somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উঠানিপাড়ায় ফুল পাখিরাও হেসে ওঠে

২৪ শে এপ্রিল, ২০১২ রাত ১:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাঁটা পথ। হাত তিনেক চওড়া রাস্তাটির মাঝখানটাই শুধু সাদা। মানুষের পদাঘাতে সাদা হয়ে গেছে। পাশে বিজন ঘাস। আমি তাকিয়ে দেখি আর হাঁটি। সে ঘাস যেন আমার দিকে চেয়ে আছে নরম-বিমর্ষ চোখে। ঘাসফড়িং নেই, সেকারণেই কী। তাকিয়ে দেখি গাছের দিকে। পাতাগুলো যেন কান্ত। সবুজ ক্ষয়ে পড়ছে। কাকেরা মগডালে ডাকছে।
হঠাৎ মর্টারের আওয়াজে কান বন্ধ হয়ে আসে। চোখে ভাসে পাখিদের ওড়াঔড়ি। কখন যে ছিঁটকে পড়ে গেছি রাস্তার ঢালে, টের পাইনি কিছুই। শুধু গলা উঁচু করে দেখেছি মানুষের দৌড়াদৌড়ি। কে কার আগে, পাটক্ষেতে লুকাবে। মনে হলো জীবনটা এখানেই শেষ। মুহূর্তেই ঘিরে ধরবে পাঞ্জাবিরা। নতুবা একটি গুলি এসে ঝাঁঝরা করে দেবে বুকটা। আমার যাওয়া হবে না তাহলে? আর কিছু দূর গেলেই তো সড়কে গাড়ি ধরে চলে যেতে পারতাম গন্তব্যে, মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ শিবিরে।
আমি না হয় শেষ হয়ে যাব। বাকিদের কি হবে। হায় পাখি, একি কাহিনী। অসীম আকাশে যাচ্ছে না কেন চলে। বাংলার সীমানা ছেড়ে যাও, পালাও।
তোমরা পালাবে না? আমার চেয়েও কি তোমরা বেশি অসহায়। জানি, শত বিপদেও তোমরা দুরে সরে যাবে না। কালিদহে চাঁদ সওদাগর পড়েছিল ঝড়ের কবলে, মনে কি পড়ে? পল্লীকবি লিখেছিলেন হায় পাখি একদিন। ‘সেদিনে অসংখ্য পাখি উড়েছিল কালো বাতাসের গায়’।
আজ বারুদের গন্ধমাখা কালো ধোঁয়া, বিস্তার ঘটাচ্ছে, একই। জানি তোমরা যাবে না। এই ভূখন্ডকে তোমরা বেশি ভালবাসো। যেমন ভালবাসি আমিও।
আমার পিতামহ ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। তার নাম অনেকেই জানে না। সেদিন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিকসহ নাম না জানা অনেকের বুকের রক্ত নিয়ে গেছে তাজা বুলেট। আমার পিতামহ সেই নাম নাজানাদের দলে। পিতামহের প্রিয় ছাত্রদের সঙ্গে তিনিও চিরতরে চলে গেলেন এই বাংলাকে ভালবেসে। বাবা বলেছিলেন, শহীদের নাম বেচে বাহ্বা নেয়ার দরকার নেই। তাই আজো মুখ খুলিনি। এখনো বলবো না পিতামহের কথা। তার নামটা আজো উহ্য রাখলাম। তার কাছে আমি ঋণী। রক্ত দিয়ে তিনি রেখে গেছেন বাংলার মান। তাই আমি বাংলায় বলি- ভালবাসি।
চারদিকে নিরবতা, কোথাও ঠুনঠান শব্দ নেই। সোজা হয়ে চারদিকে তাকাই। না, কেউ নেই। আমাকেও ধরতে আসেনি কেউ। আমি রাস্তায় উঠে দাঁড়াই। মনে হচ্ছে খুব বেশি দূরে নয় শত্রুর অবস্থান। পাড়ামহল্লার লোকেরা সবাই যে যেখানে পেরেছে লুকিয়েছে। আমিও কি নিজেকে লুকাবো? মনে সাহস আছে, প্রশিক্ষণ নেই। অস্ত্রও নেই হাতে। খালিহাতে যুদ্ধ করা যায় না। বরং নিজেকে আগে নিরাপদ রাখতে হবে। তাই দ্রুতপায়ে এগিয়ে যাই।
সড়কে পৌঁছার পর দেখি কোন গাড়ি নেই। লোকজনও নেই। বড্ড একাকী লাগে। তেমুহনীর দোকান দুটিও বন্ধ হয়ে গেছে। কারন কী? পাশের বাজারে আগুন লাগিয়েছে পাক বাহিনীরা। গুলি,মর্টারসেল নিক্ষেপ করেছে। কতজনের লাশ পড়েছে সেটি এখনো জানা যায়নি। পালিয়ে যাওয়া লোকগুলো এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
চারদিকের নিরবতায় ভয় পেয়ে যাওয়ারই কথা। তবু মনে সাহস রেখে ভাবলাম এখান থেকে দ্রুত কেটে পড়তে হবে। এ সময় কোন গাড়ি পাওয়া যাবে না। হেঁটে এতদূর পথ যাওয়াও সম্ভব নয়। বাড়ি ফিরে যাব? না, সে আর সম্ভব নয়। এতকিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎ গাড়ির আওয়াজ পেলাম। একই সঙ্গে গুলির আওয়াজও। বুঝলাম শত্রুরা আশপাশেই আছে। কিন্তুু মুক্তি সদস্য কেউ কি নেই? দ্বিতীয় গুলির শব্দ শোনার পর চারদিক তাকিয়ে মনে হল খুবই অসহায় আমি। এই মুহূর্তে পাক আর্মির সামনে পড়লে আর রক্ষা নেই। কোন কিছু না ভেবেই আমগাছের ডালে উঠে বসলাম। ওপর থেকে চারদিক লক্ষ্য করা যাবে। তারপর মুহূর্ত কয়েক, সত্যি বেঁচে গেলাম। পাক আর্মির দুটি টহল জিপ সোজা চলে গেল। তারমানে আরো গাড়ি আছে। এখন কি করবো? নেমে পড়বো, নাকি বসে থাকবো। পালিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। মানুষজন নেই কোথাও। আরো ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলাম। আর কোন গুলির আওয়াজ নেই। গাড়ির আওয়াজও নেই। তবু সাবধানে নেমে গেলাম। ক্ষেতের আইল দিয়ে, কখনো রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ে আড়াল হতে পারবো এমনটি খেয়াল করে হাটতে থাকি। এভাবে আধাঘন্টা হাঁটার পর বুঝতে পারি সম্ভাব্য বিপদ কেটে গেছে। লোকজন রাস্তায় বেরুতে শুরু করেছে।
জানতে পারি আমাদের পাশেই ইলিশপুরে মুক্তিবাহিনী অপারেশনে গিয়েছে। সেখানে পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে মারা গেছে কয়েকজন। পাকবাহিনীর দুটি গাড়িতে করে কয়েকজন সদস্য পালিয়ে গেছে। বাকীরা ধরা পড়েছে। মুক্তি সদস্যরাও মারা যেতে পারে। তবে কেউ নিশ্চিত কিছু বলতে পারছে না। কথা হয় ইব্রাহিমের সঙ্গে। নিজেকে মুক্তিফৌজের সদস্য দাবি করে বললেন, ইলিশপুরের অপারেশন সাকসেস।
বললাম, আমি ঘর থেকে বেরিয়েছি যুদ্ধে যাব বলে। ট্রেনিং নিতে মুক্তিক্যাম্পে যাচ্ছি।
আমার দিকে তাকিয়ে কাঁধে তার হাত রাখলো। বললো- এরকম জওয়ানইতো দরকার। বাবামার অনুমতি আছে তো?
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই। বলি না যে, বাবাই আমার প্রেরণা। দাদা আমার সামনে উদাহরণ। ঢাকা ছেড়ে এসেছি কিন্তুু বাবাকে আনতে পারিনি। জানি না বেঁচে আছেন কি না? কিংবা কোথায় যুদ্ধ করছেন। বাবা তো প্রথম ব্যাচেই প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন ওপারে।
আন্দাজ করি ইব্রাহিম বয়সে আমার সমসাময়িক কিংবা দুএক বছরের বড় হতে পারে। তবে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য এই মুহূর্তে তার সাহায্য দরকার। কথাটা বলতেই ইব্রাহিম বলল, আমিও সেখানেই যাচ্ছি। কিন্তুু ট্রেনিং নিতে হলে যেতে হবে বলগা স্কুল কেন্দ্রে। সেখানে নতুন একজন কমান্ডার এসেছে।
- বলগা স্কুলতো আমি চিনি না।
- ক্যাম্পে গেলে সবাই চিনিয়ে দেবে। ক্যাম্প থেকে লোকজন নিয়মিত সেখানে যাচ্ছে আর আসছে।
ক্যাম্পে যাওয়ার পর দেখি সমবয়েসী অনেকেই আছে। তেজোদীপ্ত সবাই, লক্ষ্য বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। আমার মত আরো দু’জনকে পেলাম। যারা ট্রেনিং নিতে এসেছে। সানা উল্যা আর জাহাঙ্গীর ওদের নাম। আমাদের তিনজনকে বলগা স্কুল কেন্দ্রে পৌঁছে দিল দশ বছরের বিপ্লব।
বিপ্লবকে বললাম, তোমার ভয় লাগে না?
- কি যে বলেন। ভয় লাগবো কেন?
- যদি তোমাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়?
- সেটা পারবে না। আমি ওদের চেয়ে অনেক চালাক। আজমল রাজাকারকে তো আমিই ধরিয়ে দিয়েছি।
- কিভাবে?
- সম্পর্কে সে আমার চাচা। একদিন আমাকে বললো, তুই কোন মুক্তিফৌজের খবর পেলে আমাকে বলিস। আমি বললাম, আচ্ছা। কিন্তুু আপনি মুক্তিফৌজ দিয়ে কি করবেন?
তিনি বললেন, ওদের খবর আর্মিকে দিতে হবে। ওরা দেশে গন্ডগোল লাগিয়েছে। আমি তখুনি বুঝলাম, চাচা রাজাকারের খাতায় নাম লিখিয়েছে। বিষয়টি ক্যাম্পে এসে জানালে কমান্ডারের লোকেরা তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়।
সানাউল্ল্যাহ বলে, বদমাইশ লোকটা গ্রামের অনেকের ক্ষতি করেছে। জলিল মাস্টার তার কাছে টাকা পেত। সেই টাকা চাইতে গেলে কৌশলে জলিল মাষ্টারকে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তারপর মাস্টার আর ফিরে আসেনি।
গন্তব্যে পৌঁছার পর দেখি টিনশেড স্কুলঘরের পেছনে প্যারেড হচ্ছে। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে জওয়ানরা। সবার বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। জনাবিশেক হবে সব মিলিয়ে। ক্যাম্প থেকে মুক্তিবাহিনীর এক সদস্য আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে। কমান্ডারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে তিনি আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন নাকি আমার হাত শক্ত কি না পরীক্ষা করলেন বুঝতে পারলাম না। বললেন- মৃত্যুর জন্য তৈরি আছো তো?
ততক্ষণে অন্য প্রশিক্ষণার্থীরা আরাম করে বসেছে। শেষ বিকেলের বুলেটিন শুনছে বেতারে। ঢাকায় পাক বাহিনী এখনো নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। আমার মন কাঁদলো বাবার জন্য, মায়ের জন্য। তবু স্বাভাবিক হয়ে বললাম, দেশের জন্য মরতে আমি রাজি।
- কি নাম?
- খোকা।
- নিশ্চয়ই বাবামা আদর করে এ নামে ডাকে।
- জ্বি।
- যাও, লাইনে দঁড়াও।
কমান্ডারের আদেশ। বীরদর্পে লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রশিক্ষণ নিয়েই আমাকে যেতে হবে যুদ্ধে। একটি গ্রুপ ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করেছে। ওদেরকে অপারেশনে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে বললেন কমান্ডার।
আমার যেন আর দেরি সয় না। আবার ট্রেনিং না নিয়েও যুদ্ধ করা যায় না। তাই ধৈর্য্য ধরলাম। শুনলাম আমাদের উঠানিপাড়ায় পাকিস্তানিরা আস্তানা গেঁড়েছে। শখানেক সৈন্য আছে সেখানে। তাদের উচ্ছেদ করতে যুদ্ধ শুরু হবে। প্রায় সব প্রস্তুুতিই সম্পন্ন, এমন সময় খবর এলো উঠানিপাড়ায় আরো এক প্লাটুন সৈন্য এসে পৌঁছেছে। এ খবর শোনার পর কমান্ডার একটু থামলেন। নতুন কোন কৌশল হয়তো ঠিক করবেন তিনি এমনটিই সবাই মনে করেছিল। কিন্তুু কমান্ডার সেদিন রাতেই হঠাৎ জনাপাঁচেক সঙ্গী নিয়ে বের হয়ে গেলেন। সঙ্গে কোন অস্ত্র নিলেন না।
ইব্রাহিমের যোগাযোগ আগে থেকেই এখানে। তাই ওকে বললাম, ঘটনা তো বুঝছি না। কি হতে যাচ্ছে। ইব্রাহিম বলল, বড় ধরণের কোন যুদ্ধের প্রস্তুুতি নিতে হবে আমাদের। উঠানিপাড়ার স্কুলঘরে, বোর্ড অফিসে পাকিস্তানি সেনা সংখ্যা বাড়াচ্ছে। হয়তো তারা বলগা স্কুলের মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কথা জেনে গেছে।
ইব্রাহিমের কথা শুনে কিছুটা ভড়কে গেলাম। কোথায় আমরা তাদের ওপর হামলা করবো, আর এখন তারাই হামলার প্রস্তুুতি নিচ্ছে? গভীর রাতে কমান্ডার ফিরে এসে সবাইকে নির্দেশ দিল ক্যাম্প গুটিয়ে নিতে হবে। আপাতত, সবার গন্তব্য বলগা স্কুল থেকে আধামাইল দুরের পৃথক দুটি বাড়ি। বাড়ি দুটির মাঝখানেই বলগা স্কুলের অবস্থান। ঐ বাড়ি দুটি থেকে লোকজনকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু মুক্তি সদস্যরাই থাকবে সেখানে। আর বলগা স্কুলে থাকবে দু’তিনজন। যারা সম্ভাব্য হামলার শিকার হলে বাংকারে অবস্থান করবে।
নির্দেশমত সবাই তৈরি হয়ে যারযার মত চলে গেল। কৌশলটাও সবাই বুঝে গেল। বলগা স্কুলে পাকিস্তানিরা হামলা করতে এলে দু’পাশ থেকে পাল্টা হামলা চালানো হবে। আর যদি দু’একদিনের মধ্যে হামলা না হয়, তাহলে উঠানিপাড়ায় পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সেজন্য আলাদা মুক্তিফৌজ চেয়ে খবর পাঠিয়েছেন কমান্ডার।
এ সময়ে আমাদের প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা নষ্ট হলেও মোটামুটি বন্দুক চালনা রপ্ত করতে পেরেছিলাম সবাই। আমাদের কমান্ডারের আন্দাজ ঠিকই ছিল। পরদিন রাতে পাকবাহিনী বলগা স্কুলে অভিযান চালাল। তারা যখন গুলি করতে করতে এগুচ্ছিল, তখুনি আমাদের দুটি টিম প্রস্তুতি নিয়ে এগুতে লাগলো। তাদেরকে প্রতিবাদ জানাতে আমাদের যে দু’তিনজন স্কুলে ছিল, তারা কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়লে পাক বাহিনী আরো বেশি করে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে তারা মর্টারসেল নিক্ষেপ করতে থাকলো। তারা যখন বলগা স্বুলে ঢুকে পড়লো, ততক্ষণে দেখতে পেল কেউ নেই। অস্ত্রবিরতিতে গেল তারা। এমন সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও শুরু হল। মিনিট পাঁচেকের ব্যাপার মাত্র। ততক্ষণে আমাদের দুটি দলই পৌঁছে গেছে স্কুলের একেবারে কাছাকাছি। গাছের আড়ালে সবাই অবস্থান নিয়ে নিল। কমান্ডারের সিগনাল আসামাত্রই সবাই অতর্কিতে হামলে পড়লো পাকবাহিনীর ওপর। অনবরত গুলিবর্ষনে পাকবাহিনীও পাল্টা প্রতিরোধের চেষ্টা করলো। তাতে কাজ হয়নি। আমাদের একশ’ মুক্তিযোদ্ধার কাছে তাদের হার হলো। নিহত হলো পয়তাল্লিশজন পাকিস্তানি সৈন্য। পাঁচজন আত্মসমর্পণ করলো। মু্িক্তযোদ্ধাদের মধ্যে কয়েকজন গুলি খেলেন। আমাদের কমান্ডার সদরুজ্জামান বিজয়ের হাসি হাসলেন। আমরা সবাই সমস্বরে বললাম, জয়বাংলা।
প্রাথমিক বিজয়ের পর উঠানিপাড়া মুক্ত করার অঙ্গীকার করলেন সবাই। দেরি না করে দ্রুত উঠানিপাড়ায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে হামলা করতে হবে। কমান্ডার সবাইকে বললেন, কাল রাতেই আমরা উঠানিপাড়ায় যাচ্ছি।
আমি বললাম, আমাদের রসদ ঠিক আছে তো?
কমান্ডার আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, কি খোকা, যুদ্ধ কেমন দেখেছো?
পাল্টা প্রশ্ন করায় বুঝলাম কমান্ডারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুুতি ঠিকই আছে। বললাম, যুদ্ধ এখনো বাকি। শেষ করেই না হয় বলি।
আমার কথায় আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠে। কাঁধে হাত রেখে বলে, জয় আমাদের হবেই।
সকালে খবর এলো, উঠানিপাড়ায় যে কয়জন পাকিস্তানি সৈন্য ছিল তারা সেখান থেকে চলে গেছে। পাকিস্তানিরা ভয় পেয়েছে, ইব্রাহিম আমাকে জানালো। তবু কমান্ডারের নির্দেশ, রাতে উঠানিপাড়ায় আমাদের একটি গ্রুপ যাবে। সঙ্গে থাকবেন তিনিও।
সন্দেহ করলাম কমান্ডার বুঝি খবরের সত্যতা নিয়ে একশ’ ভাগ নিশ্চিত নন। তাই অস্ত্রসমেত আমরা বিশজনের একটি দল গেলাম সেখানে। আমাদের আগেই রাস্তায় জনতার উল্লাস দেখে মনে হল সত্যিই পাকিস্তানিরা এলাকা ছেড়েছে। আমাদেরকে পেয়ে সাধারণ মানুষ আরো উল্লসিত হলো। সবাই শ্লোগান দিতে লাগলো, জয় বাংলার জয়। মানুষের এত আনন্দ আমি আগে আর দেখিনি। মুক্তির স্বাদ মানুষকে এত আনন্দ দেয়, বুঝতে পারিনি। সে কারণেই বুঝি বাবাও যুদ্ধে গেছেন। পিতামহ পরের ভাষায় কথা বলা থেকে মুক্তি পেতেই লড়েছেন ভাষা সংগ্রামে। বুকটা গর্বে ভরে যায়। মানুষের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিও যেন আনন্দিত হয়। ফুল, পাখিরাও যেন ফিরে পায় তাদের অভয়ারণ্য।
রেডি, মার্চ। আমরা কমান্ডারের পিছু পিছু ছুটলাম। যেতে হবে অন্য কোন খানে, লড়তে হবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, নতুন কোন যুদ্ধে।

#
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×