somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজনৈতিক আদর্শের অধঃপতন ও দুর্বৃত্তায়ন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি

২২ শে এপ্রিল, ২০২১ বিকাল ৪:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবি- ইন্টারনেট

প্রথম প্রকাশ- বাংলাদেশ জার্নাল, ০৬ মে ২০২০, ১৭:১৩

ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতিবিদদের অভূতপূর্ব গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস বিশ্ববাসীর জন্য দারুন বিস্ময়ের। এই উপমহাদেশের তিনটি দেশ স্বাধীনতার জন্য সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিবিদদের আত্মত্যাগ, পাহাড়সম দৃঢ়তা, অধ্যাবসায় এবং আনকোরা কৌশলের কাছে চিরঋণী হয়ে আছে। একটা সময় আমাদের দেশেও রাজনীতিবিদেরা ছিলেন আমাদের অহংকার, ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। তাদের হাত ধরেই এই দেশে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, তৎকালীন পূর্ব- বাংলার সার্বভৌমত্বের প্রথম স্মারক ঘোষিত হয়েছিল ৬-দফা পেশের মাধ্যমে, এদেশের চির-কাঙ্ক্ষিত মুক্তিও এসেছিল বঙ্গবন্ধুর প্রবল রাজনৈতিক দর্শন, অটল মনোভাবের পাশাপাশি সম-সাময়িক রাজনীতিবিদদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনে।

স্বাধীনতার মাত্র ৪৯ বছরের মাথায় বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সেই গর্বের জায়গাটি বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। আর এর মূল কারণ হলো আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অধঃপতন। অতীত এবং বর্তমনের সকল সরকারের আমলেই একটি সাধারণ অভিযোগ ছিল যে, দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এদেশের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা হর-হামেশা নানা রকম দুর্নীতি এবং অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করে থাকেন। অবশ্য আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ ধরণের অন্যায়-দুর্নীতি প্রতিরোধে যে সকল আইন আছে তা যথেষ্ট। কিন্তু সেই আইনের সঠিক প্রয়োগের প্রধান বাঁধাই হলো দুর্বৃত্ততায়নের কালোছায়ায় নিমজ্জিত কিছু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অবস্থান। তবে আমাদের রাজনীতিবিদদের অধঃপতন একদিনে হয়নি।

কিন্তু ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে রাজনীতি হয়ে ওঠে বিত্তনীতি। অপরাজনীতির অপকৌশল হিসেবে আগমন ঘটে পেশীশক্তির এবং বেশিরভাগ নেতা-কর্মীগণের নীতি হয়ে ওঠে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। অর্থ ও পেশীশক্তির মোহ দিয়ে ভবিষ্যত রাজনীতির কর্ণধার যারা হবেন, সেই ছাত্র নেতৃত্বকে সুকৌশলে মেধাহীন করার অপপ্রয়াস মূলত শুরু হয়েছিল পঁচাত্তর পরবর্তী সেনাশাস আমল গুলোতে। অবৈধ ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে এবং স্বৈরশাসনের দুর্বলতাকে আড়াল করার দুরভিসন্ধি নিয়ে স্বৈরশাসক গোষ্ঠী নগ্ন পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল পদ-পদবি, ক্ষমতা আর অর্থ-বিত্ত কেন্দ্রিক রাজনীতির। ছাত্র নেতৃত্বসহ অনেক প্রতিষ্ঠিত এবং ঝানু রাজনীতিবিদ তাদের এ অপকৌশলের কাছে বিকিয়েছিলেন তাদের নীতি-আদর্শ-দীক্ষা। ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু স্বৈরশাসক গোষ্ঠীর অর্থ-ক্ষমতায় রাজনীতিকে কুক্ষিগত করার পদ্ধতি আজও অব্যহত রয়েছে। অবস্থা এমন যেন, এদেশে খুব অল্প সময়ে বিত্ত এবং ক্ষমতার মালিক হবার প্রধান মহা-সড়ক রাজনৈতিক নেতা কিংবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়া। রাজনীতিবিদদের এমন মানসিকতা একটি জাতির ভবিষ্যতকে কিভাবে শূণ্যতার দিকে ধাবিত করছে তা উপলব্ধি করা দুঃস্বপ্নের মত ভয়ংকর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হকের বাংলাদেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল এবং অঙ্গসংগঠন সমূহে পদ-পদবী পেতে এখন আর কর্মীদের মূল্যায়নের মাপকাঠি নিষ্ঠাবান নয় বিত্তবান এ তথ্যটি 'ওপেন সিক্রেট'। রাজনৈতিক দলের অবক্ষয়ের ফলে টাকার বিনিময়ে দলের পদ কেনা যায়। আর পদ কিনেই অপকর্ম চালান নেতারা (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)। টানা ১১ বছর ক্ষমতায় থাকার কারনে আওয়ামী লীগকে নিয়েই এসকল বিষয়ে সমালোচনা বেশি। আওয়ামী লীগের পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্যে হতাশ দলটির দুঃসময়ের নেতা-কর্মীরাও।

আওয়ামী লীগের ঘাটে ঘাটে দীর্ঘদিন থেকেই রয়েছে মনোনয়ন, নিয়োগ বাণিজ্য, বিভিন্ন কমিটির পদ বিক্রি, চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ। যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের পদ পেতে হলে নেতাদের গুনতে হয়েছে ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা, সম্পাদকীয় পদে ২০ থেকে ৩০ লাখ। ছাত্রলীগের দায়িত্ব শোভন-রাব্বানী কমিটি পাওয়ার পর থেকেই তারা কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের চেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলেন উপজেলা কমিটি নিয়ে। টাঙ্গাইলের সখীপুরে ২৮ লাখ, খুলনার কয়রায় ২৩ লাখ টাকায় কমিটি দেওয়া হয়। নিয়ম না থাকলেও জেলাকে পাশ কাটিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি উপজেলা কমিটি গঠনে তৎপর ছিলেন তারা। পরে চাঁদাবাজি ও মাদক সেবনের অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অপসারণ করা হয়। একই অবস্থা কৃষক লীগেও। কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সমানতালে কমিটির পদ বিক্রি করেন। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ ছাড়া কমিটির পদ-পদবি বিক্রি ছাড়াও টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যের অভিযোগ বিস্তর। পিছিয়ে নেই জেলা পর্যায়ের নেতারাও। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে পরিবার লীগে রূপান্তর করেছেন। এমনকি দলের ভিতরে ব্যাপক আলোচনায় আছেন যুব মহিলা লীগের অনেক নেত্রী ও কর্মী। সেদিন রাজপথে থাকতে যাদের কিছু ছিল না, ১০ বছরের ক্ষমতায় তাদের অনেকের অর্থ-বিত্ত, সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি হয়ে গেছে আলাদিনের চেরাগের মতো (বাংলাদেশ প্রতিদিন, বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)।

আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ-সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর প্রায় সর্বত্র অনুপ্রবেশকারীরা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠলে তাদের বিষয়ে দলীয়ভাবে এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে খোঁজ নেন স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (ইত্তেফাক, ০১ নভেম্বর, ২০১৯)। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হয় দলীয় প্রধানকে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পরেও বিএনপিতে পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্য চলছে। যুবদল ও ছাত্রদলে পদ-বাণিজ্যের প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার বিক্ষোভ হয়েছে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। দিনের পর দিন দুই গ্রুপের মারামারিতে রক্তও ঝরেছে। টাকা দিয়ে পদ কিনতে না পেরে পদবঞ্চিতরা বহুবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা দিয়েছে। সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বিক্রির হরদম অভিযোগ ওঠে বিএনপির ভেতরেই (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)।

এমনটাও হচ্ছে প্রধান দুইটি দলেই দলের ত্যাগী, কর্মীবান্ধব কর্মীরা কমিটি গঠনে উপেক্ষিত হচ্ছেন, মূল্যায়িত হচ্ছেন অন্য দলত্যাগী নেতা-কর্মীরা। পদ বাণিজ্যের কল্যাণে রাতা-রাতি অন্যমতাদর্শী নেতা-কর্মীরা হয়ে উঠছেন ভূঁইফোড় নেতা এসব তথ্য দেশের মিডিয়ার কল্যানে এখন অজানা নয় কারো। টাকার বিনিময়ে আ. লীগে জামায়াত- বিএনপি নেতা-কর্মীদের অনুপ্রবেশ ঘটছে (কালের কন্ঠ, ১৫ জুলাই, ২০১৯)। বিএনপির নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও জামায়াতপন্থী অংশ দলীয় পদ-পদবি পেতে মরিয়া। এর জন্য তারা আওয়ামী লীগ নেতাদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে (কালের কন্ঠ, ১৮ এপ্রিল, ২০১৮)। বিএনপির পদধারী নেতারাও ভোল পাল্টে যোগ দিচ্ছেন আওয়ামী লীগে। বিএনপি সভাপতি হয়ে যাচ্ছেন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক! (যুগাম্তর, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯)। অনেক সময় দেখা যায় টাকার বিনিময়ে দলীয় পদ বা মনোনয়ন দিতে আর্থিক লেনদেনের প্রতিবাদে দলত্যাগ করতে দেখা গেছে। ময়মনসিংহের ফুলপুরে বিএনপির সাবেক সাংসদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগে ৫০০ নেতা-কর্মী দলত্যাগ করেন (প্রথম আলো, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)।

একটি দলের নেতারা যখন ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের বিবেচনায় তার দলীয় মৌলিক আদর্শ ভুলে ঠিক বিপরীত মতাদর্শী দলের নেতা-কর্মীদের বুকে টেনে নেয় সেটা খুবই দুঃখজনক কারণ এতে ওই দলের কর্মী-সমর্থকদের ভেতর দলীয় নীতি- আদর্শের ওপর আস্থা হারাবার আশংকা থেকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টাকার বিনিময়ে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দল থেকে অনেকে আওয়ামী লীগে ঢুকে পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়েছেন (ইত্তেফাক, ০১ নভেম্বর, ২০১৯)।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের আত্মীয়-স্বজন, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, মাদক ব্যবসায়ী সবাই ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেবার সুযোগ পাচ্ছেন অবিশ্বাস্য ভাবে। তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মহানগরের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলা- উপজেলা কমিটিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান-নাতিরাও ঢুকে পড়েছে। যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ স্থানীয় নেতার হাতে সোনার তৈরি নৌকা তুলে দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বাগিয়ে নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পদ। পরবর্তী সময়ে দলীয় পদ ব্যবহার করে টেন্ডার, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রকেট গতিতে বনে গেছেন কথিত ‘বড়ো নেতা’ ও অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক। অর্থ আর দলীয় পদের প্রভাবে কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রশাসনও তাদের হাতের মুঠোয় (ইত্তেফাক, ০১ নভেম্বর, ২০১৯)।

এমন নীতিহীনতার ফলাফল

এভাবে পয়সা খরচ করে, দল পাল্টে যারা রাজনীতির ময়দানে স্বার্থ হাসিল করে জননেতা হচ্ছেন কিংবা মোটা অংক খরচ করে সাম্ভাব্য ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন কিনে জনপ্রতিনিধিত্ব করছেন তাদের দ্বারা দেশের আপামর মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের সম্ভাবনা ঠিক কতটুকু তা গবেষণার দাবি রাখে। টাকা খরচ করে নির্বাচনে আসা প্রার্থীরা মনে করেন নির্বাচনে জয়লাভ করলে প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-মর্যাদা সবই বৃদ্ধি পাবে। আর অর্থযোগ, বিনা শুল্কে গাড়ি পাওয়া, রাজধানীর আবাসিক এলাকায় প্লট পাওয়া ইত্যাদি ব্যাপার তো প্রচ্ছন্নভাবে হলেও আছেই। সুতরাং জনসেবা করার জন্য গাঁটের পয়সা খরচ করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া অথবা নেতা বনে যাওয়া মানুষটি জনস্বার্থের চেয়ে নিজস্বার্থের প্রতি বেশি মনযোগী হওয়াটা অতি স্বাভাবিক।

এমন পদবী কেনা নেতা এবং প্রার্থীগন তাদের বিনিয়োগকৃত মোটা অংকের টাকা ক্ষমতায় আরোহনের পরেই যে করে হোক বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে নেওয়াটাকেই তাঁদের প্রথম লক্ষ্য হিসেবে গন্য করেন। পাশাপাশি তাদের খরচকৃত অর্থ যেহেতু তাদের বিনিয়োগ সেহেতু এখানে লাভের বিষয়টিকেও তারা সচেতন ভাবেই বিবেচনায় রাখেন। লাভের হার ক্ষেত্র বিশেষে বিনিয়োগকৃত অর্থের ১০০% পর্যন্ত হতে পারে। এটা নির্ভর করে চাটুকারিতায় কে কতটা দক্ষ (!) তার ওপর। সুতরাং, দলীয় পদবী কিংবা জনপ্রতিনিধিত্ব যে বা যারা পয়সা খরচ মাধ্যমে হাসিল করেন তিনি বা তারা মসনদে বসে দুর্নীতিবাজ না হন তা হবে চরম বিস্ময়ের। এ সকল নেতৃবৃন্দ কিংবা জনপ্রতিনিধি কার্য হাসিলের পরেই হয়ে পড়েন জনবিচ্ছিন্ন, জনগনের ট্যাক্সের টাকায় তারা গা ভাসান উচ্চাভিলাষী জীবনযাপনে, চাপেন ট্যাক্সবিহীন দামী গাড়িতে আর এর চাপে পড়ে মানুষ শুধু চিঁড়েচ্যাপ্টাই হয়। নির্বাচনী ইশতেহার ভুলে, নেতার দায়িত্ব বেমালুম চেপে গিয়ে তারা জন সাধারণকে কেবল চেহারা দেখিয়ে মিষ্টি বুলি আওড়ান, কোন কাজের কাজ তাতে হয় না। ফলশ্রুতিতে জনগনের জীবন থেকে নির্বাসিত হয় সুখ-শান্তি-স্বস্তি। এমনকি মৌলিক চাহিদা কিংবা রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রাপ্তিতেও জন সাধারনকে এসব নেতৃবৃন্দ কিংবা জনপ্রতিনিধির কাছে ধর্ণা দিতে হয়।

এমন নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রনের জন্য হাই কমান্ডকে দায়িত্ব দিয়েও খুব একটা সুফল আশা করা যায় না। কারণ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দদের কারও আশির্বাদপুষ্ট হয়েই এসব ক্ষমতালোভী নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায় আরোহন করেছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দগণ দেশের কোন বিভাগ, জেলা কিংবা কোন স্থানে সফরে এলে তাদের সার্বিক দেখ-ভাল করা, সেরা হোটেল, দামী খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটান স্থানীয় এসব নেতৃবৃন্দ এবং জনপ্রতিনিধি। দলীয় নানান কর্মসূচীতে অর্থ ব্যয়, হাই কমান্ডের প্রয়োজনও মেটাতে হয় তাদের। এসব ব্যয় পুষিয়ে নিতে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতির আশ্রয় নেন স্থানীয় নেতা এবং জনপ্রতিনিধিরা। এছাড়াও এসব বিনিয়োগকারী নেতৃবৃন্দ এবং জনপ্রতিনিধিদের অবৈধ আয়ের ভাগ-বাটোয়ারাও নিয়মিত পান অনেক দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা। সম্প্রতি দুর্নীতি এবং ক্যাসিনো চালাবার অপরাধে গ্রেফতার হওয়া সাবেক যুবলীগ নেতা র‍্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, টাকার হিসাব-নিকাশ রাখতেন তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আরমান। আরমান সেই টাকার ভাগ দিতেন আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা, যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি এবং কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে (প্রথম আলো, ০৭ জানুয়ারি ২০২০)।

দেশে সুশাসন ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে বিধায় দলীয় পর্যায় থেকে দেশের প্রতিটি দলের পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ করা খুবই জরুরী। সুস্থধারার লেজুড়বিহীন ছাত্র-রাজনীতির চর্চাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যত নীতি-নির্ধারক উঠে আসবে এই ছাত্রদের মধ্য থেকেই। প্রতিটি দলকে মূল্যায়ন করতে হবে কর্মী বান্ধব, জনহিতকর নেতা-কর্মীদের যারা সকল পরিস্থিতিতে তাদের নিজ নিজ এলাকার সর্ব সাধারণের পাশে থাকেন, যাদের ব্যক্তি ইমেজ পরিষ্কার।

বাংলাদেশ সংবিধান অনু্যায়ী অনুপার্জিত আয় ভোগ করার কোনো সুযোগ নাই। সুতরাং সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচী, অনুদান, সহায়তা কিংবা ত্রান বিতরণে অনিয়ম অথবা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া দলীয় নেতা-কর্মী এবং জনপ্রতিনিধিদের পদ থেকে দ্রুত অপসারণ করে আইনের আওতায় এনে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। এতে করে আগামীতে কেউ এমন দুর্নীতির চিন্তা করার পূর্বে দশ বার এর পরিনাম সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য হয়। নতুবা বর্তমানের রাজনীতিবিদগণ কখনও তাদের উত্তরসূরিদের নৈতিক ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে গেলেই কিন্তু তারা মুচকি হেসে বলবেন, 'তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!'

[email protected]

লিংক- Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০২১ রাত ১:৩৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×