somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যুক্তফ্রন্টের জন্ম হয় সময়ের প্রয়োজনে, মৃত্যুও হয় সময়ের করাল গ্রাসে। তবে জন্মের সময় যুক্তফ্রন্টের কুশীলবরা যতটা সক্রিয় ছিলেন, মৃত্যুর সময় তাদের অবস্থা ছিল বিপরীত। জোয়ার ও ভাটার ক্ষেত্রে যা হয়, তাই হয়েছিল পরাধীন বাংলার এই দুর্দান্ত রাজনৈতিক উদ্যোগটির ক্ষেত্রে। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ও সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণ, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, পূর্ববঙ্গে কৃষি ও শিল্প খাতের আধুনিকায়ন, খাল খনন ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে বন্যা ও দূর্ভিক্ষ রোধ, দেশের সর্বত্র অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন- ইত্যাদি যেসব অঙ্গীকার নিয়ে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল, তা সহজেই আপামর জনসাধারণের মন জয় করে নেয়।
১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয় ২ এপ্রিল। ২১ বছর বয়স্ক সকল নারী পুরুষ এই নির্বাচনে ভোটাধিকার পায়। পূর্ব বাংলার আইন সভার মোট আসন ছিল ৩০৯ টি। এই নির্বাচনের আসন গুলো বিভিন্ন ধর্মের ভিত্তিক বিন্যাস করা হয়েছিল। এ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ৭২টি আসন সংরক্ষিত ছিল। এগুলোর মধ্যে কংগ্রেস লাভ করেছিল ২৪টি আসন, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি, শিডিউল্ড কাস্ট ফাউন্ডেশন ২৭টি, গণতন্ত্রী দল ৩টি এবং ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ পার্টি ১৩টি আসন লাভ করেছিল। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী একটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন।

বাকি ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন অর্জন করে। এর মধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ৪৮টি পেয়েছিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামী ইসলাম পার্টি লাভ করেছিল ২২, গণতন্ত্রী দল লাভ করেছির ১৩টি এবং খেলাফত-ই-রাব্বানী নামক দলটি ১টি আসন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে এ নির্বাচনে পরাভূত হয় ; তারা কেবল ৯টি আসন লাভ করতে সমর্থ হয়। যুক্তফ্রন্ট এর নির্বাচনী প্রতীক ছিল নৌকা, যা পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট তাদের মন্ত্রীসভা গঠন করে। প্রাথমিক ভাবে এর সদস্য ১০ থাকলেও পরবর্তীতে বাড়িয়ে ১৪ জন করা হয়। সোহরাওয়ার্দী এই সময়ে কেন্দ্রিয় রাজনীতিতে ব্যাস্ত থাকায় ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

তরুণ শেখ মুজিব ছিলেন এই মন্ত্রী সভার কৃষি, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী। ১৫ মে তাকে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ২৯ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক সরকারকে ভেঙে দেয়। ৩০ মে করাচি থেকে ঢাকা ফেরার পর বিমান বন্দর থেকেই শেখ মুজিবকে আটক করা হয়। সেদিকে আর গেলাম না, শেখ মুজিব এরকম আটক আগেও হয়েছেন, পরেও হয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন কেন্দ্রীয় সরকার এই মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দিল?

অনেকেই বলেন, মন্ত্রীত্ব নিয়ে শরিকদের মধ্যে কোন্দল ছিল এই জোট বড় একটা দুর্বলতা। এছাড়া আদমজী জুট মিলে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, কলকাতায় ফজলুল হকের ভাষণ, কেন্দ্রের সঙ্গে প্রদেশের অসহযোগিতা ইত্যাদি এই সরকারকে ভেতর থেকে ভঙ্গুর করে ফেলেছিল। অনেক বিখ্যাত ও দেশপ্রেমিক নেতা তখন এমন ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেগুলো লিখলে অনেকেই দিলে চোট পাবেন, সে আলোচনা আরেকদিনের জন্য তোলা থাকুক। পশ্চিম পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল না, তবে ফসল ঘরে তোলার ক্ষিপ্রতা ছিল। প্রাদেশিক সরকারের এসব দুর্বলতা টের পেয়ে তারা শাসনতন্ত্রের ৯২(ক) ধারা জারীর মাধ্যমে প্রদেশে গভর্ণরের শাসন প্রবর্তন করে। পরবর্তীতে শেরে বাংলা ফজলুল হককে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করে গ্রেফতার করা হয়। ফজলুল হক সাহেব বারবার রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন, আবার ফিরেও এসেছেন। একইভাবে বারবার সাংসারিক যন্ত্রণায় হতাশ হয়ে সংসার-বিমুখ হয়েছেন, আবার নতুন করে বিয়েও করেছেন। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে যাওয়ায় শেরে বাংলা রাজনীতি এবং সংসার- দুটোর উপর চূড়ান্ত হতাশ হয়ে মাঠ ত্যাগ করেন। আমৃত্যু তিনি আর রাজনীতিতে ফিরে আসেননি, নতুন বিয়েও আর করেননি।

আলোচনা ভয়াবহভাবে বিপথগামী হচ্ছে। আপাতত এটুকুই থাকুক। সবাইকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

তথ্যসূত্রঃ
১. যুক্তফ্রন্ট, একুশ দফা ও রাজনীতির কিছু কথা- আহমদ রফিক (Click This Link)
২. যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন (Click This Link)
৩. পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের নির্বাচন, ১৯৫৪ (Click This Link)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:০২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৫



আমার এক বন্ধু আছে। ধরা যাক, নাম তার করিম। করিমকে একদিন চায়ের দোকানে একজন বলল, “আপনি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?” করিম চায়ের কাপ নামিয়ে বলল, “ভূয়া হলে লাভটা কী?” লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×