বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ব্লগার আন্দালীব ভাইয়ের প্রতি।।।।
চোখ খোলো পাপড়ি, ঠিক সেইভাবে যেভাবে লজ্জাবতীর পাপড়িগুলো ধীরে ধীরে মেলে ধরে নিজেদের;এবার এই চেয়ারটাতে বসো।চুলের বাধন খুলে দাও, ফ্যান ছেড়ে দিচ্ছি, বাতাসে তোমার চুল উড়তে থাকুক; এই দৃশ্যটি দেখবো বলেই না এত আয়োজন!
তুমি তো জানো ডায়েরী লেখাটা আমার প্রিয় অভ্যাস, তোমার-আমার প্রতিটি দিনকে সন্তানতুল্য মমতায় আমি এখানে লিখে রাখি।তবে তুমি বোধহয় জানোনা আমাদের অসংজ্ঞায়িত সম্পর্কের ৪০০তম দিন পূর্ণ হল আজ, আর আমাদের সপ্তাহান্তের সেই বিশেষ খেলাটির ৩৬৫দিন, অর্থাৎ ১বছর।এখনো মনে আছে, সম্পর্কের ৫ম সপ্তাহের শেষ দিনে আমরা এক বিকেলে রিক্সায় ফার্মগেট যাব স্থির করেছিলাম, কিন্তু কোন রিক্সাওয়ালাই সদয় হচ্ছিলনা আমাদের প্রতি। হঠাৎ তুমি কী মনে করে যেন বললে-‘আর ১০মিনিটের মধ্যে আমরা রিক্সা পেয়ে যাব, শুধু তাই নয়, সেই রিক্সাওয়ালাটি লুঙ্গির বদলে ফুলপ্যাণ্ট পড়ে থাকবে।চাইলে যে কোন শর্তসাপেক্ষে তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে বাজী ধরতেও রাজী আছি।"
১৫মিনিটের মধ্যে রিক্সা পেতেই পারি, কিন্তু ফুলপ্যাণ্ট পরিহিত রিক্সাওয়ালা সংক্রান্ত তোমার এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আমাকে অবাক করেছিল বইকি, কারণ আমি লক্ষ্য করেছি অধিকাংশ রিক্সাওয়ালারাই লুঙ্গি পরে থাকে। তাই বাজীতে রাজী হয়েছিলাম নির্দ্বিধায়_ সবার মত আমারও বিজয়ী হওয়ার দুর্দমনীয় লোভ, বিশেষত জয়টা যদি হয় তোমার বিরুদ্ধে এবং এর বিপরীতে যে কোন শর্ত দেবার স্বাধীনতায়, তাহলে তো সেই বিজয় বাংলাদেশের অষ্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয়ার চেয়েও বহুগুণে আনন্দময় আমার কাছে; হোক না সেটি রিক্সাওয়ালার পোশাকের মত আপাত গুরুত্বহীন কোন বিষয়ে।
আমি বিজয়ের ব্যাপারে এতটাই নিশ্চিত ছিলাম যে তোমার সেই বাজীর শর্তটি আমিই দিয়ে দিলাম_‘‘যদি সত্যিই এমন হয় তাহলে আগামী ৩ঘণ্টা তোমার যে কোন খেয়ালের খেলোয়াড় হয়ে থাকব, এই সময়টুকুতে তোমার যে কোন কথাই আমার জন্য আদেশ, এমনকি তুমি বললে এই ৩ঘণ্টা বসে বসে ভিক্ষা করতেও আপত্তি নেই।কিন্তু বাজীতে হারলে তোমার ক্ষেত্রেও যে একই কথা প্রযোজ্য হবে এটা বুঝতে পারছো তো?” তুমি কোন কথা না বলে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিলে শুধু, এরপর শর্তে তোমার সম্মতি জানানোর খানিকবাদেই রিক্সা পেলাম, আর আশ্চর্যজনকভাবে হেরে গেলাম বাংলা সিনেমার কাকতালীয় ঘটনার মত অবিশ্বাস্যতায়!
তোমার বাজীতে জেতার বহিপ্রকাশ আমার বুকে কাঠ ঠোকরা পাখি হয়ে নিরন্তর ঠুকরে গিয়েছিল পরবর্তী ৩ঘণ্টা, ওহ কী ভয়ানক সে অভিজ্ঞতা: তোমার ব্যাগ আমার কাধে ঝুলিয়েই ক্ষান্ত হলেনা, আমাকে বসতে হলো রিক্সার পাদানীতে গুটিসুটি হয়ে; আশেপাশের রিক্সা থেকে মানুষ কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেও তোমার দিলে একটুও দয়া হয়নি, উপরন্তু রিক্সা থেকে নেমে আমরা যখন ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকলাম তুমি নিজের জন্য লাচ্ছির order দিয়ে আমাকে দিলে সিঙ্গারার অর্ধেক, এবং পুরো লাচ্ছির তিন-চতুর্থাংশ শেষ করে বাকি লাচ্ছিটুকুর সঙ্গে পানি মিশিয়ে দিলে আমাকে খেতে। এরপর দোকান থেকে বের হয়ে তোমার নির্দেশমত একপায়ের জুতা খুলে হাতে নিয়ে আমাকে তোমার সঙ্গে হাটতে হয়েছিল বাকি সময়টুকু। খালি পায়ে হাটার একটা ভাব আছে, কিন্তু একপায়ে জুতা পড়ে হাটাটা যে কেমন অস্বস্তিকর তা কিভাবে বোঝাই!
সেই থেকে শুরু, এরপর প্রতি সপ্তাহের শেষ দিনটিতে ঐ একই শর্তে আমরা বাজী ধরতাম,যথারীতি আমার হার হত,আর তোমার বিচিত্র সব খেয়ালের বলি হতে হত ৩ঘণ্টা যাবৎ। বাজীতে জেতার মুহুর্ত থেকে তুমি হয়ে যেতে অচেনা কেউ_ কখনো আমাকে প্রখর রোদের মধ্যে স্ট্যাচু অব লিবার্টির ঢঙে দাড় করিয়ে রেখেছো, মাঝে মাঝে জেতার পর ৩ঘণ্টা নিজের জন্য রেখে দিয়েছো অন্যসময় ব্যবহার করবে বলে,কখনোবা বলাকা হলের সামনে পুরনো বই বিক্রি করিয়েছো, এমনকি ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে ভিক্ষাও করিয়েছো; কী বাদ রেখেছো তুমি! জানো, আমার একসময় প্রচণ্ড জেদ চেপে গিয়েছিল, জিততে হবেই যে কোন মুল্যে, তাইতো এই খেলাতে তোমার চেয়ে আমার আগ্রহই বেশি; মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল একদিন জিতবোই, আর সেইদিন আমার সব অপদস্থতার শোধ তুলব। বিশ্বাস করো, প্রতিটি হারের রাত্রিতে আমি পরিকল্পনা করেছি সেই কাঙ্ক্ষিত ৩ঘণ্টা নিয়ে। অবশেষে গতকাল তুমি হারলে; ইচ্ছে হচ্ছিল তখনই মনের ভেতর পুষে রাখা ইচ্ছাটা বাস্তবায়ন করি, কিন্তু মনে মনে হিসাব কষে দেখলাম আজ সেই খেলাটির ১বছর পুর্ণ হয়; তাইতো গতকালকের অব্যবহৃত ৩ঘণ্টা উশুলের জন্য তোমাকে আমার ফ্ল্যাটে ডেকে এনেছি। তুমি ভাবতেও পারবেনা কী খেলা আজ খেলব তোমার সাথে_ গত ৫১টি সপ্তাহ আমাকে বলতে গেলে রীতিমত কাঁঠাল পাতা খাইয়েছো যত্রতত্র, আমার আজকের এই ৩ঘণ্টার খেলা তোমাকে আজীবন মনে রাখতে হবে পাপড়িমণি; ভালোবাসা মনকে কেবল উদারই করেনা, কখনো কখনো হিংস্রও করতে পারে।তোমার চোখ বলছে তুমি ভয় পাচ্ছো, তাইতো এই AC room এও ঘামছো।
এই মেয়ে, ট্যিসু পেপার ব্যাগেই রাখো;এই ঘামকে ঝরে যেতে দাও, ভালোবাসা দিয়ে এই ঘামকে কিনে নেব আমি।হ্যা, আমার খেলা এখনই শুরু হবে;তার আগে প্রাথমিক কিছু শর্তের কথা বলি_ আগামী ৩ঘণ্টা তুমি মুখে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারবেনা, এমনকি চেয়ার ছেড়েও উঠতে পারবেনা, কোনকিছু বলার প্রয়োজন হলে ইশারায় বলবে, আর বাকিটুকু আমি তোমার মুখভঙ্গি থেকে বুঝে নেব। বলতে পারো, এটা আমার জন্যও একটা পরীক্ষার মত; তোমাকে কতটুকু অনুভব করতে পারি সেই পরীক্ষা। একমিনিট বসো; পাশের রুম থেকে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসি।
শুরুতেই এই অফসেট কাগজ দুটি আর কলমটি ধরো, আগেই বলেছি কোন কথা বলতে পারবেনা; কেবল আমার কথামত কাজ করে যাবে, খেলা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে।
আমার মনে হয় তোমাকে এভাবে বিভ্রান্তির মধ্যে রাখলে খেলার মুল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। তাই তোমাকে সংক্ষেপে আমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলি_ আমি আসলে তোমাকে খেলার ছলে লেখালিখির চিরায়ত বর্ণিল-স্বপ্নিল ভুবনে নিমন্ত্রণ জানাতে চাইছি; আমি কোন দেশবরেণ্য লেখক নই, কোনদিন হব এমন সম্ভাবনাও বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার সমান। তবুও আমি লিখি প্রাণের তাগিদে, একটি বিষয়কে নিজের মত করে বিশ্লেষণ-উপস্থাপনের অভিপ্রায়ে, আর সেকারণেই তোমাকে এই ভুবনে আমার এত প্রয়োজন_ এখানে আমি এক নিঃসঙ্গ পানকৌড়ি; তাড়নায় নয়, প্রেরণার জন্য হলেও কাউকে আকড়ে ধরতে চাই ভেসে থাকতে।আমি জানি, লেখার ব্যাপারে তোমার মধ্যে নিদারুণ এক ভীতি কাজ করে, তবুও বলছি, একবার শুধু সাহস করে কাগজ-কলম নিয়ে বসে মিনিটখানেক কাটিয়ে দিলেই দেখবে এর মত আনন্দদায়ক কাজ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। তাছাড়া, তুমি যে কখনই আর একজন হেলেন কেলার দুরে থাক, নিদেনপক্ষে অরুন্ধতী রায়-ঝুম্পা লাহিড়ীও হতে পারবেনা তাতো নিশ্চিত; সুতরাং তোমার সঙ্কোচ কিসের?আমাদের লেখালেখি শুধুমাত্র আমাদের নিজস্ব অনুভুতির খণ্ড খণ্ড মেঘ; আজ নাহয় খেলার ছলেই একে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে দাও, যেভাবে আমরা হাত ধরাধরি করে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম ফুলার রোডের এক সান্ধ্যবিকেলে।
চিন্তার কিছু নেই ম্যাডাম, তুমি বুঝতেও পারবেনা কখন-কিভাবে একটি লেখার কাঠামো দাড়িয়ে যাবে তোমারই অজান্তে। তুমি শুধু আমার নির্দেশনাগুলো পালন কর। তোমার সামনের টেবিলটিতে আপাত অপ্রয়োজনীয় যে জিনিসগুলো রাখা আছে এগুলোই তোমার লেখায় সঞ্চালকের ভুমিকা পালন করবে। এখন আমি এগুলোকে একটি একটি করে টেবিল থেকে তুলবো, তোমার কাজ হবে প্রত্যেকটি জিনিসের সাথে সঙ্গতিপুর্ণ একটি শব্দ অফসেট কাগজের সর্ববামে লেখা। এই যে, তুমি আবার ঘামছো!আরে, এটাও তো আমাদের সেই কাছাকাছি হওয়া খেলারই অংশ। চেয়ে দেখ, তোমার জন্য চা-বিস্কুট-পানির বোতল সবই নিয়ে এসেছি; তাড়াহুড়োর কিছু নেই, ভয তো নয়ই।
.................(চলবে).................২য় পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

