somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পশুদের প্রত্যাখ্যান

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২১ রাত ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পানি। পুকুরে, নদীতে বা সমুদ্রে। তারপর একসময় সুর্যের তাপে উপর থেকে উপরে। পাহাড়ের টানে বা বাতাসের মায়ায়। সময় শেষে আবার ঝরে পরা। গভীর থেকে আরো গভীরে। যার শুরু আছে তার শেষও থাকবে। শুরুটাই আসলে শেষের কারন। যার শুরু নেই তার শেষও নেই।
অ্যামাজনের মতই গভীর জঙ্গল কিনলে। পাশেই ছোট একটি গ্রাম। লিও। সবুজ ঘন জঙ্গলের পাশে সাজানো গ্রাম লিওর ফুটপাথেই জন্ম গ্রাফির। আর পাচটা কুকুরের মত সারাদিন ঘুরে ঘুরে মানুষের ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্ট খাদ্য থেকে ভালই দিন চলে যেত তার। কষ্ট ছিলনা। মাঝেমাঝে কিছু মানুষের গালি শোনা ছাড়া। তবে কুকুরের জীবন কিনা। বাকীদের মত তারও সব সয়। গ্রাফির দখলে ৩ টা ডাস্টবিন ছিল। সেখান থেকে যা পেত তা দিয়ে তার চলত ভালই। সারাদিন ঘুম। দুবেলা খাওয়া। আর রাতের বেলা প্রতিবেশী কুকুরদের সাথে এলাকার লড়াই। এক জীবনে এর চেয়ে বেশি রোমান্স সে কখনো আশা করেনি। সময়ের সাথে সাথে বয়স বাড়ল। এর সাথে গ্রাফির জীবনটাও সহজ থেকে সহজতর হতে থাকল।
কোন এক রাতে গহীন কিনলের ভেতর থেকে তিনজন আগন্তুক বেড়িয়ে আসল। সাহস, বুদ্ধি আর বলিয়ান কন্ঠ তিনজনের চেহারাতেই স্পষ্ট। উদ্দেশ্য কিনলের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব জয়। লিওতে পা রাখতেই সর্বপ্রথম তারা গ্রাফির সামনে পড়ল। আগন্তুক কিন্তু গ্রাফির তাদের অচেনা মনে হলনা। সে স্পষ্ট তাদের চোখে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখতে পেল। এ যেন এক কঠিন মুহুর্ত তার জন্য। হয় চিরচেনা কিনলে গ্রামের রক্ষা করতে তাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়া। না হয় বিশ্ব জয়ে তাদের সাথ দেয়া। লোকগুলো ধীরে ধীরে এগুতে থাকল গ্রামের দিকে। এবং তার সাথে সাথে গ্রাফির অন্তিম মুহুর্তও এগিয়ে আসতে লাগল। হয় প্রিয় জন্মভুমি। না হয় পুরো বিশ্ব। হয় দায়িত্ব। না হয় ক্ষমতা। একদিকে ভালবাসা। আরেকদিকে ভয়। দেখতে দেখতে লোকগুলো গ্রাফির সামনে এসে গেল। এরাই বিশ্বের ভবিষ্যৎ ত্রানকর্তা। এ মুগ্ধতা তাকে আগে কোনদিন ছুতে পারেনি। গ্রাফি তাদের চোখ ভরে দেখল। সাথে পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল কিভাবে গ্রাফি সবকিছু ভুলে তাদের সামনে মাথা নত করে তাদের কুর্নিশ করল। আগন্তুকদের অনুরোধ করল তাদের অভিযানে তাকে নিতে। আগন্তুকত্রয়ের গ্রাফিকে ভাল লাগল। শুরু হল তাদের যাত্রা। পুরো উদ্দমে, তীব্র ক্ষমতার সাথে তারা নিজেদের এক নতুন বিশ্ব উপহার দিবে এটাই লক্ষ্য।
এই প্রথম গ্রাফি তার এলাকার বাইরে পা রাখবে। এ এক অন্যরকম উত্তেজনা। কিন্তু তার থেকে যেটা বেশি সেটা হল ভয়। তার স্বজাতি যারা ওই এলাকার নিয়ন্ত্রন করে তারা কি তাকে মেনে নেবে। না নিলে গ্রাফি তাদের সাথে লড়াইয়ে একা পারবে কিভাবে এ ভয় গ্রাফিকে ঘিরে রাখল প্রতিটা পদে। তবুও কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে সে আগন্তুকত্রয়ের সাথে এগুতে থাকল। অনেকটা দিন তারা এভাবে চলতেই থাকল। গ্রাফি অনেক আগেই তার জন্মভুমির পথ ভুলে গেছে। নিষ্পাপ গ্রাফির এখন তাদের সাথে পথ চলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এ ভাবতে ভাবতে গ্রাফি দলের অনেকটা পিছে পরে গেল। হঠাত সে দেখতে পেল সামনে কতগুলো কুকুর হিংস্রতা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। আগন্তুকত্রয় ততক্ষনে অনেকদুর এগিয়ে গেছে। এমন বিপদে গ্রাফি আগে কোনদিন পরেনি। সে জানে কুকুরের দলটা তাকে তাদের এলাকায় পেলে ছিড়ে খাবে। এটা তার এলাকা হলে সেও একই কাজ করত। গ্রাফি ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে দেখতে কুকুরের দল গ্রাফিকে ঘিরে ফেলে। মৃত্যু থেকে গ্রাফির দুরুত্ব এখন মাত্র কয়েক মুহুর্ত। তীব্র ভয় তাকে পুরোটা অবশ করে ফেলে। নিশ্চিত মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখে গ্রাফি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থায়ে থাকে। অভিযাত্রার এমন ইতি সে ভাবতেও পারেনি। সে চোখ বন্ধ করে শেষের প্রস্তুতি হিসেবে। হঠাত ঘিরে থাকা কুকুরগুলো পুরো শক্তি দিয়ে পালাতে থাকে। নিজেদের জীবন রক্ষায় এমন চীৎকার এমন আকুতি গ্রাফি আগে কখনও দেখেনি। সে একটু দুরেই দেখতে পায় তিনটা ছায়া মুর্তি কুকুরগুলোর দিকে ধেয়ে আসছে। গ্রাফির আর বুঝতে বাকি থাকেনা সেই অলিখিত অঙ্গিকার তাকে বাচাতে আজ মরিয়া। প্রকৃতি স্বইচ্ছায় আজ তাকে এক মহান ক্ষমতা দান করেছে। এই প্রথম সে ক্ষমতার এত তীব্রতা অনুভব করে। এটা যে তাকে সন্মানের শীর্ষে নিয়ে যাবে, তাকে তার স্বপ্নের সবকিছু দেবে এটা তার বুঝতে বাকি থাকেনা।
এমন অনেক ছোট ছোট বিপদ কাটিয়ে অভিযাত্রীদের যাত্রা চলতে থাকে। তারা জানেনা এ যাত্রার শেষ কোথায়। তবে তারা যে একে অপরের সাথে অলিখিত এক অঙ্গিকারে আবদ্ধ এটা সবাই জানে। সততা, ন্যায়, সাহস ই পারে তাদেরকে তাদের গন্তব্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে। ক্ষমতার এই বিক্রম গ্রাফিকে গ্রাস করতে থাকে। যাত্রা পথে যে কোন ভয়ের সাথে সে চরম সাহসে লড়াই করে। যে অবহেলা তার স্বজাতির চিরসাথী ছিল সেই অবহেলাও আজ তার কাছে বিপদ মনে হয়। কোন এক অদেখা ভয়ের কারনে সে আজ পেতে চায় পুরো পৃথিবীর কুর্নিশ। অবাধ্য সকলকে মৃত্যুকুপে পাঠাবে মনে মনে শপথ করে সে। এভাবে একের পর এক সাহসী, নিরীহ, ভাল, খারাপ অনেকের রক্তের ওপর দিয়ে গ্রাফি এগুতে থাকে সামনের দিকে। আগন্তুকত্রয় এটা পুরোটা মেনে নিতে না পারলেও অদৃশ্য মায়ায় কিছু বলতে পারেনা। তার জন্য তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করতে থাকে ক্ষনে ক্ষনে। আর গ্রাফির ওপর বাড়তে থাকে স্বজাতির সাথে বিশ্বাস ঘাতকতার বোঝা। কিন্তু এই বোঝা ক্ষমতার এই দাপটে গ্রাফিকে ছুতে পারেনা। একদিন অভিযাত্রীদের সামনে আসে এক কুকুর দম্পতি। সব জানার পরে শান্তির জন্য তারা অভিযাত্রীদের পথ ছেড়ে দেয়। এতে দলের সবাই খুশি হয়। আবার তারা তাদের যাত্রা শুরু করে। কিন্তু গ্রাফির নজর গিয়ে পরে দম্পতির সুন্দরীটির দিকে। পৃথিবীর সব কিছুই তার কেন নয় এমন চিন্তায় মগ্ন থাকা গ্রাফি ভুলে যায় তার অঙ্গীকার, তার দায়িত্ব। পথভ্রষ্ট তরুন পশুটি তীব্র দাপটে মেরে ফেলতে চায় আরেক সুন্দরী পশুর স্বামীকে। দায়িত্বের কাছে বন্দী নিষ্পাপ কুকুরটিও তীব্র বিক্রমে পালটা আক্রমন করে। শুরু হয় পাপ আর কর্তব্যের লড়াই। কর্তব্যের কাছে পাপ যখন ধরাশায়ী তখন গ্রাফি সাহায্য যায় আগন্তুকত্রয়ের। কিন্তু লক্ষ্যের কাছে বন্দী আগন্তুকত্রয় বুঝতে পারে এখানেই শেষ করার সময়। নেশার কাছে অন্যায় কে প্রশ্রয় দিলে প্রকৃতিও তাদের ক্ষমা করবেনা। তারা নিষ্পাপ সাহসী পশুটিকে নির্দেশ দেয় এই অহমিকার ইতি টানতে। সন্মান আর ভালবাসার কাছে পরাজয় ঘটে ভয়ের। আগন্তুকত্রয় গ্রাফিকে পিছে ফেলেই এগুতে থাকে নিজেদের লক্ষ্য জয়ে। তাদের যাত্রার শেষ কোথায় তারা জানেনা। শুধু জানে একটি কালো অভিযাত্রার শেষ তারা করতে পেরেছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২১ রাত ১২:১৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের শিক্ষা - ১

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ৯:২৬



সমাজ আমাদের বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে। কখনো ধন-সম্পদ দিয়ে, আবার কখনোবা কপর্দকশূন্যতা দিয়েও! সমাজের এই পরীক্ষায় কেউ জিতেন, আবার কেউবা পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়ে বিদায় নেন এই ধরাধাম থেকে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিষন্ন মেঘের ভেলায় ভেসে....

লিখেছেন ইন্দ্রনীলা, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ১০:২৯



তোমাকে শুধু একটাবার বড় দেখতে ইচ্ছা করে...
এই ইচ্ছায় আমি হয়ে যাই একটা ঘাসফড়িং
কিংবা আসন্ন শীতের লাল ঝরাপাতা,
উড়ে যাই ভেসে যাই দূর থেকে দূরে...
অজানায়...

শরতের কাঁশফুলের পেঁজা তুলো হয়ে
ফুঁড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রেইস

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ২:০৯


এরা সাড়ে তিনফুট থেকে চারফুট দীর্ঘ,ছোট খাটো,পাতলা গড়ন বিশিষ্ট। চোখগুলো খুব বড়, নাক দৃশ্যমান নয়,ত্বক ছাই বর্ণের,অমসৃণ এবং কুঁচকানো। উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন। পুরোই... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭

আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের একটি জনপ্রিয় নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। ভাড়াটে খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×