রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেম ঘটিত কারণে মাত্র সাতদিনের মধ্যে চার শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এতে এক ছাত্র এবং এক ছাত্রী বিষপানে মৃত্যুবরণ করেছে। আর একজন বিষ পান করায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। অপর এক জনকে নিশ্চিত আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়ে রাবি প্রশাসন তাকে তার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।
সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) বিকালে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী কবিতা রাণী তার নিজ বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। সে মুন্নুজান হলের আবাসিক ছাত্রী। আত্মহত্যার দিনই কবিতার মাস্টার্সের ফলাফল প্রকাশ পায়। সে দ্বিতীয় শ্রেণী পেয়ে উত্তীর্ণ হন বলে তার সহপাঠীরা জানান। তার বন্ধুরা জানায়, কবিতা সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুসলমান ছেলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আর এই সম্পর্কের টানাপোড়ন থেকেই সে বিষপান করে থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
গত ৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাহাকুল ইসলাম সোহাগ বিষপানে আত্মহত্যা করেন। সোহাগের সহপাঠী ও বন্ধুরা জানায়, ওই দিন সকালে সোহাগ ওর গ্রামের বাড়ি নাটোর জেলার গুরুদাসপুরে যায়। বাড়ি গিয়ে বিষপান করলে রাত নয়টার দিকে আত্মীয়-স্বজনরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। এলাকার এক মেয়ের সঙ্গে ওর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। আর এ প্রেম ঘটিত কারণেই সাহাকুল আত্মহত্যা করে থাকতে পারে বলে তারা জানান।
এদিকে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী রকি একইদিনে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। রকি বঙ্গবন্ধু হলের আবাসিক ছাত্র। তার বন্ধুরা জানায়, রকি নিজ জেলা সিরাজগঞ্জের এক মেয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রেম করে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই মেয়ের বিয়ে হচ্ছে এমন খবর জানতে পেরে রকি হলে তার নিজ কক্ষের (২২২) দরজা-জানালা বন্ধ করে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। দীর্ঘ সময় দরজা বন্ধ দেখতে পেয়ে বিষয়টি সন্দেহের কারণ হলে রকির বন্ধুরা দরজা ভেঙ্গে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরী বিভাগে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে।
এরপর সর্বশেষ গত মঙ্গলবার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নিজের গায়ে নিজেই কেরোসিন ঢেলে আত্মাহুতির চেষ্টা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আশিকুর রহমান আশিক।
এব্যাপারে আশিকের বন্ধুরা জানায়, দু’বছর ধরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি রাজশাহী ক্যাম্পাসের এক ছাত্রীয় সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক আশিকুরের। এই সুদীর্ঘ সময়ে উভয়ই বেশ চুটিয়ে প্রেম করে। কিন্তু গত বছর ওই ছাত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-এর অধীনে এমবিএ-তে ভর্তি হলে প্রেমের সম্পর্ক অস্বীকার করে এড়িয়ে চলা শুরু করে। কিন্তু ওই ছাত্রী গত মঙ্গলবার দুপুর ১২ টার দিকে সম্পর্ক রাখবে না বলে জানালে আশিক রবীন্দ্র ভবনের ছাদে মেয়ের সামনে নিজেই নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। পরে আশিকের সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে ওই ছাত্রীসহ প্রক্টর অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে আশিক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। পরে প্রক্টর তার বন্ধুদের সহায়তায় তাকে বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এব্যাপারে ওই ছাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আশিক একজন নেশাগ্রস্থ ব্যক্তি। তার সঙ্গে কোনোদিনই প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। গত মাসে তার এক এমবিবিএস ডাক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে দাবি করে বলেন, আশিকের মঙ্গলের জন্যই তার সঙ্গে ক্ষণিকের জন্য অভিনয় করা হয়েছে মাত্র।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই সকল মৃত্যুর ব্যাপারে বলেন, মোবাইল ফোনে প্রতারণা করা এখন অতি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এই প্রবণতা অনেক বেশি। যে কারণে তাদের মধ্যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ডঃ মাহফুজুর রহমান আকন্দ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,মানুষের সচেতনতার মাধ্যমেই এসব মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতেই যদি প্রেম-ঘটিত কারণে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করে, তাদের যদি আত্মবিশ্বাসের এতই অভাব থাকে, জীবনে চলার পথে সামান্য আঘাতেই হতাশ হয়ে পরে, তাহলে সাধারণ মানুষের যাদের ট্যাক্সের টাকায় আমরা পড়াশোনা করি, যারা আমাদের দিকে পথের দিকে চেয়ে আছে তারা কাদের ওপর ভরসা করবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

