গতকাল গেল বছর বিক্রিত বইয়ের রয়েলিটির টাকা পেলাম। লেখকের জন্য এটি কতো বড় আনন্দের তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
আজ থেকে এক যুগ আগে দৈনিক ইত্তেফাক থেকে প্রথম যখন লেখার বিল পেলাম। টাকাগুলো হাতে নিয়ে বেশ কিছু সময় নেড়েচেড়ে দেখলাম। গন্ধ শুকলাম। আঁশটে মাছের গন্ধসমৃদ্ধ টাকাকে মনে হয়েছিল বিশ্বখ্যাত কোন পাফিউম মাখানো টাকা।
আব্বা আমার লেখালেখির ঘোর বিরোধী। তবুও তার জন্য হাজার দুয়েক টাকা দিয়ে একটা পাঞ্জাবি কিনে ফেললাম। তখন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। আব্বা খুব হিসেব করে টাকা দিতেন। প্রয়োজনের অধিক খরচের জন্য টাকা দিতেন না। তাই হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "টাকা কই পাইলি?"
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আব্বা ধমক দিয়ে বললেন, "কথা কস না ক্যান? টাকা কই পাই লি?"
ঢোক গিলে বললাম, "ইত্তেফাক থেকে পাইছি। আমার লেখার বিল।"
তিনি পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, "সুন্দর হইছে।"
মা'র জন্য একটা গায়ের শাল কিনেছিলাম। মা বললেন, "তোর টাকা তুই খরচ কর। কেন আমাদের জন্য কিনতে গেলি।"
আমার চোখে অশ্রু নেমে এলো। আনন্দাশ্রু। সন্তানের প্রথম হালাল রুজির অর্থ দিয়ে পিতা-মাতার জন্য কিছু একটা কিনতে পারার আনন্দের চে' বড় কোন আনন্দ পৃথিবীতে আছে কিনা আমার জনা নেই।
বাংলা একাডেমি থেকে ছয় মাসে তরুণ লেখক প্রকল্পের ২৪ হাজার টাকা বৃত্তি পেয়েছিলাম। সেই টাকা জমিয়ে মায়ের জন্য একজোড়া কানের দুল কিনলাম। আমি তখনো বেকার। মা চিৎকার করে বললেন, "এই তুই এতটাকা কই পাইলি? তোর বাপের কোন টাকা চুরিটুরি করস নাই তো?"
আমি হেসে বললাম, "না মা। বাংলা একাডেমি থেকে তরুণ লেখ প্রকল্পের বৃত্তি পাইছি।"
মা খুব যতন করে সেই কানের দুল তুলে রেখেছেন।
ক'মাস আগে এনটিভি থেকে প্রথম প্রডিউস করা নাটকের বিল পেলাম। লাভের টাকা থেকে আব্বার জন্য একটা স্যুটের কাপড় কিনলাম। মা'র জন্য একটা শাড়ি। মিডিয়া থেকে জীবনের প্রথম উপার্জন বলে কথা। এবার আর আব্বা জানতে চান নি, টাকা কোথায় পেলাম। শুধু বললেন, "বেশ দামি মনে হচ্ছে রে। শুধু শুধু এতগুলো টাকা অযথা কেন নষ্ট করলি?"
...এবার টাকাগুলো কী করবো ভাবছি। আমার লেখালেখির টাকা দিয়ে সংসার চলে না। দরকারও পরে না। কিছু লোকের কাছে আমি ঋণি। যাঁদের উৎসাহ অনুপ্রেরণা না পেলে হয়তো লেখা-লেখি নিয়ে ভাবতাম না কখনোই। ভাবছি এবার তাঁদের জন্য কিছু কিনবো। নটরডেম কলেজের আমার প্রিয় শিক্ষক, ইংরেজির সুশীল স্যার (বর্তমানে অবসরে আছেন খুঁজে বের করতে হবে)। পরিসংখ্যানের ফিলিপ স্যার। বাংলার অমল এ্যাঞ্জেল রোজারিও, সোহেল স্যার(কলেজে নেই খুঁজে বের করতে হবে)। তাঁদের মাঝে একজন এই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন, ফাদার বুকল এস রোজারিও স্যার। আমার লেখালেখির পেছনে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
আমার বন্ধুরা যারা আমার প্রথম প্রকাশিত(কাঁচা হাতে অতি বাজে লেখা) বইটি একেকজন তিন চার কপি করে কিনেছিল! নটরডেমে নবীন বরণের দিন কলেজ থেকে অনুমতি নিয়ে আমার বই বিক্রির স্টল করে কয়েক হাজার টাকার বই বিক্রি করে দিয়েছিল। একে ওকে ধরে বলেছিল, "আমাদের বন্ধু লেখক! এটা ওর লেখা বই!"
এখনো যারা ফোন করে জানতে চায়, আমার নতুন কোন লেখা বের হবে কিনা। লেখালেখির গ্যাপ তৈরী হলে আমার চে' তারা অধিক বিচলিত হয়ে পড়ে। ধমক দিয়ে লিখতে বলে। বর্তমানে তারা সবাই অতি ব্যস্ত। তবুও আমার খুব ইচ্ছা তাদের নিয়ে একটি ঝম্পেস আড্ডা দিয়ে বাকি টাকাগুলো খরচ করবো।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৫:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




