somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রথম কথা

০৪ ঠা জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মনে হচ্ছিল যেন উনি এসেছেন।
বাড়ির পিছনে আমি ইট বাঁধানোর কাজ করছি, নর্থ আমেরিকায় যেমন হয়, বাড়ির টুকটাক সবকাজ নিজেরাই করে ।

দেখি চকচকে জুতো। তাকালাম একটু উপরে, দেখি কেউ একজন দন্ডায়মান।

তারপর আরেকটু উপরে। তাকিয়ে দেখি সুদর্শন এক সুপুরুষ। সেই হাসি মাখা মুখ, সেই বুদ্ধির ঝিলিক। বললাম, দাঁড়ান পথ করে দিচ্ছি। এদিক দিয়ে না যেয়ে এই পাপোশেটার ওপর দিয়ে যান। এমন ভাবে বললাম যেন খুব কথা বলে আলাপ করে অভ্যস্ত। আসলে মনপ্রাণ দিয়ে চাইছি স্বাভাবিক থাকতে। কখনোই তো কথা বলিনি। শুধু যে দু'চোখ ভরে দেখেছি।

কিন্তু উনি তো সরছেনই না। আবারো বললাম, জায়গা টা নরম ,মাটি শক্ত হয়নি। আর মনে মনে বললাম, শক্ত নয়, খুব নরম, আপনাকে দেয়া আমার মনটার মতোই।

যদি বুঝতেন।

শুনছেন- ই না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন।

কি যে করি।

একটু পর বললেন, তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই।

এই শুরু হলো বুকে ব্যথা। আমার গলা গেল ভেঙে। বললাম, কথা বলবেন? তাহলে বাসার সামনের দিকে চলেন। সম্পূর্ণ ভাঙ্গা গলায়, হাত পা কাঁপছে আমার থর থর করে। আমি ভাবতে পারছি না এ কি সত্যিই ঘটছে।

সত্যিই।

আমি তো কল্পনায় তাকে ভেবে ভেবে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছিলাম।

কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব? উনি যে সত্যিই এসেছেন। বুকটা আমার কান্নায় ভেঙ্গে যাচ্ছে। খুব ব্যথা হচ্ছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। আমি এসব কোন কিছুই চাই না যে উনি জানুক।

বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললাম,’এদিকে তারকাঁটা আছে সাবধানে যেতে হবে।’

‘ব্যথা পাবেন’ বলেও বলিনি। সামনে এসে পূবের রোদ্র ঝলমল কাঠের বারান্দায় দাঁড়ালাম। ইচ্ছে হলো ভেতরে বসতে। তাই ঠেলে দরজা খুলে ভেতরে আসতে বললাম। আসলে কিছু বলিনি। দরজা খুলে ওনাকে নিয়ে আসলাম। ঘরের মেঝেতে আর চারিদিকে আমার যেমন থাকে - বইয়ের স্তুপ,অগোছালো। পাশে বাদ্য যন্ত্রের সমাহার- আমার প্রিয় ইয়ামাহা কি-বোর্ড। তার পাশে ডেস্কটপ, তার পাশে কিচেন। কি ভাবছে এসব দেখে কে জানে।

জিজ্ঞেস করলেন,‘বাসায় কে কে থাকে?’

পাশে দোতলার বেডরুমের সিঁড়িটা দেখেই বোধহয় জানতে চাইলেন।

বললাম, ‘কেউ না, আমি একাই। উইকেন্ডে ভাইয়ের ছেলেটা আসে, সে উপরে থাকে। আর দুটো বেডরুম সাজিয়ে রেখে দিয়েছি আমার ভাই আর আব্বু আম্মুদের আসার জন্য। কবে আসবে তারা, কে জানে। আমি নীচেই থাকি।’

এ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। কি তীব্র চাহনি। তাও আবার এত কাছ থেকে। কল্পনা না বাস্তব আমি বুঝতে পারছি না, আমার ঘোর শুরু হয়েছে। আমি মাথা নীচু রেখে সামনের জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে ওনাকে বসবার জন্য একটা চেয়ার দেবার চেষ্টা করছি। একটাই চেয়ার। আর কিছু নেই কেন? সাজানো ড্রইংরুম তো সকলের থাকে। আমার নেই কেন? আজ প্রথম মনে হলো, আমার ঘরটা যদি একটু গোছানো থাকতো। আজই প্রথম অনুভব করলাম এভাবে। এতদিন তো কখনো মনে আসেনি। জীবনের সব আয়োজন কি তাহলে অপরের জন্যই? নিজের জন্য না।

বেশ তো চলে যাচ্ছিল এমন সেট আপ –এ, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমার ড্রইংরুমটা আরেকটু সাজানো থাকলে ভাল হতো। কি যে ভাবছেন উনি মনে মনে কে জানে?

বইপত্রগুলো শেলফ উপচে সোফা, এমনকি কার্পেটের জায়গাও দখল করে নিয়েছে। এক চিলতে জায়গা নেই।

ড্রইংরুমে কোথায় বসাবো ওনাকে?

জিজ্ঞেস করলেন, এখন তাহলে নেই ও বাসায়। আমি বললাম, না । ও হস্টেলে থেকে পড়ে। বাসায় আসে উইক- এন্ডেই।

এটুকু বলতেই গলা ভারী হয়ে এলো আমার। আমি যেন আর কোন কথাই বলার মত অবস্থায় নেই। চেয়ারে মনে হয় বসবেন না, যেহেতু একটা মাত্র চেয়ার।

বললাম, চা দিই?

বললেন, না কোন কিছুই লাগবে না।

যা ভেবেছিলাম।

আবারো প্রশ্ন, তোমার হাজবেন্ড কোথায় থাকেন?

আমার খুব কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে। পারছি না স্বর তৈরী করতে। অনেক কষ্ট করে অনেক কান্না আটকে, যেন হাজার বছরের সব জমা হওয়া আবেগকে মাটি চাপা দিয়ে কথাগুলো বলে ফেললাম।

-উনি অস্টিনে থাকে।

- উনি আসেন না? কি করেন?

আমার যে এবার বুক ভাঙ্গা কান্না। এত প্রশ্ন কি কেউ করে? কি হবে আমার কথা জেনে?

বললাম, আমিই যাই ওখানে। আমার এখানে কাজ জুটেছে তাই এখানে থাকা। লম্বা ছুটি পেলেই চলে যাই ওখানে।ওনার নিজের কম্পানির কাজ । নিজের অফিস, তাই সপ্তাহে প্রতিদিনই কাজ।

তারপরের প্রশ্ন, ‘তোমার ওয়েব প্ল্যাটফর্মে কোন সাইট নাই?’

বেশ শক্তি নিয়ে আমি বললাম,‘ আছে তো। ফেসবুক আছে। তাতে আমার ২৯টা গ্রুপ। আমার নিজের শুধুমাত্র। আর কেউ নেই ওখানে।

বুকে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে এবার আমার।

বললেন, ‘দেখাও তো।’

বাহ্‌। কত আগ্রহ।

পাশের টেবিলে ডেস্কটপের সামনে দাঁড়ালাম। সেই আগের মতই সাদা শার্ট , কালো ট্রাউজার আর চকচকে কালো জুতা। মাথাটা একটু নীচু করে চলা। কিন্তু আজ তার ছিটে ফোটাও নেই। সেই লাজুক ভাবটিও নেই। কোথা থেকে এত কনফিডেন্স চলে এলো ওনার? নাকি এ তার আরেকটা রূপ?

জানি না আমি। কিন্তু সত্যিই খুব রহস্যময় আজ সবকিছু। প্রথম কথা বলছি। কিভাবে বলছি, আমি জানি না। আমার ভেঙ্গে যাওয়া স্বর উনি কি টের পেয়েছেন?

কোথা দিয়ে সময় চলে গেল জানি না। শুধু মনে আছে উনি বললেন, ‘আমি যাব এবার।’

আমি বললাম, ‘গাড়ি কোথায় পার্ক করেছেন? বাসার সামনে নাকি পেছনের রাস্তার দিকে?’

বললেন,‘আমি তো গাড়িতে আসিনি।’

-মানে?

-আমি হেঁটেই এসেছি।

-কিভাবে ?

-আমি তো তোমার খুব কাছে থাকি।

আবার আমার অবাক হবার পালা। আমি বললাম,‘ কোথায় ? কোথায় থাকেন।’

–ওই যে... তোমার বাসার পিছনের দিকের যে রাস্তাটা দেখছ, তারই ঐ পাড়ে।

তাই কি উনি আমাকে দেখেছেন? তা না হলে কিভাবে জানলেন যে আমি আছি এইখানে, এই একই শহরে?

আমি বললাম, ‘তাহলে আসেন বাসার ভেতর দিয়ে। আপনাকে পিছনের বারান্দায় নিয়ে যাই । ওদিক দিয়েই যেতে হবে।’ কিচ্ছু বললেন না। শুধুই দেখছেন আমাকে। আমার দুচোখের জল আমি আর সামলাতে পারলাম না।

উনি দু’হাত দিয়ে আমার মাথার দু’পাশে আলতো করে ছুঁয়ে মৃদু একটু চাপ দিয়ে আরো কাছে এগিয়ে এলেন। আমাকে তার দিকে টেনে নিতে চাইছেন যেন।। আমি মুখ নীচু করে নীরবে চোখের জল সামলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। পারছিলাম না। তার আলিংগনরত বাহুর মাঝে নিজেকে দেখে মুখটা তুলতেই দেখি সাদা শার্টের ওপর সাদা বোতাম। মুখটা আরেকটু উপরে তুলতে দেখি তার গলা,তারপর তার চিবুক। কিন্তু সাহস হয়নি তার চোখের দিকে তাকাবার। তার আগেই আমার মাথাটা যেন হেলে পড়ল ওনার বুকের মাঝে।

আমার সেদিনের সম্মতি তাকে কি ভাবিয়েছে আমি জানি না।

আজ এতদিন পরও আমি মনে করতে পারিনা তারপর কখন তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন।

…।...।।
ভাবনার শুরু ২৭শে এপ্রিল ২০২১
স্বপ্ন দর্শন মার্চ ২০২৫
লেখার সমাপ্তি ৩রা জুন ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:১৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাধু সাবধান!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১

রোমান সাম্রাজ্যের পম্পেই এবং বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, মানুষের সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক স্খলনের কিছু ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিচে পম্পেইয়ের সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেম....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১০



সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেমঃ সমর্থনের জায়গা থেকেই কিছু কঠিন কথা.....

ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়- কিন্তু একটি সরকারের দিকনির্দেশনা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কিছুটা ধারণা পাওয়ার জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইলিয়াস কাঞ্চন

লিখেছেন অর্ক, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৩



আমার ছোটোবেলায় ইলিয়াস কাঞ্চন সুপারহিরো। খুব সম্ভবত জীবনে প্রথম হলে দেখা সিনেমা ছিলো জবরদোস্ত। ইলিয়াস কাঞ্চন ও ওয়াসিম নায়ক। তিনবার দেখেছিলাম। বাড়ির কাছে হল। সেভাবে কড়াকড়ি ছিলো না। ছোটো বাচ্চা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "শিউলি গাছ"

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৭

শিউলি গাছ

- মঞ্জুর চৌধুরী

১.

"কাকু ভাল আছেন?"
অনিরুদ্ধ সেন শিউলিতলা থেকে ফুল কুড়াচ্ছিলেন। তাঁর উঠানের সামনে সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলি গাছটার নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে আছে। কমলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠের সওয়াব

লিখেছেন শিমুল মামুন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬


লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি। আমলটি করার ব্যাপারে হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে।

সাগরের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়
আবদুল্লাহ ইবনে আমর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×