somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈশ্বরের চর দখল

১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঈশ্বরের চর দখল



অক্সিজেন ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব না। ঠিক তেমনই উপাসনা ছাড়া ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। মানুষের উপাসনা না পেলে ঈশ্বরের মৃত্যু ঘটে, তাই বেঁচে থাকার জন্য ঈশ্বর মানুষের থেকেও বেশী মরিয়া। এক জন মানুষ মড়ে গেলেও তার বংশধর থাকে, কিন্তু ঈশ্বরের মৃত্যু ঘটা মানে নির্বংশ হয়ে যাওয়া। তাই বেঁচে থাকার যুদ্ধ মানুষ থেকে ঈশ্বরের জন্য বেশী কঠিন।



মানুষের উপাসনা পাবার জন্য ঈশ্বরের যুক্তি একটাই, তিনি সব কিছুর স্রষ্টা। আর সেটা বিশ্বাস করাবার জন্য পথ মাত্র দু'টি। একটা হচ্ছে লোভ আর একটা হচ্ছে ভয়। ঈশ্বর প্রথমে তার উপাসনা করার জন্য মানুষকে লোভ দেখান। তার উপাসনা করলে এটা দিব, ওটা দিব; মানুষের আরাধ্য সব জিনিস। আর লোভে যদি কাজ না হয়, তাহলে দেখানো হয় ভয়। আর এই পুরো প্রকৃয়াটা চালানোর জন্য একটি বিধান দেয়া হয়। সেই বিধানের বাইরে যাই থাকে তার সবই অন্যায় ও অনৈতিক। আর বিধানের ভেতরের সব কাজ ঠিক মতো করলেই লোভনীয় সব জিনিস পত্র পাবার হাতছানি। আর বিধানের বাইরের কাজ করলে ভয় ভীতি দেখানো শুরু হয়ে যায়।



হীরক রাজার দেশে সিনেমাটি যাদের দেখা আছে, তাদের কাছে হীরক রাজের একটা উক্তি মনে থাকার কথা, "এরা যতো বেশী পড়ে, ততো বেশী জানে, ততো কম মানে"। রাজা মশাই জ্ঞান ও উপাসনার মাঝের মূল সূত্রটি ধরতে পেরেছিলেন। তাই তিনি তার প্রজাদের বেশী জানার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন পাঠশালা বন্ধ করে দিয়ে। তাতে প্রজাদের বেশী পড়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, আর পড়তে না পেলে জানার রাস্তাও বন্ধ। প্রজা যতো কম জানে, ততোই তাদের ঘাড়ে আরো বেশী করে চেপে বসা যায়।



আমাদের ঈশ্বরও এই কথাটি জানেন। তাই ঈশ্বরের বিধানে জ্ঞান অর্জনের সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। ঈশ্বরের দেয়া বিধানে একমাত্র যে জ্ঞানের চর্চা করতে বলা হয়েছে সেটা হলো ঈশ্বর সংক্রান্ত জ্ঞান। ঈশ্বরের রূপ, ঈশ্বরের জ্ঞান, ঈশ্বরের ক্ষমতা, ঈশ্বরের বিধান ইত্যাদির বাইরে জ্ঞান চর্চা করা ঈশ্বরের দেয়া বিধানে নিষিদ্ধ। যে কোন নতুন জ্ঞান ঈশ্বরের বিধানে নিষিদ্ধ। কেন? কারন নতুন জ্ঞান মানেই নতুন কিছু জানা, আর নতুন কিছু জানা মানেই নতুন নতুন প্রশ্ন আর ঈশ্বরের উত্তর দিতে না পারা, আর উত্তর দিতে না পারা মানে হলো ঈশ্বরের দূর্বলতা, আর ঈশ্বরের দূর্বলতা মানে হলো মানুষের ঈশ্বরের ভয় থেকে মুক্ত করার সম্ভাবনা, আর ঈশ্বরের ভয় থেকে মুক্ত অবার মানে হলো ঈশ্বরের উপাসনা না করা।



মানুষ যতো কম জানে, ঈশ্বর ততোই তার ঘাড়ে চেপে বসে সিন্দবাদের ভূতের মতো। মানুষ যখন কাঁচা মাংশ খেত তখন আগুন তার কাছে অপার্থিব একটা জিনিস। ঈশ্বর তাকে আগুনের কাছে যেতে মানা করে দিলেন। বললেন ওটা মানুষের জন্য নিষিদ্ধ। মানুষকে আগুন থেকে দূরে রাখা হলো। তার পর এক সময় মানুষ আগুনকে ইচ্ছে মতো জ্বালাতে শিখে গেল। ঈশ্বরের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকলো না। আগুন জ্বালানোর জ্ঞানটা যখন সবার হাতে পৌঁছে গেল, তখন ঈশ্বর বললেন যে তিনিই তো তার পোষ্যদের জন্য আগুন পাঠালেন তাদের আরামের জন্য। মূর্খ মানুষ বললো "আহা... ঈশ্বর কতো মহান"! মানুষের জন্য ঈশ্বরের রূপ নিয়ে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ। তাই মানুষ সেটা করে না, ঈশ্বরের ভয়ে। কিন্তু স্বভাবের দোষে মানুষের প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে তার পালানোর পথ খুঁজে না পেয়ে ঈশ্বর চন্দ্র সূর্য ইত্যাদি দেখিয়ে বললেন যে সেগুলোই ঈশ্বরের রূপ। কিন্তু একটা সময় মানুষ জেনে গেল যে সেগুলো ঈশ্বর না, চন্দ্র-সূর্যের রূপ আবিষ্কার করে বসলো সে। ঈশ্বর দেখলেন সমূহ বিপদ উপস্থিত। ঈশ্বর চন্দ্র-সূর্কে দখল করে বসলেন। বললেন, আরে, ওরা তো আমারই সৃষ্টি। আমি তো তোমাদের জন্যই তাদের বানিয়েছি। তিনি তার বিধান সংশোধন করে দিলেন। বলে দিলেন যে মানুষের থাকার জায়গা, যেটার নাম পৃথিবী, সেটার চারপাশে চাঁদ-সূর্য ঘুরতে থাকে, শুধুই মানুষকে সার্ভ করার জন্য। মানুষ আবার খুশী হয়ে গেল, "আহা... ঈশ্বর কতো সদয়"। বেয়াদব মানুষ তখন প্রশ্ন করে যে রাতে সূর্য আর দিনের বেলায় চাঁদ কোথায় যায়? ঈশ্বর দেখেন মহা বিপদ! বলে দিলেন যে ওরা তখন আমার সিংহাসনের নিচে বিশ্রাম নেয়! মানুষ প্রশ্ন করে পৃথিবী কিসের ওপর আছে? ঈশ্বর উত্তর দেন তারা একতা ষাড়ের শিং এর ওপর আছে ইত্যাদি। মানুষও ঈশ্বরের ক্ষমতার কথা ভেবে খুশী।



একটা সময় মানুষ ঈশ্বরের বিধানে দেয়া সীমা ভেঙ্গে আরো জ্ঞান অর্জন করলো। তার জন্য বিষ পানে মৃত্যু, আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু, গৃহবন্দী হয়ে মৃত্যু ইত্যাদি অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে। তার পরেও মানুষ জ্ঞান অর্জনের পথে এগিয়ে গিয়েছে। অর্জিত জ্ঞান সবার মাঝে ছড়িয়েও দিয়েছে। হাজার বছরের একচ্ছত্র রাজত্বকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দেয়ার ব্যাবস্থা করে দিল নবলব্ধ জ্ঞান। ঈশ্বর হন্তদন্ত হয়ে তার লাঠিয়াল বাহিনীকে আদেশ দেন "এই ব্যাটারা! যা, দখল কর"! লাঠিয়াল বাহিনী গিয়ে জ্ঞান প্রাকৃত জনে ছড়িয়ে যাবার আগেই দখল করে নিল। কি সেই জ্ঞান? সৌরজগৎ, মহাকাশ, নক্ষত্র ইত্যাদি। ঈশ্বর সেই জ্ঞানের আলোকে তার বিধান আপডেট করলেন। আকাস বাতাস ও মহাকাশের আলোকে তার অবস্থান ঢেলে সাজালেন। তার পর সেটা ছড়িয়ে দিলেন সবার মাঝে, তখন সবাই ভাবলো "দেখেছো ঈশ্বরের কতো ক্ষমতা। তিনি সেই সাত আকাশের ওপরে বসে কতো কিছু দেখেন!" তার পর কতো দিন কেটে গেল, কতো কিছু হলো, কতো জ্ঞান যোগ হলো মানুষের জ্ঞান ভান্ডানে। দখল করতে করতে এখন ঈশ্বরের লাঠিয়াল বাহিনীও ক্লান্ত। ছোট খাট কিছু হলে সেটা ছেড়ে দেয় সাব কনট্রাক্টে। সেই সাব কন্ট্রাক্টরেরা তখন বিজ্ঞানের ছোট খাট আবিষ্কার দখল করে দেয়। আর বড় কোন জ্ঞান আবিষ্কার হলেই কেবল এখন ঈশ্বরের এলিট ফোর্স আসে সেটা দখল করতে।



এলাকার মোড়লদের মতো, ছোট খাট খাল-বিলে চর জাগলে তেমন গা করেন না, কিন্তু পদ্মার চর দখল করতে যায় তাদের খাস লাঠিয়াল বাহিনী। এই যেমন এখন ঈশ্বর দখলের চেষ্টা করছেন অচিন্তনীয় মহাবিশ্বের এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত রহস্যসমূহ। সৌরজগতের তুলনায় এটা একটু বেশীই বড়। তাই পুরনো বিধানে চলছে না। মানুষ বেমক্কা প্রশ্ন করে তাকে বপদে ফেলে দিচ্ছে। তবে ঈশ্বর হাল ছাড়ছেন না, পদ্মার চর বলে কথা, সেটা তো দখল করতেই হবে!



হীরকরাজ পাঠশালা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কী বোকা। পাঠশালা বন্ধের রাস্তা এখন বন্ধ, ঈশ্বর তাই পাঠশালা দখল করে নিয়েছেন! কী চালাক!
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:১০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×