somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বর্তমানেও অনেক পীর-মাশায়েখ ও বক্তাকে দেখা যায়, যারা হাল্লাজের মর্যাদা বর্ণনায় অনেক গাজাখোরি কাহিনী বর্ণনা করে থাকে।

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সমস্ত বাগদাদের আলেমগণ ঐক্যমতের ভিত্তিতে মানসুর হাল্লাজকে কাফের ফতোয়া দিয়েছেন, এমনকি তার নিজ উস্তাদ জুনায়েদ বাগদাদীও তাকে হত্যা করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন।

যারা মানছুরের সমর্থক তাদের লেখা কিতাব থেকেও একথা প্রমান হয় যে, মানসুর নিজেকে আল্লাহ দাবী করেছিল।

ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ইবনে কাসীর (রঃ) প্রণীত “আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া” , খতীব বাগদাদী (রঃ) এর তারিখে বাগদাদ, ইবনুল জাওজী (রঃ) এর আল মুন্তাজেম ও ইমাম আয যাহাবী (রঃ) এর সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ইত্যাদি নির্ভর যোগ্য গ্রন্থে হাল্লাজের আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মজীবনের উপর আলোচনা এসেছে। সেখান থেকে সামান্য কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্‌ ।

মানসুর হাল্লাজ ২৪৪ হিঃ/৮৫৮ খ্রিঃ জন্ম গ্রহণ করে। তার দাদা পারস্যের অধিবাসী ও একজন অগ্নি উপাসক ছিল। সে ইরাকের ওয়াসেত শহরে জীবনের একটি অংশ অতিবাহিত করার পর বাগদাদে গমন করে । হজ্জ পালনের জন্য কয়েকবার মক্কায়ও গমন করে । বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত, সে যাদু শিখার জন্য ভারতে আসে । সে বলতঃ أدعو به الى الله –আমি যাদুর মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ্‌র দিকে দাওয়াত দেই । (“আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”)

ইবনুল জাওযী বলেন,
-মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার নানা কৌশল তার আয়ত্তে ছিল। সে তার বেশভূষা পরিবর্তন করে এক শহর থেকে অন্য শহরে যেত । মানুষ তার ব্যপারে দ্বিধা বিভক্ত ছিল। সে Pantheism (সর্বেশ্বরবাদ) ও Zoroastrianism (জরাথ্রুস্ট প্রবর্তিত ও জেনদ্-আবেস্তায় বর্ণিত প্রাচীন পারস্যবাসীর অগ্নি উপাসনার ধর্ম) ইত্যাদি দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল । সে সূফীবাদী দর্শন হুলুল ( আল্লাহ্‌ তায়ালা কোন ব্যক্তি বিশেষের মাঝে প্রবিষ্ট হওয়া ) ও ওয়াহদাতুল ওজুদ ( স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে কোন পার্থক্য নেই, স্রষ্টার আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই, সকল সৃষ্টির মাঝে তাঁর অস্তিত্ব বিরাজমান ) এর অন্যতম প্রবক্তা । ওয়াহদাতুল ওজুদ তথা একক অস্তিত্ব এই দর্শনে প্রভাবিত হয়ে সে বলতঃ ما في جبتيي الا الله.- আমার জুব্বার মাঝে যে স্বত্বা রয়েছে তা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কেউ না । أنا الحق - আমি আল্লাহ্‌ ইত্যাদি ।
হাল্লাজের কবিতা সংকলন ديوان الحلاج- থেকে কয়েক লাইন তুলে ধরলাম ।
فإذا أبصرتني أبصرته/وإذا أبصرته أبصرتنا
أنا أنت بلا شـــــــــك فسبحانك سبحاني
وتوحيدك توحـــــيدي وعصيانك عصيانـــي
كفرت بدين الله والكفر واجب
لديَّ وعـنـد المسلمين قبيـح
مُزِجت روحك في روحي كما
تمزج الخمرة بالماء الزلال
فـإذا مسَّـك شيء مسّنــي
فإذاً أنت أنا في كلّ حـال
মানুষকে সম্বোধন করে হাল্লাজ বলছে:
—তুমি আমাকে দেখার অর্থ তাঁকে (আল্লাহ্‌) দেখা
আর তাঁকে (আল্লাহ্‌) দেখার অর্থ আমাকে দেখা ।
আল্লাহকে সম্বোধন করে বলছে
—নিঃসন্দেহে আমি হচ্ছি তুমি (আল্লাহ্‌)
তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করা আমারই পবিত্রতা ঘোষণা করা ।
তোমার তাওহীদ ঘোষণা করা আমারই তাওহীদ ঘোষণা করা ।
তোমার নাফরমানী করা আমারই নাফরমানী করা ।
আমি তোমার দ্বীনের সাথে কুফরী করেছি, কারণ কুফরী আমার জন্য
ওয়াজিব হয়েছে । যদিও মুসলিমদের নিকটে তা নিন্দনীয় ।
তোমার আত্মা আমার আত্মার সাথে মিশে গেছে
যেরূপে মদ সুপেয় পানির সাথে মিশে যায় ।
তোমাকে কিছু স্পর্শ করলে তা আমাকে স্পর্শ করে,
কারণ সর্বাবস্থায় আমিই তো তুমি।
আব্দুর রহমান সুলামী আমর বিন উসমানের সূত্রে বর্ণনা করেনঃ আমর বলেন,
-হজ্জের মৌসুমে আমি হাল্লাজের সাথে মক্কার এক গলিতে হাঁটছিলাম আর কোরআন তেলাওয়াত করছিলাম। হাল্লাজ আমার তেলাওয়াত শুনে বললঃ আমার পক্ষেও এই ধরণের কথা বলা সম্ভব। একথা শুনে আমি তার সঙ্গ ত্যাগ করলাম । (“আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”)

আমর বিন উসমান হাল্লাজকে লানত করত আর বলত, আমার ক্ষমতা থাকলে তাকে নিজ হাতে কতল করতাম । (“আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”)

আবু জুর’য়া আত তাবারী বলেনঃ আমি আবু ইয়াকুব আল আকতা’য় কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ
-হাল্লাজের প্রতি মুগ্ধ হয়ে আমি আমার বোনকে তার সাথে বিবাহ দেই। কিছু দিন পর আমার নিকট পরিষ্কার হয়ে যায়,সে একজন যাদুকর, প্রতারক, খবীস ও কাফের। (“আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”)

আব্দুর রহমান সুলামী আমর বিন উসমানের সূত্রে বর্ণনা করেনঃ আবু বকর বিন মিনশাদের নিকট এক ব্যক্তি আসল। যার সাথে একটি থলে ছিল । রাতে-দিনে কক্ষনো সে থলেটি নিজের কাছ থেকে দূরে রাখত না । লোকেরা কারণ অনুসন্ধানের জন্য থলেটি খুললে মানসুর হাল্লাজ প্রেরিত একটি চিঠি পেল । যার শিরোনাম ছিল- من الرحمن الرحيم الى فلان ابن فلان- রাহমান রাহীমের পক্ষ হতে .........। হাল্লাজ চিঠিটির সত্যতা স্বীকার করল। লোকেরা তাকে প্রশ্ন করল, তুমি কি নিজেকে আল্লাহ্‌ দাবী কর ? জবাবে সে বললঃ না, তবে আল্লাহ্‌ ও আমি তো একই সত্ত্বা । (“আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”)

হাল্লাজ তার খাস মুরিদদের মাধ্যমে পাহাড়ী এলাকার সহজ-সরল মূর্খ মানুষদের প্রতারিত করে হাজার হাজার স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা উপার্জন করেছে । তার মিথ্যা কারামতির কৌশল জেনে ফেলায় একজনকে গুপ্ত ঘাতক পাঠিয়ে হত্যার হুমকিও দিয়েছে । এসব প্রতারণার কাহিনী ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে উল্লেখ করেছেন।
বাগদাদের আলেমরা হাল্লাজ কাফের ও মুরতাদ হওয়া ও তাকে হত্যার ব্যপারে একমত পোষণ করেন । তখন বাগদাদ ছিল পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় আলেমদের আবাস । (“আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”)
৩০৯ হিঃ/৯২২ খ্রিস্টাব্দে হাল্লাজকে মৃত্যু দণ্ড দেওয়া হয় ।

ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ যে আকীদা পোষণ করার কারণে হাল্লাজকে হত্যা করা হয়েছে, সেই আকীদা যদি কেউ পোষণ করে সে মুসলিমদের ঐক্যমত অনুযায়ী কাফের ও মুরতাদ । মুসলিমরা হুলুল, ওয়াহদাতুল ওজুদ ইত্যাদি আকীদা পোষণ করার কারণে তাকে হত্যা করেছে । যেমন সে বলতঃ আমি আল্লাহ্‌, আসমানে এক প্রভু রয়েছে ও জমিনে আরেক প্রভু রয়েছে । তার কিছু যাদুকরী ক্ষমতা ছিল । যাদুর উপর কয়েকটি বইও লিখেছিল । (মাজমুয়ুল ফাতওয়া)
তিনি আরও বলেনঃ
-আমি মুসলিমদের কোন আলেম ও মাশায়েখ সম্পর্কে জানিনা, যারা হাল্লাজ সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখে । তবে কিছু লোক হাল্লাজের আকীদা সম্পর্কে না জানার কারণে তার প্রশংসা করেছে । (“আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া”)

বর্তমানেও অনেক পীর-মাশায়েখ ও বক্তাকে দেখা যায়, যারা হাল্লাজের মর্যাদা বর্ণনায় অনেক গাজাখোরি কাহিনী বর্ণনা করে থাকে। তারা হয় হাল্লাজের আকীদা সম্পর্কে জানে না অথবা একই আকীদা পোষণ করে গোমরাহিতে লিপ্ত রয়েছে।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝর্ণা জল

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২১


আমি ব্যস্তবতা দেখি
পানকৌড়ির সাঁতার-
কল্পনায় শুধু স্বপ্ন আঁকি,
মধ্যবিকাল ঢেউ তোলা সাগর
হতাশা ডিঙিয়ে যায়- নিরিবিলি
রাত দুপুরের বাসর।

উড়ে ধোয়া, নিঃশ্বাসে সাদা বক,
খেলা করে যে, প্রণয়ের চক-
নীল মেঘ ভীর জমায়, বর্ষা কাঁদাময়,
ভোরের ক্লান্তি দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কো রুবিও ভারতে কী করছেন?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২


আওয়ামী দোসর নবনীতা আপার মতে, মার্কো রুবিও ভারতে গেছেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে। ডিসেম্বর মাসে যাতে শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন, সেই আলোচনা করতেই নাকি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×