somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঠাঁট আর বাট

১১ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কি স্টাইল!
কি কণ্ঠ!
কি অসাধারণ উপস্থাপনা।
প্রফেসারের লেকচার ডেলিভারিং, ব্যক্তিত্ব, রুচি সব এক করে ভাবলে তৃণা কেন, কলেজের সবাই ওনার ভক্ত।কথা বলার সময় প্রফেসরের সুরেলা কন্ঠটা যখন একটু ভেঙ্গে আসে তখন তার কন্ঠের ঝংকারে সমস্ত ক্লাশরুম যেন অনুরণিত হয়ে ওঠে। ইনি-ই কলেজের নামকরা শিক্ষক প্রফেসর ডি. মুখার্জি। ওনার ক্লাশের প্রথম দিকে তৃণা ভাবতেও পারেনি তার ভাগ্যটা তার জন্য, এত সুন্দর একটা উপহার প্রস্তুত করে রেখেছে। আর তা হলো প্রফেসর মুখার্জির লেকচার শোনার সৌভাগ্য। শুধু লেকচার ক্লাশই নয়, প্র্যাকটিকাল ল্যবেও তার উপস্থিতি সারা ল্যাবকে ভীষণ প্রানবন্ত করে তুলতো। করিডোর দিয়ে হেঁটে প্রফেসর মুখার্জি যখন হেঁটে আসতেন, মুখে তার মৃদু হাসি, অভিবাদন গ্রহণের সময় বিনয়ের সাথে তার সম্ভাষণ সকলকে স্তম্ভিত করে দিত। তার স্টাইল সেন্স অনন্য । একরঙা শার্টের মাঝ বরাবর সেই রঙের সুতার কাজ করা এমব্রয়ডারি কি যে ভাল দেখাত। এ ধরণের কাজ সচরাচর দেখা যেত না। কিন্ত ওনার নিজস্ব এই স্টাইল তো কারোর সাথে সদৃশ হবার জো নেই।নিঃসন্দেহে এই আর্ট-সেন্স তারই সৃষ্ট। কলেজের অন্য সকলের মতো ওনাকে পুরোনো স্যান্ডেল পায়ে রিকশা থেকে নেমে চপড় চপড় করে কলেজের সিঁড়িতে পা দিতে দেখেনি কেউ। সবসময় চকচকে জুতো।
ফিট ফাট।
টপ্ স্মার্ট।
ছাত্ররা আরো অনেক খবর জানত। তিনি যে সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে আগত, সে সব কথাও বলে ফিরতো সকলের মুখে মুখে।এসব শুনে তৃণা ভাবতো সেজন্যই স্যারের ব্যক্তিত্ব এত কালচারড্, এত পশ্।ওনার উপস্থাপনায় স্মার্টনেসের ছোঁয়া নির্ঘাৎ এ কারণেই। এতেই একসময়ে তিনি হয়ে উঠলেন তৃণার আদর্শ।সে ভাবতো তার প্রিয় এই শিক্ষকের সাথে পাঁচ মিনিট কথা বললেও পাঁচটা আদব শেখা যায়। তার জ্ঞানের পরিধি, পড়া বোঝানোর দক্ষতা তৃণাকে সামনে অপার বিস্ময় ভরা এক জগতের দ্বার অন্মোচন করতো।

সেদিন ভীষণ বৃষ্টি। তৃণা আর তার বান্ধবী ল্যাবের কাজ ফেলে রেখে বৃষ্টি দেখায় ব্যস্ত।সেই ব্রিটিশ আমলের তৈরি বিশাল কক্ষ নিয়ে কলেজটির ভবন তৈরী। ল্যাবের তিনটি কক্ষে পেরিয়ে শেষেরটায় শিক্ষকদের বসার স্থল।চারিদিকে ঘোরানো বারান্দা। তৃণাদের কক্ষটি থেকে বারান্দায় যাবার সংযোগস্থলে রয়েছে একটি দরজা। দরজার দু’পাশে দাঁড়িয়ে উদাস হয়ে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়া দেখতে দেখতে তৃণাকে তার বান্ধবীটি তার জীবনের সব না পাওয়ার কথা সেদিন বলে যাচ্ছিল। এসময় প্রফেসর মুখার্জি সবার টেবিলে এক্সপেরিমেন্ট দেখে তৃণাদের কক্ষে ঢুকতেই দেখে কাজ ফেলে তাদের উদাস নয়নে বৃষ্টি দেখার প্রকল্প। প্রফেসরকে দেখে তারা তো তটস্থ। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে প্রফেসর নিজেই বলে ফেললেন, ‘ওহ্, ঠিক আছে।’
অর্থাৎ ‘যেমন ভাবে বৃষ্টি দেখছ, দেখ। আমি তোমাদের বিরক্ত করব না। জানতেও চাইব না এক্সপেরিমেন্টের রিডিং কি কি নিয়েছ।’
তৃণাদের মনোজগত যেন তাদের থেকে তিনিই ভাল বুঝে ফেলেছেন। এই বয়সে মেয়েরা ভাবনার কোন জগতে থাকে, তা যেন তার খুব ভাল ভাবে জানা । এত্ত স্মার্ট একজন মানুষ এই ভদ্রলোক, যাকে নিয়ে একটা কটু কথা বলতে পারবে না কেউ।কারো সাথে অযথা দুর্ব্যবহার করা, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছাত্রদের হয়রানি করা, যখন তখন ক্রোধান্বিত হওয়া তার স্বভাবের বাইরে।
কিন্তু নিরঅহংকার এই মানুষটিকে জীবনের তাগিদে কিছু অতিরিক্ত আয়ের কথা চিন্তা করতে হয়।আর সে থেকেই ওনার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যোগদান করতে হয়েছে তখন। ওখানে সরকারী স্কেলের চেয়েও বেতন ভাল। যদিও কলেজের সহকর্মীরা তার এই অতিরিক্ত কাজটা নিয়ে কিঞ্চিৎ ঠাট্টা করে।বিশেষ করে কাঠি বেগমের সারসের মত গলাটা একটু বেশী শোনা যায়। কিন্তু তাতে কি! স্কুলের সীল থাকলে টুকটাক টিউশনি করার সুযোগও মেলে।যদিও তা প্রফেসর করেন কি না কেউ জানে না।তার সীমিত আয় দিয়ে যতটুকু চলা যায় এর থেকে আরেকটু বেশী তো প্রয়োজন হয় জীবনের তাগিদে। কেউ তো এসে ওনাকে খাইয়ে পড়িয়ে দেবে না। অন্তত তার সহকর্মী প্রফেসর কাঠি বেগম তো নয়ই। তারপরও কাঠি বেগমের সাথে তিনি খুব সাবলীল। আসলে কার সাথেই বা না? তার তরল জলীয় স্বভাবের জন্যই তো আজ সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে তার এতো শুভাকাংখী ।
মানুষ অনেক কিছু বললেও আবার থেমেও যায়। তার একটাই কথা কিছুটা ভাল থাকতে পারলেই তো হলো।
কিছুটা। জীবনে এর চেয়ে বেশী আর কি লাগে?
প্রফেসর মুখার্জি আর কিছু ভাবেনও না। কিন্তু তার তুখোড়, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব এবার নজর কেড়েছে বড় বাবুদের। তারা আসেন ওনার কাছে পরামর্শ নিতে। পরামর্শদাতার আরেকটি নাম আছে –অ্যাডভাইসার, মানে কনসাল্টেন্ট। এই কাজে তিনি সিদ্ধ হস্ত। তাই সবার নজর তার দিকেই। তিনি ইদানিং আমন্ত্রণ পান রাজনীতির অংগনের পালা পার্বণে। পরামর্শদাতা থেকে ক্ষেত্র বিশেষে মন্ত্রণাদাতা হিসেবেও যথেষ্ট পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন। সেখানে যে অনেক টাকার খেলা। তাহলে আর বাড়তি টাকার জন্য স্কুলে কাজ করে কে? নেতা আর পাতি নেতাদের ধর্ণা দিতে গিয়ে তাদের ঘরে বসে থাকতেই তো অনেক সময় চলে যায়।মন্ত্রণা সফল হলে মাস শেষে উপঢৌকন আসে বাড়িতে। বড়বাবুরা লাইন ধরিয়ে দেয়। অমুকের সাথে তমুকের সাথে দেখা করার সুযোগ মেলে। ফলে প্রফেসর ডি. কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এতো তো আশা করেন নি। রাজনীতির মহলে, তিনি এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেন বছর দুয়েকের মধ্যে। সংসারের অভাব অনটন তখন কমে এসেছে। এক বাঘা মন্ত্রীপুত্র তার বাবার শুন্যস্থান কোন তরিকায় দখল করবে তার বুদ্ধি বাতলে দিয়ে প্রফেসর ডি. আবারো সবার নজর কাড়েন। বহমান স্রোতের বেপরোয়া গতি যেমন বাধা মানে না, তার চাণক্য নীতিও তেমন বল্গাহীন হয়ে পড়ে এক সময়ে। টালবাহানা করে কলেজের প্রশাসনের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি হলে কলেজে আন্দোলন শুরু হয়। কপাল এমন মন্দ , ঐ বিপক্ষদলের ছেলেরা বড্ড বেয়াড়া।মেয়েদেরকে দেয়ালে ঠেসে ধরে পরিধেয় বস্ত্র খুলে ফেলে তাদের খুবলাতে শুরু করে।এসব থামাতে ছাত্রী হস্টেলে পুলিশ পাঠানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। মেয়েরা ছাত্রদের দ্বারা বীভৎসতার শিকার হলে প্রফেসর মুখার্জি নিরব দর্শক হয়ে অপেক্ষা করেন কখন ক্যামেরার সামনে চোখের পানি ফেলতে হবে।
ফেলেনও।
এদিকে ছাত্রীদেরকে রক্ষা করার বদলে তাদেরই ধরে শিকের ভেতর পুরে এমন একটা প্যাদানি দিল কলেজ কর্তৃপক্ষ যে কেউ আর মুখ খুলতে সাহস পেল না। অথচ ছাত্রীদের নাকাল অবস্থায় ফেলে দিয়ে অসম্মান করাটুকু বাদ দিয়ে গন্ডগোল থামানোর সকল বাহাদুরী তার জিম্মায় নিয়ে ফেলেন তৎক্ষণাত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সকল বাহাবা নিয়ে অধ্যক্ষের চেয়ারাটা বাগিয়ে নিতে তার আর কোন অসুবিধাই থাকলো না।চেয়ারখানা পাওয়া যেন তার সারা জীবনের স্বপ্ন পূরণ। কারণ সে একবারই শুধু চেয়েছিল, মরার আগে অধ্যক্ষের পদটা দখল করা।আর এ সুযোগ কেমন করে যেন গড়িয়ে গড়িয়ে তার হাতের নাগালে চলে এলো। এখন আর যায় কই। প্রফেসর মুখার্জির মনটা ময়ূরের মত পাখনা মেলে ধেই ধেই করে নেচে উঠলো। এখন মন্ত্রণাদাতা হিসাবে কাজ করার জন্য দেশ বিদেশ থেকে দাওয়াত আসে প্রায়ই । কিন্তু ওসব নিমন্ত্রণ পরিহার করেছেন তিনি। কলেজের অধ্যক্ষ পদের মর্যাদা তার উন্নতির সোপান। তাই এই পদ ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।

তৃণাদের থার্ড ইয়ার শেষ।চতুর্থ বর্ষের ক্লাশ সবে মাত্র শুরু হয়েছে। কালেজের আদর্শ ছাত্রী হিসাবে সে ততদিনে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। আর সেটাই কাঠি বেগমের গা জ্বালার কারণ। মেয়েটি তার পদলেহন করে না কেন? একবার সুযোগ পেলে কাঠি বেগম এমন একটা আছাড় মারত যেন ছাত্রীটি একদম সিধা হয়ে যায়। সেদিন ক্যন্সারে আক্রান্ত শাওনের লাশ এলো কলেজে। তৃণারা সবাই শেষ বিদায় জানাবার জন্য শাওনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। তৃণাকে বহুদিন পর দেখে কাঠি বেগমের কেন জানি বেচাইন অবস্থা।সবাই চলে গেলে খালি বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে হাতের ফোনটা নিয়ে তার সে কি নাড়াচাড়া।সে কাকে যেন হন্যে হয়ে একটা মেসেজ দিয়ে চায়। কি বলতে চায়? বেচাইন হয়ে গেছে কেন তৃণাকে দেখে? তার ধাত, মানে যাকে বলে খাসিয়াত সেটা তৃণাকে সহ্য করতে পারে না।কারণ তৃণা কাঠি বেগমের ঘরানার না। কাঠির অন্য চ্যালাগুলো তো দিব্যিই আছে তার আশপাশে। সর্বক্ষণ।
বিশাল বড় বড় আঁচিল ওয়ালা ঐ আরেকটি ছাত্রী তো নিজে এবং তার মা শুদ্ধ দুজনে একসাথে এই প্রফেসারনিকে লেহন করার ওপর রাখে। শুধু তৃণাকে দিয়ে এ কাজটা করাতে পারে না। এটাকে পায়ের কাছে এনে নত করাতে পারলেই পুরো জগৎটা তার হাতের মুঠায় এসে যেত। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব?একটা বুদ্ধি তার মাথায় এসেছে।আসলে এই ছাত্রীটি এমন এক ব্যক্তিত্ব যাকে না ভাল বলে পারা যায় না।কাঠি বেগম নিজেও তা জানে। তাই যাদের খুব ভাল ধারণা আছে এই মেয়েটির ওপর, তাদের কানে বিষ ঢালবে তৃণাকে নিয়ে। একেবারে আচ্ছা মতন। আর অধ্যক্ষ ডি. মুখার্জি তো সেই লিস্টে এক নম্বরে আছে।তাই সেদিন শাওনকে শেষ বার দেখিয়ে নিয়ে যাবার পরপরেই অধক্ষ্যের ঘরে প্রবেশ করলো কাঠিবেগম। নিবেদিত হলো কলেজের খবরাখবর পরিবেশন করতে। এভাবে সকালে একবার, দুপুরে একবার। দু’বেলা করে যায় অধ্যক্ষের রুমে, প্রশাসনিক দপ্তরে। অতিরিক্ত আন্তরিকতা দেখাতে কাপড়ও খুলে ফেলে। কিন্তু আল্লাহ্র দেয়া কাঠি শরীরে কি দেখানোর আছে? কিছুই নেই । তবে প্রচলিত আছে কাঠি ফিগারদের কামড় বেশী থাকে। অফিসের লোকেরাই সেটা ভাল বুঝে। প্রফেসর মুখার্জির চার্মিং পারসোনালিটি (মানে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব) থাকা সত্ত্বেও নারী ঘটিত কোন স্ক্যান্ডেল নেই। কাঠি বেগম তার শরীর দেখিয়ে এখানে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না।কিন্তু তাতে কি? খোদার দেয়া সারসের মত একটা গলা তো আছে।সেই গলা দিয়ে টেনে টেনে ইংরেজিতে কানপরা দেয়াই উওম হবে।প্রয়োজন হলে চিৎকার করে এই মেয়েটিকে নিয়ে সারা কলেজে একটা ছোটখাটো ভাষণও দিয়ে দেবে।
আজ তেমনই।
আধ ঘন্টার একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়ে ফেললো ঐ টার্গেটেড ছাত্রীটিকে নিয়ে।এটা তার না-মুনাফেকেরই একটা অংশ। তৃণার মারদাঙ্গা শ্বশুরের কাছ থেকে প্রচুর টাকা খেয়েছে কাঠি বেগম।শর্ত –তৃণার বদনাম ছড়াতে হবে কলেজে। সোশিওপ্যাথ ঐ শ্বশুরের সাথে কাঠি বেগমের অ্যান্টেনা বেশ মিলে।সেইদিনের সেই ভাষণে তৃণার বাপ-দাদা সহ চোদ্দ গুষ্টির মান সম্মান ধূলায় যেন লুন্ঠিত হয় সেই ব্যবস্থা করে ফেলল। সবাই তার ভাষণ না খেলেও প্রফেসর ডি. মুখার্জি কেন জানি তার সবটুকুই খেয়ে ফেলল।তৃণা টেরও পেল না, তাকে নিয়ে অধক্ষ্যের কক্ষে নতুন বয়ান চলছে।কিন্তু তার পরপরই শুরু হলো তৃণার নতুন অভিজ্ঞতা। তার এই প্রিয় শিক্ষককে অভিবাদন জানালে তা তিনি আর গ্রহন করেন না।তৃণা তার প্রিয় শিক্ষকের এহেন ব্যবহারে বেশ হতবাক! সেই কত ছোট থেকেই না দেখছে প্রফেসর মুখার্জি কে। রাজনীতি করে অধ্যক্ষের প্রেস্টিজ পজিসান বেড়ে গেলেও কলেজ চত্বরে তার বিন্দুমাত্র অহংকার কেউ দেখে নি। এখনো এত টাকা পয়সার মালিক হলেও ঘটর ঘটর করে সেই রিক্সায় চড়েই তো কলেজে আসেন। চাকচিক্যে, অভিজাতপণায় তার কোন ঊনিশ বিশ হয়নি। যেমন ছিলেন, তেমনই আছেন। তাহলে প্রফেসর হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিলেন কেন? তৃণা কোন কারণ তৃণা খুঁজে পায় না।কোন বেয়াদবী তো সে করেনি। তাহলে কেন ওনার এই পরিবর্তন?
এসব ভাবতে ভাবতেই তৃণার শেষ বর্ষ সমাপ্ত হয়ে গেল।এবার কলেজের পাশের ইনস্টিটিউটে যাবে গবেষণার কাজ করতে। সারা জীবনের ইচ্ছা তার, এইখানে গবেষণার কাজ করার। প্রফেসর মুখার্জির ল্যাবে অনেকে কাজ করে। কিন্তু রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াতে প্রফেসর আর ল্যাবে এসে কাজ দেখাতে পারেন না। সহপাঠী এবং পরবর্তীকালে সহর্মীদের কাছে শুনেছে, প্রফেসর ডি. ইদানিং ল্যাবের চাবি ছাত্রকে হস্তান্তর করেই দায়িত্ব সারেন। ল্যাবমুখো হননা। শিক্ষকতার পেশা রূপ নিয়েছে রাঘব বোয়ালদের সাথে মিটিং আর কলেজের কর্মীদের সাথে দরবার করার কাজে। সেজন্য তৃণা অন্য ল্যাবেই কাজ জোগাড় করে নেয়।ইন্সটিটিউটের ঠাঁট তো কলেজ থেকে বহুগুণে বেশী । তাই প্রফেসরকে মাসে একবার হলেও ঢুঁ মারতে হয় ওনার ল্যাবে।আফটার অল্ তার উপস্থিতি যে সর্বত্র আছে তা তো কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হবে। মন্ত্রণালয় থেকে গ্র্যান্ট নিতে হবে না? সেটাও তো একটা ইনকাম। ল্যাব চললো কি চললো না, তা জরুরী নয়।গবেষণা দিয়ে তো দেশ উদ্ধার হবে না।আরো অনেক গুরুত্বপুর্ণ কাজ যে এখন আছে।
এদিকে কাজ শেষে তৃণা সেদিন বাড়ি ফিরছিল।কলেজের মতো এখানে এইসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র –ছাত্রীদের তেমন ভিড় নেই।সেদিন খালি বারান্দা ধরে হেঁটে আসতেই তৃণা দেখল তার প্রিয় শিক্ষকের পদচারণা। খুশীতে যেমন মনটা ভরে উঠলো, তেমনি শংকাও তৈরি হলো। ওনাকে অভবাদন জানাতে গেলে না আবার দুর্ব্যবহার করে বসেন।কিন্তু অভিবাদন না জানিয়ে অধ্যক্ষের পাশ কাটিয়ে চলে যাবার মতন ছাত্রী তো সে নয়।এখন কি করবে? তৃণাকে তার মুখের সামনে উহ্য করবার ঘটনা তো তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে ঘটিয়েই চলছেন।কলেজের হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে সে একজন। নির্দিষ্ট কেউ তো নয়। কিন্তু কিছু শিক্ষক মহাশয়দের ঘাড় ঘুরানো দেখে মনে হয় তৃণা যেন তাদের ঘরের ভাগিনা, ভাতিজা লাগে। যে কিনা ঘরে তাদেরকে তটস্থ করে তুলে এখন এসেছে কলেজ প্রাংগনের বারান্দায়। এই আমজনতার মাঝে আসলে তৃণা কি অমার্জনীয় অপরাধটি করেছে তা সে জানে না। তাহলে কি করবে এখন? মুখোমুখি যেহেতু পড়েই গেছে, অভিবাদন দিয়ে প্রফেসরের দুর্ব্যবহার দেখার আরেকটা এপিসোড না হয় দেখবে! কিন্তু কেন জানি অন্যদিনের মতন ভীড়ের মধ্যে পাশ কেটে চলে যাবার হেতু না পেয়ে ঐ খালি বারান্দায় তৃণার অভিবাদন গ্রহণ করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু বিরক্তিসূচক একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেলেছিলেন। তৃণার ওপর নয়। তার নিজের ওপর। নিয়তি কখন যে কি করে বসে! কেন যে এমন অবস্থায় ফেলেছে নিয়তি তাকে। অন্যসময় তৃণাকে দেখলেই উহ্য করে যেখানে কিনা সোজা প্রস্থান গ্রহণ করতে পারত, সেখানে কি না বাধ্য হয়েছে মুখোমুখি পড়ে এই ছাত্রীর অভবাদনের উত্তর দিতে? কাঠি বেগমের কথায় এই ছাত্রীটিকে কতই না তাচ্ছিল্য করে আসছিল। আর আজ কিনা ঘাড়ের উপর পড়ায় বাধ্য হয়েছে ভাল ব্যবহার করে ফেলতে?
ভাল ব্যবহার করা মানে তো হেরে যাওয়া। দাম্ভিকতা দেখানোই না সত্যিকারের ঠাঁট–বাট।উপরন্তু দীর্ঘ দিনের পথচলার সঙ্গী কাঠি বেগমের কানপড়ার কি হবে?
ভেস্তে যাবে?
কি যে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। জীবনের অর্ধশতক পরিভ্রমণ করে অবসরের পরও এগিয়ে চলছেন সাফল্যের সাথে। তার সূক্ষ্ম বুদ্ধিই এনে দিয়েছে এই মান, এই সম্মান আর আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য। ভাল ব্যবহার করতে তো পয়সা লাগে না। কিন্তু তাকত্ লাগে। তা নেই যে তা না। কানপড়াতে টিউনড্ বলেই হয়তো বা এই সিদ্ধান্তহীনতা। না হলে তো তার স্মার্টনেসের কোন কমতি কখনই ছিল না। এই কাঠি বেগমই কি না কি বলেছিল যেন সেদিন?এসব ভাবতে ভাবতে প্রফেসর মুখার্জি সামনের দিকে এগুতে থাকেন। ।যাই হোক। বেশী কিছু তো না। কেউ অভিবাদন দিতেই পারে। একটু মাথা নোয়ানো আর কি!

কিছুদিনের মাঝে উচ্চ পর্যায়ের সভায় তার নাম অনুমোদিত হতে যাচ্ছে।আজীবন সম্মমনা পাবার ছাড়পত্র মিলেছে । প্রফেসর অফ ইমিরেটাস! আজীবনের জন্য এই সম্মান। এই দুনিয়াতে বাকী জীবন জন্য সম্মান তার জন্য বরাদ্দ হয়ে গেছে। এ ধরা থেকে প্রস্থানের পর কি হবে কে জানে? কিন্তু এ দুনিয়াতে সব কিছু ভোগ করা তো হয়ে যাবে। এ ভাগ্য ক’জনের জোটে? যেমন করে যে চাইবে তেমন করে চলবে।
মন্ত্রণা, কুমন্ত্রণা, ভালোচাল, কুটচাল সবপন্থা প্রয়োগে তার কোন বেগ পেতে হয় না। পানির মতো গড়িয়ে গড়িয়ে যখন যে পাত্রের আকার ধারণ করা দরকার তাই-ই তো করেছেন। ইংরেজীতে একে বলে shape shifter. এরা ইচ্ছাকৃত ভাবে বা জাদুমন্ত্রের সাহায্যে নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু এই গুণটি যে তার এত ভাল ছিল, তা তিনি নিজেও জানতেন না, যদি না তার বড়- কর্তারা তার চিকন বুদ্ধিকে সময় মতো কাজে না লাগাতো। পর্দার আড়ালে থেকে পরামর্শ দাতা হিসাবে আজ তার নব জীবন লাভ হয়েছে।তার সহকর্মীরা অনেকেই জুবু থুবু হয়ে এখন ঘরবন্দী।কিন্তু প্রফেসর মুখার্জি নব উদ্যমে যাত্রা শুরু করেছেন। অবসর গ্রহণের পরে কিছুদিন প্রাইভেট কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।কিন্তু তা কি আর এই সম্মমনার ধারে কাছে যায়? এবার ফিরে এসেছেন তার ফেলে যাওয়া কলেজে।তিনি যে এখন অমরত্ব লাভ করেছেন।দেশ এবং দশ তাকে নিয়ে গর্বিত – শুধু তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী আর ছাত্ররা ছাড়া। তারা এবার হতভম্ব!

২৭/০৬/২০২৬
স্টিকি ওরফে কাঠি বেগম
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৪৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাধু সাবধান!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১

রোমান সাম্রাজ্যের পম্পেই এবং বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, মানুষের সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক স্খলনের কিছু ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিচে পম্পেইয়ের সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেম....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১০



সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেমঃ সমর্থনের জায়গা থেকেই কিছু কঠিন কথা.....

ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়- কিন্তু একটি সরকারের দিকনির্দেশনা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কিছুটা ধারণা পাওয়ার জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইলিয়াস কাঞ্চন

লিখেছেন অর্ক, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৩



আমার ছোটোবেলায় ইলিয়াস কাঞ্চন সুপারহিরো। খুব সম্ভবত জীবনে প্রথম হলে দেখা সিনেমা ছিলো জবরদোস্ত। ইলিয়াস কাঞ্চন ও ওয়াসিম নায়ক। তিনবার দেখেছিলাম। বাড়ির কাছে হল। সেভাবে কড়াকড়ি ছিলো না। ছোটো বাচ্চা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "শিউলি গাছ"

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৭

শিউলি গাছ

- মঞ্জুর চৌধুরী

১.

"কাকু ভাল আছেন?"
অনিরুদ্ধ সেন শিউলিতলা থেকে ফুল কুড়াচ্ছিলেন। তাঁর উঠানের সামনে সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলি গাছটার নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে আছে। কমলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠের সওয়াব

লিখেছেন শিমুল মামুন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬


লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি। আমলটি করার ব্যাপারে হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে।

সাগরের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়
আবদুল্লাহ ইবনে আমর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×