(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আমার আসার অনেক আগেই এসেছিলি তুই। ঠায় দাড়িয়েছিলি বাসার বাইরে। চোখের কোণ ভেজা। হয়তো কেঁদেছিলি আমার অজান্তেই। আমার শরীরে তখন প্রচন্ড ব্যাথা। হাত পায়ে ব্যন্ডেজ করা। কে যেন হাসপাতাল থেকে বাসায় দিয়ে গিয়েছিল। আজ মনেও নেই তাদের নাম। তবে সম্ভবত তারা আমার সহকর্মী হবে। সবাই শেষ দেখার জন্য চৌরাস্তার মোড়ে দাড়িয়েছিল। বিভাগীয় বিক্রয় প্রতিনিধির প্রধান এম্বুলেন্স থামিয়ে কাকে যেন বলেছিলেন.... আছেতো? উত্তর গিয়েছিল----“একজনের অবস্থা খারাপ”। খারাপ মানে আমার সুপরিয়রের অবস্থা খারাপ। সে সাত দিন পর হাসপাতাল ত্যাগ করেছিলেন। আর আমি--প্রাথমিক সেবা নিয়ে হাসপাতাল থেকে সোজা মেসে। কোন কথা না বলে পকেটে হাত দিল ও। দেবেই তো? আমার দুহাত আর পায়ে তখন শিল্পীর নিপুন হাতে বাঁধা গজ আর তুলা। ছিড়ে কেঁটে যাওয়া চর্ম আর মাংসের পিন্ডরা তখন বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে। আমি ওকে ইশারা করাতেই ও বুঝে গিয়েছিল। চাবিটা আমার পকেটেই ছিল।
আমাকে নিয়ে ও ভিতরে গেল। কোন মতে বিছানা ঠিক করে আমায় শুইয়ে দিল....পিছনে বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিল আমার ইশারায়।
বলল...কি খাবি?
কিছুনা...উত্তর দিলাম।
কমলার রস করে দেই?
মাথা নাড়িয়ে না বললাম।
ফোনটা এগিয়ে কানের কাছে রেখে বলল----নে মায়ের সাথে কথা বল। প্যাথেডিনের কর্মক্ষমতাকে উপেক্ষা করে সেদিন প্রথম কেদেঁছিলাম। কি করে হল, কেন হল কিছুই বলতে পারিনি।
অনেক সময় আমার পাশে বসেছিল। গায়ের জামা কাপড় খোলা থেকে শুরু করে সমস্ত রক্ত মুছিয়ে দিয়েছিল। লজ্জায় আমি আমি শুধু চোখই বন্ধ রেখেছিলাম। সবচেয়ে অবাক হলাম তখন, যখন ও আমায় পরম মমতায় ভাত খাইয়ে দিল। আমার চোখের জল খাবারে পরতেই ও আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। জড়িয়ে ধরে সেকি কান্না............তোমার যদি কিছু হত!!
বলেছিলাম...কিচ্ছু হয়নি...কিচ্ছু হবেনা.......ভগবান আছেতো.....তিনিই আমাদের রক্ষা করবেন।
তিনি আমাকেও রক্ষা করেছেন আর ওকেও।
আর তার অসীম কৃপায় আমি এখন স্বঘোষিত নাস্তিক....খাটি...বিশুদ্ধ এবং শতকরা একশ ভাগ।
আর ও এখন দুবেলা ঠাকুর ঘরে পূজা দেয়।
সালটা ২০০৫.সদ্য দেশে ফেরা জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক যুবক। মাথার উপর কয়েক লক্ষ টাকার দেনা। কাজের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঢু মেরে বেড়াচ্ছি। এর মধ্যে এলাকারই একটা নাট্য দলের সংগে যুক্ত হলাম। জমির কাজ শেষে অবসন্ন, ক্লান্ত দেহে প্রায় প্রতিদিনই যাই সংগঠনে। প্রতিদিনই চলে নাট্ট্য চর্চা..চলে সংগীত অনুশীলন। প্রথমে সবাই ভালো ভাবে নেয়নি আমাকে। কারন ভাষাগত সমস্যা। দীর্ঘ দিন বাইরে থাকার কারনে আমার উচ্চারনে নাকি সেখানকার আঞ্চলিকতা চলে আসত। পরে সব ঠিক হয়েছিল। এখানেই ভালো বেশে ফেলি লালনকে। তার কৃপায় এখনো প্রায় শতাধিক লালন সংগীত আমার মুখস্ত।
সংগঠনের নামটা না বললে নিজেকেই নিজের কাছে অনেক ছোট, অকৃতজ্ঞ মনে হবে।
সংগঠনের নাম ছিল জনম। ছিল বলছি এই জন্য যে, রাজনৈতিক কারনে সংগঠনটির কার্যক্রম বন্ধ আছে। জনম নামটি নেয়া হয়েছে তিনটি শব্দের প্রথম অক্ষর থেকে। জীবন নাটকে মানবতা। কি অদ্ভুত নাম! নামেই প্রেমে পরেছিলাম। এতো বছর পরও তার সংগ ছাড়তে পারিনি।
সংগঠনের যিনি পরিচালক ছিলেন তিনি অসম্ভব প্রফেশনাল। আমি তার বাল্যবন্ধু হলেও কাজের ক্ষেত্রে তিনি আমাকেও ছাড় দিতেননা বিন্দুমাত্র। শ্রদ্ধাভরে তার নাম আমি স্মরণ করছি আজ...যার অনেক কিছু হওয়ার কথা থাকলেও আজ সে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন...তিনি আমার বাল্য বন্ধু সুব্রত। যার জন্য আমি এ লেখা লিখতে পারছি তিনি আমার সহপাঠী সুব্রত।
আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তা না বলে এ কোন গল্প আপনাদের শুনাচ্ছি? হ্যা এই গল্পেরই নায়িকা সে। সেটাই বলতে চাই আপনাদের।
সংগঠনে কাজ করতে করতেই ডাক পরল “প্রমাতে”। প্রমা মানে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান। PROMA...Participatory Rapid Orientation and Motivational Activities পুরো নাম। কাজ করে বিভিন্ন NGOর। এবারের কাজ ব্র্যাকের সাথে। ৮০টি গণ নাটকের দল তৈরি করে দিতে হবে। আমার জোন পরেছিল রাজশাহী ও বগুড়া। আমরা ১০জন এসেছিলাম ঢাকায়। সেখান থেকে যে যার জোনে ভাগ হয়ে গিয়েছিলাম। সফল কর্ম সম্পাদন করে যে যার এলাকায় ফিরে গিয়েছিলাম।
পরে ডাক পরেছিল আমার একার।
হ্যালো.....
জি...বলছি
ব্যস্ত....?
না....বলুন
কাজ করবেন?
হ্যা.....।কাজটা কি?
এটা একটা ডকু ফিল্ম....
কি কাজ করতে হবে...?
স্ক্রিপ্ট লিখতে পারেন?..আমার সংগে এসিস্ট করতে হবে।
হ্যা......
তাহলে আজ গাড়ীতে উঠুন.....পারবেন?
হ্যা বলে রেখে দিলাম।
পরের দিন সকালে ঢাকা হয়ে পাবনা। তারপর শুধু কাজ আর কাজ।পরের কাজগুলো বেশীর ভাগই ছিলো ট্রেনিং....ফোক কালচার ব্যবহার করতাম বেশী এইসব ট্রেনিং এ।
এরকমই একটা ট্রেনিং করাতে এসেছিলাম খুলানায়। ভ্রাম্যমান পতিতাদের সচেতনা বৃদ্ধি করার জন্য। আয়োজন করেছিল দূর্জয় নারী সংঘ। তাদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ইত্যাদি ছিল বিষয় বস্তু।
ওর সংগে যোগাযোগের সূত্র এখান থেকেই।পাঁচদিনের সফল ট্রেনিং শেষে আমরা একটা নাটক মঞ্চস্থ করলাম খুলনার হাদিস পার্কে। ওরা আগেই আমার বিদায়ের একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রেখেছিল। নাটক শেষে সোজা ধরে নিয়ে এল ওদের অফিসে। দাদা...আমাদের তরফ থেকে আপনার জন্য....আর কিছু বলেনি..বলতে দেইনি। সোজা মাথায় তুলে নিয়েছিলাম সেই বিশাল উপহার। সেই উপহার আজও আমায় শিক্ষা দেয়।
অনেক পথ অতিক্রম করে যখন ওদের বাসাতে পৌছলাম তখন রাত ১০টা ৪৫মিনিট। আমার মাথা ভর্তিচুল....অন্ধকার রাত, আমায় না চেনারই কথা। সামনে একটা হারিকেন জ্বালানো। সেই আবছায়া আলো আর আমার কন্ঠস্বর আমাকে হয়তো চেনাতে পারছিলোনা। পরিচয় দেয়াতে আমাকে বরণ করলো রাজকীয় সম্মানে। ১৯৮৫র পরে ২০০৫। ২০ বছর মোটেও কম সময় নয়! খেতে খেতে অনেক কথা। কেন মাথা ভর্তি চুল...কি করছি...কোথায় ছিলাম এতোদিন....কেন ছিলাম?? নানা প্রশ্ন ছুটে আসছে তীরের ফলার মত। সাধ্য মত উত্তর দেয়ার চেষ্টা করছি। এক সময় এড়িয়ে যাবার জন্য বললাম মা আমি কাল দিনে সব প্রশ্নের উত্তর দিব। আজ আমি খুব ক্লাস্ত। আচ্ছা বাবা তুই ঘুমিয়ে পর। আমি বিছানা ঠিক করে দিচ্ছি। কাল কথা হবে।
হাত মুখ ধুয়ে বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম আর ভাবছি তিন জনে কে কি করে জানলাম কিন্তু এ বাড়ির সবচাইতে যে ছোট সে কোথায় থাকে? কি করে? কি ভাবে জিজ্ঞেস করি? মনের মধ্যে খুত খুত করতে লাগল। ধ্যাত বলে সিগারেটের বাকী অংশ ফেলে দিয়ে মুখ ধুয়ে শুয়ে পরলাম।(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১৫ রাত ৯:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



