somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রার্থনা - The Prayer

২৫ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১.
‘এ কেমন ভাগ্য লিখিয়ে নিয়ে এলাম ‘ – ভাবছে ঝর্ণা মনে মনে। ইশ্বরের কাছ থেকে আসবার সময়ে তার সকল ইচ্ছা, দায়িত্ব, কর্মযোগ জেনে বুঝে একটি আত্মা এ দুনিয়াতে প্রবেশ করে। ঝর্ণা তেমন-ই শুনেছে । তাহলে তার চয়েস, তার সিলেকশান সব সে এমনই করলো কেন?
সেই ১৯৮৪ সালের কথা। বয়স আর কতই বা হবে, ১৪/১৫. শীলা আপার বিয়ের দিন। অনুষ্ঠানে ঝর্ণা তার হাতখানি দেখাল শীলা আপার ছোট বোন, তার প্রাণের বন্ধু কেয়াকে। কেয়া দেখে বললো, ‘দুটি রেখা, মানে বিয়ে ভাঙা?’ ঝর্ণা বললো, ‘দেখলে তো এবার? বলেছিলেম না হাতের রেখায় আমার বিয়ে ভাঙা।‘ হাতের প্রধান রেখাগুলো সেই ১৪ বছর বয়স থেকেই হস্তরেখাবিদদের মত লেখা পড়ে করে ঝর্ণা মোটামুটি চিনে। আর কিশোরী বয়সে প্রেম, বিয়ের রেখা তো সব্বার আগে মনযোগ কাড়ে। তাই না?
এবং সে জানে তার ভাগ্য তেমন একটা প্রসন্ন হবে না। অর্থাৎ বিবাহ নামক জিনিসটা তার জন্য সুখকর হবে না। তারপর কৈশোরের গন্ডী পেরিয়ে যখন যৌবনে পা রাখলো,সুদর্শনের সাথে তার দেখা হলো। সুদর্শনের চেহারায় সে কি বুদ্ধির ঝলক। হাঁটায় সে কি স্মার্টনেস। আর মুখে চঞ্চলতায় ভরা হাসি। প্রথম দেখায় অজান্তে বুকটা ধক্ করে উঠেছিল ঝর্ণার।
বইয়ের পাতা থেকে মুখু তুলতেই দেখে সামনা সামনি সুদর্শনের সেই মুখখানা।
প্রথম দেখা!
দেখতে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ের টার্কমিনিস্তান, আজারবাইজান অঞ্চলের মানুষদের মতন। যারা পারস্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল পরবর্তীতে।
প্রথম দর্শনে শুধু সৌন্দর্য্য নয়, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব সবকিছুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল ঝর্ণা। পুরো কলেজে এই ব্যক্তিটির রুচি, পোশাকের সিলেকশান একদম স্ট্যান্ডার্ড । মনে মনে কল্পনাও করে ফেলেছে ঝর্ণা তাকে নিয়ে – তার সংসার কেমন হবে। কলেজের টিচার্স কলোনীতে তাদের নতুন সংসার শুরু হবে । ঐ যে ঐ বিল্ডিংগুলো, সেখানে থাকবে, যেগুলো মাত্র নতুন তৈরী হয়েছে। আর সুদর্শনেরও নতুন যোগদান এ কলেজে। ঝর্ণা এখন বিশে পা রেখেছে। হৃদয় মন আকুলতা বাসনায় বিভোর এক মনের মানুষের খোঁজে। আর ইশ্বর তাকে নিজ হাতে এনে দিয়েছে এই মানুষটিকে। বলছেন, ‘দেখ। প্রাণ ভরে দেখো। কিন্তু পাবার আশা করো না। ও তোমার ভাগ্যে নেই।‘
কেন নেই?
ঝর্ণা হাতের তালুর দিকে তাকায়। বিয়ের রেখাটা ভেঙ্গে দ্বিখন্ডিত।
নাহ্ এ মানুষটিকে সে হারাতে চায় না। কখনো তার কাছেও যাবে না, মনের বাসনাগুলো প্রকাশও করবে না। বিয়ে নামক কিছু করতে হয় বলে করবে। অন্য কাউকে। যদি সংসার তখন টিকেও যায়, সংসারের নিয়মে নাহয় জীবনটা তখন কাটিয়ে দেবে।
আহ্! কি বুক বাঁধা আশা!
ভাগ্যের কন্ট্রাক্টে যখন সে লিখিয়ে এনেছে, এ পথ একা চলার পথ, তার কোন জোড়া নেই, সেখানে আবারও ঝর্ণা আশা করে তার সংসারটা টিকে যাবে?
কিন্তু সুখের স্পর্শ তো দূরের কথা , জ্বলন্ত উনুনে পুড়েছে ঝর্ণা।
১৯৯৫ সাল। ২৪ বছর বয়সে জীবনের নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে। সে সময়ে হাতের রেখাটা আবারো দেখলো ঝর্না। রেখাটা বেশ রুগ্ন, বেশ ক্ষীণ। সম্পর্ক টেকাবার লক্ষণ – এ রেখা বুঝায় না। কিন্তু অপ্রকৃতস্থ, মানসিক প্রতিবন্ধী সেজন্য ভাগ্যে এসে পড়বে?
এ কেমন কন্ট্রাক্ট? কেউ সখ করেও করবে না এ কন্ট্রাক্ট ইশ্বরের সাথে। নাকি আজ ইশ্বর তাকে task দিয়েছে এ জন্মে। এটা তার choice নয়। তার দায়িত্ব – এক পাগল ছেলের দায়িত্ব নেয়া তার স্ত্রী হিসাবে।
এ কেমন হিসাব জীবনের?
জীবনের এ কেমনতর খেলা?
এর মাঝে প্রাণের শংকা দেখা দিতেই ঝর্ণা তার স্বামীর ঘর ত্যাগে বাধ্য হলো। শাস্ত্র মতে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তির সাথে বিবাহ, বিবাহ নয়। তার কি বিয়ে নামের প্রহসন হয়েছিল তবে? বিয়ে তো নয়। এখানে জীবন যেন রসিকতা করতে করতে প্রহসনের চরম পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছিল ঝর্ণাকে।
কিন্তু কেন?
ঝর্ণার মনে আবারোও প্রস্ন জাগে, ‘ এ কেমন ভাগ্য লিখিয়ে নিয়ে এলাম?’

২.
আজ তিন দশক অতিবাহিত হয়েছে। আবার আজ হাতের তালুতে চোখ রাখলো ঝর্ণা। জ্যোতিষী বলেছেন তার ভাগ্য লেখার ভিডিওতে –খুব স্পষ্ট দুটি সমান্তরাল রেখা যদি হৃদয় রেখা আর শিরো রেখার মাঝে অবস্থান করে এবং যথারীতি বিয়ের রেখাটি ভেঙ্গে, চুড়ে নুয়ে পড়ে নীচের দিকে প্রবাহিত হয়, তাহলে জাতিকার সংসার জীবনে ভাঙ্গন নিশ্চিত। কিন্তু এতদিন মনে হতো ঐ ছোট দুটি সমান্তরাল রেখা দুটি সন্তান রেখা নির্দেশ করছে।
হায় রে ভাগ্য!
কোথায় সন্তান আর কোথায় সংসার! বিয়েই তো স্থির রাখতে পারছে না।
এরপর ২০০১ সালের কথা। পরিচয় হল অসামান্য প্রতিভাবান একজন সুন্দর মনের মানুষের সাথে। স্বভাবে তিনি চারণ কবি। ঝর্ণার মনে হলো রেখা টেখা কোন বিষয়ই নয়! ভাগ্যের চাকা এবার বোধহয় ফিরবে। আর ভাগ্যই বা কি। ভাগ্য বলে কিছু আছে না কি? সব না পাওয়াগুলোকে পিছনে ফেলে এবার সম্মুখে পদচারণা শুরু করলো সে। কিন্তু কবি যে তার ,কবিতার উপাদান খুঁজে বেড়ায় তার প্রাক্তন প্রেমিকাদের মাঝে। কবির সময় কোথায় ঝর্ণাকে সময় দেবার?

৩.
ট্রেনে যেতে যেতে চোখ ভরে ওঠে জলে। আশপাশের যাত্রীরা কি ভাববে? কিন্তু কষ্ট দমিয়ে রাখতে পারে না ঝর্ণা। আবারো প্রস্তুতি নিতে হবে তার – সকল আশা, আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্নগুলোকে জলাঞ্জলি দেবার জন্য। ভীষণ কষ্টকর এক decision , ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক এক আয়োজন ,বারবার করতে হয়েছে ঝর্ণাকে।
কিন্তু কেন?
চারিদিকে তাকায় । সুখী মানুষ দেখতে পায় না কোথাও। তবুও সংসার চালিয়ে নিচ্ছে সকলে। আর প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে এসে ঝর্ণা শুধু প্রশ্ন করছে নিজেকে, ‘কোথায় সুখ? কেন এমন হলো? এ কেমন ভাগ্য নিয়ে এলাম?’
নাহ্।
আর কিছু চাইবে না ঝর্ণা এ জীবনের কাছে। কেউ যেন সেই বার কানে কানে বলেছিল, ‘তোমার কোন জোড়া নেই। তোমার পথচলা একার। ‘ সেই প্রথম বিয়ের রাতে, আপ্রকৃতস্থ স্বামীর আচরণ দেখার দুই তিনদিন পরই ঝর্ণা এমন কথাটি শুনতে পেয়েছিল কানে কানে –কে যেন বলে দিয়েছিল তাকে, তার পথ নির্ধারিত। এই নিয়তিই সে নিয়ে এসেছে তার জীবনে।
আর চারণ কবির সান্নিধ্যে এসে কি হলো? অনেক কিছু শিখেছে তার কাছ থেকে। কিন্তু সংসার মেলেনি। বিয়ের রাতে কবির মদিরার নেশায় বুঁদ হয়ে অর্ধচেতন হয়ে পড়ে থাকা অবস্থা ঝর্ণাকে তার সেই রাতের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে ; যখন অপ্রকৃতস্থ, মানসিক প্রতিবন্ধী স্বামীটি ঝর্ণার সাথে কোন কথা বলতো না। ঝিম মেরে পড়ে থাকতো। বিয়ের রাতে প্রথম যখন দেখেছিল তার অপ্রকৃতস্থ, স্বামীকে, ঝর্ণা ভেবেছিল তার স্বামী বোধহয় দার্শনিক। তাই ভাবুক মনে অন্য জগতে ঘুরে বেড়ায়।
আসলেই কি তাই?
দার্শনিকদের মতন মানসিক ভাবে অপ্রকৃতস্থ, পাগলরাও কি অন্য ভুবনে ঘুরে বেড়ায়? দ্বিতীয়বারের বাসরেও একই ঘটনা। স্বামীটি যেন এই পৃথিবীতে নেই। নেশায় চুর হয়ে অচেতন ।
বারবার একই ঘটনা, একই যন্ত্রণা, ভাগ্যের চাকা ঘুরে ঘুরে এই একই রূপ প্রদর্শন – ঝর্ণাকে ভাবিয়েছে অনেকবার।
নাহ্। আর যন্ত্রণা, কষ্ট সে নেবে না। আর যন্ত্রণা, কষ্ট সে পাবেও না। এবার চরম পরমের পানে ছুটে যাবে সে। total blissful state বলে একটা শব্দ আছে ধ্যান জগতের সর্বোচ্চ মননের স্তরে। ঝর্ণার হাতের তালুর দিকে আবার সে তাকায়। তার আয়ু রেখাটি ও দেখে। ২০৪৯ সাল –যখন তার exit এর সময় হবে এই রিয়্যালিটি থেকে। কিন্তু এর আগেই, এখন ঝর্ণা ধ্যানস্থ হবে। ইশ্বরের কাছে নিবেদিত হবে। আর বলবে, ‘আমাকে আমার টাস্ক যা দিয়েছ তুমি, তা আমি পালন করতে চেষ্টা করেছি যতটুকু পেরেছি। অপ্রকৃতস্থ, ছেলেকে সুস্থ করবার, মানসিক ভাবে প্রশান্তি দেবার চেষ্টা আমি করেছি। past trauma থেকে ক্ষত নিয়ে আসা কবি বরকে চেষ্টা করেছি ট্রমা মুক্ত করার। কিন্তু আমি কি শুধু অন্যকেই heal করে যাব? আমাকে কে heal করবে? আমার তো পথ চলা একার। আমি তোমার মাঝে আমাকে নিবেদন করলাম। আমার আত্মার শান্তি আমি প্রার্থনা করি তোমার কাছে। প্রভু, তুমি সকলের। তুমি আমারও। আমরা আসি source থেকে। তোমার কাছ থেকে। ভাগ্য লিখে নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ছকে। তারপর তা পালন করার চেষ্টা করি। সফলতা মাপার মালিক তুমি। তুমি আমাকে সর্বোচ্চ blissful state -এ পৌঁছানোর জন্য সাহায্য কর এটাই আমার প্রার্থনা তোমার কাছে।

২৩.১২.২০২৫
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলে গেছো তাতে কি? নতুন একটা পেয়েছি, তোমার চেয়ে করে বেশী চাঁন্দাবাজিইইই....

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৭

আমি কবিতা লিখি না কখনও। চেষ্টাও করি না। আমি মূলত কবিতা অপছন্দ করি। কিন্তু....



আমি যখন ক্লাস ৪/৫ এ পড়ি, তখন স্কুলের বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগীতার সময় নিজের লেখা গল্প-কবিতা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজব পোশাক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৬


এক দেশে ছিল একজন রাজা। রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। সিপাহী-সামন্ত লোকলস্করে রাজপুরী গমগম। রাজার ধন-দৌলতের শেষ নেই। রাজা ছিল সৌখিন আর খামখেয়ালি। খুব জাঁকজমক পোশাক-পরিচ্ছদ পরা তার শখ। নিত্যনতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাচনী অঙ্গীকার চাই ফুটপাথ ফেরাও মানুষের কাছে

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬


ভোটের মিছিলে কথা হয় অনেক
পোস্টারে ভরা উন্নয়নের ঢাক
কিন্তু বলো তো ক্ষমতাপ্রার্থী দল
ফুটপাথ কার এ প্রশ্নের কি জবাব?

ঢাকা ছোটে না, ঢাকা পায়ে হেটে ঠেলে চলে
শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পড়ে কষ্টের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালুর নিচে সাম্রাজ্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫১


(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)

ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।

এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×