somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কবি হাফেজ আহমেদ
আমি একজন বাঙ্গালি। বাংলা আমার ভাষা, নিভৃত আবাস ও অহংকার। বিঃ দ্রঃ- ব্লগে ছন্দ নামে দ্বন্দ্ব নাই।

স্যার.......। {{{ ছোট গল্প }}} পর্ব ০১

২১ শে জুন, ২০১৬ রাত ৮:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রুদ্র আর দুরন্ত ওরা দু`ভাই । ছোট বেলা হতেই যেমন মেধাবী তেমনি দুষ্ট প্রকৃতির। গ্রামের কাদামাটি আর মুক্ত বাতাসে প্রকৃতির বুকে ওদের বসবাস। পাড়ার নবীনদের অভিভাবকগন ওদের প্রতি অতুষ্ট থাকলেও প্রতিটি কিশোরের কদর ছিল এ দু`ভাই। বাবা মতিন সরকারি স্কুলের দু`বার গোল্ড মেডেল পাওয়া একজন সুনামধন্য শিক্ষক। বোর্ড পরীক্ষায় তার বিষয়ে আজ পর্যন্ত কোন ছাত্র অকৃতকার্য হওয়ার রেকর্ড নেই।
ঘড়ির কাটা যখন রাত আটটা তখনও ঘরে ফেরেনি ওরা। মতিন খুব চিন্তায় পড়ে গেল। জাহানারা বেগম ঠাট্রার মাঝে বিষয়টি যতই ধাপাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে ততই শুনতে হয় মতিনের কড়া হুশিয়ারি। জাহানারা বেগম ওদের মা। দু`ভাই তাদের গোপন কোন কথা বাবার সামনে বলার সাহস আজ পর্যন্ত পায়নি। আলমারিতে সাজানো যতগুলো ক্রিয়া পদক আর ক্রেষ্ট জমেছে বলতে গেলে জাহানারাও তাতে সমান অধিকারী। ছেলেদেরকে জীবনে কোনদিন কোন কটুকথা বলেনি এই মা। সবসময় উৎসাহ উদ্দীপনার মাঝে মমতার আচঁলে লালন করত ওদের। হাত পাতলেই দু`ভাই প্রতিযোগীতার ছলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের আচঁলে। ঘড়ির কাটা ৯টা অতিবাহিত হতে দেখায় জাহানারার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। মুখে ফুটছেনা কোনা কথা, হৃদপিন্ডের অনল বাষ্প হয়ে যেন ঝরছে তার ঘার্মাক্ত কপালে। যিনি এতক্ষন মতিনের মন ভুলাতে যুদ্ধ করেছে তার এমন চেহারা মতিনকে ভাবিয়ে তুলল। রাগী মেজাজের মানুষ হলেও মনে মনে একথা সে ভালো করে জানতো যে, ছেলেরা মায়ের কথা ছাড়া কখনো এক ছুলও নড়েনা। রজনী গভীর হওয়ার সাথে সাথে জাহানারার কলিজায় চিড়চিড় করে টান মেরে উঠে।
এইমাত্র ফাহিম হাপাতে হাপাতে এসে বলল, ওরা নাকি হসপিটালের ইমারজেন্সিতে আছে। জাহানারা চিৎকার করে মতিনকে নিয়ে বেহুশ হয়ে ছুটল হসপিটালের দিকে। তথ্যকেন্দ্র হতে শুরু করে পুরো হসপিটাল তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও মেলেনি এই নামের কোন রুগীর সন্ধান। জাহানারার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। মেইন গেটের আবছা আলোর ল্যামপোষ্টের পাশে জাহানারাকে রেখে দিশেহারা হয়ে মতিন ছুটলেন রিচার্জ করতে। জাহানারার ক্লান্ত লোচন গিয়ে ঠেকছে দেয়ালের এপাশ হতে ওপাশ। হঠাৎ পিছন হতে কে যেন শড়ীর আচঁল টেনে ধরল। চিৎকার করে অবাক নয়নে তাকাতেই দেখল দু`ভাই চুপচাপ দাড়িয়ে আছে। স্তব্দ হয়ে জাহানারা হাত বাড়ালেই মা বলে চিৎকার করে ওরা ঠাই নেয় তার কলিজায়। জাহানারার বক্ষ শীতল হয়ে টলমলিয়ে ঝরছে টাটকা চোখের জল আর মমতার কোমল সুরে প্রশ্ন করছে। এতক্ষন কোথায় ছিলে? কি হয়েছে তোদের? এখানে কেন? দুষ্ট ছেলেরা মায়ের প্রশ্নের জবাব না দিয়েই বলল পালও পালাও ঐ যে দেখ কে আসছে। মতিনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক পলকেই ওরা সিঁড়ির রুমের একটু আড়ালে দাড়িয়ে গেল। জাহানারা বেগমও নিল তাদের পিছু। জাহানারা সব কিছু শুনার পর একসাথে ছুটল ইমারজেন্সি রুমের দিকে।

এতক্ষনে নীলার জ্ঞান ফিরেছে। নীলা শহরে থাকে, গ্রীষ্মের ছুটিটে সে তার মামার সাথে গ্রামে বেড়াতে আসে। কে জানতো বিকেল বেলায় মামাতো বোনদের সাথে ঘুরতে বের হলেই রুদ্রের ব্যাট হতে বল গিয়ে এতবড় বিপদ ডেকে আনবে। নীলার মাথায় বল পড়ার সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। আর তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ে আসা হয় হসপিটালের ইমারজেন্সিতে। জ্ঞান ফেরার পর নীলা শুধু মা মা বলে ডাকছে আর কাঁদছে। নীলার মামা পাশে বসে শান্তনা দিলেও ঘরে তার নবজাতক শিশুর জন্ম হওয়ায় আসতে পারেনি রহিমের স্ত্রী। জাহানারা ইমারজেন্সীতে ডুকেই বলে উঠল, আরে রহিম ভাই ! রহিম নীলার মামা আর মতিনের বাল্য বন্ধু। এর মাঝে মতিনেরও আবির্ভাব হল।মতিনের ক্লান্ত ঘার্মাক্ত আর ফ্যাকাশে চেহারা আজ রাগের অন্তরালে লুকায়িত গভীর ভালোবাসার ইঙ্গিত প্রদান করে। জাহানারা জানতে চাইলো রুদ্র আর দুরন্ত কই গেল? তারপর দরজায় এসে এদিক ওদিক তাকিয়েও মিলেনি ওদের কোন সন্ধান। জাহানারার মোবাইলও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। মতিনের মোবাইল নিয়ে কল দিলেই প্রথমে চুপ থেকে পরে রুদ্র বলে উঠল আমরা বাড়ি যাচ্ছি তোমরা চলে এসো আম্মু।

ডাঃ নীলাকে রিলিজ দিলেও মায়ের জন্য সে অজস্র কান্না করছে। রহিমের বাড়ীতে এই অবস্থায় নীলাকে দেখে রাখার কেউ না থাকায় জাহানারার সাথে নীলাকে রাখতে রহিমের কোন আপত্তি রইলনা। রহিম নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। দু` ছেলের দুরন্তপনায় খুব চিন্তিত হয়ে উঠলেন মতিন। বাড়িতে মতিনের আগমন টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দৌড়ে পালাতে গিয়ে মতিনের সামনেই উল্টো ফেঁসে গেল ওরা। ভয়ে গাল ফুলিয়ে চোখ নামিয়ে দাড়িয়ে রইল দু`ভাই। সামনে পিছে কিংবা পাশে কোন দিকেই পালানোর আর সুজোগ রইলনা। মতিন চুপচাপ শান্ত কোমল নয়নে তাকিয়ে রইল ওদের প্রতি। অতঃপর আস্তে আস্তে দু`কদম সামনে বাড়িয়ে কাপা কাপা ঠোঁটে সন্তানদেরকে জড়িয়ে নিলেন প্রশান্ত বক্ষে। বাবার পরশে ওরাও নিমেশেই মিশে একাকার। নীরব পরিবেশে মাথায় হাত বুলিয়ে ওদেরকে জাহানারার কাছে যাওয়ার ইশারা দিয়ে পকেট হতে রুমাল বের করে নিল মতিন। একদম চুপচাপ ভেজা চেহারায় শান্ত পায়রার মত আস্তে আস্তে গিয়ে জাহানারার কলিজা শীতল করে দিল দু`ভাই।

একটুপর নীলাকে দেখতে পেয়ে রিতিমত হতভম্ব হয়ে গেল দু`ভাই। এতোক্ষণ আড়াল হতে সন্তান আর বাবা মায়ের এক অদ্ভুত মোহের দৃশ্যে সিক্ত হয়েছে নীলর দু`নয়ন। জীবনে এমন কোনদিন বাবার পরশ তার কপালে জুঁটেনি। জাহানারা নিজ হাতে ওদের তিনজনকে খাইয়ে দিল। এ যেন অন্য এক জগতে নীলার আবির্ভাব। এদের প্রতিটি আচরন মায়া মমতা তাকে শুধু অবাক-ই করেনা আসলে সে বুঝে-ই উঠছে না এ কি দুনিয়া নাকি স্বর্গ না অন্য কোন জগৎ। নব প্রত্যুষের লগ্নে কোকিল ডাকা ভোরে দামি গাড়ির হর্নে ঘুম ভাঙ্গল সবার।

রহিম নীলার বাবা মাকে নিয়ে হাজির হলেন কিন্তু জাহানারা ওদেরকে খালি মুখে যেতে দিতে নারাজ। নানা আয়োজন করলেও নিলার বাবা গফুর চৌদুরীকে এক কাপ চা পান করেই ওদেরকে রেখে বিদায় নিতে হল। তবে যাওয়ার সময় নীলার কপালে চুমু খেতে এসেই হঠাৎ তার চোখ লাল হয়ে চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তবুও কিছু না বলে চুপচাপ অট্রহাসিতে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হল। তিনি শহরের অনেক বড় শিল্পপতি। কর্ম ব্যাস্ততা কখনো তার পিছু ছাড়েনা। ফারিয়া অনেক দিনপর বাবর বাড়ির স্পর্শ পেয়ে খুব আনন্দিত তবে পূর্ব পরিচয় থাকায় মা মেয়েকে আজ থেকে যেতে হল রুদ্রদের বাড়িতে। এভাবে ১১ দিন তারা নীলার মামার বাড়িতে আর দুরন্তদের বাড়ীতে কাটিয়ে দিল। ঘটে গেল জীবনের অজস্র স্মৃতিময় ঘটনা ওদের। এই সেই এতিম ফারিয়া যার সাথে জাহানারার রক্তের বাধন ঘটেছে। বিবাহের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় থাকাকলীন জাহানারা এই পাপীষ্ঠ সমাজের চোখ ফাঁকি দিয়ে আপন কিডনী দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন তাকে। তাবে ওরা মেয়ে হওয়ায় ভবিষ্যাত চিন্তা করে সমাজের কাছে বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।

দুরন্ত আর রুদ্র প্রতিদিন নীলার মামার বাড়িতে গিয়ে তাকে নিয়ে আসত। দিনভর গাছে গাছে চলত ওদের আম, জাম, লিচি সহ ভিবিন্ন ফলমূল কুড়ানো আর গল্প গানে বিকেল বেলায় দিঘির পাড়ের সবুজ ঘাসে আড্ডায় মেতে থাকত ওরা। এই কয়েক দিনে নীলাও হয়ে গেছে গাছের বানর। একদিন নীলা মই দিয়ে গাছে উঠে নামতে না পারায় দু`ভাইয়ের ঘাড়ে ভর নিয়ে নামিয়েছিল তাকে। ১২ দিন পর একদিন সকালে হঠাৎ রহিমের ঘরের দরজায় জুলন্ত তালা দেখে দুরন্ত আর রুদ্রকে মলিন মুখে মায়ের কাছে ফিরে আসতে হল।

এদিকে মতিন আজ সাফ সাফ জানিয়ে দিল খেলাধুলা একদম বন্ধ। দেড় বছর পর এস এস সি ফাইনাল পরীক্ষাকে ইঙ্গিত করেই মতিনের এমন হুশিয়ারি। তবে, হুশিয়ারির আগেই তাদের মন ভেঙ্গে আছে এমনিতেই আজকাল তাদের মন এগুচ্ছেনা খেলার মাঠে। কী যেন হারিয়ে ফেলেছে ওরা। সকালে জাহানারার সাথে ফারিয়ার কথা হলেও নীলা ছিল স্কুলে। সে অষ্টম শ্রেণীর একজন মেধাবী ছাত্রী। শহরের নামকরা স্কুল আর দামি গাড়িতে ওর চলাফেরা। সন্ধায় জাহানারা হঠাৎ রুদ্রকে ডেকে মোবাইল হাতে দিল আর নীলার হাউমাউ করে কান্না শুনে ওদের মনের আকাশে জমে থাকা সমস্ত অভিমানের কালো মেঘের ছায়া এক নিমিষেই আড়াল হয়ে গেল। প্রানভরে কথা বলার পরও ওদের সবার মনে রয়ে গেল শূন্যতা আর হাহাকার।এভাবে যোগাযোগ চলতে থাকে দু পরিবারের আর দিন দিন বাড়তে থাকে ঘনিষ্ঠতা। গত বছরের দুটি ঈদেই রুদ্রের পরিবারে আমন্ত্রিত মেহমান ছিল ফারিয়ারা। জাহানারার সাথে ফারিহার কথা ছলে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা। ঈদের সময় নীলাকে আবার কাছে পেয়ে ওদের আনন্দ উল্লাস দেখে ফারিয়া জাহানাকে অনুরোধ করল দুরন্ত আর রুদ্র যেন ভবিষ্যাতে তার কাছে থেকে শহরে পড়াশুনা করে। কিন্তু প্রস্তাবটি মতিনের কানে আসলে ওনি সরাসরি নাকোছ করে দেয়। নীলা জন্মদিনে ঢাকায় থাকায় দুরন্ত তার জন্য গিফট নিয়ে রেখেছিল। সেটি ছিল লাভ আকৃতির একটি কাপেল। সাথে একটি গোলাপও নীলার হাতে তুলে দিয়েছিল দুরন্ত। রাতভর নীলা ঐ গিফট গুলোর হুবহু ছবি এঁকে রুদ্রের অগোচরে তার ব্যাগে রেখে দেয়। বিষয়টি দুরন্তের নজর কেড়েছে।
পরীক্ষাকে সামনে রেখে পড়াশুনায় খুবই মনোযোগী দু ভাই। পরীক্ষা চলাকালীন জাহানারা তার কলিজার টুকরা দু`সন্তানকে সাথে নিয়ে যেতেন আবার অপেক্ষায় থেকে নিয়ে আসতেন। রেজাল্টের দিন সকাল হতেই থেমে ছিলনা ফারিয়ার ফোন। জোড়া গোল্ডেন প্লাসের আনন্দে ছাত্রশিক্ষকের সাথে আহলাদে ফেটে পড়েছিল গ্রামবাসীরাও। গ্রামের স্কুলের জন্য এটি ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। বড় হয়ে ছেলেরা ডাঃ হয়ে মানব কল্যানে কাজ করবেন, বাবা মায়ের সাথে দু`ভাইয়েরও ছিল একই সপ্ন। প্রধান শিক্ষক পরিমল বাবু মতিনকে ডেকে গ্রামের পরিবেশ তুলে ধরলেন। এবং এতেকরে ছেলেরা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে শহরের নামকারা কলেজে ভর্তি করিয়ে ওদের মেধা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। পরিমল ছিল মতিনের সবথেকে কাছের বন্ধু। মতিনের কোন আত্মীয় স্বজন শহরে না থাকায় অবশেষে ফারিয়ার প্রস্তাবই মাথা পেতে নিতে হল তাকে। ভলোবাসা আর আবেগের অন্ধমায়ায় ছেলেদের ভবিষ্যাত মাটি করে দিতে রাজি নেই জাহানারাও।

দু`ছেলের মাঝখানে শুয়ে না ঘুমিয়ে বারবার ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে আর মাথায় হাত বুলিয়ে কেটেছে জাহানারার সারাটি রাত। মতিন এসে মশারিটা লাগিয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়াল। অথচ সন্তানেরা কোনদিন টেরও পায়নি যে, ওদের বাবার এমন অজস্র রজনী একলা বিষাদে কেটেছে শুধুমাত্র সন্তানের উজ্জল ভবিষ্যাত কামনার ভাবনায়। বাবার রক্তবর্ণ নয়নের অন্তরালে ঢাকা থাকে যে প্রশান্ত হৃদয়ের ভালোবাসা তা বুঝারমত সৌভাগ্যবানের সংখা এই জগতে অতি নগণ্য। সকাল ভোরেই ফারিয়ারা এসে হাজির। নীলার বাবার অতি ব্যাস্ততার কারনে জাহানারার সমস্ত আয়োজন ছিল বৃথা। খুব তাড়াহুড়ার মাঝে আজ বিদায় দিতে হল দু`টুকরো কলিজার ধন। জাহানারা ফারিহাকে আড়ালে ডেকে বলেছিল "বোন আমার আজ থেকে তুমি ওদের মা, আমার নাড়িছেড়া কলিজার ধন তোমার হাতে তুলে দিলাম মূল্য বুঝিও"। যাওয়ার সময় রুদ্র তার মাকে বলেছিল "মা, ঈদের আর মাত্র ২৩ দিন বাকি। এডমিশন নিয়েই ফিরে এসে আমরা একসাথে কেনাকাটা করব।" জাহানারা সন্তানের ভবিষ্যাতের কথা চিন্তা করে হাসির অন্তরালে লুকিয়ে রেখেছিল তার হৃদয়ের সমস্ত যন্ত্রনা। সন্তানদেরকে উৎসাহ উদ্দীপনায় মাতিয়ে রাখার প্রচেষ্টার কোন দিনও কমতি ছিলনা তার। বিদায় দিয়েই চিনচিন করে উঠে জাহানারার কলিজায়। মতিনও কাপাকাপা ঠোটে চশমাটি খুলল। সন্তানের মোহে মতিনের সমস্ত গুপ্ত ভালোবাসা আজ বিস্ফোরিত হল। জাহানারা মতিনকে এমন আর কোন দিনও হতে দেখেনি। ডাঃ মতিনকে হুশিয়ারী করে বলেছে জাহানারার প্রতি যত্মবান হতে। নতুবা যে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনায় দূর্ঘনা ঘটে যেতে পারে।

এদিকে নীলা রুদ্র আর দুরন্ত একে অন্যকে কাছে পেয়ে যেন আসমানের চাঁদ হাতে পেয়েছে। ওদের আনন্দালাপে ফারিয়া যথেষ্ট খুশি হলেও গফুর তা দীর্ঘায়িত হতে দিলেন না। সে নীলাকে নিয়ে যায় তার পাশের সিটে। আকাশচুম্বি অট্রালিকা, যানবাহনের হট্রগোলের সাথে ধুলোবালির সাগর, জনকোলাহলের সাথে দুর্গন্ধময় শহর আর সন্ধায় লাল নীল বাতির সমারোহ এ সবই ছিল ওদের কাছে রুপ কাথার গল্পের মত। ৬ষ্ঠ তলায় উঠে আকাশ ছোঁয়া অনুভূতি তাদের। রুদ্র আর দুরন্ত ক্লান্ত হয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে এডমিশন ফ্রমের জন্য তাদেরকে নিয়ে কলেজের দিকে ছুটল ফারিয়া আর নিলা। সেখান থেকে নীলাকে স্কুলে পৌছে দিতে গিয়েছিল তারা। নীলা তার সকল বন্ধু বান্ধবীর সাথে রুদ্র আর দুরন্তকে পরিচয় করিয়ে দেয়। ওদের ভাষায় সরলতা আর গ্রামের ভাব ফুটে উঠায় খিলখিল করে হেসে উঠে সবাই। রাস্তাপারাপারের সময় আজ রুদ্রকে বাঁচাতে গিয়ে অল্পের জন্য বেঁচে গেল দুরন্ত। গ্রামের সবচেয়ে দুরন্ত বালকেরা এই দুষিত শহরে হাবাগোবা। তাদেরকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন করে তাল মেলাতে হয় এই শহরে। এখানে দিক নির্দেশনা দেওয়ার মত পন্ডিতের অভাব হয়না। শিখিয়ে দেয় মানুষ ঠকানোর নব নব কৌশল, আচরনে বুঝিয়ে  দেয় কথা কাটানোর পদ্ধতি। ওদের ভদ্র আচরনে এখানে অনেকের অট্টহাসির খোরাক মিলে। ভয়ে বিড়াল ছানার মত হয়ে গিয়েছিল দু ভাই। দূষনের অভিসপ্ত এই শহরের জ্যামে বড়ই দুর্বিপাক হয়ে পড়েছে ওদের জীবনযাত্রা। নীচে যেতেও আজকাল ভয় যেন ওদের পিঁছু ছাড়ছেনা। গ্রামের দুরন্তপনা পাখিরা আজ শহরের বন্ধি কোঠায় আবদ্ধ। দেয়ালের আন্দরেই কেটেছে গত চারটি দিন। নীলার বেশিরভাগ সময় স্কুল এবং কোচিং-এ কাটে তাই দিনে খুব অল্প সময় ওরা তাকে কাছে পায়। আর সেই সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। নীলাকে কাছে পেলে মেতে উঠে সারাদিনের গল্পে আর নীলার ঈদের পোশাক, অতীতের স্মৃতিময় খেলনা , জামাকাপড় প্রদর্শন সহ নানা আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে ওরা। নীলা যখন বাসার বাহিরে থাকে তখন দু ভাইয়ের কাছে এই শহরকে জাহান্নামের টুকরা মনে হয়। নীলাকে কাছে পেলে ওরা আসমানের চাঁদ হাতে পায়।

আজ অভিমানী আকাশের মন ভালো নেই, সেই ভোর বেলায় শুরু হয়েছিল অঝোরে কান্না , এখনো থেমে নেই। কাল শুক্রবার তাই নীলা সারাদিন বাসায় থাকবে। অনেকদিন পর নীলাকে কাছে পাওয়ার আশায় নীলার স্কুল হতে আসার সময় হলেই দু ভাই শুকনো মুখে ভেলকনির গ্রীল ধরে দাড়িয়ে রয় গভীর প্রতিক্ষায়। নীলা গাড়ী হতে নামতে দেখেই ছুটে গিয়ে রুদ্র নীলার ব্যাগ আর দুরন্ত ছাতা হাতে নিয়ে নীলাকে বাসায় নিয়ে আসে। প্রবল প্রতীক্ষার পর বৃষ্টিময় এমন রোমান্টিক দিনে একে অন্যকে কাছে পেয়ে আহলাদে মাতোয়ারা হয়ে উঠে ওদের সমস্ত হৃদয়। এর ফাঁকে ফারিয়াও যোগ দিলেন আনন্দঘন পরিবেশে। ওনি তিন গ্লাস গরম দুধ এনে ওদের তিন জনের হাতে তুলে দেয়। বারান্দায় দাড়িয়ে ওরা একসাথে গল্পগান আর বৃষ্টি উপভোগ করছিল। সন্ধার একটু আগে নীলা হঠাৎ বলে উঠল 'চলো বৃষ্টিতে যাই' । প্রথমবারের মত ছাদে গিয়ে চমকে উঠে দু` ভাই। এই নিথর নর্দমার শহরে বাতাসের সাথে মিষ্টি ফুলের সুবাসে মুগ্ধ হয় ওরা। উপরে আকাশ চারদিকে ফাঁকা মুক্তবাতাসে ফুলের সুবাস সাথে রিমঝিম বৃষ্টিতে নীলা হাসি আর ভঙ্গিমার ছলে গান ধরলে এক মধুময় আনন্দঘন মুহুর্তের সৃষ্টি হয় সেখানে। নীলার ভেজা চুল বেয়ে টপটপ করে ঝরছে বৃষ্টির ফোটা জল, ঠিক যেভাবে মুক্তা ঝরছে তার হাসিতে। হাতেহাত ধরে মনের আনন্দে ঘুরছে ওরা ছাদের এপাশ হতে ওপাশ। হঠাৎ রুদ্র জানতে চাইল এমন মিষ্টি ফুলের সুবাস সম্পর্কে আর নীলা অপলক ভঙ্গিতে দেখিয়ে দিল পাশের ছাদের বিশাল ফুলের বাগানটি। আর সেই বাগানের শেষ প্রান্তে চিল অদ্ভুত ধরনের একটি ফুল। যেই ফুলটির নামতো দূরের কথা ছবিও জীবনে কোনদিন দেখেনি ওরা। নীলা চক্ষু ইশারায় তাকিয়ে বলল, " ঐ দেখ কী অদ্ভুত স্বর্গীয় ফুলটি ! " ঠিক তখনি গফুরের রাগান্বিত কন্ঠের শব্দ এসে ঠেকল নীলার কানের পর্দায়। বাবার এমন কন্ঠ শুনে থমকে যায় নীলা। ভেজা শরীরে কোন কথা না বলে মূহুর্তেই সে চলে গেল রুমের দিকে। এদিকে দু` ভাই অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে নীলার পছন্দের ফুলটির দিকে। রুদ্র চিন্তা করল এখনি ফুলটি এনে নীলাকে দেবে কিন্তু এর মধ্যে শুরু হয়ে গেল দু ভাইয়ের কথা কাটাকাটি। কার আগে কে এনে দেবে দু` ভাই অস্থির হয়ে উঠল। রুদ্র বলল আমি লাফ দিয়ে আনতে যাচ্ছি কিন্ত দুরন্ত দেখল দু`ছাদের মাঝখানে প্রায় ছয় ফুট দুরত্ব এমনকি ছাদটি ছিল প্রায় দশ ফুট নিছে। দুরন্ত আর দেরি না করে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামা শুরু করল। রাস্তার ডান দিকে ফিরতেই প্রকম্পিত চিৎকারে হাত পা ছেড়ে কাত হয়ে যায় দুরন্ত। প্রথমে অস্পষ্ট মনে হলেও দু`পা সামনে বাড়িয়ে তার আর বুঝতে বাকি রইলনা ছিটকা মগজের নিথর দেহটি তার আপন রক্তের। উপরে তাকিয়ে অস্পষ্ট ভঙ্গিতে পরিচিত কারো রাগান্বিত চোখ দেখতে পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে দুরন্ত। অন্ধকার এই গলিতে শত শত মানুষের ভীড়ে সেই রাতে করো চোখে পড়লনা গফুরের চেহারা। দু` ঘন্টাপর শোকের কাতরে আরও একটি লাশের যোগ হল।

ছয় মাস পরেও পুলিশের হাতে মেলেনি সঠিক তথ্য। শুনেছি গফুর ছিল প্রধান শিক্ষক পরিমল বাবুর সবচেয়ে কাছের মানুষ। সেই সুবাদেই অনেক বছর পূর্বে গ্রামে বেড়াতে এসে ফারিয়ার সাথে প্রনয়ে আবদ্ধ হয় সে। দুরন্ত আর সোজা হয়ে দাড়াতে পারেনি কোন দিন, মানুষ দেখলেই খুব ভয় পায়। ফিরে পায়নি বাক শক্তি, হাত পা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। শরীর বেকে গেছে। শুনেছি মরনব্যাধিতে আক্রান্ত সে। সাত বছর পরেও পরিত্যক্ত বাড়ীর মালিক রাস্তার পাশের অর্ধউলঙ্গ পাগলটিকে সবাই স্যার বলে ডাকে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুলাই, ২০১৬ সকাল ৯:৪৯
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×