অফিস থেকে সোজা নিউমার্কেটে ঢুকে টুকুন ভাইয়ের দোকানে উকি দেই। দেখি সে বসে চা ও সিগারেট একসাথে পান করছে। আমাকে দেখে বলল, বসেক। এতদিন পর, কি মনে করে?
মায়ের জন্যে একটা ভাল কাপড় দাও। তোমার দোকানে তো ভাল কাপড় পাওয়া যায়।
তা, যা বলেছিস। দেখ্ দেখ্। বলে সে দোকানের কর্মচারীকে কাপড় নামাতে বলল।
লাল, নীল, সবুজ, কাল বিভিন্ন রঙের বাহার। অনেকগুলো কাপড় একসাথে দেখে কনফিউজড হয়ে গেলাম। টুকুন ভাইকে বললাম, তুমি একটা পছন্দ করে, দাও।
সে একটা দিল। বেশ সুন্দরই বলতে হবে। পায়ের রঙ কালো, আচলটা একটু সাদাটে, তবে সাদা নয়। ছাই রঙের কাপড়। বেশ ভাল লাগল।
দাম জিজ্ঞাসা করলাম।
এটার দাম ৪০০০ টাকা। তোমার জন্যে কমই রাখলাম।
আমি দমে গেলাম। বেতন যা পাই, তাতে বাসা ভাড়া, খাবার-দাবার ও আনুষঙ্গিক খরচ করতে করতে শেষ হয়ে যায়। এত দামী কাপড় নিব কি করে?
সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আরে ভাই নিয়ে যাও, তুমি যখন খুশি টাকা দিও। বাধা নাই।
এই কথা শুনে আমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাস্তায় বের হলাম। বাস আসল। উঠে পড়লাম। প্রচন্ড গরম। ঘামে ভিজে জবজব করছে, আমার শরীর। একটা সিট পেয়ে শান্তিতে বসলাম। ইদানিং বাসে সিট পাওয়া দুরুঢ় ব্যাপার, বিশেষ করে লোকাল বাসে।
বাস চলতে আড়ম্ভ করল। কিন্তু চিরচেনা জ্যামে থেমে থেমে যাচ্ছে বারবার। আমরাও অভ্যস্থ।
কলাবাগান আসার পর, হঠাৎ করে হই-হুল্লা শুরু হল। প্রথমটাতে বুঝতে না পারলেও যখন দেখলাম সামনের জানালায় আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে, তখন নামার জন্যে ব্যস্ত হয়ে, ঠেলাঠেলি শুরু করে দিলাম।
শেষ পর্যন্ত নামতে পারলাম।হাত-পায়ের কয়েক জায়গায় ক্ষত হয়েছে, কিন্তু বিশেষ কিছু হয় নি। তাই স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে জ্বলন্ত বাসটাকে দেখছি। কয়েকজন আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু বেশির ভাগই আমার মত দাঁড়িয়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখছে।
ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিণে দেখি মা।
হ্যা, মা বল।
কোথায় তুই?
কলাবাগান। আমাদের বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
তোর কিছু হয় নি তো।
না। আগেই নেমে পড়েছি। কারও কিছু হয় নি।
আচ্ছা, বাবা তাড়াতাড়ি চলে আয়। আমার মনটা যেন কেমন কেমন করছে?
আচ্ছা, মা।
বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। তখন হঠাৎ করে মায়ের জন্যে আনা কাপড়ের কথা মনে পড়ল।
অগ্নিনিরুদক বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এখন বাসটা পানিতে কাকভেজা হয়েছে, তবুও বাসের কয়েকটা সিটে আগুন নিভে নি।
আমি যে সিটটায় বসেছিলাম, সেখানে গেলাম। গলা উঁচু করে দেখলাম, সিটে কাপড়টা ঠিকই আছে, কিন্তু আধ-পোড়া। আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মত অনেকেই দাঁড়িয়ে আছেন। তখন আমার মায়ের কথা আবার মনে পড়ল। বার বার মনে পড়ল, কল্পনায় আমি আমার মায়ের হাস্যেজ্জ্বল মুখ-খানা দেখতে পেলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০১৬ রাত ১:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



