somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সময়ের কাঁটা,আর ক্যালেন্ডার শত্রু এখন

০৫ ই জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
সময়ের কাঁটা,আর ক্যালেন্ডার শত্রু এখন


জাহাঙ্গীর বাবু

বাবা,মা,শশুর,শাশুড়ী চার জনই বার্ধক্য জনিত অসুস্থ্য।একজন প্রবাসী তার প্রবাস জীবন,স্ত্রী,সন্তান,বাবা,মা পরিবার,পরিজন নিয়ে আশংকা,চিন্তা,ভাবনায় থাকে প্রতি মুহুর্ত, স্মৃতি পাতায় উল্টায় নিজের অজান্তে।হারিয়ে যায়,শৈশবে,কৈশরে,যৌবনের রোমাঞ্চকর, আবগে অনুভুতির মাঝে। এই ভাবাবেগ অনুভুতিকেই "হোম সিক" বলি।দেশ,বাড়ি,ঘর,আপনজনের ভাবনায় ডুবে থাকা একটা রোগ, যার নাম হোম সিক।

আমি যখন সৌদি আরব ইলসাইফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর সুপারভাইজার তখন,কিংডোম টাওয়ার প্রজেক্টে আয়ারল্যান্ডের একজন প্রজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন।না ছিলো পেট্রিক মরান।সেই পেট্রিক দারুন একজন মানুষ ছিলেন।ইয়ং এনার্জেটিক,দুর্দান্ত,সুদর্শন।বাংলাদেশী, পাকিস্তানী,ভারতীয়, শ্রীলংকার শ্রমিকদের প্রতি তার একটা টান ছিলো।আই এক বার একটা কবিতা লিখে অনুবাদ করে তাকে উপহার দিয়েছিলাম।নাম ছিলো এইম লেস লাভার।পড়ে হাসি দিয়ে বলেছিলেন,তুই বড় আবেগী,হোম সিকে ভুগিস।

লেখাটি যখন লিখছি তখন,নিজ সন্তান স্ত্রীকে বুকের এক পাশে রেখে ওপাশে অনুভব করছি বাবা মাকে ,ভাবছি বাবা মায়ের কথা,সেই সাথে আঠারো বছর ধরে পাওয়া আরো দুজন বাবা, মায়ের কথা,আমার স্ত্রীর বাবা আর মা।যাদের কোন দিন সুস্থ্য দেখিইনি ।

আমার মা, অবশ্য আমার জন্মের পর থেকেই অসুস্থ্য। মা,কাবু হয়েছেন ১৯৮৭ সালে, বিদ্যুৎ শকে।মৃত্যুর দুয়ার থেকে আল্লাহ কিভাবে ফিরিয়েছিলেন, অবিশ্বাস্য। ব্যাথা বেদনা নিয়ে চলছেন আজো। ফোন করলে,যখন মা কাঁপা স্বরে কুঁকিয়ে" কি রে বাবা কি খবর" বলেন,দুচোখ জলে ভিজে উঠে।

আমার মা নামাজের বিছানায় বসলে তার কাপড়ের আঁচল থেকে কি সুন্দর ঘ্রান আসে আজো।কি মোলায়েম মায়ের পরশ। ইচ্ছে ছিলো মায়ের কষ্টের চোখের জল আমি পান করে নেব,পারিনি।

সময়ের কাছে অসহায় প্রবাসী,ভ্যাগ্যের সাথে লুকুচুরি জুয়াখেলা,ক্যালেন্ডার করে বিদ্রুপ,বলে,কি আর কবে,আমি চলেছি আপন গতিতে,তুই পড়ে রইলি পিছে,পিছনে, অদ্যাবধি।

বাবা ১৯৮৮ সালে প্রথম মারাত্মক অসুখে পড়েন। গ্ল্যান্ড টিভির অপারেশনের পর, এরপর কয়েক বছর বেশ ভালো ছিলেন। দুহাজার সালের দিকে ডায়াবেটিক্স এ আক্রান্ত এখন তো মারাত্মক।তার পর হাঁটু,তার পর দুই চোখ।এখন জীবন টিকিয়ে রাখা কষ্ট বাবার।চলছেন কোন রকম।

আমি যখন কলেজে পড়তাম,বিরানব্বই সালে ঢাকা পলিটেকনিক হোস্টেলে থাকতাম, বাবা মনে হয় আমার সাথেই পড়তেন।ক্লাস মেটের মতো।চায়ের আড্ডা,মেসের খাবার,ঢাকায় আসলে বিছানায় শুয়ে যেতেন কয়েক ঘন্টা।আমি নাটক পাড়ায় বেইলী রোডে কিংবা শাজাহান পুরের বুলবুল ললিত কলায় নাট্য সংগঠনের রিহার্সেলে।

বাবা বসে মশার কামড় খেতেন জহির রায়হান ছাত্রাবাসের সামনে বাগানের বেঞ্চে। দারোয়ান নানার কাছে রেখে যেতেন চিরকুট।এক দিন বুঝবি,সবাই পড়া শেষ করে বিছানায়।তুই নাটক করছিস।কাল সকালে তোর পরীক্ষা।জীবনটা তোর।তুই আর ছোট নেই। ইচ্ছে ছিলো তোর সাথে রাতের খাবার খেয়ে রাতের শেষ ট্রেনে ফিরব।

নতুন চাকরীতে মেঘনা,সোনার গাঁয়ে পচানব্বই সালে,বাবা রান্না করে খাইয়েছিলেন। দু'হাজার সালে,আমার বিয়ে নিয়ে সেকি উৎসাহ উদ্দীপনা।এতো স্মৃতি এতো কথা, আমি বাকী জীবন লেখলেও শেষ হবেনা। বাবা,মায়ের সাথে প্রায় কথা হয়। বাবা বড় অভিমানী এখন,বড় অবুঝ।

আজ কাল ফোন রাখার শুরুতে বলে, যাক,তুইতো খবর নিস।শেষে বলে, ফোন করিস।
এই দুহাজার আঠারোর দ্বীতীয় রমজানের ইফতারের সময় ফোন দিলাম,বলল, গত রমজানে তুই ছিলি,এহতাকাফে ছিলাম,খাবারে কষ্ট হয়নি।মসজিদে ইফতার পার্টি দিয়েছি।তারাবী শেষে মাথা ঘুরিয়ে দেখমতাম, তুই মসজিদে আছিস কিনা।এক সাথে ঘরে ফিরতাম।গ্রামের মুসল্লীদের আপ্যায়ন করেছি।ঘরে ইফতার আয়োজন ছিলো।তুই নেই আনন্দ নেই, নাতীনরা পড়া শোনা করে।শহরে থাকে,ঘর খালি,আমার ছেলে,মেয়ে নাতি,নাতনি কতো, আয়ালদ।সময়ের ব্যাবধানে আমার ঘর শুন্য,বাবা ফোন করিস।খবর নিস।

চোখ বেয়ে আমার টপাটপ কয়েক ফোটা গরম জল খসে পড়ে।বুক কেঁপে উঠে।পয়তাল্লিশ পেরিয়েছি আমিও।ডায়াবেটিক থেকে শুরু করে কতো রোগের আবাস এই শরীর।আর্থিক অনটন জেঁকে বসেছে,অনিয়মিত সেলারীর কারনে।চিকিৎসা করাতে পারিনা,ব্যায়বহুল এই প্রবাসে।
সব কিছু ধরা ছোয়ার বাইরে চলে যায়,যদি নিয়মিত বেতন না পাওয়া যায়। আজ বউকে অস্থির দেখলাম মোবাইল কথপোকথনে তার মা, ভীষণ অসুস্থ্য, অন্যবারের মতো হুট করে বলতে পারিনি,ভেব না।যাও এটা ওটা করো। এই হাসপাতালে নাও,ওই ডাক্তার দেখাও।বাবা মা ভাই বোন সন্তান আত্মীয় পরিজনের কথা দেশে থাকলে যা না অনুভব হয় ,তার চেয়ে বেশি প্রবাসে থাকলে হয়.লেখার এই পর্যায়ে জানলাম ছোটভাই উদ্বিঘ্ন তার স্ত্রীকে নিয়ে ,হাসপাতালের বারান্দায় কালচে দৌড় ঝাঁপ। আজ তাকে ফোন করতে গিয়েও হাত কাঁপছে কারণ পকেট মোবাইল ,দুটোর ই স্বাস্থ্য খারা,ব্যাটে বলে সংযোগে রানের হিসাব।জীবনের ক্রিজে যেন টেকাই দায়।ভাগ্যের ঘুর্নি বলে কুপোকাত প্রবাসী,প্রবাস জীবন।সময়ের কাঁটা,আর ক্যালেন্ডার শত্রু এখন।

সিঙ্গাপুর




সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৪৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রিয়েলিটি আপনারা মাইনে নেন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩০



নরেন্দ্র মোদীকে আপনি যতই অপছন্দ করেন না কেন, তার একটা একটা প্রশংসনীয় গুণ আছে। সে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ নিতে এবং সেই অনুযায়ী নিজের অপছন্দের কাজটা করতেও পিছপা হয় না।
সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এভাবেই নাকি এখন চলে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



চাবি সহযোগে তালা খোলা অতিশয় সহজ
কিন্তু আজকাল প্রায়শই গুলিয়ে ফেলি তালগোল!
এটা নিয়ে নিত্য বাহাসে ভেঙে যায় পাখিদের পার্লামেন্ট!
অতঃপর গোপনে সেরে ফেলি সহজ বোঝাপড়া!

প্রতিদিন যে পথে আসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না।

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:২৬

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না। আর এগুলো কোন কিছুই তার বানানো না। একেকটির বয়স শত বছর থেকে কিছুর ইতিহাস হাজার বছরের ও।
যদিও সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদীর টানে, সবুজের গানে

লিখেছেন মাকার মাহিতা, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫

বয়ে চলে নদী দূর হতে দূরে,
অনন্তকালের শান্ত এক সুরে।
তার দুই কূলে রূপের মেলা,
সবুজ প্রকৃতির মিষ্টি খেলা।
হাওয়ায় দোলে ঘাস আর বন,
আকাশের সাথে মেলায় মন।
নদীর জলে আলোর ঝিলিক,
বাতাসে মেশে পাখির কিচিরমিচির।
গাছের ছায়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×