ড. আহমেদের ফোন রিসিভ করতেই বললেন, রফিক ভাইয়ের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার ছেলেকে নিয়ে কোথায় যে গেছে, কেউ জানে না।
এমন খবর পেয়ে যে কেউই উদ্বিগ্ন হবেন, এমনটি স্বাভাবিক। কিন্তুু সুলতান মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। সে রফিক ভাইকে যেমনটি জানে, তাতে ধরেই নিয়েছে যে কোথাও গিয়ে হয়তো মোবাইল ফোন বন্ধ করে ঘুমুচ্ছে। উদাসীন লোক এরচেয়ে আর বেশি কিছু কি করতে পারে। তবু আহমেদের কন্ঠে কিছুটা উদ্বেগ বুঝতে পারে সে। বলে, অফিসে ফোন করেছেন?
- হ্যাঁ, কিন্তুু অফিসেও যাচ্ছেন না কয়েকদিন ধরে। চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন হয়তো।
- হতে পারে। সুলতানের মুখে এমন সাদামাটা উত্তর শুনে প্রীত নন তিনি। সুলতানও সেটি বুঝছে। কিন্তুু আহমেদ যে কিছু একটা লুকোচ্ছে, কিংবা এর পেছনেও কোন রহস্য লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না সুলতানের। তাই তার সাদামাটা জবাব শুনে বেশি কিছু না বলেই ফোন রেখে দিল আহমেদ। বিকেলে আবার ফোন করলো। জানালো যে, রফিক ভাই ভাবিকে ডিভোর্স দিয়েছে।
- ডিভোর্স? সকালে আহমেদের ফোনে যে রহস্য লুকিয়ে ছিল তা স্পষ্ট হয় তার কাছে। এমন কিছু না ঘটলে আহমেদের এত উৎকণ্ঠা কেন? নাকি আহমেদের সঙ্গে সম্পর্কের কোন বিষয়ে সন্দেহপোষণ করেই এমনটি হয়েছে? বুঝে উঠতে পারে না। জিজ্ঞেস করে কেন?
- বলা নেই, কওয়া নেই- হঠাৎ করেই ভাবিকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর বাসায় তালা।
- ভাবি কোথায় ছিল?
- ভাবি বাইরে গিয়েছিল। বাসায় ফিরে দেখে তালা।
- তারপর..
- মোবাইল ফোন বন্ধ। অগত্যা তার এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছে। পরদিন ডাক মারফত ওটি পেয়েছে।
কারো সংসার ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি সত্যি কষ্টকর। দীর্ঘদিনের বন্ধন ছিঁড়ে গেলে তা ক্ষত বাড়িয়ে তোলে। সুলতানের সন্দেহ হয় আহমেদকে। আহমেদ কি একাজে প্ররোচিত করেছেন? বাচ্চাটা কার কাছে আছে? তার কি হবে?
আহমেদ বললেন, রফিক ভাইর কাছে। ভাবি চাচ্ছে ছেলেটা তার কাছে থাকুক। কারণ, ছেলেটাকে ছাড়াতো ভাবি বাঁচতে পারবে না।
- এখন কি করা,
- ভাবি থানায় এজাহার করেছে।
পারলে পুলিশে ফোন করার জন্য সুলতানকে অনুরোধ জানালো আহমেদ। সুলতান কারো পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলাতে অপ্রস্তুুত। প্রয়োজনে ঝগড়াবিবাদ মিটিয়ে দিতে পারলে ভাল। আহমেদকে সেরকমই পরামর্শ দিল। কিন্তুু খারাপও লাগলো। রফিক ভাইর জন্য সুলতানের সত্যি কষ্ট লাগলো। লোকটিকে যতটুকু জেনেছে ততটুকুতে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সে। তবুও, এরকম বিপর্যয় কারো জীবনে আসুক, এমনটি কাম্য হতে পারে না। দীর্ঘদিনের পরিচয় রফিক ভাইয়ের সঙ্গে তার। দেখা হলেই দুজনের নানা বিষয়ে আলাপ হতো। তার বন্ধুরাও স্বস্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তুু তিনি জানি কেমন, অ™ভুত প্রকৃতির। কোন এক থানার নির্বাহী কর্মকর্তাও ছিলেন। ডিসি সাহেব তার কাছে মাছ চেয়ে পাঠাতেন। কিন্তুু থানার পুকুরগুলো সব ইজারা দেয়া। তাই তিনি মাছ দেবেন কোথা থেকে? এ নিয়ে ডিসির সঙ্গেও তার ভাল দিন কাটেনি।
কর্মকমিশনে থাকার সময় মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন তা আাঁচ করতে পেরেছিল সুলতান। প্রায়ই তিনি সুলতানকে বলতেন, চাকরিটা ছেড়ে দেব। এমন গোলামির চাকরি করে লাভ কি? সৃজনশীলতা নেই। আরো বলতেন, এদেশে ভাল মানুষটিই আজ পাগল। কারণ, ভাল মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ মানুষ লোভ, হিংসার বশবর্তী হয়ে পাগলের মত কেবল পাওয়ার জন্য ছুটে চলেছে। এই সমাজে তাই যারা ভাল আছে তাদের কথাই বরং বেমানান। তাদেরকেই লোকেরা পাগল বলছে। আরেকদিন বললেন, আমার যেন কি হয়েছে। রাতে শোয়ার আগে বারবার চেক করতে হয় ছিটকিনিটা দিয়েছি কি না।
এমন লোককে নিয়ে কোন সারসিদ্ধান্তে আসা যায় না। সুলতানও বুঝতে পারেনি তাকে। তারপর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে দুজনের যোগাযোগ হয়নি। আহমেদের মাধ্যমেই পরবর্তীতে কিছু খোঁজখবর পেত সে।
ড. আহমেদ কাজ করেন একটি পিআর কোম্পানিতে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ কাজ থাকে যেগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হয়। পত্রিকা, টেলিভিশন কিংবা অন্যান্য উপায়ে তথ্য প্রচারের কাজটিই করেন তারা। আরো আছে একটি মুদ্রন কারখানা। বড় সাহেবের প্রায় ২৫ বছরের পুরনো ব্যবসা এটি। এখানে কেমন করে ড. আহমেদ যোগ দিলেন সেটি বড় কথা নয়, বরং কোন এক ব্যবসার কাজে ড. আহমেদকে দরকার ছিল বড় সাহেবের। রাশিয়ার সঙ্গে যখন ব্যবসা করতেন তিনি। ড. আহমেদ রাশিয়ায় পড়াশোনা করেছেন। তার নামের আগে ড. না দিয়ে ডা. দিলেই ভাল। কারণ, তিনি ডাক্তারি পড়েছেন। কিন্তুু ডাক্তারের ইংরেজি ডক্টর থেকেই তিনি ড. আহমেদ হয়ে গেলেন। ফর্সা ত্বক, মাঝারি গড়নের মানুষটি সদালাপী, সদাহাস্যোজ্জ্বল। একের পর এক সিগারেট টানা যেমন তার নিয়মিত অভ্যেস, তেমনি মেয়েদের সঙ্গে সখ্যতাও। সুলতান সে বিষয়টি জানে। মেয়ে বন্ধুদের নিয়ে সুলতানের সঙ্গে অকপটে আহমেদের আলাপেই একদিন জানা গিয়েছিল যে, একটি মেয়ে তাকে বেশ জ্বালাচ্ছে। সুলতানের এতে কিছুটা সন্দেহ হয়। আহমেদ জ্বলছে না, কিন্তুু তাকে জ্বালাচ্ছে! তবু আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়। আহমেদ বলেছিলেন, মেয়েটি আত্মহত্যা করতে চায়। এ পৃথিবীতে বাঁচার কোন সাধ নেই তার। এমন পরিস্থিতিতে উভয়ের পরিচিত এক মহিলার মাধ্যমেই আহমেদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। কাকতালীয়ভাবে আহমেদের এলাকাতেই থাকে সে। একটি সংস্কৃতি স্কুলের শিক্ষিকা, নাম রমা দেওয়ান। এমন নামের কেউ যে পরবর্তীতে আহমেদ ও সুলতানের ভাবি হয়ে যাবে তা কে ভেবেছে আগে। যতক্ষণ না আহমেদের কাছে পুরো ব্যাপারটি খোলাসা করে জানা গেছে।
একদিন আহমেদের অফিসে বসেই কথা হচ্ছিল দুজনের মধ্যে। সেই মেয়েটির প্রসঙ্গ এলো। আহমেদ জানতে চাইলেন রফিক ভাইয়ের কথা। সুলতান বললো- হ্যাঁ, রফিক ভাইকে তো আমি চিনি।
- কেমন করে?
- এক সময় তিনি কর্মকমিশনে চাকরি করতেন। শুনছি পরে চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন।
- ঠিক আছে। লোকটি এমনিতে কেমন? সংসার জীবন..
- জানি না। তবে লোকটি কেমন জানি, যোগাযোগ রাখে না।
- আমি যে মেয়েটির কথা বলছিলাম সেইই রফিক ভাইয়ের স্ত্রী।
ড. আহমেদের মুখে কথাটি শুনে খারাপই লাগলো সুলতানের। তার পরিচিত একজনের স্ত্রী ও সংসার নিয়ে নেতিবাচক কথা বলতে লজ্জাই লাগছিল। সেই থেকেই রমা দেওয়ান ভাবি এবং ড. আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাত ঘটলেই, ভাবির প্রসঙ্গটি আসবেই।
আহমেদ বললেন, মেয়েটি অনেক ধৈর্য্য ধরেছে। কিন্তুু রফিক ভাইর পক্ষ থেকে কোন রেসপন্স পাচ্ছে না সে।
- কি ধরণের, জানতে চাইলো সুলতান।
- ভাবি চায় রফিক ভাইকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তুু ভাই যাবে না। গোয়ার্ত্তমি করে। ভাবি সেদিন বলেছিল, অনেক চেষ্টা করে সংসারটা ধরে রেখেছে।
- এরমধ্যে ভাবির সাথে দেখা হয়েছে?
- হ্যাঁ, দেখা তো নিয়মিতই হয়। ও যখন স্কুলে যায় আমি অফিসের উদ্দেশে বের হই।
- আচ্ছা।
ভাবির রুপেরও প্রশংসা করেন আহমেদ। নিজেরও করেন। বলেন, মেয়েরা কেন জানি আমাকে পছন্দ করে বুঝি না।
ড. আহমেদের একথা শুনে ঈষৎ হাসলো সুলতান। আহমেদের একটি ছেলে মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছে। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। তবু মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা থামেনি। আহমেদ অবশ্য দাবি করেন, আমি শুধু কথাই বলি। কাউন্সেলিং করি, আর কিছুই নয়।
ভাবি প্রায়ই আহমেদের অফিসে আসতো। নানা কিছু গিফট দিত। স্বামীর বিরুদ্ধে নানা কথা বলতো।
ভাবির জন্য আহমেদের এই দরদ তার পরিবারেও কিছুদিনের জন্য অশান্তি ডেকে এনেছিল। আহমেদের বউ কয়েকদিন কথাও বলেনি তার সঙ্গে। কে বা কারা টেলিফোনে আহমেদের স্ত্রীকে ঘটনাটা বলে দিয়েছে। বহু কষ্টে আহমেদ বউকে বুঝিয়েছে যে তার সঙ্গে কোন মেয়ের এমন কোন সম্পর্ক নেই যা স্বামী-স্ত্রীর কমিটমেন্টের জায়গায় আঘাত করে। যদিও কথায় কথায় একদিন আহমেদ বলেছিলেন, ভাবির বাসায় গিয়ে তিনি চা খেয়েছেন। এক পর্যায়ে ভাবিকে কোলে তুলে দুই দণ্ড ঘুরিয়েছেন। তাতে ভাবি খুব আনন্দই পেয়েছিল। সুলতান বলেছিল, এমন কাজটি কেন করলেন? আপনার তো সংসার আছে।
- আমি তো দুষ্টুমি করেছি। সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। বলছি সেটি সম্ভব নয়।
- তাহলে ভাবির সমস্যাটা কোথায়?
- সমস্যা আসলে রফিক ভাই। ভাবিকে টেককেয়ার করে না ঠিকমত।
- তাই বলে এতদিনের সংসার...?
- মেয়েরা স্বামীর আদর চায়। এই মেয়েটি একটু বেশি আহাদি। এধরণের মেয়েকে আদর-সোহাগ দিয়ে ধরে রাখতে হয়।
- রফিক ভাই নিশ্চয়ই তা করে।
- না, করে না বলেইতো সে আমাকে চায়। আমার কাছে ফোন করে। পরামর্শ নেয়।
- তাই.
- সে আত্মহত্যা করতো। আমি তাকে বরং বেঁচে থাকার উৎসাহ যুগিয়েছি। এখন সে যেকোন কাজ করতে গেলে আমার পরামর্শ নেয়।
- ওদের একটি ছেলেও আছে। সংসারটা যাতে না ভাঙে, সে পরামর্শই দিন।
সুলতানের মুখে একথা শোনার পর আহমেদ বললেন, ওদের বনিবনা হচ্ছে না অনেক দিন ধরেই। আমি দেখছি কি করা যায়।
এই কি করার মানে কি সম্পর্কচ্ছেদ? সুলতান বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবে মেনে না নিলেও এ ব্যাপারে তার করণীয় কিছু নেই। এতে নাক গলানোর মত প্রেক্ষাপটও তৈরি হয়নি। তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। সুলতানেরও ব্যস্ততার কারণে আহমেদের অফিসে যাওয়া হয়নি। সেদিন কাজের চাপও কম ছিল। হাটতে হাটতে চলে গেল আহমেদের অফিসে।
ড. আহমেদের রুমে বসেও স্বস্তি পাচ্ছিল না সে। ভাবলো, এই সময়ে আসাটাই ভুল হয়েছে। হয়তো আহমেদও তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে চাচ্ছেন। কিন্তুু কাজ শেষ না হলে তা সম্ভব নয়। অন্যরা ফাঁকি দিলেও তার ফাঁকি দেয়ার সুযোগ কম। গরুর হাটে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। সেটিও হচ্ছে না। তবে হাটে না গিয়েও অনেক গরু দেখেছে। শহরের পথে পথেই এখন মোটাতাজা গরুর ভিড়। কোথাও রাস্তা দখল করে হাট বসেছে, কিংবা কোরবানির জন্য হাট থেকে বাসায় গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছে। পথে লোকজন জিজ্ঞেস করছে কত দাম? কেউ বলছে যা দাম, কারো মতে আবার গত বছরের চেয়ে সস্তা। সুলতান হাটতে হাটতে গরু ও মানুষের নানা বচন শুনছে। শেষ মুহূর্তের বাড়ি ফেরার তাড়া রয়েছে অনেকের। সুলতান ঢাকায় ঈদ করে। তাই ঢাকার বাইরে যেতে হয় না। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও পথে পথে ঝক্কি-ঝামেলার কারণে তা হচ্ছে না।
আহমেদ দীর্ঘদিনের ঘনিষ্টজন। তাই সময় পেলেই তার অফিসে এসে গালগল্প করে যায় সুলতান। কিন্তুু আজ পরিবেশটা সেরকম নয়।
আহমেদের ফোন বাজছে। সেটিও ধরছেন না তিনি। নিরবে মুঠোফোনটি বেজেই চলেছে। কিছুটা বিরক্তির ভাব তার চোখেমুখে। কাল থেকে ঈদের ছুটি শুরু। শেষ অফিস আজ, তাই লোকজনও কম। জরুরী কাজও পড়েছে। খোলার পরদিনই বড় একটি কাজ উঠাতে হবে। কোন ওজরআপত্তি চলবে না। বড় সাহেব বলেছেন, কাজটি যেন হাতছাড়া হয়ে না যায়।
বড় সাহেবের এই কথার মানে আহমেদ বোঝেন। এই অফিসে আহমেদকেই নির্ভর করেন তিনি। আবার কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দিকটিও তাকে দেখতে হয়। কেউ কেউ নানা ছুতোয় আগেই চলে গেছেন। কেউবা ছুটির দরখাস্ত লিখে জমা দিয়েছেন। সবগুলোই বড় সাহেবের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ছুটির দরখাস্তগুলো দেখতে দেখতে আহমেদকে ডাকলেন বড় সাহেব। সুলতানকে একা বসিয়ে না রেখে আহমেদকে সঙ্গে নিয়েই বড় সাহেবের রুমে ঢুকলেন। বড় সাহেব সুলতানকে আগে থেকেই চেনেন।
- সবাই যদি ছুটিতে যায়, অফিস চলবে কেমনে?
- ছুটি দিয়েন না, আহমেদের উত্তর।
বড় সাহেবে এক এক করে সবগুলো ছুটির দরখাস্ত উল্টালেন। তারপর জেনারেল ম্যানেজারকে ডাকলেন। বললেন, সব দরখাস্ত আমার কাছে পাঠিয়েছো কেন?
- স্যার আমিতো সিদ্ধান্ত দিতে পারি না। তখন কথা উঠবে কাউকে খাতির করেছি। কাউকে ছুটি দেইনি।
বড় সাহেব আহমেদকে বললেন, এতজনকে ছুটি দেয়া যাবে না। এমন সময় রুমে ঢোকার অনুমতি চাইলেন এক তরুণী। তার পেছনে আরো দু’জন। অনুমতি মেলার পর তিনজনই ভেতরে ঢুকে দাঁড়ালেন। বোঝা গেল এরা এখানেই, কোন বিভাগে কাজ করেন।
- স্যার আমরা আজ চলে যেতে চাচ্ছি।
- ঠিক আছে।
- স্যার, আমাদের টিকিট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে।
তিন তরুণীর কথা শুনে সুলতান বুঝলো এরা বিমানের টিকিটের কথা বলছে। একটি বিদেশী বিমান সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করেন বড় সাহেব কিংবা তার একটি কোম্পানি। কয়েক পলকে তিনজনকেই আপাদমস্তক দেখে নিল সুলতান। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। একজন বাড়তি একদিনের ছুটি দাবি করলো। বাকি দু’জনও। বড় সাহেব কথা বলার আন্তসংযোগের মাধ্যমে কার সঙ্গে যেন কথা বললেন। তারপর এই তিনজনকে ছুটি মঞ্জুর করে দিলেন। তাতে খুব খুশি সবাই। ধন্যবাদ স্যার, ঈদ মোবারক। সবাইকে অগ্রিম ঈদ মোবারক।
শেষের বাক্য শুনে সুলতান ভাবলো, তাকেও ঈদ মোবারক জানিয়েছে ওরা। বাহ্ । তারপর ওরা বেরিয়ে গেলে আহমেদ নিজেও বেরিয়ে পড়েন। পেছন পেছন সুলতানও বেরিয়ে আবারো আহমেদের রুমে গিয়ে বসেন। বড় সাহেব তাকে দেখে আজ আর খুব খাতির করলেন না। নেহায়েত কুশলাদি বিনিময়। অন্য সময় হলে দেশের হালচাল, ব্যবসাবাণিজ্য নানা বিষয়ে আলোচনা হতো। সুলতান ভাবলো- হয়তো ভাল ঝামেলায় আছেন।
আহমেদ একবার চেয়ারে বসছেন। আবার বেরিয়ে যাচ্ছেন কাজের তদারকি করতে। এরই মধ্যে আরো কয়েকবার তার মুঠো ফোনটি বেজে উঠলো। কিন্তুু ধরছেন না তিনি। কিছুক্ষণ চেয়ারে বসার অভিপ্রায় নিয়ে দু’কাপ গরম পানি আনতে বললেন পিয়নকে। ছোট্ট বোতলে কফি রাখা আছে। গরম পানি আনলে কফি মিশিয়ে নেবেন। সুলতান এলে এককাপ কফি না খেয়ে ওঠে না। কফির চেয়ে বড় বিষয় দুজনে আড্ডা দেয়া। কিছুক্ষণ নানা বিষয়ে খোশগল্প করা।
মুঠো ফোনটি বাজছেই। বুক পকেটেই ছিল সেটি। বের করতে করতে আহমেদ বললেন, ভাবি ফোন করেছে। ধরতে ইচ্ছে করছে না।
- কেন? ধরুণ না।
- না, তার কাজে আমি নাখোশ হয়েছি।
- কেন?
- ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার বেড়াতে গেছে। আমি বলছিলাম যাও, কিন্তুু....
কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি। উঠে গেলেন, কম্পিউটার রুমে জরুরী কোন নির্দেশনা দিতে। আবার ফিরে এলেন রুমে। সুলতান বললো- আজ উঠি। আপনার ব্যস্ততা কমলে আরেকদিন আসবো।
- বারান্দায় যাই, একটু সিগারেট টেনে আসি।
সুলতানও পেছনে গেল। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আহমেদ সিগারেট টানতে টানতে বললেন, ভাবি কক্সবাজারে গেছে তার এক কাজিনকে নিয়ে। ঐ মেয়েটিরও বিয়ে সামনের মাসে। এরকম এক মেয়েকে নিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি তার।
- সঙ্গে আর কে গেছে।
- রফিক ভাইর এক বন্ধু, যাকে সে বিয়ে করবে।
- ও তাই।
- আমি বলছিলাম যাও, কিন্তুু এভাবে কেন? ছেলেটাকেও রফিক ভাইর কাছে রেখে গেছে।
- কি অ™ভুত ব্যাপার, না?
সিগারেটের শেষ টান দিয়ে আহমেদ রুমে ফিরে গেলেন। সুলতান লিফটের অপেক্ষায় দাঁড়ালো। যে লোকটির সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে, তার কাছেই আবার ছেলেকে রেখে গেল? অথচ মামলা, পুলিশ কত কিছুই না ঘটলো এই ছেলেটিকে নিয়ে। সুলতান অবাক হয়। আহমেদের সঙ্গে ভাবির সম্পর্কের বিষয়টি অনুমান করতে পারে না সে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


