somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

র‍্যাগিং

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'এই ছেলে, এদিকে আসো... ফার্স্ট ইয়ার?'
'জি...' ছেলেটা ইতস্তত করে উত্তর দেয়। ক্যাম্পাসে সবে দুইদিন, কাউকে ভালোমতো চেনে না।
'এই আপুকে দেখসো? আপু দেখতে সুন্দর না?' সিনিয়র ভাইয়া প্রশ্ন করেন।

নবাগত ছাত্রটি দ্বিধায় পড়ে যায়। কি উত্তর দেবে সে? সিনিয়র আপুকে সুন্দর বললে যদি বেয়াদবি হয়ে যায়? আবার সুন্দর না বললে যদি কোন সমস্যা হয়? আপুর দিকে তাকানো দূরে থাক, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে মাথা নিচু করে থাকে ছেলেটা। বারো বছরের শিক্ষাজীবন এবং তারপর তিনমাসের কঠোর সাধনা শেষে স্বপ্নের ক্যাম্পাসে এসেছে সে। উচ্চশিক্ষার দুয়ারে এসেই এ কোন পরীক্ষা?

ছেলেটা দরদর করে ঘামতে থাকে।
বসে থাকা সিনিয়রদের কেউ কেউ গলা চড়িয়ে বলেন, ' এই পুলা খাম্বার মতো খাড়ায়া আছে ক্যান? বেদ্দপ নাকি...'

'তোমার বাড়িতে কে কে আছে?'
'জি আপু... আব্বু, আম্মু, ছোটভাই...' সিনিয়র আপুর কাছে আনন্দে বলতে থাকে মেয়েটা।
'বড় ভাইবোন কেউ নাই?' আপু প্রশ্ন করেন।
'জি না আপু...' মেয়েটা উত্তর দেয়।
আপু এরপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন 'ও তাই তো বলি, আদব কায়দা নাই ক্যান! বাবা-মাও শিক্ষাটা ঠিকমতো দেয় নাই দেখছি... সিনিয়র আপুদের টেবিলে এসে ধুপ করে বসে পড়েছে, এই দেখেছিস এই বেয়াদবের কাণ্ড?"
মেয়েটার খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। রুমে ফিরে দরজা লাগিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। আঠারো বছরের জীবনে তার বাবা-মা'কে অসম্মান করে একম কথা সে কারো কাছে শোনেনি।

বড় বড় ক্যাম্পাসে সিনিয়রদের সাময়িক আনন্দের খোরাক হিসেবে কাজ করে এই র‍্যাগিং । হয়তো সিনিয়র একজন জুনিয়রদের ডেকে পাঠালেন তার রুমে, সেখানে যাওয়ার পর বাংলা সিনেমার গান শুরু হল এবং সিনিয়র শিক্ষার্থী জুনিয়রকে নির্দেশ দিলেন গানের তালে নাচার জন্য। সমস্যা প্রকট হয়, যখন কয়েকজন সিনিয়র মিলে একজন জুনিয়রকে নাস্তানাবুদ কিংবা অপমান করেন। অকথ্য ভাষায় গালাগাল তো আছেই, নানা রকম শারীরিক নির্যাতনও এদেশে র্যা গ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমন ক্যাম্পাসও আছে, যেখানে সিনিয়র ভাইদের সিগারেটের প্যাকেট কিংবা খাবারদাবার এনে দিতে হয় জুনিয়রকে। প্র্যাকটিক্যাল খাতা লেখা কিংবা আঁকার অলিখিত টেন্ডার চাপিয়ে দেয়া হয় ফার্স্ট ইয়ারের ঘাড়ে। অনেকেই এগুলো পাশ কাটিয়ে নিজের জীবন গুছিয়ে নেয়। কেউ কেউ সেটা পারে না,মানসিক সক্ষমতা তো সবার এক না । পরিবার থেকে দূরে এসে এরকম বিরূপ পরিবেশে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা জুনিয়র ছেলে কিংবা মেয়েটা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে নিজের প্রতি, দূর থেকে আকর্ষণীয় মনে হওয়া ক্যাম্পাসের প্রতি সৃষ্টি হয় বিতৃষ্ণা। কেউ কেউ পিছিয়ে যায় পড়াশোনায়, কেউ বেছে নেয় ড্রাগ। অনেকেই হয়তো বলবেন, এ সংখ্যা একেবারেই কম; যদি সেটা শতকরা একজনও হয়, এই ভয়াবহ অন্ধকার পরবর্তীতে ক'জনকে কিভাবে গিলে খাবে, সেই হিসেব কেউ রেখেছে? ক্যাম্পাসগুলোতে ফার্স্ট ইয়ারের ড্রপ-আউটের হিসেব করুন, স্নাতক পর্যায়ে নতুন করে মাদকাসক্ত হবার রেকর্ড যোগাড় করুন, আত্মহত্যা কিংবা হত্যাচেষ্টার হিসেবগুলো পেলে আরও ভালো হয়। জানি, এসবের কোন খতিয়ান নেই, সরকার এ হিসেব দিয়ে কোন পুরষ্কার পাবে না বলেই এসব খতিয়ান নথিপত্রের বাইরে। কিন্তু এ যে বাস্তব সত্য দেশের অধিকাংশ ক্যাম্পাসে! চোখ বুজলেই তো অস্বীকার করা যায় না!

একেকটা ক্যাম্পাস একেকটা পরিবার। নবাগত সন্তান পরিবারে যেটুকু আদর কিংবা শাসন পায়- সেটুকু নতুন শিক্ষার্থীকে করা যেতেই পারে, সেটা অবশ্যই সীমার মধ্যে। পরিবারে প্রবীণের প্রজ্ঞা নবীনের প্রাণোচ্ছল পথচলাকে সমৃদ্ধ করতে পারে, পরিশীলিত করতে পারে, কিন্তু রুখে দিতে পারে না। র‍্যাগিং এর নামে চলে আসা অসভ্যতা ভারতবর্ষের হাজার বছর পুরনো শিক্ষাঙ্গনের চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ নয়। 'বিদ্যা বিনয় আনে, বিনয়ে জগত বশীভূত হয়'- এই মহান শিক্ষা সিনিয়রই জুনিয়রকে দেবেন, গান ছেড়ে নাচার আদেশ দেয়া তার অধিকার বহির্ভূত। অসুস্থ সিনিয়রকে চিকিৎসালয়ে নিয়ে যাবার নীরব কর্তব্য জুনিয়র শিক্ষার্থী বিনা আদেশেই পালন করবেন, কিন্তু সিনিয়রের সিগারেটের হালকা প্যাকেট বহনের আদেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের আচার্যের পদে অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্রপতিও কাউকে দিতে পারেন না।

অন্যকে সম্মান দেয়াই হোক নিজে সম্মান পাওয়ার শর্ত, ভয়ে দেয়া সম্মান আসলে এক ধরনের ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। ভ্রাতাভগ্নিতুল্য জুনিয়রের চোখে সশ্রদ্ধ ভালোবাসার পরিবর্তে এই ঘৃণা দেখে যদি কেউ তৃপ্তি পায়, তাহলে সেটা তার নিজের মানসিক সমস্যা। সিনিয়রদের ক্ষুদ্রতা নয়, মাহাত্ম্য সঞ্চারিত হোক নবীনের মাঝে। দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন হোক এমন জায়গা, যেখানে রবিঠাকুরের লেখনী মূর্ত হয়ে উঠবে-

''চিত্ত যেথা ভয়শূন্য,উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত,যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গনতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি''

ইতোমধ্যেই স্নাতক প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে। দেশের আলোকিত ক্যাম্পাসগুলোর আনাচে কানাচে ঘাপটি মেরে থাকা র‍্যাগিং নামক sociopsychiatric disorder এর অবসান হোক। হালকা কুয়াশায় ঢাকা সকালের মিষ্টি রোদে সীমাহীন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দৃপ্ত পদক্ষেপে নিজের শিক্ষাঙ্গনে বিচরণ করুক আগামীর জ্ঞান-অন্বেষী প্রাণগুলো।

শুভ হোক সবার ক্যাম্পাসজীবন।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:১২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×