somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিরোনামহীন গল্প

২০ শে এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১০:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার হাতে তিনটে বই। পাওলো কোয়েলহোর 'দ্য স্পাই', দান্তে অলিগেরির 'ডিভাইন কমেডি', সিডনি শেলডনের 'ডুমসডে কন্সপিরেসি'। বইগুলো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি মিনিট পনের হচ্ছে। এর মধ্যে মেয়েটা তিন জন ক্রেতার কাছে বই বিক্রি করেছে। প্রথম দুইজন পুরুষ, তৃতীয় জন একটা বাচ্চা ও তার মা। পুরুষ দুইজন নিয়েছে একটা বাংলা একাডেমীর ইয়া বড় ডিকশনারি ও একটা লাল কাভারের কবিতার বই। বাচ্চার মা নিয়েছে এক কি দুইটা বড় বড় রঙিন কমিক বই। এই পনের মিনিটের মধ্যে সেলসগার্ল মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়েছে তিন বার। প্রথমবার সরাসরি প্রশ্নাতুর চোখে, দ্বিতীয়বার কৌতুহলি চোখে, তৃতীয়বার আড়চোখে লাজুক ভাবে। আমি তাকিয়েছি পাক্কা পনের মিনিট। স্পেসিফিকলি বললে তার দিকে নয়, তার ডান হাতের দিকে।
মেয়েটার ডান হাত এর অনামিকা আঙুলে একটা স্বর্ণের আংটি আছে। নকলও হতে পারে। আংটিটার উপরাংশে পাথর বসানো। পাথরটা অচেনা জাতীয় কালচে রঙের। উপরের আস্তরণ থেকে কিছুটা উঠে গেছে। সম্ভবত সে ঘরের ধোয়া-মোছার কাজ নিজেই করে অথবা পাথরটাই অমন। বৃদ্ধাঙ্গুল এর নোখ বেশ লম্বা। নেইল পলিশ দিয়ে ছোপ ছোপ দাগ আঁকা। বেশ সুন্দর দেখতে। তর্জনী আর মধ্যমার মাথা সামান্য দেবে আছে। অনেকক্ষণ টাইপ করার ফল।
মেয়েটার হাতে লাল কালার বেশি মানায়। কারণ তার হাতও লালচে ঘরনার। রক্ত চলাচল বেশি। কনিষ্ঠা আঙ্গুল সবসময় বাঁকা হয়ে থাকে। সম্ভবত কোন অস্থি সম্বন্ধীয় রোগ কিংবা অভ্যাস।
ষোল মিনিটের মাথায় মেয়েটার চোখে সরাসরি চোখ রাখলাম আমি। তার কাজলটানা চোখ এ অন্তহীন ব্যাকুলতা।
“আপনার আংটিটা সুন্দর।” বললাম তাকে।
প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেলেও সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মাঝে মুখে মাপা বহু চর্চিত হাসি ফিরিয়ে আনলো।
“থ্যাংক্স। আপনি কি বই গুলো কিনবেন?”
আমার হাতের দিকে ইশারা করল সে।
“হ্যাঁ। কিনবো। সাথে আরেকটা জিনিস কিনবো।”
কৌতুহলি হলো সে। “কী?”
“আপনার মন।” জবাব দিলাম।
মেয়েটা এবার মিষ্টি করে হাসলো। স্বাভাবিক হাসি। হাসলে তার গালে টোল পড়ে না, ঠোঁট বেকে গিয়ে দু'চারটে ঝকঝকে দাঁত প্রকাশিত করে।
“মন তো কেনা যায় না।”
“যায়। ধরুন আমি আপনাকে আজ না হয় কাল পটিয়ে ফেললাম। সে জন্য অবশ্যই আমাকে হালি হালি ডেটিং, মোবাইল রিচার্জ ইত্যাদি ব্যয়বহুল কাজ করতে হবে। তাহলে ব্যাপারটা আলটিমেটলি কি দাঁড়াল?”
“খোঁড়া যুক্তি।” মুখ বাঁকাল সে।
হাসি দূরত্ব কমিয়ে দেয়। আমি হাসলাম। নিশব্দ হাসি। যেন বুঝিয়ে দিলাম অখন্ডনযোগ্য খোঁড়া যুক্তিই দিয়েছি। মেয়েটাও হাসলো। যেন বুঝিয়ে দিল হার মেনেছে সে।
আমি স্বাভাবিক ভাবে তার দিকে বইগুলো এগিয়ে দিলাম। সে হাত বাড়িয়ে নেয়ার সময় তার কনিষ্ঠা আঙ্গুলে আমার হাতের ছোঁয়া লাগলো একটু। আঙ্গুল দ্রুত গুটিয়ে নিয়ে নারীর স্বাভাবিক লাজুকতার প্রকাশ ঘটাল সে।
“আপনি কি এই বই গুলো পড়েছেন?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
মেমো তৈরি করার ফাঁকে উত্তর দিলো সে,“দুটো পড়েছি। ডিভাইন কমেডি পড়া হয়নি।”
“কালজয়ী বই। কিছুদিন আগেই পড়েছি আমি। বইটিতে দান্তের নরক সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণা তিনি তাঁর নরক ভ্রমণ এর প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন।”
“আবার কিনছেন যে? কাউকে গিফ্ট করবেন নাকি?”
“হ্যাঁ। আপনাকে।” সংক্ষেপে উত্তর দিলাম।
মেয়েটা এবার মুখ তুলে তাকাল। অবাক দৃষ্টি।
“অপরিচিত কাউকে গিফ্ট দেওয়াটা কি ঠিক?”
ভাবনার বিষয়। একটু মাথা চুলকে হাত বাড়ালাম হ্যান্ডশেক এর উদ্দেশ্যে। মুখে বললাম,“আমি শাহ মোহাম্মদ ইসমাইল। আপাতত বেকার।”
সে ইতস্তত করলো অল্পক্ষণ। তারপর দ্বিধার সাথে হালকা ভাবে হ্যান্ডশেক করলো।
“আমি তনুশ্রী রায়। আপাতত কর্মী।”
“উই আর নট স্ট্র্যাঞ্জার এনিমোর।” স্মিত হেসে বললাম তাকে।
হাত ছাড়িয়ে নিল মেয়েটা।দুই আঙুলের ফাঁকে ক্যাশ মেমো রেখে বাড়িয়ে দিল কয়েক সেকেন্ড পরেই। নিলাম জিনিসটা। ৪২৮ টাকা। এত কম কিভাবে এলো?
জিজ্ঞাসু দৃষ্টি হানলাম 'বাতিঘর' এর সেলসগার্ল তনুশ্রী রায়ের দিকে।
“আপনি যদি গিফ্ট করতে পারেন, তবে আমার করতে দোষ কি বলেন? 'দ্য স্পাই' আমি আপনাকে গিফ্ট করলাম।”
মেয়ে বেশ চালু। মনে মনে একছুট প্রশংসা করে নিলাম।
“ধন্যবাদ তবে। আজ আসি। হয়তো শীগ্রই আবার কোন বই নিয়ে চলে আসব আপনার কাছে।”
“ধন্যবাদ আপনাকেও। আবার আসবেন।” বলে বহুল চর্চিত মেকি হাসিটা আবার মুখে ফুটিয়ে তুললো তনুশ্রী রায়।
আমিও আমার ভুবনভোলানো হাসি ঠোঁটের কোণায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে এলাম। মেয়েটা জানে না সে যখন 'ডিভাইন কমেডি' খুলবে তখন দান্তের সাথে তারও নরক ভ্রমন এর টিকেট কাটা হয়ে যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ১০:৫৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×