আবারো এসে গেলো ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। এ দিবসকে সামনে রেখে সকলের মতো আমিও ঝাপিয়ে পড়লাম নিজেকে দেশপ্রেমিক প্রমাণের মিছিলে। আমাদের 'সিজনাল' দেশপ্রেম আমাদেরকে মহান করে। আমরা বিশেষ দিনে দেশপ্রেম প্রদর্শন করে একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। যা আমাদের পরের পুরো এক বছর নিশ্চিন্ত রাখে। যাক, এ বছর আর দেশপ্রেম না দেখালেও চলবে।
অদ্ভুত এক জাতি আমরা।
আমাদের দেশপ্রেমও দেখার মতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশপ্রেম দেখে আতকে উঠতে হয়। আমাদের দেশপ্রেমের সঠিক দিক নির্দেশনা সঠিক ধারনা না থাকায় আমরা বিশেষ করে তরুণ সমাজ একটা অস্বচ্ছ দেশপ্রেমের ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছি। যেখানে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে বলতে হয়, আজ এই সময়ে দেশপ্রেম বৃদ্ধির চেয়ে দেশপ্রেম কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরী। আমরা বুঝে না বুঝেই যা করে চলছি তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সাধারণভাবে চোখ মেললেই অনেক দৃশ্য চোখে পড়ে। যেমন, এখন আমরা অতিরিক্ত আবেগে, অতিরিক্ত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের মোবাইলে ব্যবহার করে চলেছি আমাদের জাতীয় সঙীতের সুর। যে সুরে দাঁড়িয়ে সন্মাণ জানানোর নিয়ম থাকলেও তা হচ্ছে উপেক্ষিত। তাই বাস, রিকশা, অফিস-আদালতে এমনকি টয়লেটেও বিরামহীন বেজে চলছে আমাদের জাতীয় সঙীত।
হায় দেশপ্রেম!
আরেকটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, আনন্দের কিছু হলে অথবা পাকিস্তান-টাকিস্তানসহ বড় দেশের বিরুদ্ধে ক্রিকেটে জিতলে বলে দেই স্বাধীনতার পর এতো আনন্দ আর পাইনি। অথবা একটা ভয়াবহ কিছু ঘটলে বলে দেই, ওটা একাত্তুরের মতো ভয়াবহ সময় ছিল।
যা আমার আছে একই সঙ্গে হাস্যকর এবং গর্হিত কাজ বলে মনে হয়। আমাদের স্বাধীনতা বা আমাদেরও মুক্তিযুদ্ধ কোনো ওয়ান ডে ম্যাচ ছিল না। ওটা সুদীর্ঘ বছরের অত্যাচারের আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক কঠিনতম বিস্ফোরণ। যার সাথে অন্য আর কোনো কিছুরই তুলনা চলেনা।
বলতে হয়, এই সময়ে আমাদের নজর দেয়া প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের মতো এই স্পর্শকাতর বিষয়ে। আজ টিভিতে যে ধরণের মুক্তিযুদ্ধের নাটক দেখানো হয় তাতে কি মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য প্রতিফলিত হয়? বিষয়টা ভেবে দেখা প্রয়োজন। অধিকাংশ নাটকে থাকেনা কোনো গল্প। কয়েকটি যুদ্ধের দৃশ্য দেখিয়েই মনে হয় মুক্তিযুদ্ধকে দেখিয়ে দিচ্ছেন নাট্যকার, পরিচালক মহোদয়। যার ফলে নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে ছোটরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ধারণা পায়না। অন্যভাবেও যে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনা যায় সে বিষয়টা মনে হয় জানা-ই নেই তাদের। কারন এমন এক বহুমাত্রিক অর্জন আমাদের তা ব্যাখা করার প্রয়োজন নেই।
আগুনের পরশমনি, শ্যামল ছায়া, জয়যাত্রার মতো ভালো চলচিত্র থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সে ধরণের নাটক নেই। তবে স্পার্টাকাস'৭১ একটি অসাধারণ ভিডিও ফিকশন।
কথায় কথায় বাড়ে। ইদানিংকালের দেশাত্মবোধক গান নিয়েও কথা থেকে যায়। সে গানগুলো কানে কেমন যেন শোনায়। অথচ বিশাল এক সমৃদ্ধ বাংলা গানের ভান্ডার আমাদের।
দুয়েকটা যা গানও হয় সেগুলেতেও বৈচিত্র কম। বেশির ভাগ গানেই থাকে গতানুগতিক সহজ কথাবার্তা, আগামীর সম্ভাবনা আর বিভেদ ভুলে যাওয়ার বাণী।
আমার অজ্ঞতা কিনা জানিনা, আমি বুঝতে পারিনা দেশ স্বাধীনের এই ৩৮ বছর পরও স্বপ্ন দেখানোর কি আছে? আর কতদিনই বা এই স্বপ্ন দেখাদেখি? এখন স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়িত স্বপ্নের কথা শোনানো প্রয়োজন। যেগুলোতে উদ্দীপ্ত হবে মানুষ। আর বিভেদ ভুলে যাওয়ার যে ডাক শোনানো হয় তাতেও একটু অবাক হতে হয় ভাবনায় পড়ে যেতে হয়। সন্মানীত গীতিকারকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, বলবেন কি আমাদের বিভেদটা কোথায়? যেখানে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, আমাদের মধ্যে মতাদর্শগত বিভেদ ছাড়া অন্য কোনো বিভেদ নাই। যেমন নাই আঞ্চলিকতার বিভেদ, নাই ধর্মীয় বিভেদ। যা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রবল।
তাই সময় অনেক হয়েছে। আর সময়ক্ষেপন নয় নয়। ভেতরে বাইরে দ্রুত ঘটুক যাবতীয় মঙ্গলময় পরিবর্তন। মঙ্গলের পরিবর্তন।
আবারো এসে গেলো স্বাধীনতা দিবস; চলেন ঝাপিয়ে পড়ি নিজেকে দেশপ্রেমিক প্রমাণের মিছিলে...
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান কি বাংলাদেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ছে?

পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার সহযোগী সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়ার কয়েকজন নেতা দাবি করেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই জঙ্গি সংগঠনটির নেতা সাইফুল্লাহ কাসুরি বলেন, তারা ১৯৭১ সালে... ...বাকিটুকু পড়ুন
অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !
অচেনা মাটিই আমার শেষ ঠিকানা !

পাথর বা গ্রানাইটে বেঁধো না তো আমার শেষ শয্যা,
নাম খোদাই করে রেখো না আমায়, দিতে একা থাকার লজ্জা।
চাই না উপাধি, চাই না তারিখ, ধূসর... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্য ব্লাইন্ড স্পট

ঘন কুয়াশার চাদর আর আঁকাবাঁকা সড়কের আড়ালে ‘পদ্মাডাঙা’ গ্রামটা দেখতে আর দশটা নীরব, নিরুপদ্রব পল্লীর মতোই। কিন্তু সাইবার অপরাধের মানচিত্রে এই জায়গার পরিচয় ভিন্ন। ফিশিং, ব্যাংক... ...বাকিটুকু পড়ুন
কাতুকুতু'র কাহিনীনামা
কাতুর সাথে কুতু দিয়ে হচ্ছো পগারপাড়,
ফের যদি আসো কাছে বলবো- 'খবরদার!'
একটু হেসে, কাছে এসে, দিচ্ছো বুঝি কাশি,
ঝুলিয়ে দাড়ি, যাচ্ছো বাড়ি, যেথায় আছেন মাসি।
তোমার সাথে, দুধে-ভাতে, গপ্প করছি কত,
তবু কেন, ঘন... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাঙালিয়ানা ভোজ ও রুপালি ইলিশের স্বাদ


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।