somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রাথমিক চিকিৎসা: কেউ অজ্ঞান হয়ে গেল, আপনি কী করবেন?

১২ ই অক্টোবর, ২০১২ রাত ১:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একজন অজ্ঞান রোগী, একজন অসহায় মানুষ—তিনি হতে পারেন আপনার প্রিয়জন, নিকটস্থ যে কেউ, আবার অচেনা। পরিচয় যা-ই হোক না কেন, আপনার মমত্ববোধ, আপনার দায়িত্ব ও একজন মানুষ হিসেবে সমাজের প্রতি আপনার দায়বদ্ধতার কারণে আপনাকে অবশ্যই কিছু না কিছু করতে হবে। কেউ আপনার সামনে রাস্তায় অজ্ঞান হতে পারে আবার কেউ বা বাড়িতে—যেখানেই হোক না কেন, দয়া করে দূরে সরে যাবেন না, এগিয়ে আসুন, কাছে যান। কাছে গিয়ে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে, তা হলো, অজ্ঞান রোগীর অজ্ঞানের অবস্থার মাত্রা নিরূপণ করা।
প্রথমেই রোগীর নাম ধরে ডাকুন আর নাম না জানা থাকলে একটু ভরাট ও দরাজ কণ্ঠে বলুন, এই যে মা, বাবা, চাচা, চাচি, ভাই বা বোন একটু চোখ খুলে তাকান তো দেখি। এর মাধ্যমে কখনো দেখবেন রোগী একটু চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে, আবার কখনো চোখ না খুলেই গোঙানির স্বরে বলছে, আমি কোথায়? আবার কখনো বা কোনো ধরনের সাড়া দিতেই ব্যর্থ হচ্ছে। রোগীর নাকের কাছাকাছি একটি হাত নিয়ে অনুভব করতে চেষ্টা করুন, শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কি না। শ্বাস-প্রশ্বাস চলার ব্যাপারটি বুকের ওঠানামা দেখে এবং নিশ্বাসের শব্দ শুনেও বুঝতে পারা যায়। ঠিক এ অবস্থায় আপনাকে কয়েকটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে।
 প্রথমত, নিকটস্থ সার্বক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়, এমন একটি সেন্টারে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন করুন (সবার ফোনের অ্যাডড্রেস-বুকে এক বা একাধিক অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর রাখা উচিত)।
 দ্বিতীয়ত, জোরে চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে সাহায্যের জন্য ডাকুন।
 এবং সর্বশেষ আপনি আপনার নিজের সামর্থ্যমতো পূর্ব-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রোগীর সাহায্যের জন্য কিছু কাজ করবেন।
রোগীকে সোজা করে শুইয়ে দিন। এ সময় অবশ্যই রোগীকে কাত করে রাখতে হবে। চিত বা উপুড় করে রাখলে রোগীর শ্বাসকষ্ট হতে পারে। গায়ে শক্তভাবে আটকানো কোনো পোশাক থাকলে তা ঢিলা করে দিন। মনে রাখবেন, শক্ত করে আটকানো একটি বেল্ট বা বক্ষবন্ধনীর জন্য রোগীর শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
কোনোভাবেই উঠিয়ে বসানো যাবে না। এ অবস্থায় কোনো খাবার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। বরং সম্ভব হলে আপনার নিজের আঙুলে রুমাল জড়িয়ে রোগীর মুখে জমে থাকা লালা বের করে দিতে হবে। মাথা পেছনের দিকে কাত করে ধরে থুতনি একটু উঁচু করে ধরুন।
এ সময় খিঁচুনিও থাকতে পারে। খিঁচুনি হলে হাত-পায়ের কাছ থেকে আঘাত লাগতে পারে, এমন সবকিছু সরিয়ে নিন। দয়া করে খিঁচুনির রোগীকে জোর করে ধরে রাখার চেষ্টা করবেন না। দ্রুত একপাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দিন।
পাশাপাশি রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনুন, যেমন—আগুন থেকে দূরে নেওয়া, চলমান রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে গেলে রোগীকে রাস্তার পাশে নেওয়া, লিফটে অজ্ঞান হওয়া রোগীকে লিফটের বাইরে আনা, বাথরুমে অজ্ঞান হওয়া রোগীকে বাইরে আনা প্রভৃতি কাজ করতে হবে।
এ অবস্থায় রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে মুখের লালা পরিষ্কার করার পাশাপাশি খেয়াল করে দেখুন, দাঁত ও জিহ্বার অবস্থান কী। যদি জিহ্বা দাঁতের মাঝে আটকা পড়ে অথবা জিহ্বা পেছনের দিকে গিয়ে শ্বাসনালির মুখ আটকে দেয়, তা হলে একটি চামচের উল্টো দিক দিয়ে দাঁতের পাটিকে খুলে রাখা ও জিহ্বাকে যথাস্থানে রাখা সম্ভব। নকল দাঁত থাকলে খুলে রাখুন, যদিও এ কাজের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে একটু জেনে নিই, কেন একজন মানুষ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।
 স্ট্রোক, অ্যাকসিডেন্ট ও মাথায় আঘাত, এপিলেপ্সি বা মৃগী
 হার্ট অ্যাটাক, হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া
 ডায়াবেটিস থেকে সুগার কমে অথবা বেড়ে যাওয়া, রক্তে লবণের তারতম্য
 খুব বেশি জ্বর
 নেশার দ্রব্য বা বেশি মাত্রায় ওষুধ খাওয়া, সাপের কামড়, বিষক্রিয়া
 বজ্রপাত ও ইলেকট্রিক শক, হিটস্ট্রোক
 থাইরয়েডের বা পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের সমস্যা, লিভার বা কিডনি ফেইলর
 বিষাক্ত গ্যাসের সংক্রমণ (দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা গর্তে কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস জমে থাকে, সেখানে কেউ ঢুকলে এ ধরনের বিপদে পড়তে পারেন)
 হঠাৎ হার্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (সাডেন অর্থ হঠাৎ, কার্ডিয়াক অর্থ হূৎপিণ্ড আর অ্যারেস্ট হচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া) এটি একটি অতি জরুরি অবস্থা। এ পরিস্থিতিতে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দেওয়া অতি জরুরি। তবে আমাদের দেশে অনেকের ভেতরে এ সম্পর্কে এক বিভ্রান্তি কাজ করে। এ অবস্থায় রোগী মারা যাওয়ার পর অনেকে বলে থাকেন, রোগীকে বুকে চেপে মেরে ফেলা হয়েছে, বাস্তবে কি তাই? কথাটা একটুও ঠিক নয়, বরং যে ব্যক্তি বুকে চেপে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিয়েছেন, তিনি অনেক ধন্যবাদ পেতে পারেন। এ বিপদে এটাই সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা। এবং সময়মতো অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এই প্রচেষ্টার জন্য অনেকেই বেঁচে যেতে পারেন। আসুন, এ অবস্থায় কর্তব্যরত ব্যক্তিকে সঠিক চিকিৎসা প্রদানে আমরা আরও সাহায্য করি।
 যদি জানা থাকে রোগী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তা হলে দেরি না করে মিষ্টি কিছু খাইয়ে দিন। তবে গ্লুকোজ বা চিনির পানি খাওয়ানোই সবচেয়ে ভালো।
আগে থেকেই আপনি যদি রোগী সম্পর্কে জানেন এবং রোগী পরিচিত হয়, তা হলে হাসপাতালে দরকার হয়, এমন সব ওষুধ এবং আগের চিকিৎসার কাগজপত্র একটি ব্যাগ বা ফোল্ডারে নিয়ে নিন। নিকটস্থ আত্মীয়স্বজনকে ফোন করুন।

সুদিপ্ত কুমার মুখার্জি
নিউরোসার্জন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, শেরেবাংলা নগর, আগারগাঁও, ঢাকা
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১২ রাত ১:৪৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্ত-গায়েব-গুম এবং পিওর ও শিওর লাভ

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:১৬


৭ মাসে বাংলাদেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ !!!
এমন রোমহর্ষক, চমকে যাওয়া এবং অন্তরে কাপুনি ধরানোর মতো তথ্য বা কথা বার্তার কোনও মানে হয় ??!!
গরীব পরিবারের শিশুদের কথা বাদ দেই-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেমোরি লুপ (Memory Loop)

লিখেছেন চারাগাছ, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৪




মেমোরি লুপ (Memory Loop)

​গভীর রাত। ল্যাবের নিস্তব্ধতা চিরে শুধু ভেসে আসছে মনিটরের নীলচে আলোর মৃদু কম্পন। টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসে আছেন ডা. আরিয়ান। স্ক্রিনে ভাসছে তার বহু বছরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×