somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কিছু বোকা মানুষের গল্প

২৫ শে জুলাই, ২০১৬ রাত ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শোনা গল্প।
বহুকাল আগে এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার সভাকবির অকালমৃত্যুতে রাজা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। নতুন সভাকবি কোথায় পাওয়া যাবে, কীভাবে পাওয়া যাবে- এই নিয়ে চিন্তা। তখনকার সময়ে গুণী লোকের সমাদর ছিল। রাজার সভাকবি পদে যোগদানের লোভে প্রচুর আবেদন জমা হল। তাও কমপক্ষে হাজার পাঁচেক। রাজা প্রমাদ গুনলেন। তাঁর রাজ্যে এতো কবি? এদের মধ্যে আসল কবি বের করার উপায় কী?

রাজার প্রধান উজির বুদ্ধিমান লোক (প্রশাসন ক্যাডারের লোকমাত্রই বুদ্ধিমান হয়, এ কথা বর্তমান যুগের সরকারী কর্মচারীরা হাড়ে হাড়ে জানেন)। উজির রাজাকে বললেন, ‘ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দিন। দেখেন কীভাবে আসল মাল বের করি’।

উজির রাজ্যব্যাপী ঘোষণা করে দিলেন, রাজার সভাকবি হবার জন্য যারা আগ্রহী, তাদের প্রতিটা কবিতা লেখার জন্য দশটা করে চাবুকের ঘা খেতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে ৪৯৫০ জন আবেদনকারীর আচরণ বদলে গেল। তারা বলতে লাগলো, ‘কবিতা কাহাকে বলে? কবি কী জিনিস? এগুলো খায় না মাথায় দেয়?’ বাকি পঞ্চাশ জন লিখতে লাগল। চাবুক চলতে লাগল।

এবার উজির ঘোষণা দিলেন, ‘যারা এরপরও লিখবে, তাদের পঞ্চাশ ঘা করে খেতে হবে’। ঘোষণার পর পঞ্চাশ জনের মধ্যে চল্লিশ জন বলা শুরু করল, ‘কবিতা কাহাকে বলে? কবি কী জিনিস?’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

দশজন বাকি রইল।
উজির নতুন ঘোষণা দিলেন, ‘এখন যারা লিখবে, তাদের একশ ঘা করে চাবুকের আঘাত করা হবে’। নতুন ঘোষণার পর আটজন কবিতা কী- বেমালুম ভুলে গেল। সুবোধ বালকের মতো যার যার বাড়িতে ফিরে গেল। রইল বাকি দু’জন।

উজির ফরমান জারি করলেন, ‘এখন যারা কবিতা লিখবে, তাদের আমৃত্যু চাবকানো হবে’। এই ঘোষণা শোনার পর দুজন কবির একজন হাল ছেড়ে দিলেন। রক্ত মুছে বাড়ির পথ ধরলেন। জীবনই যদি না থাকে তাহলে কবিতা লিখে কী হবে?

একজন তখনও লিখে চলেছেন।
উজির স্তম্ভিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাথা দিয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে, সারা গায়ে ক্ষত, তবু এক মনে লিখে চলেছেন। যেন উপাসনায় বসে আছেন ধ্যানমগ্ন পূজারী। উজির তাকে প্রণাম করে গলায় পুষ্পমাল্য দিয়ে রাজার সামনে হাজির করে বললনে, ‘মহারাজ, ইনিই আপনার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি। প্রাণ গেলেও তিনি তাঁর সাধনা থেকে বিচ্যুত হবেন না- এটা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত’।

গল্প লেখার কারন, আমি সেই রক্তাক্ত কবির মতো অনেকগুলো মানুষ দেখেছি। যারা শত অত্যাচার সয়েও মানুষের সেবা করার ধ্যানে মগ্ন। আমার প্রিয় সতীর্থ এবং মেডিকেল হোস্টেলে পাশের রুমের বাসিন্দা বাপ্পা, যে চিকিৎসক জীবনের শুরুতেই নাইট ডিউটিতে থাকাকালে অপহৃত হয়েছিল- সে আজও সানন্দে রোগী দেখে বেড়াচ্ছে। আমার আরেক বন্ধু আরিফ, যে নটর ডেমে আমার কয়েক বেঞ্চ পরেই বসতো, সম্প্রতি মাতুয়াইল মা ও শিশু হাসপাতালে রোগীর স্বজনের হাতে মার খেয়েছে। মারার আগে তাকে বলা হয়েছে, 'ডাক্তার মানুষ এত কথা কছ কেন, নরম সরম থাকবি, যাই কমু শুনবি'। মেরে তার হাতের হাড় ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। আমি জানি, আরিফ সুস্থ হয়ে আবার রোগী দেখবে। ছোট্ট অসুস্থ বাচ্চাদের গাল টেনে বলবে, ‘কী হয়েছে তোমার, মামণি?’ ওষুধ লিখতে গিয়ে হয়তো হাতে ব্যাথা করবে, সেই ব্যাথাকে পাত্তা না দিয়েও সে ওষুধ লিখে যাবে।

রাষ্ট্রের সীমাহীন অনিয়ম ও ধাপ্পাবাজিতে সাজানো স্বাস্থ্য-অবকাঠামোর মাঝে বসে মার খেয়ে খেয়ে চিকিৎসা করা, এটা বাপ্পা কিংবা আরিফদের বোকামি নাকি মহত্ত্ব- সেটা বিচারের ভার কে নেবে? দেশে ‘মানুষ’ থাকলে ভারটা হয়তো তাদের হাতেই ছেড়ে দেয়া যেত।

এদেশে দু’পেয়ে আছে প্রচুর, কিন্তু মানুষ যে বড্ড বিরল!
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১৬ রাত ১০:০৮
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিরবিদায়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শায়িত ডা. খায়রুল ইসলাম – Regional Director for South Asian Countries, WaterAid UK

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৪




২০ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে ফিরে ঘুমাতে ঘুমাতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে সকালে উঠতেও দেরি। আগের দিন দুপুরে বিদ্যুৎ এক ঘণ্টার জন্য চলে যাবার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×