছে শালা!"
মন্টুকাকু বললেন, "আজেবাজে কথায় সময় নষ্ট না করে কাজের কথায় আসা যাক। দেখো তোমার স্ত্রী 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার করেছে এটা পাড়ার সবাই শুনেছে। এখন তোমাকে আমরা সবাই ভাল বলেই জানি। কিন্তু মুনিনাঞ্চ মতিভ্রম বলেও তো একটা কথা আছে। তাই তোমার স্ত্রী বেঁচে আছে এবং সুস্থ আছে এইটুকু দেখেই আমরা চলে যাব।"
আমি আর একটু হলেই উল্টে পড়ে যাচ্ছিলাম! কোনরকমে বললাম, "এসব কী বলছেন! আর ও তো এখন কিছুতেই আসতে পারবে না। হাঁটার অবস্থা ওর নেই।"
বগলাকাকু হুঙ্কার দিয়ে বললেন, "যেরকম আর্তনাদ আমি নিজের কানে শুনেছি তাতে ঠিক এই ভয়টাই আমি পাচ্ছিলাম।"
সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়ে একটা পুলিশের জিপ যেতে যেতে দাঁড়িয়ে গেল।
.
এক দশাসই চেহারার পুলিশ অফিসার জিপ থেকে নেমে হেঁড়ে গলায় বললেন, "এখানে এত ভিড় কেন?"
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, "কিছু নয় স্যার। আমার স্ত্রী অসুস্থ, তারই খোঁজখবর করছেন এঁরা।"
অসুস্থ শুনেই পুলিশ অফিসার লাফিয়ে উঠলেন, "জ্বর আছে? কাশি আছে? শ্বাসকষ্ট আছে? কোনও ফরেন কানেক্সান আছে? বা অন্য স্টেট থেকে এসেছেন? রিলেটিভের মধ্যে কেউ কোভিড পজিটিভ আছে?"
আমি বললাম, "না না ওসব কিছু নয়, হাঁটুতে আঘাত লেগেছে।"
শুনে পুলিশ অফিসার যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, "আপনারা এখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকবেন না। সবাই যে যার ঘরে যান। একজন মহিলার হাঁটুতে লেগেছে, সবাই লাইন দিয়ে চলে এসেছেন দেখা করতে! যত্তসব..."
নাটক অসমাপ্ত রেখে কারুর যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। ভুতুদা ফিসফিস করে বগলাকাকুকে বলল, "মেরে বউয়ের হাঁটুর মালাইচাকি ভেঙে দিয়েছে নাকি বলুন তো? একটা কিছু ঘটেছে সিওর!"
ঠিক এমন সময় গোটা পাঁচেক ম্যাগনাম সাইজের বোলতা কোথা থেকে এসে বোঁ করে উড়তে লাগল। নির্ঘাত আশেপাশে কোথাও বোলতা বাসা বেঁধেছে। আর কাউকে কিছু বলতে হল না। বগলাকাকু দৌড়াতে গিয়ে ভুতুদার সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুজনেই পড়ে গিয়ে আবার উঠে দৌড়াতে লাগলেন। মন্টুকাকু লিকলিকে শরীর নিয়ে পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ভজহরিদা ভয়ে পুলিশ অফিসারের পেছনে লুকাতে গিয়ে এক রদ্দা খেয়ে পড়তে পড়তে কোনওরকমে উঠে পিটটান দিল। পুলিশ অফিসারও জিপে উঠে চম্পট দিলেন। নিমেষে ময়দান ফাঁকা হয়ে গেল।
আমিও দৌড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মে, ২০২০ রাত ১:১৩
৯টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাদা নীল জার্সি

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪২


গায়ে ভাই রে সাদা নীল জার্সি
গন্ধ বাতাসে উম্মুখ হয়ে আছি;
কখন হবে- কণ্ঠ নালীর মিছিল-
তারপর- তারপর- সজোরে কিক
গোল- গোল শব্দটা আনন্দ মুখর!
আমার জার্সির রঙগুলো আত্মহারা
রাতজাগা পাগলাপাড়া ফুটবল খেলা
নয়ন জলে টলমলে- স্মৃতির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইরে এসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

এসো, বৃত্তবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে বাইরে এসো,
কল্পনাতীত উদাত্ত আকাশে চোখ পেতে
দুজনে বসি ঘাস গালিচাতে আজ পাশাপাশি ,
দেখ, পুস্প-ফলে বৃক্ষদের একাগ্র তপস্যা
দেখ, পূর্নিমাকে অর্থ দেয় বিপরীত অমাবশ্যা ।

দেখ, সাপ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীবর্গের দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত নয় কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"হে কাবা! তুমি কতই না উত্তম, তোমার সুঘ্রাণ কতই না চমৎকার! তোমার মর্যাদা কতই না মহান! তবে সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের জান,... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পর্শে_ _ _ _ _

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০

-কি পাও আমার মাঝে ?
-দুটি চোখ।
যেখানে আমার সর্বসুখ নিহিত,
ছমছমে সন্ধ্যা, ভয় জাগানিয়া অন্ধকার রাত,
এসব বৃথা হয়ে যায়,
তোমার একটি ছোঁয়ায়।
তোমার চোখের একটি পলক, আমার হাজার বছর,
আর কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×