somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফেসবুকের মতো ভালোবাসা

০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ৭:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক দেশে, যেমন থাকে, তেমনি ছিলেন এক রাজা।
রাজা খুব প্রফুল্ল চিত্তের—কথায় কথায় হাসেন। রাজার অনেক সুখ। এই সুখের উৎস তাঁর তিন কন্যা। তিন কন্যাই রাজাকে খুব ভালোবাসে। বড় কন্যা রাজার মাথার চুলে বিলি কেটে দেয় আর মেজো কন্যা রাজার চুলে দেয় কলপ করে। ছোট কন্যাটা অবশ্য একটু অন্য রকম। রাজার পাশে পাশে থাকে ঠিকই; কিন্তু সারাক্ষণই সে ঘাড় গুঁজে থাকে তার মোবাইল ফোনে। রাজা বলেন, ‘কী করিস তুই মাথা নিচু করে?’
: ফেসবুক দেখি, বাবা।
: ফেসবুকে কী আছে? আয়, আমার কাছে আয়!
রাজকন্যা রাজার কাছে যায়। কিন্তু তখনো সে তাকিয়ে থাকে তার স্মার্টফোনের দিকেই। রাজা ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলেন। মনে মনে ভাবেন, এই ছোট মেয়েটা কেমন যেন হয়ে গেল! মেয়েটা কি তাহলে তাঁকে ভালোবাসে না?
সন্দেহ বেশি দিন ধরে রাখতে পারেন না রাজা। একদিন বসেন পরীক্ষা নিতে। কোন মেয়ে তাঁকে কেমন ভালোবাসে, সেই পরীক্ষা!
আসে বড় কন্যা। রাজা জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই আমাকে কেমন ভালোবাসিস, মা?’
কন্যা বলে, ‘আমি তোমাকে মাথার চুলের মতো ভালোবাসি, বাবা!’
রাজার মাথায় চুল কম। নিজের কেশ-বিরল মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে রাজা হেসে ওঠেন। মাথার চুল যার যায়, সে-ই জানে চুল কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বড় কন্যা তাহলে তাঁকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে! রাজা খুশি হয়ে বড় কন্যাকে একটা বিএমডব্লিউ গাড়ি উপহার দেন।
এরপরে আসে মেজো কন্যা। রাজা খুশি খুশি মনে জানতে চান, ‘মা, তুই আমাকে কেমন ভালোবাসিস?’
মেজো কন্যা চটপট বলে, ‘তোমাকে তো বাবা আমি কলপের মতো ভালোবাসি!’
রাজা অত্যন্ত খুশি হন। তাঁর কেশ-বিরল মাথায় যে অল্প কটা চুল বাকি আছে, তার সবই ধবধবে সাদা। সেই চুল তো এই কলপেই কালো হয়ে থাকে। বৃদ্ধ রাজাকে কলপই তারুণ্য ফিরিয়ে দেয়। মেজো কন্যাকে রাজা খুশি হয়ে একটা চার্টার্ড প্লেন উপহার দেন।
রাজা এবার ডাকেন ছোট কন্যাকে। ছোট কন্যা স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আসে রাজার কাছে। রাজা বলেন, ‘মা, তুই আমাকে কেমন ভালোবাসিস?’
ছোট কন্যা মাথা না তুলেই চট করে বলে, ‘একেবারে ফেসবুকের মতো ভালোবাসি, বাবা!’
রাজা ভীষণ আহত হন। এই মেয়ের মাথায় ফেসবুক ছাড়া অন্য কিছু কি নেই? আহত চিত্তেই রাজা ছোট রাজকন্যাকে শাস্তি দেন। বড় মর্মান্তিক শাস্তি! নির্জন এক দ্বীপে দশ বছরের নির্বাসন।
ছোট কন্যাকে বিদায় দেওয়ার সময় রাজা বলেন, ‘তুই কি কিছু নিতে চাস সঙ্গে?’
রাজকন্যা বলে, ‘চাই। আমার স্মার্টফোন আর সেটার চার্জার!’
রাজা আরও একবার ধাক্কা খান। তিনি ভেবেছিলেন, মেয়েটা হয়তো নির্বাসনে না যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করবে। ‘বাবা’ বলে তাকে জড়িয়ে ধরবে। রাজাও তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে শাস্তি মওকুফ করবেন। কিন্তু তা নয়, সে চায় কিনা স্মার্টফোন আর চার্জার!
রাজার রাগ আরও বাড়ে। ছোট রাজকন্যাকে পাঠিয়ে দেন নির্বাসনে। মনে মনে বলেন, ‘আমার দুই কন্যাই যথেষ্ট! লাগবে না আমার ফেসবুকের মতো ভালোবাসা!’
রাজা বসেন সিংহাসনে। কিন্তু রাজার মুখে আর হাসি নেই। বেজার মুখে রাজকার্য করেন। করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠেন। শুধু ছোট রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। সে যেন তাঁর সব আনন্দ নিয়ে নির্বাসনে গেছে। আহা রে, সেই মুখটা যদি আবার দেখতে পেতেন রাজা!
মন্ত্রী দিলেন বুদ্ধি। বললেন, ‘রাজা মশাই, রাজকন্যা তো সব সময় ফেসবুকেই থাকে। আপনিও একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলুন! তাহলেই তাকে দেখতে পাবেন!’
রাজা বলেন, ‘ফেসবুকে ছবিও দেখা যায় নাকি মন্ত্রী?’
: হ্যাঁ রাজা মশাই। ছবি দেখা যায়, মনের কথা লেখা যায়, দিন-দুনিয়ার সব খবর পাওয়া যায়! ফেসবুক বড় কাজের জিনিস!
: বলো কী!
রাজা একটু থমকে যান। ফেসবুক যে এত কাজের জিনিস, তা তো তিনি জানতেন না! মন্ত্রীর কথায় রাজাও একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললেন। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালেন ছোট রাজকন্যাকে।
বাবাকে ফেসবুকে দেখে রাজকন্যাও খুব অবাক। শুরু হয়ে যায় মেয়ে-বাবার ফেসবুকে যোগাযোগ। রাজা স্ট্যাটাস দেন। মেয়ে সেই স্ট্যাটাসে কমেন্ট করে, লাইক দেয়। মেয়ের লাইক পেয়ে রাজা তো খুবই খুশি। মেয়ের লাইক পাওয়ার আশায় রাজা আরও ভালো ভালো স্ট্যাটাস খুঁজতে থাকেন। দারুণ কিছু মাথায় এলেই সেটা লেখেন ফেসবুকে। আর মেয়েটাও যেন তৈরি থাকে। সঙ্গে সঙ্গে তার লাইক পৌঁছে যায় রাজার স্ট্যাটাসের নিচে। রাজা মেয়েকে বলেন, ‘মা রে, তোকে তো এখন খুব দেখতে ইচ্ছা করছে...!’
মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট বাঁকানো সেলফি তুলে রাজাকে ইনবক্স করে। রাজার চোখে পানি চলে আসে। আবার মেয়ের এ রকম অদ্ভুত ভঙ্গির ছবি দেখে হেসেও ওঠেন রাজা।
রাজা হেসেছেন শুনে রাজ্যজুড়ে ধন্য ধন্য রব ওঠে। সবাই বলে, ‘ধন্য ছোট রাজকন্যা, ধন্য তার ফেসবুক!’
ওদিকে মেয়েও রাজাকে ছবি পাঠাতে বলে। রাজাও মেয়ের মতো ঠোঁট বাঁকিয়ে সিংহাসনে বসে ‘সিংহাসনফি’ তুলে পাঠান মেয়েকে। মেয়ে তো ‘এত্তগুলা’ খুশি!
রাজা আর ছোট রাজকন্যা ফেসবুকের মাধ্যমে সব সময় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে থাকে। কখন কী খেল, কখন কী ভাবল, কখন কী মনের অবস্থা—সব জানায় তারা। রাজা বলেন, ‘তোকে নির্বাসনে দিয়ে তো আমার বিরাট ভুল হয়ে গেছে! এখন এই বুড়া বয়সে বুড়া আঙুল দিয়ে মোবাইল ফোন চাপতে চাপতে জীবন যাওয়ার উপক্রম!’
মেয়ে ওদিক থেকে বিরাট একটা স্মাইলি পাঠায়। রাজা লেখেন, ‘তোকে আর নির্বাসনে থাকতে হবে না মা, চলে আয়...!’
কিন্তু লেখাটা পাঠানোর আগেই ফেসবুক বন্ধ হয়ে যায়। রাজা কোনোভাবেই আর লেখাটা পাঠাতে পারেন না। মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। রাজা দশদিকে লোক পাঠান। কী হলো? হঠাৎ করে ফেসবুক বন্ধ হয়ে গেল কেন? কেউ কিছুই বলতে পারে না। রাজার আর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় না। রাজার আর কিছুই ভালো লাগে না। তখন ছোট মেয়ের সেই কথাটা মনে পড়ে রাজার, ‘তোমাকে ফেসবুকের মতো ভালোবাসি, বাবা!’
রাজাও মনে মনে বলেন, ‘আমিও তোকে ফেসবুকের মতোই ভালোবাসি রে, মা! ফেসবুক চালু হলেই তোকে জানিয়ে দেব, তোর নির্বাসন শেষ! তখন ছুটতে ছুটতে চলে আসবি। আর তুই এলে আমরা দুজন মিলে একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে আপ করব! সেই ছবির ক্যাপশন হবে ‘ফেসবুকের মতো ভালোবাসা!’
রাজা অপেক্ষা করেন। বন্ধ ফেসবুক নিশ্চয়ই খুব তাড়াতাড়ি চালু হবে

Rosh alo
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×