কথা হচ্ছিল একজন বুড়োকে নিয়ে। তিনি আর কেউ নন, কর্মক্ষেত্রে সফল এক ব্যক্তিত্ত্ব। তার নীতি আদর্শ নিয়ে সমালোচনা করছে কেউ। সমালোচকরা বলছে, শুরুতে তিনি পুঁজিবাদ বিরোধী হলেও এখন পুঁজিবাদের ধারক ও বাহক। তবে ভালমন্দের মধ্য দিয়েই একজন মানুষের এগিয়ে যাওয়া, তাই তাকে একেবারে অন্ধভাবে সমর্থন না করেও ভালই বললো তপতী। ভাল না বলেও উপায় কি, ওর বসকে নিয়ে অন্যরা সমালোচনা করলেও সে তো আর করতে পারে না। তপতী বললো, এমন বস খুব কমই হয়। ডায়নামিক, এখনো তরুণ। একদিন অফিসের মিটিংয়ে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন ইদানীং কালে জিরো ফিগার কার।
জিরো ফিগারের একজন বিখ্যাত মানুষ আছেন, ঠিক নাম মনে করতে পারছিল না কেউ। অনেক বছর আগের কথা সেটি। একজন বলল, নামটা ভুলে গেছি। এত বছর পর কি আর মনে থাকে।
তখন তপতীর বস বললেন, এ যুগের কথা বলছি আমি। এ যুগে কোন নায়িকার জিরো ফিগার।
কেউ বলতে পারেনি। বসই বললেন, কারিণা কাপুর।
গল্পেচ্ছলে আড্ডায় বিষয়টি জানান দিয়ে তপতী তার ষাটোর্ধ্ধ বসের তারুণ্যের প্রমাণ দিতে চেয়েছিল। তানিম বললো, তা ঠিকই। তিনি একজন স্বপ্নবাজ লোক। আর তরুণরাই কেবল পারে এসব স্বপ্ন দেখতে।
তপতী বললো, তিনি একেবারেই আপডেট। কারিণা থেকে শুরু করে জিজিটাল যুগেও এই বুড়ো লোকটি নিজেকে বেশ খাপখাইয়ে নিয়েছেন। অন্যরা এই বয়সে যা পারে না।
তানিম বললো যেমন।
তপতী এবার নতুন এক ঘটনার জানান দিল।
বছর চারেক আগের কথা। তাকে ফোন করেছে কেউ একজন। ধরতে পারেননি। পিএসকে বললেন, দেখো তো কে ফোন করেছে। কলব্যাক করো। সেই বস্ এখন নিজেই নিজের ইমেইল চেক করেন। ফেসবুকে থাকেন। জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেন। একেবারেই বদলে গেলেন তিনি।
পাশে বসে তপতীর কথা শুনছিলো শুকা। তপতীর এরকম একজন বসের কথা শুনে তার ঈর্ষা হচ্ছিল। শুকারও একজন বস আছেন। কিন্তুু ভদ্রলোক কেমন জানি। অফিসের মেয়েদের দিকে চোখ তুলেও তাকান না। আড্ডাতো দূরের কথা।
তপতী আরো বললো, আলাপ করলে মনে হবে আমার বস এখনো সাতাশ বছরেই আছেন। এই সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেন তিনি। আমাদেরও তার স্বপ্নের মিছিলে এগিয়ে নিচ্ছেন।
শুল্কা মনে মনে ভাবলো এমন একজনকেই তো দরকার। যাকে দিয়ে ঘুণেধরা সমাজটাকে বদলানো যায়। কিন্তুু একার পক্ষে কি আর সব বদলে দেয়া সম্ভব? তবু কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। সে কাজটি যদি শুরু করা যায়। শুকা তপতীর কথার দিকে আরো বেশি মনোযোগি হয়।
তপতী বলতে থাকে, দেশের জন্য আমার বস সবসময়ই ভাবেন। ভালো কিছু করার কথা ভাবেন। আমাদেরকেও অনুপ্রাণিত করেন। বস প্রায়ই বলেন, বায়ান্ন, একাত্তর হয়েছে শুধু তরুনদের জন্যই। তরুণরাই পারে আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে দেশকে কিছু দিতে।
তানিমের বাসার ড্রয়িং রুমে বসে এমন আড্ডা প্রায়ই হয়। আড্ডার রসদ যোগাতে নানা টিপসও থাকে। সঙ্গে আদা দিয়ে তৈরি লাল চা। তানিমের স্ত্রী, মানে ঝর্ণা পারিবারিক বন্ধুদের খাবারের রসদ যোগায়। কখন চা হবে, কখন হালকা নাস্তা, সব সময় মত ড্রয়িং রুমে চলে আসে। ফাঁকে ফাঁকে ও এসে হাজিরা দিয়ে যায়। আর ঈষৎ টিপ্পটি কেটে যায়।
এবারে চা নিয়ে এসে ঝর্ণা তপতীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে তোমার বসের এতই যখন সুনাম, তাকে বলো না রাজনীতি করতে। উনি নাকি রাজনীতিকদের গালমন্দ দিতে পছন্দ করেন।
- এটি অনেকেই বলে। কিন্তুু আমরা দেখেছি রাজনীতিকদের উনি শ্রদ্ধা করেন। তবে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে তিনি লেখালেখি করছেন।
ঝর্ণা ভেতরে চলে যায়। আলাপ বেশ জমে। দুপুরের খাওয়ার পর সোফায় বসে এরকম অলস আড্ডার আয়োজনের জন্য তানিমকে ধন্যবাদ জানায় হারুন। তবে একজনকে নিয়ে এতক্ষণ আলোচনা করার পক্ষপাতি নয় সে। বলে, তোমরা অন্য আলাপ করো।
হারুনের আছে কবিতার ঝুড়ি। কবে কোন কবির কোন কবিতা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সেটি হয়তো কবি নিজেই ভুলে গেছেন। কিন্তুু সেখান থেকেই এক স্তবক কবিকে মনে করিয়ে দিয়ে প্রায়ই চমকে দেয় হারুন। তাই তাকে দেখলে সবাই কবিতা শুনতে চায়। কবিতার সঙ্গে রোমান্টিকতার একটি মিল আছে। বয়স পঁয়ত্রিশ পেরুলেও এখনো ঘর সংসার হয়নি। তবে কাব্যপ্রেমিক। বন্ধুরা প্রায়ই বলে, কবিতা নিয়েই তুই থাক। আর কিছু লাগবে না তোর।
তপতী বলে, ভাইয়ার কি মন খারাপ। গম্ভীর শোনা যাচ্ছে আপনাকে।
হারুনের মন খারাপ কথাটা বলা যাবে না। তবে মন ভালো সেটিও নয়। বাসা খুঁজতে হবে তাকে। সকালেও ঘন্টা দুই কযেক বাড়িঅলার দরজায় কড়া নাড়িয়েছে। সবাই না করে দিয়েছে। ব্যাচেলরদের ভাড়া দেবে না। তাহলে কি দুই হাজার টাকা বেশি দিয়ে পুরনো বাসায়ই থাকতে হবে?
সকালের ঘটনা। বাড়িঅলা বার্তা পাঠিযেছে। বাসা ছেড়ে দিতে হবে। জিজ্ঞেস করেছিল, কারণ কী। কৈফিয়ত দিতে বাড়িঅলা পছন্দ করেন না। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের সাবেক কেরানী। ছয়তলা বাড়ি করতে অনেক খরচ হয়েছে। হারুন সাহস নিয়ে বললো, আমি তো কোন অন্যায় করিনি।
- অন্যায় করেছেন তো বলিনি।
- অন্য কোন কথা থাকলে বলেন।
- দেখেন মহল্লার বাড়িঅলারা আপত্তি দিয়েছে।
- কি জন্য?
- আমিই নাকি ব্যাচেলর ভাড়া দিই। আবার আমার বাড়ির ভাড়াও কম।
- আমার অন্য ভাড়াটেদের তো কোন ডিস্টার্ব হচ্ছে না।
- ভাই এত পঁ্যাঁচাল করতে পারবো না। থাকতে হলে আগামী মাস থেকে দুই হাজার টাকা বেশি দিতে হবে।
বাড়িঅলার একথা শুনে কোন উত্তর দেয়নি হারুন। তখুনি মনে হয়েছিল কাউকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে বিয়ে করে ফেলতে। কিন্তুু তা কি করে হয়? অগত্যা আশপাশের কয়েকটি টু লেট দেখে নতুন বাসা নেয়ার চেষ্টা করেছিল। লাভ হয়নি।
রাতে বাসায় গেলে বাড়িঅলা আবারো আসবে। জানতে চাইবে, কি সিদ্ধান্ত নিলেন। বাসা ছাড়বেন, নাকি দুই হাজার টাকা বেশি দেবেন?
ভেতরের অবস্থা চাপা রেখে তপতীর প্রশ্নের উত্তরে হারুন বললো, এই তো তোমাদের কথা শুনছি। নতুন কিছু বলো।
শুকা বললো, ভাইয়া আপনি বরং একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।
অন্যান্য সময় হারুন কবিতা আবৃত্তি করে। গানের লাইন ধরে। আড্ডাকে প্রাণবন্ত করতে পারে সে। আজ সে রকম মুড নেই। তবু সবার মুখের দিকে একবার তাকায়। অনিন্দ্য বলে, তুমি ঐ গানটা গাও না.. ও রে আমার হাসের ছা ও রে।
অনিন্দ্যের এমন প্রস্তাবে সবাই হো হো করে হেসে উঠে। তানিম বলে, ও একটি বিরহের গান দিয়েই শুরু করুক।
তপতী বললো, বিরহ কেন হারুন ভাই। ছ্যাঁকা খেয়েছেন বুঝি।
- আরে না, অনিন্দ্য ভাইয়ের জন্যই তো আমি পারলাম না।
- কেন, তিনি কি করেছেন?
- আমি এগুতে চেয়েছিলাম, তিনি পথের কাঁটা হয়েছিলেন।
অনিন্দ্য বলে, না হারুন। তোমাকেই তো আমি ছেড়ে দিয়েছি।
তপতী বলে, তাই বুঝি। মেয়েটি তাহলে কে?
সে এখন গত। তার আলোচনা এখন থাকুক। হারুন প্রসঙ্গ উল্টাতে গিয়ে বলে, গান নয়, শিল্পীর বাড়ি খোঁজা নিয়ে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি।
সবাই সায় দিল। হারুন শুরু করলো।
এক অনুষ্ঠানে গান গাইবার আমন্ত্রণ নিয়ে বি সি সিদ্দিকির বাসায় যেতে হবে। রাতে ফোন করতেই বললো, কাল সকালে চলে আসুন। কিন্তুু বাড়ির ঠিকানা বললো না। বললো, ধানমন্ডি সাতাশ নম্বরে এসে আমাকে ফোন করুন। তখন ঠিকানা বলে দেব। সকালে তিনি আর ফোন ধরেন না। শতাধিকবার ফোন করার পরও নহে। এখন কি করি। বিভিন্ন বাড়ির গেটে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকি, ভাই এখানে কি কোন শিল্পী থাকে। এরকম খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে পেলাম ঋতা হকের বাসা। জানতে চাইলাম বিসি সিদ্দিকির বাসার ঠিকানা। বলতে পারলো না। তবে চা না খাইয়ে ছাড়বে না। আমার মত একজন আবৃত্তিকারকে পেয়ে তিনি যেন ধন্য হয়ে গেলেন। এভাবে দুই ঘন্টার বেশি সময় ধরে খুঁজেছি আর মোবাইল ফোনে কল দিয়েছি। দুপুরে বারোটার সময় তার স্ত্রী ফোন রিসিভ করলো। বললাম, ভাবী আমি টাকা নিয়ে এসেছি। ভাই কোথায়।
- একটু ধরুন, দিচ্ছি।
টাকার কথা শুনে মনে হয় দ্রুতই কাজ হলো। বিসি সিদ্দিকি এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলেন। বাড়ির ঠিকানা দিয়ে বললেন, তাড়াতাড়ি আসুন। আমি তো তাড়াতাড়িই আসতে চাই বলে লাইনটা কেটে দিলাম।
বাড়ি খোঁজার প্রসঙ্গ উঠতেই তপতী কিছু বলতে চাইছে। তবে শিল্পীর নয়, তার নিজের জন্য বাসা খোঁজার ঝক্কিঝামেলার কথা। তপতী বললো, ভাল প্রসঙ্গ টেনেছেন। আমি তো বাসা খুঁজে পাচিছ না হারুন ভাই। আমাকে একটা বাসা খুঁজে দেন না।
হারুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার বাড়ি খোঁজার কাহিনী বললো। তপতীরও একই সমস্যা। ব্যাচেলর মেয়েদের এই শহরে বাসা ভাড়া দেবে কে? তপতী বললো, বাড়িঅলারা এখনো মেয়েদের মেয়ে হিসাবেই দেখছে।
শুকা টিপ্পনি কেটে বললো, তোমার বস যদিকে বলো না এই শহরের বাড়িঅলাদের মানসিকতার বদল ঘটাতে। অথবা এর একটি সমাধান দিতে।
তপতীর কথা শুনে সামান্য হাসির রেশ বয়ে গেল সবার মধ্যে। তানিম বললো- আমরা হাসলেও বিষয়টি সিরিয়াস।
শুল্কা বললো, আমি সে কারণেই তো বলছি। তপতীর বস যদি এদের জন্য কিছু উদ্যোগ নিত।
হারুন বললো, সমাধান একটাই।
- কি হারুন ভাই।
- ঢাকা শহরে ব্যাচেলর্স হোম চাই।
তপতীও তাতে সায় দিল।
হারুন কবিতা শুরু করলো:
‘কেউ যখন আসেনি যৌবনে,
জীবন সায়াহ্নে ব্যাচেলর্স হোমে
যদি দেখা পাই কারো,
নিজেরাই নিজেদের বেছে নেব। ’
##

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


