একটি ইঁদুর,ধুসর লোমশ, আকারে ছোটখাট বিড়ালের সমান। রান্নাঘরের সিংকের খোলা মুখ দিয়ে প্রতি রাতেই আসে।
তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ সুখকর ছিল না আমার জন্য, খাবারের সন্ধানে রান্নাঘরে গিয়ে বাটির উপরে বসা অবস্থায় তাকে আবিস্কার করি। নিজের খাবারে অন্যায় হস্তক্ষেপকারীকে দেখে যতটা না বিরক্ত হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছিলাম দখলদারের বিড়াট বপু দেখে। ডিস্কোভারি চ্যানেলেও এতবড় ইঁদুর দেখিনি কখনো।
বিস্ময়ভাব কাটার আগেই তাকে পালিয়ে যেতে দেখলাম।
সেই রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে যেতে হল, তবুও অহেতুক যন্ত্রণাপ্রদানকারীর উপর কি এক অজানা কারনে মেজাজ খারাপ করতে পারলাম না।
কিন্তু পর পর কয়েক রাত আমাকে অভুক্ত রাখার দরুণ তার উপর সৃষ্ট সহানুভূতিটুকু উধাও হয়ে গেল। ইতিমধ্যে অনেকের খাবারে ভাগ বসানোর সুবাদে বাসার সবার সাথে তার মোটামুটি পরিচয় ঘটে গেল।
এভাবে রাতের পর রাত আমাদের অভুক্ত রাখার অপরাধে, আলোচনার মাধ্যমে নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেললাম।
হত্যা করা হবে তাকে।
কয়েকদিন পর এক গভীর রাতে রান্নাঘরে বাসন পতনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। বুঝতে পারলাম কসাই হওয়ার সময় অনাগত। রুমমেটকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নাটকীয় সুরে বললাম আজকেই সেই রাত। নীরবে উঠে এল সে, চোখে শীতল পৈচাশিক দৃষ্টি। নিঃশব্দে দুজন রান্নাঘরে প্রবেশ করলাম, নীরেট অন্ধকার।
চাপাস্বরে শাকিল আমাকে বলল, সিংকের মুখটা বন্ধ করে দে।
আমি নিঃশব্দে সিংকের মুখ বন্ধ করে সেখানে বসে পড়লাম। লাইট জ্বালানোর পর পাতিলের ভিতরে আয়াসে ভজনরত অবস্থায় দেখলাম তাকে, মেজাজ খারাপ হয়ে গেল সাথে সাথে।
আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সচকিত হয়ে উঠল সে, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ছুট লাগাল তার গমন পথের দিকে। সিংকের মাঝে গর্তের অস্তিত্ব খুজে না পেয়ে থমকে দাঁড়াল। তার বিমূঢ়তার সুযোগে খপ করে ধরে ফেললাম।
এইবার তোমার জারিজুরি খতম,চাঁদু। পড়েছ নিষ্ঠুর কসাইয়ের হাতে।
শাকিল সোল্লাসে এগিয়ে এল আমার দিকে, মুখে ক্রুঢ় হাসি। শিকার আমাদের হাতের মুঠোই।
কিভাবে এই ক্ষুদ্র ট্যানেলবাসীর ভবলীলা সাঙ্গ করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবতে বসলাম দুজনে। বললাম ছুড়ি দিয়ে মাথাটা আলাদা করে ফেলি।
- না থাক, অযথা বেশি রক্তপাত হবে এতে।
- তাহলে পাথর দিয়ে মাথাটা থেঁতলে দেই।
-গুড আইডিয়া, এতে খুনের পর রক্ত পরিস্কার করার ঝামেলা কম হবে।
শাকিল উঠে গেল খুনের উপযোগী পাথর খুজতে।
আমি হাতের মুঠোই থাকা এই ক্ষুদ্র জীবটির দিকে নজর দিলাম। দীর্ঘ পুরুষ্ট লেজ, মাংসল তুলতুলে শরীর, ভারী। আমি তাকালাম তার চোখের দিকে, কম্পনরত চোখের পাতায় অসহায় চাহনি। সোজা তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে, হঠাৎ জগতের এই অপ্রয়োজনীয় উপদ্রপ জীবটার প্রতি মায়াতে মনটা ভরে উঠল।
শাকিলকে ডেকে দেখালাম তার চোখের অসহায় দৃষ্টি। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেলাম, ক্ষুদ্র এই অপরাধীকে হত্যা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। চুপচাপ সিংকের মুখটা খুলে তাকে ছেড়ে দিলাম। নীরবে এসে শুয়ে পড়লাম দুজনে।
এরপর কেটে গেছে কয়েকরাত, একদিনও দেখিনি তাকে আর। হয়ত সেই রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার স্মৃতি পট থেকে মুছে যায়নি এখনো।
বেশ কয়েকদিন পর, এক গভীর রাতে রান্নাঘর থেকে ভেসে এল খুটখাট আওয়াজ। বুঝলাম এসেছে সে। কাউকে না জানিয়ে নিঃশব্দে উঠে গেলাম রান্নাঘরে। লাইট জ্বালিয়েই তাকে দেখলাম সেই রাতের মত পাতিলের ভিতরে। কিন্তু সে রাতের মত প্রতিক্রিয়া দেখালো না। আমাকে দেখার পরও আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত স্থির আছে সে। আমি তার পাশে বসলাম, তার পুর্ণ মনযোগ খাবারে। আমিও আর বিরক্ত করলাম না। খাওয়া শেষে ধীরলয়ে এগিয়ে গেল সিংকের দিকে, পিছু ফিরে একবার আমার দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গেল গর্তের ভিতরে।
পরেরদিন থেকে আমরা খাবার সাবধানে রাখতে শুরু করলাম, তার নাগালের বাহিরে। আর কিছু খাবার নিচে রেখে দেই তার জন্য। প্রতি রাতেই আসে সে, খেয়ে চলে যায়। কোন কোন রাতে বসি তার পাশে, খাবার এগিয়ে দেই। দ্বিধা, সঙ্কোচ, ভয় কিছুই নেই আর তার মাঝে, যেন আমার নির্বাক বন্ধু হয়ে উঠেছে। তাকে জিজ্ঞেস করি, পরিবারে আর কে কে আছে, না'কি আমার মত নিঃসঙ্গ একজন সে?
আমি জানি আমার কথা সে বুঝতে না পারলেও ভালবাসাটুকু ঠিক বুঝতে পারে।
প্রায় রাতে মহাকালের স্রোতে অহেতুক আটকে পড়া দুটো নিঃসঙ্গ প্রানী আমরা বসে থাকি পাশাপাশি, আর থাকে নীরবতা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

