



আগের পর্বঃ হুট করে উত্তরে (ভ্রমণকথা - প্রথমাংশ)
অপেক্ষা করা আমার একেবারেই অপছন্দের কাজ। কোন এক জায়গায় কারন ছাড়া এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, কিন্তু অপেক্ষার জন্য দশ মিনিটেই আমার বিরক্তি ধরে যায়। সকাল সাড়ে পাঁচটায় ফুলবাড়ী স্টেশনে নেমে এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও যখন আমাদের নিতে কেউ আসছে না, আমি ছোট ভাইকে বললাম উনাকে ফোন দিয়ে বল, আমাদের ঠিকানা দিতে, আমরা চলে যাই। ফোন দিতে জানা গেল উনি রওনা হয়েছেন। সাড়ে ছয়টা নাগাদ উনি একখান ভ্যানগাড়ী নিয়ে এলেন, সেটাতে চড়ে আমরা “ঢাকা মোড়” নামক জায়গায় এলাম, সেখানে আবার চা-পানের বিরতি। আমরা চা পানের ফাঁকে গল্প জুড়ে দিলাম, গল্পের ফাঁকে বের হয়ে এল উনি আমার প্রফেশনাল একাডেমিক ইন্সটিটিউট এর সহপাঠীর বড় ভাই। দিনাজপুরের গ্রানাইট খনি প্রকল্পে উনাদের কোম্পানী কাজ করছে, উনি আছেন ইঞ্জিনিয়ারদের তত্ত্বাবধানে। যাই হোক, পরিচিত বের হয়ে যাওয়ায় রাগ কিছুটা কমে গেল। সাতটা নাগাদ উনাদের অফিসের গাড়ী (যেটা করে এমপ্লয়িদের পিক এন্ড ড্রপ সার্ভিস দেয়) এলে পড়ে সেটায় করে আমরা চলে এলাম সেই খনি প্রকল্প এলাকায়। প্রকল্প এলাকার প্রায় পাঁচ-সাত কিলোমিটার রাস্তা মসৃণ কার্পেটিং করা, দুধারে সারি সারি গাছ, দেখেই মনে হয়ে এখানে সাইক্লিং করতে কতই না ভাল লাগবে। দুঃখের বিষয় আক্ষরিক অর্থে শেষ সাইকেল চালিয়েছি প্রায় একযুগ আগে।

ফুলবাড়ী রেলষ্টেশন

প্রকল্পের ভেতর, দূরে অফিস বিল্ডিং দেখা যায়

গ্রানাইট প্রকল্পে যাওয়ার রাস্তা
খনিটি জার্মানী’র এক কোম্পানীর তত্ত্বাবধানে চলছে। এখন খনন কাজ সাময়িক বন্ধ। আমাদের নিয়ে গেল ওদের রেস্ট হাউজ বিল্ডিং এ, সব সাদা চামড়ার অফিসারগুলো এটাতে থাকে। নিচে তিনটি গেস্ট রুম, আমাদের একটি খুলে দিলে সেখানে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। এরপর সেখানকার ডাইনিং এ নাস্তা করে আমার অবসর। ছোট ভাই চলে গেল তার নিজ কাজে, আমি একা একা শুয়ে রইলাম। বারবার ভাবছিলাম, এই ফাঁকে পার্বতীপুরস্থ হাবড়া জমিদার বাড়ি ঘুরে আসি। এই ভাবনা নিয়ে দোমনা ছিলাম, চাইছিলাম ছোট ভাইকে নিয়েই যাই। এই করতে করতে দুপুর গড়িয়ে গেল। শেষে দুপুরের লাঞ্চ শেষ করে (লাঞ্চে ছিল ভুনা খিচুড়ি আর গরুর মাংস; সেই রেস্ট হাউজের ডাইনিং এ। সেইরকম স্বাদ ছিল, আসলে প্রজেক্টের বড় বাবুরা সবসময় জমিদারী হালতেই থাকে বুঝা গেল) আমি ছোট ভাইকে বললাম আমি একটা জমিদার বাড়ি ঘুরে আসি। তখন ঘড়িতে তিনটা বাজে, সন্ধ্যের আগে ফিরে আসলেই হবে। খনির দুই চেকপোস্টে বলে গেলাম, রাস্তায় বের হয়ে কোন যানবাহন পেলাম না। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটা অটোরিক্সা করে মধ্যনগর বাজার, সেখান থেকে আরকেটা অটোতে ফুলবাড়ী, ঢাকা মোড়। সেখান থেকে আধঘণ্টা বাসে বসে থাকার পর বাস ছাড়ল, এরপর যখন হাবড়া পৌছলাম তখন বিকেল পাঁচটা...। এখানে এসে এক স্থানীয় হিন্দু ভদ্রলোকের সহায়তায় খুঁজে পেলাম (অস্তিত্বহীন) জমিদার বাড়ি, সেই গল্প হবে জমিদার বাড়ি সিরিজে। জমিদার বাড়ির খোঁজ শেষ করতেই ছোট ভাই এর ফোন, ওর কাজ শেষ। আমি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম চলে যাব দিনাজপুর শহরে। ওকে বললাম, ঢাকা মোড় চলে আসতে। সন্ধ্যের পরপর ঢাকা মোড় থেকে একটা রকেট সার্ভিস (আজব নাম, দাঁড়িয়ে যাত্রী নেয়, যেখানে সেখানে থামে, কিন্তু দ্রুত যায়) গাড়ীতে করে যখন দিনাজপুর টার্মিনালে নামলাম তখন রাত আটটা।

গ্রানাইট প্রকল্পে যাওয়ার রাস্তা

এই জায়গায় উত্তোলিত খনিজ স্তুপ করে রাখা হত লোডিং এর জন্য।

গ্রানাইট প্রকল্পে যাওয়ার রাস্তা
বেশ খোঁজ খবর নিয়ে চলে এলাম মালদহপট্টি এলাকায়, সেখানকার হোটেল ডায়মন্ড এ। রুমে ব্যাগ রেখে নিচে নেমে হালকা কিছু খাওয়ার প্ল্যান করতে দেখি ঘড়িতে রাত নয়টা। অগ্যতা রাতের খাবার খেয়ে নিলাম একেবারে, তাড়াতাড়ি ঘুমাব বলে। খাবার হোটেল থেকে খোঁজ নিয়ে নিলাম লিচুর বাজারের। এরপর হোটেলে এসে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর আয়োজন করলাম। কিন্তু বিধিবাম, হোটেলের হরেক কিসিমের বোর্ডারদের উচ্চস্বরের যন্ত্রনায় রাত দুটো বেজে গেল কিন্তু ঘুম আর আসে না। কখন ঘুমিয়েছি জানি না, ভোর ছয়টা বাজে উঠে পড়লাম, চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম। বেড়াতে গেলে এই সব ঘুমকে সান্ত্বনা দিয়ে রাখি, বাসায় গিয়ে আরামসে ঘুমাস ব্যাটা, এখন একটু ঘুরে নেই।

পার্বতীপুর বড় পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

হাবড়া জমিদার বাড়ীর একাংশ

হাবড়া জমিদার বাড়ীর পুকুর এবং মন্দির

জমিদার বাড়ীর মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া গ্রামের পাকা রাস্তা
সকালের নাস্তা করে গেলাম লিচু বাজারে, সেই গল্প তো আগেই শুনিয়েছি। এরপর লিচু বাজার হতে চলে এলাম দিনাজপুর রাজবাড়ী। সকালবেলা ফাঁকা রাজবাড়ী ঘুরে দেখতে ভাল লাগল। রাজবাড়ীর গল্প নিয়ে আলাদা পোষ্ট দেব ইচ্ছে আছে। রাজবাড়ী দেখা শেষে সুখ সাগরে বৃথা সুখের সন্ধান করে রওনা হলাম ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ী। প্রায় আধঘণ্টার পথ, ব্যাটারি অটোরিকশায়। এই প্রায় নেই জমিদার বাড়ীতে দেখা মিলল জনাব, আব্দুল মান্নান সাহেবের, জমিদারদের চতুর্থ প্রজন্মের প্রবীণ সদস্য। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। ব্যাগ নিয়ে চেক আউট করে ছুটলাম টার্মিনালে, গন্তব্য কান্তজী মন্দির। বাসে করে আধঘণ্টার মধ্যে কান্তজী মন্দির চলে এলাম। কান্তজীর গল্প হবে আরেকদিন। কান্তজী মন্দিরে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে আবার রওনা হলাম “বারো মাইল” নামক এলাকায়। এখান হতে বাস ধরেতে হবে রংপুরের। পথে কয়েকটা লিচু বাগান দেখে অটো রিক্সা ছেড়ে দিয়ে ক্ষেতের আইল ডিঙিয়ে চলে গেলাম লিচু বাগানে। গাছ হতে লিচু পাড়া হচ্ছে, সেগুলো আঁটি আকারে বেধে প্যাকিং করছে কয়েকজন শ্রমিক গোছের মানুষ। কিছু ছবি তোলা শেষে ওদের কাছ থেকে শখানেক লিচু কিনতে চাইলাম এখন খাব বলে। কিন্তু উনারা রাজী হলেন না, বরং প্রায় ত্রিশ-চল্লিশটি লিচুর একটা গোছা হাতে ধরিয়ে দিলেন বিনে পয়সায় লিচু চেখে দেখার জন্য। গ্রাম্য সারল্য এখনও সেখানে অটুট আছে।

খনি প্রকল্পের রাস্তা

সুখ সাগর দীঘি

ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের রাস্তায় সাইকেল চালানো এক বালক
লিচু খেতে খেতে ক্ষেতের আইল পার হয়ে মেইন রোডে আসতেই একটা বিআরটিসি এসি বাস পেয়ে গেলাম, কিন্তু সিট নেই। তাড়া ছিল, তাই কোন চিন্তা না করেই উঠে পড়লাম। দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে রংপুর যখন পৌঁছলাম তখন বেলা পৌনে তিনটা। একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে চলে গেলাম ঢাকা বাস টার্মিনালে, সেখানে গিয়ে নাবিল পরিবহণের টিকেট করব, সন্ধ্যে ছয়টার... কিন্তু হায়, বিকেল পাঁচটার পর গাড়ী রাত নয়টায়। কি আর করা, দ্রুত টিকেট করে রওনা হলাম, তাজহাট জমিদার বাড়ী (এই গল্পও পাবেন জমিদার বাড়ী সিরিজে; মূলত এই ভ্রমণটাই ছিল তিনটা জমিদার বাড়ী কাভার করার জন্য) দৌড়ের উপর জমিদার বাড়ী দর্শন শেষে ঠিক বিকেল পাঁচটায় বাস স্ট্যান্ড ফিরে এলাম। কিন্তু বাস ছাড়ল সাড়ে পাঁচটার পর, কেমন লাগে, আমি রিলাক্সভাবে জমিদার বাড়ীটা ঘুরে দেখতে পারলাম না।

দিনাজপুর রাজবাড়ী

দিনাজপুর রাজবাড়ীর পরিত্যাক্ত অংশের পেছনভাগ

কান্তজী মন্দির

গ্রাম্য পথে সাইকেল চালনা
বাস ছাড়ার পর, হিসেবে করছিলাম, ঢাকায় পৌঁছব কয়টা নাগাদ, দশটা নাকি এগারটা। সব হিসেব মিথ্যে করে দিয়ে রাত দুটো নাগাদ পৌঁছলাম গাবতলী। কারন গাজীপুর থেকে গাবতলী (বাই পাস হয়ে) পৌঁছতে লেগে গেল প্রায় তিন ঘণ্টা। এই সময় এক যাত্রী বেশ বিনোদন দিয়েছেন। আমার ঠিক পেছনের সিটের উনি, বারবার উনার ফোন আসছে, আর উনি বলছেন দশ মিনিটে পৌছে যাব। প্রায় দুই ঘণ্টায় উনার দশ মিনিট শেষ হয় নাই। আমি একসময় বললাম, ভাই বলেন আরও ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। উনি বললেন আচ্ছা... ঠিক একটু পরে ফোন আসলে এবার বললেন, এই তো আর পাঁচ মিনিট, গাড়ী তখন সাভার বাজারও পার হয় নাই, জ্যামে আটকে আছে।

তাজহাট জমিদার বাড়ী, রংপুর

কান্তজী মন্দির

লিচু বাগানের লিচু গাছ
ঝটিকা এই সফর শেষে বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন রাত তিনটে বাজে, তখন মনে হল এর চেয়ে রাতের গাড়ীতেই ফিরতাম, পাঁচটা-ছয়টা নাগাদ হয়ত বাসায় যেতাম, কিন্তু এতে করে সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ একটু কমত, ভ্রমণটাও আরও ভাল হত। যাই হোক, ভাগ্যের লিখন, যায়না খণ্ডন। এই ট্যুর তো দুইদিন আগেও আমার পরিকল্পনাতেই ছিল না...

তাজহাট জমিদার বাড়ী
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুন, ২০১৬ বিকাল ৪:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




