somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্রিটিশ উপনিবেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যৌক্তিকতা বাংলাদেশে নেই

২২ শে এপ্রিল, ২০২১ রাত ২:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবি-ইন্টারনেট
প্রথম প্রকাশ- বাংলাদেশ জার্নাল, ২০ এপ্রিল ২০২১

ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে ভারতবষের্র রাজনৈতিক আদর্শে বিভক্ত হয়েছিল মূলত ধর্মের ভিত্তিতে। ইংরেজরা দখলদারিত্বকে দীর্ঘায়িত করার মূল হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিল ধর্মকে। ইংরেজদের কূটকৌশলে হিন্দু-মুসলিম সাপ্রদায়িক দ্বন্দ কার্যত রাজনৈতিক বিদ্বেষে রুপ নিত। ব্রিটিশ পূর্ব ভারতে তুর্কি-পাঠান-আফগান মোগল শাসকেরা হিন্দু প্রধান ভারতীয়দের কাছে মুসলিম শাসক বলে পরিচিত হলেও ইংরেজরা নিজেদের খ্রিস্টান শাসক বলে পরিচিত করেননি। তাদের এই পরিচিতি অসাম্প্রদায়িক ছিল বলে বিবেচ্য নয় কারণ ব্রিটিশরা ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে বিভ্রান্ত করতে হিন্দু-মুসলিম বিবাদের সর্বোচ্চ ফায়দা নিয়েছে। ঘৃণ্য কৌশলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়কে কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে পৃথক করে রেখে ভারতে কংগ্রেসকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।

১৮৭০-এর দশক থেকে ব্রিটিশরা সুপরিকল্পিত ভাবে ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানদের সরাসরি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠনে উৎসাহিত করতে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের উচ্চ শিক্ষিত ও অভিজাত শ্রেণির আকাখ্ঙার প্রতিফলন হিসেবে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’বা ভারত সভা। আরো পরে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে নেয় সর্বভারতীয় সংগঠন ‘সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’। ইংরেজি শিক্ষার প্রতি উদাসীন থাকা এবং বিদেশি শাসনের সংগে সহযোগিতা না করার ফলে ভারতীয় মুসলমানরা অত্যন্ত পিছিয়ে পড়ে। তাদের সেই দুর্দিনে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং বাংলার নেতা নবাব আবদুল লতিফ ও স্যার সৈয়দ আমির আলী। আগা খান এবং ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ প্রমুখ মুসলিম নেতাগণও কেবল সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পরা মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়েই প্রাধান্য দিতেন। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ থিওডোর বেক-এর প্রভাবে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ও আলিগড় আন্দোলনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বিভেদপন্থী সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রকাশ করেন। স্যার সৈয়দ আহমেদ খান মনে করতেন কংগ্রেস হিন্দুদের প্রতিষ্ঠান এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন হিন্দুদের আন্দোলন। কংগ্রেস নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা দাবি করলে হিন্দুদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের এই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের প্রচন্ড ভাবে প্রভাবিত করে। ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ব্রিটিশ সরকার এই পরিস্থিতির পূর্ণ সদব্যবহার করে। ধর্মীয় বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য লর্ড ডাফরিন জাতীয় কংগ্রেসকে ভারতীয় জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন।

১৯০৬ সালের ২০ জুলাই কমন্সসভায় ভারত সচিব লর্ড মর্লি ভারত শাসনতন্ত্র বিষয়ক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় আলিগড়ের মুসলিম নেতাগণের এই ধারণা হয় যে নতুন ব্যবস্থায় হিন্দুদের কাছে সব ক্ষমতা চলে যাবে। ইতোপূর্বে ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনে মুসলমানদের স্বার্থ ভীষণভাবে ক্ষুন্ন হয়েছিল। এ আইনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে প্রতিনিধি প্রেরণের যে রীতি প্রণীত হয়েছিল তা মুসলমানদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়। ফলে মুসলিম নেতৃবৃন্দের মধ্যে বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে মুসলিমদের স্বার্থ যথাযথরূপে সংরক্ষণের যৌক্তিক দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষে মুসলিম নেতৃবৃন্দ প্রস্তাবিত কাউন্সিলের গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি শাসকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এ উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখে আলীগড় কলেজের সেক্রেটারি নওয়াব মুহসিন-উল-মুলক কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ.এ.জে আর্চবোল্ড-এর মাধ্যমে বড়লাট লর্ড মিন্টোর কাছে আসন্ন শাসনতান্ত্রিক সংস্কার সম্বন্ধে আলোচনার জন্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের একটি প্রতিনিধি দল গ্রহণ করার আবেদন জানান।

১ অক্টোবর আগাখানের নেতৃত্বে ৩৫ জনের একটি প্রতিনিধিদল লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ প্রতিনিধিদলে পশ্চিম বাংলা থেকে পাঁচ জন এবং পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ থেকে একমাত্র নওয়াব নওয়াব আলী চৌধুরী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রতিনিধি দল লর্ড মিন্টোর কাছে যে দাবিসমূহ পেশ করে সেগুলি হলো: (ক) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই সামরিক, বেসামরিক এবং বিচার বিভাগে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নিয়োগ; (খ) পৌরসভা, জেলাবোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটে মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষণ; (গ) জনসংখ্যার অনুপাতে নয় রাজনৈতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাদেশিক কাউন্সিলে মুসলমানদের নির্বাচিত করতে হবে; (ঘ) মুসলমানগণ যাতে গুরুত্বহীন সংখ্যালঘুতে পরিণত না হয় সেজন্য পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে যথেষ্ট সংখ্যায় মুসলমানদের নির্বাচনের রক্ষাকবচ থাকতে হবে এবং (ঙ) একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা হবে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের গর্ব। গভর্ণর জেনারেল স্মারকলিপিতে উল্লিখিত মুসলমানদের প্রধান দাবি অর্থাৎ, মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন ব্যক্ত করেন। এর ফলে সা¤প্রদায়িক বিভেদের বীজ দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলায় কংগ্রেস পরিচালিত হত ‘হিন্দু মহাসভা’দ্বারা। ভারতবর্ষের রাজনীতিতে লালা লাজপত রায়, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো নেতারা ছিলেন হিন্দুত্ববাদী। কংগ্রেস নেতা বালগঙ্গাধর তিলকের গণপতি উৎসব এবং পরবর্তী কালে চরমপন্থী বিপ্লবীদের সনাতন ধর্মীয় উন্মাদনা ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদ তৈরি করেছিল, কালক্রমে তাই সাম্প্রদায়িকতা এবং বিরোধের পথ প্রশস্ত করেছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক ভাবনার বাস্তবায়ন এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে ডিসেম্বর ঢাকার নবাব সালিম উল্লাহ। ভারত মুসলিম লিগ গঠন করেন। ফলে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ রাজনৈতিক পরিচিতি লাভ করে। ১৯০৯ সালে মুসলিম লিগ একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে আইনসভায় মুসলিম সদস্য পাঠানোর দাবি তোলে। তাই ১৯০৯ সালে ২৩ শে ফেব্রুয়ারি মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন -এ মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

ইংরেজ শাসনামলে মধ্যবিত্তদের উত্থান, বুর্জোয়াদের আবির্ভার, হিন্দু জাতীয়তাবাদ, চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ, মুসলিম জাতীয়তাবাদ, আর্থসামাজিক অনগ্রসরতা, আর্যসমাজের উগ্র হিন্দুত্ববাদ, বঙ্গভঙ্গের সময় ব্রিটিশের কুমন্ত্রণা ইত্যাদি ঘটনা ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ভিত তৈরি করেছিল তাতে মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে শাসনতান্ত্রিক মর্যাদা লাভ করে।

৪৭-এর ‘স্বাধীনতা’ ও ‘দেশভাগ’-এর পরেও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি খারিজ করে কেন্দ্রভিত্তিক শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন ও সংবিধান প্রণয়ন করতে চেয়েছিল। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির নেতৃবৃন্দ মুসলিম ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে এককেন্দ্রিক পাকিস্তানি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পুঁজি করেই পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি সমৃদ্ধ করার নামে তারা শুরু করল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত। ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বছর না ঘুরতেই ভাষার মর্যাদা নিয়ে মতদ্বৈততা এই ভূখন্ডের অধিবাসীদের চিন্তার জগতে একটি বড় পরিবর্তনের বার্তা দিল। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষার লড়াইটা তৃণমূল পর্যায়ের মুসলিম মানসে অসাম্প্রদায়িক ভাবনার খোরাক জুগিয়েছিল।

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বাংলা ভাষার প্রশ্নে নির্বিচার হত্যা ও নির্যাতন মানুষকে ধর্ম ভিত্তিক বিভাজন-দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে ভাবিয়েছিল। অধিকার বঞ্চনার ফলে ধর্মভীরু বাঙালির মনোভাবে পরিবর্তন আসতে থাকে। ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিতব্য পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন পূর্ববাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকার কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে আইন পাশের মাধ্যমে পিছিয়ে দেয় ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। ৮ থেকে ১২ মার্চের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে মুসলিম লীগের কবর রচনা করল বাঙালিরা। অথচ এই অঞ্চলের মানুষই পাকিস্তান গঠনের পক্ষে একচেটিয়া ভোট দিয়েছিল। সেই জনগনের মানসিক জগতে বিপরীতমূখী পরিবর্তনের কারণ ছিল ধর্মীয় ভাবাবেগকে ব্যবহার করে তৈরি বৈষম্য। ১৯৫৪ সালে

পূর্ববাংলা সচিবালয়ে কোনো বাঙালি সচিব ছিলেন না। ১৯৫৬ সালে দেশের সেনাবাহিনীতে মেজর থেকে জেনারেল পর্যন্ত মোট ৬০০ জন অফিসারের মধ্যে মাত্র ১০ জন ছিলেন বাঙালি। ১৯৪৭-১৯৫৪ সময়কালে কেন্দ্রীয় সরকার যেখানে পূর্ববাংলায় ব্যয় করেছে ৪২ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকা, একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯০ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা। বিদেশি সাহায্যের তের ভাগের মাত্র এক ভাগ পূর্ববাংলায় দেয়া হয়। পূর্ববাংলার সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতি এ অন্যায্য আচরন মানুষের মনে সাম্প্রদায়িক চেতনার মুসলিম লীগ ও সরকারের প্রতি ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করে। নির্বাচনে মোট ৩০৯টি আসনের ৩০০ টিতেই যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে।
পূর্ব বাংলায় ভোটের বিপ্লবে সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জয় হয়। মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পূর্বে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুট মিলে অবাঙালি এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির ষড়যন্ত্রে সংঘটিত এক দাঙ্গায় ১ হাজার ৫০০ নিরপরাধ শ্রমিক নিহত হন। এ বিষয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও যুক্তফ্রন্ট নেতা এবং গোপালগঞ্জ আসনের প্রাদেশিক আইনসভার এমএলএ পদে বিজয়ী শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এই দাঙ্গা যে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এবং দুনিয়াকে নতুন সরকারের অদক্ষতা দেখাবার জন্য বিরাট এক ষড়যন্ত্রের অংশ সে সম্বন্ধে আমার মনে কোনো সন্দেহ নাই। ষড়যন্ত্র করাচি থেকে করা হয়েছে।’ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি জনবিদ্বেষের উদগিরণ ঘটায় নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে সাংবাদিক কালাহান লিখেছিলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বলেছেন, বাংলাকে স্বাধীন করা তাঁর প্রথম কাজ।’ এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৪ সালের ৩১ মে দেশদ্রোহের অভিযোগে এ কে ফজলুল হকের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরের এক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তৎকালীন পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহম্মদ আইয়ুব খান। আইয়ুব খানের প্রায় সাড়ে দশ বছরের শাসনামলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য আরো বৃদ্ধি পায়। বাঙালির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভূমিকা পালন করার দায়ে আইয়ুব খান ইত্তেফাক, সংবাদ ও পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকা তিনটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেন। তিনি রোমান হরফে বাংলা লেখার জন্য বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের সভাপতিত্বে ‘বাংলা ভাষা সংস্কার কমিটি’গঠিত করেন। বাংলা ভাষাকে পরিবর্তন করে ‘মুসলমানিত্ব’ প্রদান করার উদ্দেশ্যে নজরুলের কবিতার শব্দ পরিবর্তন করে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনে বাধার সৃষ্টি করে। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ বন্ধে সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। বাঙালিদের মৌলিকতার ওপর পশ্চিমাদের এমন রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা প্রদর্শনে পূর্ববাংলার মানুষের ধারণা জন্মায় যে তাদের কখনই সমঅধিকার দেয়া হবে না। ইসলামাবাদের উন্নয়নে ১৯৬৭ সালে বরাদ্দ হয় ৩০০০ মিলিয়ন টাকা, ঢাকার উন্নয়নে বরাদ্দ হয় মাত্র ২৫০ মিলিয়ন টাকা। ১৯৪৭-৬৬ সময়কালে পাকিস্তানের মোট রফতানিতে পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ ছিল ৪২ ভাগ, অথচ মোট আমদানিতে তার অংশ ছিল ৬৯ ভাগ। অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে রফতানি খাতে অবদান ৫৮ ভাগ হলেও সেখানে আমদানি হয় মাত্র ৩১ ভাগ। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ৩৬ টি, যার মোট ১১৩০টি শাখার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে শাখা ছিল মাত্র ৩৬২টি (৩২%)। ১৯৬৬ সালে কেন্দ্রীয় সরকারে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৩৩৮ এবং ৩৭০৮ জন। একই বছর নন-গেজেটেড কর্মচারী সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানী ২৬,৩১০ জন এর পশ্চিম পাকিস্তানী ৮২,৯৪৪ জন। তাছাড়া ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত, অর্থ ও সংস্থাপন সচিব, অর্থমন্ত্রী, স্টেট ব্যাংকের গভর্নর কখনই পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিযুক্ত হননি। ক্যাডার সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানীদের হার ছিল নিম্নরূপ: সচিব ১৪%, যুগ্মসচিব ৬%, উপ-সচিব ১৮%, সহকারি সচিব ২০% (মোট ৭৪১ জনের মধ্যে মাত্র ৫১ জন)। ১৯৪৭ সালে প্রাইমারি থেকে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে বেশি থাকলেও পরবর্তী ২০ বছরে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে মানুষ বুঝতে পারে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলতে কিছুই নেই। এসব বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও জোরদার হয়। অবশেষে ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলনের সূচনা হয় যা নানান ঘটনায় পাকিস্তান সরকারের ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানীরা মুসলিম ভাবাবেগ ভুলে গোটা বাঙালি জাতিকেই অমুসলিম গন্য করে বাঙালিদের অপারেশন সার্চলাইটের প্রণেতা জনারেল টিক্কা খান যশোরে সাংবাদিকদের একটি দলের সঙ্গে আলাপকালে বাঙালি সম্পর্কে বলেন ‘প্যাহেলে উনকো মুছলমান কারো’(প্রথমে এদেরকে মুসলমান বানাও)। এ প্রসংগে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কোরাল বেল স্কুল অফ এশিয়া-প্যাসিফিক এফেয়ার্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ড: বীণা ডি কস্টা তাঁর ‘ভিক্টোরি’স সাইলেন্স’বইটিতে বলেন, এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বোচ্চস্তরের নিকট বাঙালিদের সম্পর্কে অনুভূতি হচ্ছে আনুগত্যহীন মুসলিম এবং দেশপ্রেমহীন পাকিস্তানী। মুসলমান-মুসলমান ভাই ভাই একথা বেমালুম ভুলে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে এবং বাঙালি জাতিকে শুদ্ধ করতে বাঙালি নারীদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করে গর্ভবতী করার মাধ্যমে জাতিগত শোধন বা এথনিক ক্লিনজিং-এর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।

পাকিস্তানি জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা ‘আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ঔন কান্ট্রি’ বইতে লিখেছেন: ‘নিয়াজী ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে এক বাঙালি সেনা অফিসার আত্মহত্যা করতে বসেন।’ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার আবদুল রহমান সিদ্দিকী তার ‘ইস্ট পাকিস্তান দ্য এন্ড গেইম’বইতে আর লেখেন: ‘নিয়াজী জওয়ানদের অসৈনিকসুলভ, অনৈতিক এবং কামাসক্তিমূলক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করতেন।’ জোরপূর্বক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে, গর্ভপাতের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন ১৯৯০ সালে করা হলেও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারীদের জীবন ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গর্ভপাত’কে আইনসিদ্ধ করা হয়েছিল। তখনকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এই ঘৃন্য অপরাধের প্রতিবাদ তো করেই নি বরং এই পৈশাচিকতায় মদদ দিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিটার টমসনের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগনকে রুখতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আই.এস.আই. ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামির সাথে মিলিত হয়ে আল বদর (চাঁদ), আল শামস (সূর্য) এর মত মিলিশিয়া আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। এই সকল বাহিনী অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী হত্যা, নারী ধর্ষণের মত যুদ্ধাপরাধে অংশ নিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত মুসলিম লীগ, নিজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামি এবং জমিয়তে উলামা পাকিস্তান দলের সদস্যরা সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল।

বাঙালির বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ প্রানের আত্মত্যাগের মহিমা এবং ২ লক্ষেরও অধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল তা ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পুঁজি করে প্রতিষ্ঠিত একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে, মুসলিম ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থ হাসিলের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের পরাজয় মানে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিজয়। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পাশাপাশি মানুষের এই আদর্শিক এবং মনোজগতিক পরিবতর্নে স্বভাবতই আশা করা হয়েছিল বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থাকবে না। এর প্রতিফলন স্বরূপ ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সাংবিধানিক ভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ও বিশেষ কোনো ধর্ম পালনের কারণে ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য লোপ করা হবে বলে অঙ্গীকার ছিল। তদুপরি সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুযায়ী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করার বা তাদের সদস্য হওয়ার বা অন্য কোনোভাবে তার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকবে না। ১৯৭৭ সালের প্রোক্লেমেশন অর্ডার নম্বর ১-এর মাধ্যমে সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণভাবে ও ৩৮ অনুচ্ছেদের অংশবিশেষ বিলোপের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিকে ফিরে আসে। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদেরকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে ৮০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে নিজের একটি শক্তিশালী ‘ধর্মভিত্তিক আদর্শিক সমর্থক গোষ্ঠী’ তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নৃশংস ভাবে হত্যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সামরিকতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, বিভাজনের রাজনীতি, অবিশ্বাস, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, বাকস্বাধীনতা বা মানবাধিকারহরন সহ অনেক কিছুই দেখেছে। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জনও কিন্তু কম নয়। এসব অর্জনে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবদান সম্পর্কে দেশের সচেতন নাগরিকদের খুব ভাল ধারনা রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এদেশের মাঠে বা ভোটে কোথাও জনপ্রিয় হয়নি। বাংলাদেশে নিবন্ধিত ইসলামি রাজনৈতিক দল আছে ১০টি, নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে সত্তরটিরও বেশি। লেজুড়বৃত্তি ভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে এসব দলের পরিচিতিও খুব সীমিত। এসব দল বিভিন্ন নির্বাচনের পূর্বে ক্ষমতার ‘হালুয়া-রুটির’ যৎসামান্য ভাগেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে নিজেদেরকে বিভিন্ন জোটে অন্তর্ভুক্ত করে। তবুও বিরানব্বই শতাংশ মুসলমানের সত্তরটি ইসলামি দল এগারোটি সংসদ নির্বাচন মিলিয়ে সাকুল্যে সত্তরটি আসনও পায়নি। নানান দোহাই, ধর্মীয় প্রোপাগান্ডা চালিয়েও নির্বাচনে সফলতা পাননি তারা।

নারী-পুরুষদেরও ইসলামি দলগুলোকে ভোট দানে ব্যাপক অনাগ্রহ লক্ষ্যনীয়। স্থানীয় ওয়াজ মাহফিলে কয়েক হাজার থেকে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটলেও সংসদ নির্বাচনে ঐ এলাকার ইসলামি প্রার্থীর হাতে গোনা কয়েক হাজার ভোট পাবার রেকর্ডও রয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষন করলে ভোট দানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ভোটাগণের চূড়ান্ত রকমের ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। ধর্মীয় রাজনীতি কিংবা রাজনীতির সাথে ধর্ম মেশানোকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ কখনোই পছন্দ করেননি। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি বাদে একমাত্র ইসলামি ঐক্যজোটই ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল মোট ৪টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাকুল্যে ৪টি আসন লাভ করেছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রয়ারি ২য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ যৌথভাবে ১০% ভোট পেয়ে ২০টি আসন লাভ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পাওয়া জামায়াতে ইসলামি প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে ৪.৬% ভোট পেয়ে ১০ আসন পায় জামায়াত, ১.৪% ভোট পেয়ে ৪ টি আসন লাভ করে মুসলিম লীগ। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি ১২.১% ভোট পেয়ে ১৮টি আসন এবং ০.৮% ভোট পেয়ে ইসলামি ঐক্য জোট ১ টি করে আসন পায়। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি ৮.৬% ভোট পেয়ে ৩টি আসন, ইসলামি ঐক্য জোট ১.১%ভোট পেয়ে ১ আসন লাভ করে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি ৪.২৮% ভোট পেয়ে ১৭ টি এবং ইসলামি ঐক্য জোট ০.৫৬% ভোট পেয়ে ২ টি আসনে জয়লাভ। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল মূলত জোট ভিত্তিক। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামি ৪.৬% ভোট পেয়ে ২টি আসন পায়। মোট গৃহীত ভোটের মধ্যে ইসলামি দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার বলে দেয় বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষই ধর্মকে রাজনৈতিক রূপ দিতে অনিচ্ছুক।

তবুও বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কেন টিকে আছে এ প্রশ্ন জাগে অনেকের মনেই। এর পেছনে মোটা দাগে মূল কারণ হিসেবে যেসব বিষয় সামনে আসে সেগুলো হল- বাংলাদেশের আবহমান কালের সংস্কার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে ব্যবহার ও ধর্মীয় দলের সংগে জোট বন্ধন, বৈষম্যমূলক উন্নয়ন এবং ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আধিক্য। ২০১১ সালে আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বর্ণনা করে তা বাতিল করা হলে সংবিধানে ১২ অনুচ্ছেদ ফিরে আসে এবং ৩৮ অনুচ্ছেদ নতুন রূপ লাভ করে। এই পঞ্চদশ সংশোধনীর পরিবর্তিত ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে কারও এমন সমিতি বা সংঘ গঠন করার কিংবা তার সদস্য হওয়ার অধিকার থাকবে না, যা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কিংবা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ পরিবর্তনের ফলে এ সংবিধানের আওতায় রাষ্ট্র কোনো দলকে ধর্মভিত্তিক হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ করতে পারবে না। আবার নিষিদ্ধ কালীন অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল অবধি দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল না থাকলেও এ লক্ষ্যে কাজ করেছে বিভিন্ন সংগঠন। একই প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল এবং এখন তা ব্যাপক রূপ লাভ করেছে। সাম্প্রতিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভয়াবহ সহিংসতা দেশকে যে অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে তার থেকে পরিত্রান পেতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমস্যাগুলোর ঝুঁকি নিরসনে এসব দলগুলোর ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রন প্রাতিষ্ঠা করা জরুরি। এজন্য সবার আগে জরুরি নাগরিকের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। গণতান্ত্রিক রাজনীতি সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম। জনগনের ভেতরে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে তফাত সমন্ধে আরো পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে সব ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক বিষয়গুলো এক রকম রাখা জরুরি। মনোজগতে পরিবর্তন আনতে ধর্মীয় রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন উন্নত মুসলিম প্রধান দেশের ইসলামপন্থীদের চিন্তাভাবনা, রাজনীতি ও সমাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিতির সুয়োগ এবং খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত ও যুক্তিবাদী মানুষেরাই এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অযৌক্তিকতাকে বারবার প্রমাণ করবেন।

ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে ভারতবষের্র রাজনৈতিক আদর্শে বিভক্ত হয়েছিল মূলত ধর্মের ভিত্তিতে। ইংরেজরা দখলদারিত্বকে দীর্ঘায়িত করার মূল হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিল ধর্মকে। ইংরেজদের কূটকৌশলে হিন্দু-মুসলিম সাপ্রদায়িক দ্বন্দ কার্যত রাজনৈতিক বিদ্বেষে রুপ নিত। ব্রিটিশ পূর্ব ভারতে তুর্কি-পাঠান-আফগান মোগল শাসকেরা হিন্দু প্রধান ভারতীয়দের কাছে মুসলিম শাসক বলে পরিচিত হলেও ইংরেজরা নিজেদের খ্রিস্টান শাসক বলে পরিচিত করেননি। তাদের এই পরিচিতি অসাম্প্রদায়িক ছিল বলে বিবেচ্য নয় কারণ ব্রিটিশরা ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে বিভ্রান্ত করতে হিন্দু-মুসলিম বিবাদের সর্বোচ্চ ফায়দা নিয়েছে। ঘৃণ্য কৌশলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়কে কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে পৃথক করে রেখে ভারতে কংগ্রেসকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।

১৮৭০-এর দশক থেকে ব্রিটিশরা সুপরিকল্পিত ভাবে ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানদের সরাসরি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠনে উৎসাহিত করতে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের উচ্চ শিক্ষিত ও অভিজাত শ্রেণির আকাখ্ঙার প্রতিফলন হিসেবে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’বা ভারত সভা। আরো পরে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে নেয় সর্বভারতীয় সংগঠন ‘সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’। ইংরেজি শিক্ষার প্রতি উদাসীন থাকা এবং বিদেশি শাসনের সংগে সহযোগিতা না করার ফলে ভারতীয় মুসলমানরা অত্যন্ত পিছিয়ে পড়ে। তাদের সেই দুর্দিনে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং বাংলার নেতা নবাব আবদুল লতিফ ও স্যার সৈয়দ আমির আলী। আগা খান এবং ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ প্রমুখ মুসলিম নেতাগণও কেবল সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পরা মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়েই প্রাধান্য দিতেন। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ থিওডোর বেক-এর প্রভাবে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ও আলিগড় আন্দোলনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বিভেদপন্থী সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রকাশ করেন। স্যার সৈয়দ আহমেদ খান মনে করতেন কংগ্রেস হিন্দুদের প্রতিষ্ঠান এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন হিন্দুদের আন্দোলন। কংগ্রেস নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা দাবি করলে হিন্দুদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের এই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের প্রচন্ড ভাবে প্রভাবিত করে। ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ব্রিটিশ সরকার এই পরিস্থিতির পূর্ণ সদব্যবহার করে। ধর্মীয় বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য লর্ড ডাফরিন জাতীয় কংগ্রেসকে ভারতীয় জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন।

১৯০৬ সালের ২০ জুলাই কমন্সসভায় ভারত সচিব লর্ড মর্লি ভারত শাসনতন্ত্র বিষয়ক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় আলিগড়ের মুসলিম নেতাগণের এই ধারণা হয় যে নতুন ব্যবস্থায় হিন্দুদের কাছে সব ক্ষমতা চলে যাবে। ইতোপূর্বে ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনে মুসলমানদের স্বার্থ ভীষণভাবে ক্ষুন্ন হয়েছিল। এ আইনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে প্রতিনিধি প্রেরণের যে রীতি প্রণীত হয়েছিল তা মুসলমানদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়। ফলে মুসলিম নেতৃবৃন্দের মধ্যে বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে মুসলিমদের স্বার্থ যথাযথরূপে সংরক্ষণের যৌক্তিক দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষে মুসলিম নেতৃবৃন্দ প্রস্তাবিত কাউন্সিলের গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি শাসকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এ উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখে আলীগড় কলেজের সেক্রেটারি নওয়াব মুহসিন-উল-মুলক কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ.এ.জে আর্চবোল্ড-এর মাধ্যমে বড়লাট লর্ড মিন্টোর কাছে আসন্ন শাসনতান্ত্রিক সংস্কার সম্বন্ধে আলোচনার জন্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের একটি প্রতিনিধি দল গ্রহণ করার আবেদন জানান।

১ অক্টোবর আগাখানের নেতৃত্বে ৩৫ জনের একটি প্রতিনিধিদল লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ প্রতিনিধিদলে পশ্চিম বাংলা থেকে পাঁচ জন এবং পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ থেকে একমাত্র নওয়াব নওয়াব আলী চৌধুরী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রতিনিধি দল লর্ড মিন্টোর কাছে যে দাবিসমূহ পেশ করে সেগুলি হলো: (ক) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই সামরিক, বেসামরিক এবং বিচার বিভাগে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নিয়োগ; (খ) পৌরসভা, জেলাবোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটে মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষণ; (গ) জনসংখ্যার অনুপাতে নয় রাজনৈতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাদেশিক কাউন্সিলে মুসলমানদের নির্বাচিত করতে হবে; (ঘ) মুসলমানগণ যাতে গুরুত্বহীন সংখ্যালঘুতে পরিণত না হয় সেজন্য পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে যথেষ্ট সংখ্যায় মুসলমানদের নির্বাচনের রক্ষাকবচ থাকতে হবে এবং (ঙ) একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা হবে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের গর্ব। গভর্ণর জেনারেল স্মারকলিপিতে উল্লিখিত মুসলমানদের প্রধান দাবি অর্থাৎ, মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন ব্যক্ত করেন। এর ফলে সা¤প্রদায়িক বিভেদের বীজ দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলায় কংগ্রেস পরিচালিত হত ‘হিন্দু মহাসভা’দ্বারা। ভারতবর্ষের রাজনীতিতে লালা লাজপত রায়, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো নেতারা ছিলেন হিন্দুত্ববাদী। কংগ্রেস নেতা বালগঙ্গাধর তিলকের গণপতি উৎসব এবং পরবর্তী কালে চরমপন্থী বিপ্লবীদের সনাতন ধর্মীয় উন্মাদনা ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদ তৈরি করেছিল, কালক্রমে তাই সাম্প্রদায়িকতা এবং বিরোধের পথ প্রশস্ত করেছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক ভাবনার বাস্তবায়ন এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে ডিসেম্বর ঢাকার নবাব সালিম উল্লাহ। ভারত মুসলিম লিগ গঠন করেন। ফলে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ রাজনৈতিক পরিচিতি লাভ করে। ১৯০৯ সালে মুসলিম লিগ একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে আইনসভায় মুসলিম সদস্য পাঠানোর দাবি তোলে। তাই ১৯০৯ সালে ২৩ শে ফেব্রুয়ারি মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন -এ মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

ইংরেজ শাসনামলে মধ্যবিত্তদের উত্থান, বুর্জোয়াদের আবির্ভার, হিন্দু জাতীয়তাবাদ, চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ, মুসলিম জাতীয়তাবাদ, আর্থসামাজিক অনগ্রসরতা, আর্যসমাজের উগ্র হিন্দুত্ববাদ, বঙ্গভঙ্গের সময় ব্রিটিশের কুমন্ত্রণা ইত্যাদি ঘটনা ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ভিত তৈরি করেছিল তাতে মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে শাসনতান্ত্রিক মর্যাদা লাভ করে।

৪৭-এর ‘স্বাধীনতা’ ও ‘দেশভাগ’-এর পরেও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি খারিজ করে কেন্দ্রভিত্তিক শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন ও সংবিধান প্রণয়ন করতে চেয়েছিল। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির নেতৃবৃন্দ মুসলিম ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে এককেন্দ্রিক পাকিস্তানি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পুঁজি করেই পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি সমৃদ্ধ করার নামে তারা শুরু করল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত। ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বছর না ঘুরতেই ভাষার মর্যাদা নিয়ে মতদ্বৈততা এই ভূখন্ডের অধিবাসীদের চিন্তার জগতে একটি বড় পরিবর্তনের বার্তা দিল। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষার লড়াইটা তৃণমূল পর্যায়ের মুসলিম মানসে অসাম্প্রদায়িক ভাবনার খোরাক জুগিয়েছিল।

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বাংলা ভাষার প্রশ্নে নির্বিচার হত্যা ও নির্যাতন মানুষকে ধর্ম ভিত্তিক বিভাজন-দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে ভাবিয়েছিল। অধিকার বঞ্চনার ফলে ধর্মভীরু বাঙালির মনোভাবে পরিবর্তন আসতে থাকে। ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিতব্য পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন পূর্ববাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকার কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে আইন পাশের মাধ্যমে পিছিয়ে দেয় ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। ৮ থেকে ১২ মার্চের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে মুসলিম লীগের কবর রচনা করল বাঙালিরা। অথচ এই অঞ্চলের মানুষই পাকিস্তান গঠনের পক্ষে একচেটিয়া ভোট দিয়েছিল। সেই জনগনের মানসিক জগতে বিপরীতমূখী পরিবর্তনের কারণ ছিল ধর্মীয় ভাবাবেগকে ব্যবহার করে তৈরি বৈষম্য। ১৯৫৪ সালে

পূর্ববাংলা সচিবালয়ে কোনো বাঙালি সচিব ছিলেন না। ১৯৫৬ সালে দেশের সেনাবাহিনীতে মেজর থেকে জেনারেল পর্যন্ত মোট ৬০০ জন অফিসারের মধ্যে মাত্র ১০ জন ছিলেন বাঙালি। ১৯৪৭-১৯৫৪ সময়কালে কেন্দ্রীয় সরকার যেখানে পূর্ববাংলায় ব্যয় করেছে ৪২ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকা, একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯০ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা। বিদেশি সাহায্যের তের ভাগের মাত্র এক ভাগ পূর্ববাংলায় দেয়া হয়। পূর্ববাংলার সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতি এ অন্যায্য আচরন মানুষের মনে সাম্প্রদায়িক চেতনার মুসলিম লীগ ও সরকারের প্রতি ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করে। নির্বাচনে মোট ৩০৯টি আসনের ৩০০ টিতেই যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে।
পূর্ব বাংলায় ভোটের বিপ্লবে সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জয় হয়। মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পূর্বে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুট মিলে অবাঙালি এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির ষড়যন্ত্রে সংঘটিত এক দাঙ্গায় ১ হাজার ৫০০ নিরপরাধ শ্রমিক নিহত হন। এ বিষয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও যুক্তফ্রন্ট নেতা এবং গোপালগঞ্জ আসনের প্রাদেশিক আইনসভার এমএলএ পদে বিজয়ী শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এই দাঙ্গা যে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এবং দুনিয়াকে নতুন সরকারের অদক্ষতা দেখাবার জন্য বিরাট এক ষড়যন্ত্রের অংশ সে সম্বন্ধে আমার মনে কোনো সন্দেহ নাই। ষড়যন্ত্র করাচি থেকে করা হয়েছে।’ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি জনবিদ্বেষের উদগিরণ ঘটায় নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে সাংবাদিক কালাহান লিখেছিলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বলেছেন, বাংলাকে স্বাধীন করা তাঁর প্রথম কাজ।’ এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৪ সালের ৩১ মে দেশদ্রোহের অভিযোগে এ কে ফজলুল হকের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরের এক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তৎকালীন পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহম্মদ আইয়ুব খান। আইয়ুব খানের প্রায় সাড়ে দশ বছরের শাসনামলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য আরো বৃদ্ধি পায়। বাঙালির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভূমিকা পালন করার দায়ে আইয়ুব খান ইত্তেফাক, সংবাদ ও পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকা তিনটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেন। তিনি রোমান হরফে বাংলা লেখার জন্য বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের সভাপতিত্বে ‘বাংলা ভাষা সংস্কার কমিটি’গঠিত করেন। বাংলা ভাষাকে পরিবর্তন করে ‘মুসলমানিত্ব’ প্রদান করার উদ্দেশ্যে নজরুলের কবিতার শব্দ পরিবর্তন করে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনে বাধার সৃষ্টি করে। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ বন্ধে সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। বাঙালিদের মৌলিকতার ওপর পশ্চিমাদের এমন রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা প্রদর্শনে পূর্ববাংলার মানুষের ধারণা জন্মায় যে তাদের কখনই সমঅধিকার দেয়া হবে না। ইসলামাবাদের উন্নয়নে ১৯৬৭ সালে বরাদ্দ হয় ৩০০০ মিলিয়ন টাকা, ঢাকার উন্নয়নে বরাদ্দ হয় মাত্র ২৫০ মিলিয়ন টাকা। ১৯৪৭-৬৬ সময়কালে পাকিস্তানের মোট রফতানিতে পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ ছিল ৪২ ভাগ, অথচ মোট আমদানিতে তার অংশ ছিল ৬৯ ভাগ। অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে রফতানি খাতে অবদান ৫৮ ভাগ হলেও সেখানে আমদানি হয় মাত্র ৩১ ভাগ। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ৩৬ টি, যার মোট ১১৩০টি শাখার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে শাখা ছিল মাত্র ৩৬২টি (৩২%)। ১৯৬৬ সালে কেন্দ্রীয় সরকারে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৩৩৮ এবং ৩৭০৮ জন। একই বছর নন-গেজেটেড কর্মচারী সংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানী ২৬,৩১০ জন এর পশ্চিম পাকিস্তানী ৮২,৯৪৪ জন। তাছাড়া ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত, অর্থ ও সংস্থাপন সচিব, অর্থমন্ত্রী, স্টেট ব্যাংকের গভর্নর কখনই পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিযুক্ত হননি। ক্যাডার সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানীদের হার ছিল নিম্নরূপ: সচিব ১৪%, যুগ্মসচিব ৬%, উপ-সচিব ১৮%, সহকারি সচিব ২০% (মোট ৭৪১ জনের মধ্যে মাত্র ৫১ জন)। ১৯৪৭ সালে প্রাইমারি থেকে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে বেশি থাকলেও পরবর্তী ২০ বছরে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে মানুষ বুঝতে পারে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলতে কিছুই নেই। এসব বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও জোরদার হয়। অবশেষে ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলনের সূচনা হয় যা নানান ঘটনায় পাকিস্তান সরকারের ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানীরা মুসলিম ভাবাবেগ ভুলে গোটা বাঙালি জাতিকেই অমুসলিম গন্য করে বাঙালিদের অপারেশন সার্চলাইটের প্রণেতা জনারেল টিক্কা খান যশোরে সাংবাদিকদের একটি দলের সঙ্গে আলাপকালে বাঙালি সম্পর্কে বলেন ‘প্যাহেলে উনকো মুছলমান কারো’(প্রথমে এদেরকে মুসলমান বানাও)। এ প্রসংগে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কোরাল বেল স্কুল অফ এশিয়া-প্যাসিফিক এফেয়ার্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ড: বীণা ডি কস্টা তাঁর ‘ভিক্টোরি’স সাইলেন্স’বইটিতে বলেন, এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বোচ্চস্তরের নিকট বাঙালিদের সম্পর্কে অনুভূতি হচ্ছে আনুগত্যহীন মুসলিম এবং দেশপ্রেমহীন পাকিস্তানী। মুসলমান-মুসলমান ভাই ভাই একথা বেমালুম ভুলে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে এবং বাঙালি জাতিকে শুদ্ধ করতে বাঙালি নারীদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করে গর্ভবতী করার মাধ্যমে জাতিগত শোধন বা এথনিক ক্লিনজিং-এর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।

পাকিস্তানি জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা ‘আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ঔন কান্ট্রি’ বইতে লিখেছেন: ‘নিয়াজী ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে এক বাঙালি সেনা অফিসার আত্মহত্যা করতে বসেন।’ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার আবদুল রহমান সিদ্দিকী তার ‘ইস্ট পাকিস্তান দ্য এন্ড গেইম’বইতে আর লেখেন: ‘নিয়াজী জওয়ানদের অসৈনিকসুলভ, অনৈতিক এবং কামাসক্তিমূলক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করতেন।’ জোরপূর্বক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে, গর্ভপাতের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন ১৯৯০ সালে করা হলেও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারীদের জীবন ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গর্ভপাত’কে আইনসিদ্ধ করা হয়েছিল। তখনকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এই ঘৃন্য অপরাধের প্রতিবাদ তো করেই নি বরং এই পৈশাচিকতায় মদদ দিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিটার টমসনের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগনকে রুখতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আই.এস.আই. ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামির সাথে মিলিত হয়ে আল বদর (চাঁদ), আল শামস (সূর্য) এর মত মিলিশিয়া আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। এই সকল বাহিনী অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী হত্যা, নারী ধর্ষণের মত যুদ্ধাপরাধে অংশ নিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পরাজিত মুসলিম লীগ, নিজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামি এবং জমিয়তে উলামা পাকিস্তান দলের সদস্যরা সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল।

বাঙালির বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ প্রানের আত্মত্যাগের মহিমা এবং ২ লক্ষেরও অধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল তা ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পুঁজি করে প্রতিষ্ঠিত একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে, মুসলিম ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থ হাসিলের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের পরাজয় মানে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিজয়। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পাশাপাশি মানুষের এই আদর্শিক এবং মনোজগতিক পরিবতর্নে স্বভাবতই আশা করা হয়েছিল বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থাকবে না। এর প্রতিফলন স্বরূপ ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সাংবিধানিক ভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ও বিশেষ কোনো ধর্ম পালনের কারণে ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য লোপ করা হবে বলে অঙ্গীকার ছিল। তদুপরি সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুযায়ী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করার বা তাদের সদস্য হওয়ার বা অন্য কোনোভাবে তার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকবে না। ১৯৭৭ সালের প্রোক্লেমেশন অর্ডার নম্বর ১-এর মাধ্যমে সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণভাবে ও ৩৮ অনুচ্ছেদের অংশবিশেষ বিলোপের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিকে ফিরে আসে। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদেরকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে ৮০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে নিজের একটি শক্তিশালী ‘ধর্মভিত্তিক আদর্শিক সমর্থক গোষ্ঠী’ তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নৃশংস ভাবে হত্যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সামরিকতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, বিভাজনের রাজনীতি, অবিশ্বাস, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, বাকস্বাধীনতা বা মানবাধিকারহরন সহ অনেক কিছুই দেখেছে। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জনও কিন্তু কম নয়। এসব অর্জনে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবদান সম্পর্কে দেশের সচেতন নাগরিকদের খুব ভাল ধারনা রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এদেশের মাঠে বা ভোটে কোথাও জনপ্রিয় হয়নি। বাংলাদেশে নিবন্ধিত ইসলামি রাজনৈতিক দল আছে ১০টি, নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে সত্তরটিরও বেশি। লেজুড়বৃত্তি ভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে এসব দলের পরিচিতিও খুব সীমিত। এসব দল বিভিন্ন নির্বাচনের পূর্বে ক্ষমতার ‘হালুয়া-রুটির’ যৎসামান্য ভাগেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে নিজেদেরকে বিভিন্ন জোটে অন্তর্ভুক্ত করে। তবুও বিরানব্বই শতাংশ মুসলমানের সত্তরটি ইসলামি দল এগারোটি সংসদ নির্বাচন মিলিয়ে সাকুল্যে সত্তরটি আসনও পায়নি। নানান দোহাই, ধর্মীয় প্রোপাগান্ডা চালিয়েও নির্বাচনে সফলতা পাননি তারা।

নারী-পুরুষদেরও ইসলামি দলগুলোকে ভোট দানে ব্যাপক অনাগ্রহ লক্ষ্যনীয়। স্থানীয় ওয়াজ মাহফিলে কয়েক হাজার থেকে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটলেও সংসদ নির্বাচনে ঐ এলাকার ইসলামি প্রার্থীর হাতে গোনা কয়েক হাজার ভোট পাবার রেকর্ডও রয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষন করলে ভোট দানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ভোটাগণের চূড়ান্ত রকমের ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। ধর্মীয় রাজনীতি কিংবা রাজনীতির সাথে ধর্ম মেশানোকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ কখনোই পছন্দ করেননি। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি বাদে একমাত্র ইসলামি ঐক্যজোটই ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল মোট ৪টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাকুল্যে ৪টি আসন লাভ করেছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রয়ারি ২য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ যৌথভাবে ১০% ভোট পেয়ে ২০টি আসন লাভ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পাওয়া জামায়াতে ইসলামি প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে ৪.৬% ভোট পেয়ে ১০ আসন পায় জামায়াত, ১.৪% ভোট পেয়ে ৪ টি আসন লাভ করে মুসলিম লীগ। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি ১২.১% ভোট পেয়ে ১৮টি আসন এবং ০.৮% ভোট পেয়ে ইসলামি ঐক্য জোট ১ টি করে আসন পায়। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি ৮.৬% ভোট পেয়ে ৩টি আসন, ইসলামি ঐক্য জোট ১.১%ভোট পেয়ে ১ আসন লাভ করে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি ৪.২৮% ভোট পেয়ে ১৭ টি এবং ইসলামি ঐক্য জোট ০.৫৬% ভোট পেয়ে ২ টি আসনে জয়লাভ। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল মূলত জোট ভিত্তিক। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামি ৪.৬% ভোট পেয়ে ২টি আসন পায়। মোট গৃহীত ভোটের মধ্যে ইসলামি দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার বলে দেয় বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষই ধর্মকে রাজনৈতিক রূপ দিতে অনিচ্ছুক।

তবুও বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কেন টিকে আছে এ প্রশ্ন জাগে অনেকের মনেই। এর পেছনে মোটা দাগে মূল কারণ হিসেবে যেসব বিষয় সামনে আসে সেগুলো হল- বাংলাদেশের আবহমান কালের সংস্কার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে ব্যবহার ও ধর্মীয় দলের সংগে জোট বন্ধন, বৈষম্যমূলক উন্নয়ন এবং ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আধিক্য। ২০১১ সালে আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বর্ণনা করে তা বাতিল করা হলে সংবিধানে ১২ অনুচ্ছেদ ফিরে আসে এবং ৩৮ অনুচ্ছেদ নতুন রূপ লাভ করে। এই পঞ্চদশ সংশোধনীর পরিবর্তিত ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে কারও এমন সমিতি বা সংঘ গঠন করার কিংবা তার সদস্য হওয়ার অধিকার থাকবে না, যা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কিংবা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ পরিবর্তনের ফলে এ সংবিধানের আওতায় রাষ্ট্র কোনো দলকে ধর্মভিত্তিক হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ করতে পারবে না। আবার নিষিদ্ধ কালীন অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল অবধি দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল না থাকলেও এ লক্ষ্যে কাজ করেছে বিভিন্ন সংগঠন। একই প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল এবং এখন তা ব্যাপক রূপ লাভ করেছে। সাম্প্রতিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভয়াবহ সহিংসতা দেশকে যে অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে তার থেকে পরিত্রান পেতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমস্যাগুলোর ঝুঁকি নিরসনে এসব দলগুলোর ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রন প্রাতিষ্ঠা করা জরুরি। এজন্য সবার আগে জরুরি নাগরিকের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। গণতান্ত্রিক রাজনীতি সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম। জনগনের ভেতরে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে তফাত সমন্ধে আরো পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে সব ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক বিষয়গুলো এক রকম রাখা জরুরি। মনোজগতে পরিবর্তন আনতে ধর্মীয় রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন উন্নত মুসলিম প্রধান দেশের ইসলামপন্থীদের চিন্তাভাবনা, রাজনীতি ও সমাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিতির সুয়োগ এবং খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত ও যুক্তিবাদী মানুষেরাই এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অযৌক্তিকতাকে বারবার প্রমাণ করবেন।

লিংক- https://www.bd-journal.com/other/157414/
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০২১ রাত ১:৩৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×