somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

(গল্প) হলুদ রঙ

২৫ শে ডিসেম্বর, ২০২৩ দুপুর ২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রায় তিনমাস হলো বাদল নতুন কেনা নিকেতনের এই ফ্লাটে উঠেছে। নয় তলা ব্লিডিং এর পাঁচ তলায় সে প্রায় বাইশো স্কয়ার ফিটের এই ফ্ল্যাটে বউ রিতা আর দুই সন্তান নীলা আর নিলয় কে নিয়ে থাকে।
সারাজীবনের সঞ্চয়ের বিনিময়ে এই নতুন ফ্লাট।
নতুন বিল্ডিং এর সবার সাথে এখনো ভালোভাবে পরিচয় হয়ে উঠেনি বাদলের।
হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয় লিফটে কারো না কারো সাথে। বাদল আন্দাজ করেছে সবাই বোধহয় ফ্লাটের মালিক না,ভাড়াটিয়া ও আছে কয়েকজন, অনেকের সাথে এখনো কোন কথাই হয়নি, শুধু শূভেচ্ছা হাসি বিনিময় হয়েছে।

বিকেলে অফিস থেকে ফিরে বিল্ডিং এর লিফটের সামনে দাঁড়ৈতোই পাশেই এক ভদ্র মহিলাও এসে দাঁড়ালেন লিফটের অপেক্ষায়।
হঠাৎ করেই ভদ্র মহিলা বলে উঠলেন -
“আচ্ছা আপনি কি কখনো উত্তর যাত্রাবাড়ীতে ছিলেন?”
বাদল খুবই আশ্চর্য্য হয়ে বললো,
“জ্বি, ছিলাম ,সে তো প্রায়”
বলেই দেখলো হিসাব ভুলে গেছে,একটু হিসাব করা শুরু করলো মনে মনে ,
সে একুশ বছর বলার আগেই ভদ্র মহিলা বলে উঠলেন-
“একুশ বছর হবে,।”
বাদল আশ্চর্য হয়ে মহিলার চেহরা এক ঝলক ভালোভাবে দেখে নিলো, কিন্তু কোন মতোই কারো সাথে মিলাতে পারলো না।

বাদল নিজের স্মৃতি ক্ষমতার উপর কিছুটা হতাশ হয়ে‌ই বললো.

-“কলেজে পড়তাম তখন, দু’বছর ছিলাম, ওয়াশা গলিতে ছিলাম,বাসার নাম্বারটা মনে নেই, কেনো বলুনতো ?”
ভদ্র মহিলা কিছুটা আশাহত হয়ে বললো-

“ঠিক পাশের দোতলা বাড়ীটা ছিলো আমাদের, আমাদেরটা ছিলো আশি আর আপনি ছিলেন উনাশিতে,সিজারদের বাসায়”।

বাদল এবার সোজাসুজি ভদ্র মহিলার চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছু সময়,
কোনো ভাবেই উনাকে পরিচত মনে হচ্ছে না তার, তবুও হাসি মুখে বাদল বললো,
“আমার স্মৃতিশক্তি খুবই দূর্বল, ক্ষমা করবেন, আপনার দেখি সব মনে আছে,
আসলে বাবার বদলি চাকুরী ছিলো, সারাজীবন অনেক জায়গায় থাকতে হয়েছে,
কলেজ শেষ করে আমরা সিলেটে চলে গিয়েছিলাম, আর আপনাদের তো নিজেদেরই বাড়ী?”
এইটুকু বলতেই লিফটা আবার নিচে নেমে আসলো।
ভদ্র মহিলার লিফটে উঠার কোনো লক্ষনই বাদল দেখলো না,অগ্যতা তাকেও দাড়িয়ে পড়তে হলো।

ভদ্র মহিলা বললেন -“আমি থাকি 7/A তে , আপনি?”
“আমি 5/D তে থাকি” বলেই বাদল লিফটের দিকে তাকালো। লিফট আবার ফিরে এসেছে।

“আপনি প্রায়ই হলুদ শার্ট পড়তেন, হলুদ আপনার প্রিয় রং, তাই না?” বলেই মহিলা ওর দিকে তাকালো।
বাদল এতোই আশ্চর্য্য হলো যে আবারও লিফট এসে কখন যে চলে গেলো সে বলতেই পারবে না।

বাদলের মনে পরে গেলো সেই হলুদ শার্টের কথা, তার বাবাকে কে যেনো হলুদ কাপড় এর একটা থান দিয়েছিলো। বাদলের ধারনা কোন কাজের ঘুষ হিসাবে এই কাপড়ে দিয়েছিলো কেউ তার কেরানী বাবা’কে।বিনে পয়সার কাপড় পেয়ে তার বাবা একসাথে তিনটা হলুদ শার্ট বানিয়ে দিয়েছিলো বাদলকে। কলেজের দু’বছর তাকে এই হলুদ রঙের শার্ট পরেই কাটাতে হয়েছিলো,। সে তখন প্রায়ই মা’র সাথে অনেক ঝগড়া করতো হলুদ শার্ট নিয়ে, বাবা’কে কিছু বলার সাহসই ছিলোনা তার কখনো ।

বাদল বললো, -“আপনার স্মৃতিশক্তি সত্যিই বলার মতো।”
ভদ্রমহিলার চেহারায় কিছুটা প্রসন্ন ভাব নিয়ে বললো- “ আমার একটাই ছেলে ,কলেজে পড়ে, আর স্বামী ব্যাবসায়ী, আমি গৃহিনী, আপনার?”

একথা বলেই বাদলের দিকে উত্তরের আশায় তাকালেন মহিলা-
“ আমার এক ছেলে, এক মেয়ে, বউ ডাক্তার,
আমি ও ব্যাবসা করি”
বলেই বাদল সাথে সাথে বললো
“আজ আসি”।

ভদ্র মহিলা খুবই মনঃক্ষুণ্ন হয়ে বললো,
“আমার নামটা ও জানতে চাইলেন না?, আমার নাম ‘রুমা”
বাদল খুবই অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
“ আমার নাম..”
উনি বাদলকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“থাক আর বলতে হবে না, আমি জানি আপনার নাম।”
বলেই রুমা লিফটের বদলে সিড়ি ভেঙে উঠতে লাগলেন,বাদল খুবই অপ্রস্তুত হয়ে তাকিয়ে থাকলো শুধু।

বাদলের আর দেখা হয়নি কয়েকদিন রুমার সাথে, একদিন আবার লিফটেই মধ্যেই দেখা দু’জনের। রুমার সাথে কিশোর বয়সের একটি ছেলে, বাদল রুমার দিকে তাকিয়ে পরিচিত মানুষের মতো সৌজন্য হাসি দিলো।
রুমা বাদলের দিকে তাকালোই না, দেখে মনে হচ্ছে এ‌ই জীবনে বাদলের সাথে রুমার দেখা হয়নি।
কিশোরটির পরনে হলুদ রঙেরএর একটি শার্ট । কিশোরটি কিছুটা বিরক্ত প্রকাশ করে নীচু স্বরে রুমাকে বললো,
“ মা’ হলুদ রং আমার একটুও পচ্ছন্দ না, তুমি সব সময় আমাকে জোর করে হলুদ রং এর কাপড় পরাও,আমি এখন বড় হয়েছি, কলেজে পড়ি, বন্ধুরা সবাই হাসাহাসি করে,
মা,আমার নিজের পচ্ছন্দ বলেতো কিছু আছে।”
বাদল কিশোরটির দিকে তাকিয়ে দেখলো হলুদ রঙের সার্ট পরাতে তাকে ভালো‌ই মানিয়েছে।

লিফটে রুমা কিছুই বললেন না তার ছেলেকে। লিফট থেকে নামার সময় শুধু বাদলের দিকে নির্লিপ্ত ভাবে একবার তাকালো, ছেলেকে বললো,
এমন ভাবে বললে যেনো বাদল ও শুনতে পায়
-“ হলুদ রং আমারও পচ্ছন্দ না,
তুই বাসায় গিয়ে শার্টটা বদলিয়ে আয়,
হলুদ রঙে চোখে আজ কেমন যেনো অস্বস্তি লাগছে,দেখলেই শরীর গুলিয়ে উঠছে, আর কোনদিন আমার সামনে হলুদ রঙের কাপড় পরবি না, মনে হচ্ছে এখনি বমি করে দিবো”

বাদল খুবই আশ্চর্য হয়ে রুমার দিকে তাকালো, বুঝতেই পারলো না রুমা হঠাৎ এসব কেনো বলছে।
বাদল রুমাকে বললো -“ আপনার শরীর কি খারাপ লাগছে?”
রুমা মুখে একটু ম্লান হাসি এনে বললো- “ইদানিং হলুদ রঙ দেখলেই শরীর গুলিয়ে উঠে,মনে হয় ডাক্তার দেখাতে হবে”
বাদল আর কোন কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলো অফিসের জন্য
————————————
রশিদ হারুন
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০২৩ বিকাল ৩:০৯
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক: একটি প্রগতিশীল (?) অগ্রযাত্রা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১:০৮


আমি আসলে জন্মগতভাবেই খুব আশাবাদী মানুষ। সত্যি বলছি। ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা জারি করল, আমি মনে মনে বললাম , অবশেষে কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×