somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জয়দীপ চক্রবর্তী
জয়দীপ চক্রবর্তী : পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। নেশায় লেখক। আকাশবানী কোলকাতায় সম্প্রচারিত হয়েছে তার লেখা নাটক। পেশাদারী থিয়েটার “অবেক্ষন” তার লেখা নাটককে বেছে নিয়েছে তাদের প্রযোজনা হিসেবে। তার কাহিনী চিত্রনেট্যে তৈরী সর্ট ফ্লিম, প্রচারিত হয়েছে ইউটিউব চ্যা

মাঝরাতের কীর্তি-কলাপ

২৬ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১০:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত দুটো। শর্মিষ্ঠার ঘুম ভেঙে গেল। দেখে আদিত্য পাশে শুয়ে নেই। টয়লেট করতে উঠে দেখে পাশের ঘরে আলো জ্বলছে। টয়লেট করে উঁকি মেরে দেখে আদিত্য মোবাইলে কথা বলছে। একটু অবাক হলেও আদিত্যকে কিছু না বলে শুতে চলে গেল। বিছানায় এসে দেখে আর্য ওর জায়গা দখল করে আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে আছে। ছেলেকে ঠিক করে শুইয়ে ওর পাশে শুয়ে পড়ল শর্মিষ্ঠা।
এরপর অনেকদিনই শর্মিষ্ঠার মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে দেখেছে, আদিত্য পাশে শুয়ে হোয়াটস-অ্যাপে চ্যাট করছে। কখনও দেখেছে পাশের ঘরে গিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে। কখনও দেখেছে কারো সাথে ফোনে কথা বলতে। একদিন শর্মিষ্ঠা মাঝরাতে উঠে দেখে পাশের ঘরে আলো জ্বলছে, দরজা লক করা। দরজায় কান পেতে শুনল, আদিত্য “হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ” গান গেয়ে কাউকে বার্থ ডে উইশ করছে। কে সেই বিশেষ মানুষ, যার জন্মদিনে আদিত্যকে রাত জেগে বার্থ ডে উইশ করতে হচ্ছে? প্রশ্নটা মনের মধ্যেই লুকিয়ে রেখে, ব্যাপারটা দেখেও না দেখার, শুনেও না শোনার ভান করে থাকল শর্মিষ্ঠা । তবে ওর মনে ক্রমশ একটা সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকল।
দশ বছরের বিবাহিত জীবনে এমনটা কখনও দেখেনি শর্মিষ্ঠা। স্বামী, স্ত্রী ও আট বছরের ছেলে আর্যকে নিয়ে মোটামুটি সুখের সংসার। আদিত্য সাতে-পাঁচে না থাকা একটি নিপাট ভালো মানুষ। অফিস, বাড়ি, বন্ধু-বান্ধব, সকল ঘটনাই শর্মিষ্ঠার সাথে শেয়ার করে আদিত্য। সেই মানুষটি প্রায় দু মাস ধরে কি লোকাচ্ছে শর্মিষ্ঠার কাছে? পাছে শর্মিষ্ঠা ব্যাপারটা টের পেয়ে যায়, তাই মধ্যরাতকে বেছে নিয়েছে। এমন একটা ঘুম কাতুরে মানুষ, মাঝরাতে প্রায়ই উঠছে কেন? কিসের তাড়নায়? নিশ্চয় এমন কিছু ও করছে যা শর্মিষ্ঠাকে জানানো যায় না। এমন কোনও অপরাধ, যা ও জানলে আদিত্য ওর কাছে অনেক ছোটো হয়ে যাবে। কি সেই অপরাধ? তবে কি আদিত্য নতুন করে কোনও মেয়ের প্রেমে পড়েছে? চল্লিশোর্ধ বয়সটা ছেলেদের পক্ষে খুবই মারাত্মক। এ সময় অনেক পুরুষই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। আদিত্যও কি তেমন কিছুতে জড়িয়ে পড়ল?
ছোটো মেয়ে হওয়ায়, ছেলেবেলা থেকে একটা স্পেশাল আদর, স্পেশাল কেয়ার পেয়ে এসেছে শর্মিষ্ঠা। আর ওর দিদি অনন্যার বিয়ে হয়ে প্রবাসে চলে যাওয়ার পর শর্মিষ্ঠার ওপর ওর বাবা-মার নির্ভরতা যেমন বেড়েছে, তেমন আদর ভালোবাসাও বেড়েছে। এরকম একচেটিয়া ভালোবাসা পাওয়া মেয়ে, অন্যের সাথে ভালোবাসা ভাগ করে নেবে কেন? তাও আবার স্বামীর ভালোবাসা!
সেদিন আদিত্য অফিস থেকে বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ফোন আসে। আদিত্য ফোন নিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়। আগে এসব ব্যাপার নিয়ে শর্মিষ্ঠা বেশী মাথা ঘামাত না। এখন ব্যাপার গুলো ওকে বেশ ভাবায়। ও আড়াল থেকে ফোনের কথা শোনার চেষ্টা করল। কোনও মহিলার সাথে গয়না, শাড়ি এসব নিয়ে কথা চলছে। বেশীক্ষণ না দাঁড়িয়ে সরে এলো শর্মিষ্ঠা। আদিত্য ফোন সেরে বাথরুমে ঢুকলে শর্মিষ্ঠা, আদিত্যর ফোন নিয়ে লাস্ট কলটা দেখল। বিদিপ্তা ফোন করেছিল। বিদিপ্তা আদিত্যের বন্ধু। কোনও এক সময়ে দুজনেরই দুজনের প্রতি দুর্বলতা থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে সেটা কেটে গেছে বলেই জানে শর্মিষ্ঠা। পুরানো প্রেম আবার উথলে উঠল নাকি?
সেদিন মাঝরাতে শর্মিষ্ঠা উঠে দেখে, আদিত্য পাশের ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। উঁকি মেরে দেখে ফ্লিপকার্টে কিছু একটা বুক করছে আদিত্য। প্রতিদিনের মতো সেদিনও কিছু না বলে, কিছুই টের পায়নি ভাব করে বিছানায় এসে শুয়েছে শর্মিষ্ঠা। আদিত্যর ফ্লিপকার্টের লগইন আইডি, পাসওয়ার্ড শর্মিষ্ঠার জানা। পরদিন ফ্লিপকার্ট খুলে, ও দেখল বিদিপ্তার ঠিকানায় দামী ও সুন্দর একটা শাড়ি বুক করেছে আদিত্য। ওরকম একটা শাড়ি শর্মিষ্ঠার অনেক দিনের শখ। বুকটা কেমন হু-হু করে উঠল ওর।
এখন রাতে আর ভালো ঘুম হয় না শর্মিষ্ঠার। একটা দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক ঘুরপাক খায় সারারাত। কতগুলো আবছা, খাপছাড়া, টুকরো টুকরো স্বপ্নের মধ্যে রাতগুলো কাটে। হঠাৎ আদিত্যের ফোনের ভাইব্রেশনে ঘুম ভাঙে শর্মিষ্ঠার। বিদিপ্তা-২ থেকে ফোন এসেছে। ফোনটা রিসিভ করে, নিঃশব্দে কানে দিল ও।
কিরে ফোন ধরছিস না কেন? কখন থেকে ডায়াল করছি। বৌ জেগে আছে বুঝি? মাঝরাতেও বৌকে জাগিয়ে রেখেছিস? খুব রোমান্স করছিস বুঝি?
এতোগুলো কথার কোনও উত্তর না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল শর্মিষ্ঠা। গলাটা বেশ চেনা চেনা লাগল ওর। কিন্তু কার গলা, সেটা ঘুম চোখে ঠিক বুঝতে পারল না শর্মিষ্ঠা।
আদিত্য, শর্মিষ্ঠার সম্পর্কটা যে বিশ্বাসের বন্ধনে বাঁধা ছিল, সে বন্ধন ক্রমশই যেন ক্ষীণ হয়ে এলো। আদিত্য সকালে অফিস চলে গেলে শর্মিষ্ঠা ওর কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে, এই ব্যাপারটা নিয়ে ওদের সাথে আলোচনা করল। বছর খানেক হল ডিভোর্স হয়েছে সুলগ্নার। ও বলল, ব্যাপারটা খুব একটা সুবিধের ঠেকছে না। শুরু থেকেই শক্ত হাতে হাল ধর, নইলে পরে সামলাতে পারবি না। বাকি সবাইও প্রায় একই ধরনের কথা বলল। আদিত্যের ওপর শর্মিষ্ঠার রাগ, অভিমান চতুর্গুণ হয়ে গেল। ঠিক করল আদিত্য অফিস থেকে ফিরলে ওর সাথে সরাসরি কথা বলে সব কিছু জেনে নেবে। এই মাঝরাতের লুকোচুরি আর ভালো লাগছে না। যদি কারো সাথে নতুন ভাবে সম্পর্ক গড়তেই হয়, প্রকাশ্যে, সবাইকে জানিয়েই গড়। শর্মিষ্ঠা নিজেই সে পথ করে দেবে। ছেলেকে সাথে নিয়ে চিরদিনের মত আদিত্যের জীবন থেকে সরে যাবে ও। ভাবতে ভাবতেই আদিত্যের ফোন। একটা কাজে আটকে গেছে। ফিরতে রাত হবে।
বেশ রাত করেই ফিরল আদিত্য। ফিরে জামা-কাপড় পালটে, ফ্রেস হয়ে খেয়ে ঘুম। কোনও কথাই হল না। আর আদিত্য এত ক্লান্ত ছিল যে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ওসব প্রসঙ্গ আর তুলতে ইচ্ছে করল না শর্মিষ্ঠার।
সেদিন মাঝরাতে আদিত্যের ফোন বাজে নি, কোনও মেসেজও ঢোকেনি। তবে প্রতিদিনের মত সেদিনও শর্মিষ্ঠার নানা রকম চিন্তা ও স্বপ্নের আনাগোনায় ভালো ঘুম এলো না। ও ভাবল দুদিন বাদেই তো ওর জন্মদিন। দেখিনা জন্মদিনে আদিত্য কি করে! প্রত্যেকবার শর্মিষ্ঠার জন্মদিনের আগের দিন রাত বারোটার সময় ওকে নানা ধরনের সারপ্রাইজ গিফট দেয় আদিত্য। আর গিফট দেওয়ার পর শর্মিষ্ঠার সর্বাঙ্গে ভালোবাসার উষ্ণ পরশ মাখিয়ে দেয়। জন্মদিনে, জন্মদিনের পোষাকে, শর্মিষ্ঠা সেই উষ্ণ পরশ, সেই দুষ্টুমির ছোঁয়া সারা গায়ে মেখে শিহরিত হয়ে ওঠে। তাই জন্মদিনটা কাটিয়েই একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায় শর্মিষ্ঠা।
আদিত্যের বইয়ের তাক গোছাতে ও পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা সুন্দর র‍্যাপারে মোড়া, গিফট প্যাক করা বাক্স চোখে পড়ল শর্মিষ্ঠার। ভালো করে বাক্সটা দেখে, না খুলে, একইভাবে, একই জায়গায় রেখে দিল ও। আর মনে মনে ভাবল, এই গিফটটাই তবে আদিত্য আজ রাত বারোটায় ওকে দেবে।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। আদিত্য সেদিন অফিস থেকে ফিরে অন্য একটি সাধারণ দিনের মতই আচরণ করল। খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়ল। রাত ১২টা, বা মাঝরাতে উঠল না। যে মানুষটার মাঝরাতে ওঠা নিয়ে, মাঝরাতের কাজ-কর্ম নিয়ে শর্মিষ্ঠার রাগ, অভিমান, দুশ্চিন্তা, আজ সে মানুষটির মাঝরাতে না ওঠা নিয়ে, মাঝরাতে কিছু না করার জন্য শর্মিষ্ঠার রাগ, অভিমান, দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কিছু উপহার না দিক, একটু আদর করে চুমুও তো দিতে পারত ওর ঠোঁটে, ওর জন্মদিনে। অথচ নিজের পছন্দের মানুষটির জন্মদিনে তাকে মাঝরাতে উঠে উইশ করা যায়। এমনটা আগে কখনও হয় নি। আদিত্য সত্যি ওকে আর আগের মত ভালোবাসে না। সারারাত কেঁদে বালিশ ভেজাল শর্মিষ্ঠা।
সকালে উঠে তৈরি হয়ে, টিফিন করে প্রতিদিনের মত আর্যকে স্কুল বাসে তুলে দিয়ে, অফিসে বেড়িয়ে গেল আদিত্য। শর্মিষ্ঠাকে জন্মদিনের উইশ পর্যন্ত করল না। ভীষণ খারাপ লাগল ওর। সকাল থেকেই ফেসবুকে, হোয়াটস-অ্যাপে জন্মদিনের সহস্র শুভেচ্ছা-বার্তা আসছে। বাবা, মা, কাছের কয়েকজন বন্ধু ফোন করে উইশ করেছে। কিন্তু এতো শুভেচ্ছা-বার্তাও শর্মিষ্ঠাকে খুশি করতে পারেনি।
এক মনে ভাবছে শর্মিষ্ঠা। না এ সংসারে আর ও এক মুহুর্ত থাকবে না। সুলগ্নাকে ফোন করল ও। সুলগ্না অনেক বুঝিয়েও শর্মিষ্ঠার মত পরিবর্তন করতে পারল না। আদিত্যকে ও মুক্তি দেবেই।
দ্যাখ, যে সম্পর্কে ভালোবাসা নেই, সে সম্পর্ক জোর করে টিকিয়ে রাখা যায় না। পচন ধরার আগেই সে সম্পর্কের ছেদ টানলে দুটো মানুষই বাকি জীবনটা ভাল থাকবে।
তবুও একবার ভেবে দেখতে পারতিস। আমি তো ভুক্তভোগী, তাই বলছি। একটা মেয়ে একা বাঁচতে পারে না। সমাজ বাঁচতে দেয় না।
নারে, আমি ঠিক একটা রাস্তা খুঁজে নেব বাঁচার। ছেলেকে সাথে নিয়ে কাটিয়ে দেব বাকি জীবনটা। তবে এ সম্পর্কে আর নয়। তুই বরং আমাকে উকিলের নম্বরটা দে। আমি আজই বাপের বাড়ি চলে যাব। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে উকিলের চিঠি পাঠাব।
সুলগ্না আর কথা না বাড়িয়ে উকিলের ফোন নম্বর দিল। শর্মিষ্ঠা, আদিত্যের টেবিলে পড়ে থাকা একটা ভাঁজ করা কাগজের ওপর নম্বরটা লিখে, কাগজটা নিজের পার্সে ঢুকিতে রাখল। তারপর আদিত্যকে ফোন করল। ফোন এনগেজ। অনেকবার ফোন করেও আদিত্যকে ফোনে পেল না ও। খানিক ভেবে অফিসের ফোনে ফোন করল শর্মিষ্ঠা।
- আদিত্য তো আজ অফিস আসেনি। ছুটি নিয়েছে। কালকেই তো বলে গিয়েছিল। কেন বাড়িতে কিছু জানায় নি?
- না, মানে তাহলে হয়তো অন্য কোথাও গেছে। বাড়ি ফিরে আসবে। ঠিক আছে, আমি রাখছি।
ফোন রেখে আরও হতাশ হয়ে পড়ে শর্মিষ্ঠা। অফিসে আজ ছুটি নিয়েছে, সেটাও ওকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি আদিত্য। আর জানাবেই বা কেন? শর্মিষ্ঠা, আদিত্যর কে? হয়তো মনের মানুষের সাথে সময় কাটাবে সারাদিন। হায়রে, সেইজন্য বৌ-এর জন্মদিনটাই বেছে নিতে হল। শর্মিষ্ঠার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে ওর ফোনটা বেজে উঠলো। আদিত্য ফোন করেছে।
- আমার টেবিলের ওপর একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ আছে। ওতে একটা ফোন নম্বর লেখা আছে। ফোন নম্বরটা হাতে নিয়ে আমাকে কল ব্যাক কর। অথবা , হোয়াটস-অ্যাপও করতে পারো নম্বরটা।
- সে করছি। কিন্তু তুমি এখন কোথায়?
- কোথায় আবার? অফিসে। নম্বরটা তাড়াতাড়ি দাও, খুব দরকার।
ফোন কেটে দিল আদিত্য। সত্যি কি মিথ্যেবাদীই না হয়েছে আদিত্যটা। ইচ্ছে না থাকলেও ওর টেবিলের কাগজ পত্র ঘেঁটে, দায় সারা ভাবে নম্বরটা খুঁজল শর্মিষ্ঠা। না, কোথাও কোনও নম্বর লেখা নেই। নেই তো নেই, আদিত্যকে তা জানানোর প্রয়োজন মনে করল না শর্মিষ্ঠা। ব্রেকফাস্ট করে, তৈরি হয়ে নিলো। জামা-কাপড় গুছিয়েই বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবে শর্মিষ্ঠা। মাঝপথে আর্যর স্কুলে নেমে ওর ছুটি পর্যন্ত অপেক্ষা করে ওকে সাথে নিয়ে নেবে। ওর ব্যাগ গোছানো প্রায় শেষের দিকে, ঠিক এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল।
তুমি এখন? তুমি না অফিসে? দরজা খুলে আদিত্যকে দেখে অবাক হওয়ার ভান করল শর্মিষ্ঠা।
এতেই অবাক হলে? আমার সাথের জনকে দেখলে তো চমকে উঠবে। আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা পাশের মহিলাটিকে সামনে আনে আদিত্য।
শর্মিষ্ঠা রাগে দুঃখে মাথা নিচু করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আগত অতিথির শুধু জুতো ও শাড়ি দেখতে পাচ্ছে ও। শেষ পর্যন্ত বিদিপ্তাকে বাড়িতেই নিয়ে এলো আদিত্য!
কিরে, দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছিস যে? ঘরে ঢুকতে দিবি না? শর্মিষ্ঠার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে অনন্যা।
আরে দিদি তুই? মুখ তুলে চমকে উঠেছে শর্মিষ্ঠা। প্রায় বছর দুয়েক পর নিজের দিদিকে দেখছে ও। আনন্দে দিদিকে জড়িয়ে ধরল শর্মিষ্ঠা।
দরজায় দাড়িয়েই দুই বোনের ভাব-ভালোবাসা চালাবে? নাকি দিদিকে ঘরে বসতে দেবে? কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকে এলো আদিত্য।
ড্রইং রুমের সোফাতে দুই বোন এসে বসল।
- তারপর না বলে কয়ে হঠাৎ? জাম্বু, শ্রেয়ান আসেনি।
- না, তোর জাম্বু ছুটি ম্যানেজ করতে পারেনি। আর শ্রেয়ানের তো এবার ফাইনাল এক্সাম। আমি একাই এক সপ্তাহের জন্য ঝটিকা সফরে এসেছি। শ্বশুর বাড়িতে প্রপার্টি সংক্রান্ত কিছু কাজ আছে। অনেকদিন ধরেই আসব আসব প্ল্যান করছিলাম। আদিত্য! বলল, শর্মির জন্মদিনের দিন আসো। জন্মদিনে একটা বাড়তি পাওয়া হবে ওর। আসার বেশীর ভাগ আরেঞ্জমেন্ট তো আদিত্যই করেছে। আমার যখন কথা বলার সুবিধে, তখন তো তোদের এখানে মাঝরাত। আদিত্য বলল, মাঝরাতই ভাল। শর্মি জানতে পারবেনা। আমার একটু কষ্ট হয়তো হবে। সে হোক। বউয়ের জন্য একটু কষ্ট না হয় করলাম।
- ছাড়ত ওর কথা। যে বউয়ের জন্মদিনে উইশ পর্যন্ত করে না, তার সাথে আমার কোনও কথা নেই।
- মানে? তোমাকে যে বললাম টেবিলের ওপর একটা কাগজ আছে। তুমি সেটা দেখো নি?
- ঐ ফোন নম্বর লেখা কাগজ তো? ওটা আমি খুঁজে পাইনি। তাছাড়া তোমার দরকার, তুমিই মেটাও না। আমাকে বলতে যাও কেন?
আরে, কাগজটা তে ফোন নম্বর ছিল না। কথা বলতে বলতে টেবিলের সামনে গেল আদিত্য। এখানেই তো ছিল কাগজটা। গেল কোথায়?
শর্মিষ্ঠার এতক্ষণে খেয়াল হল, টেবিলের ওপর থেকে একটা কাগজ নিয়ে ও উকিলের ফোন নম্বর লিখে পার্সে ভরেছে। ঐ কাগজটা নয় তো? পার্স থেকে কাগজটা বের করে আদিত্যের হাতে দিল ও। এই টা?
আদিত্য কাগজটা একটু দেখে বলল, হ্যাঁ এইটা। নাও খুলে দেখ।
শর্মিষ্ঠা খুলে দেখল যে ওতে লেখা আছে, -
নম্বর খুঁজছ? তবে,
একটু কষ্ট করতে হবে।
আমার বইয়ের তাকে,
দুটি বইয়ের ফাঁকে,
বাক্স, মোড়া র‍্যাপার দিয়ে,
খুলে ফেল হাতে নিয়ে।
শর্মিষ্ঠা আগেই ঐ র‍্যাপার মোড়া বাক্সটা দেখেছে। বইয়ের তাক থেকে ওটা এনে বাক্স খুলল। একটা ব্লু-টুথ স্পিকার, আর সাথে একটা কাগজ। লেখা আছে,-
অনেক খাটালাম এতক্ষণ,
এবার স্পিকার কর অন।
শর্মিষ্ঠা স্পিকার অন করতেই আদিত্যের গলা শোনা গেল।
হ্যালো শর্মি, আজকে স্পেশাল দিনে, একটু স্পেশাল ভাবে তোমাকে শুভেচ্ছা জানানোর ইচ্ছে হল। আসলে তুমি আমার কাছে এতোটাই স্পেশাল যে, তোমাকে চেনা ছকে উইশ করতে ইচ্ছে করল না। তাই এই অভিনব আয়োজন।
এরপর আদিত্যের গলায় শোনা গেল সেই চির পরিচিত হ্যাপি বার্থ ডের গান, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ। এই গানটাই তবে সেদিন মাঝরাতে উঠে রেকর্ডিং করছিল আদিত্য। শর্মিষ্ঠার মুখে কোনও কথা নেই। একদম স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দাঁড়াও, গিফট এখনো শেষ হয়নি। একটা সুন্দর প্যাকিং করা বাক্স শর্মিষ্ঠার হাতে তুলে দিল আদিত্য। শর্মিষ্ঠা খুলে দেখল সেই শাড়িটা, যেটা আদিত্য ফ্লিপকার্টে অর্ডার করে ছিল।
কি, কেমন হয়েছে?
দারুণ।
এটার ক্রেডিট অবশ্য আমার নয়। পুরোটাই বিদিপ্তার। ও পছন্দ করেছে, ওর অ্যাড্রেসে এটা ডেলিভারি হয়েছে। আমি শুধু অর্ডার আর পেমেন্ট করেছি।
আদিত্য, তুই শুধু তোর বউকে বার্থ ডে গিফট দিয়ে যাবি? আমাকেও আমার বোনটাকে কিছু দেওয়ার সুযোগ দে। ট্রলি ব্যাগ থেকে সুসজ্জিত বাক্স বের করে শর্মিষ্ঠার হাতে তুলে দিল অনন্যা। পারফিউম ও নানারকম কসমেটিক্সে ভরা বাক্স।
কিরে, পছন্দ হয়েছে?
পছন্দ মানে? অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ করে দিলি তুই। আমার এই জন্মদিনটাকে তোরা এতো সুন্দর, এতো স্পেশাল করে দিবি, ভাবতেও পারিনি।
এজন্য আমার কোনও ক্রেডিট নেই। পুরোটাই তোর হাসব্যান্ডের।
আরে দেখলে হবে? এমনি এমনি এসব হয়েছে। এজন্য যে কত রাত জাগা আছে, তা তুমি জানো না। তুমি তো শুয়ে নাক ডেকে ঘুমিয়েছ।
শর্মিষ্ঠা, আদিত্যের কথায় কোনও উত্তর দিল না। বলল না যে ও সব জানে। আর জানে বলেই যত সমস্যা।
আদিত্যের ফোনটা অনন্যার পাশে রাখা ছিল। হঠাৎ ওটা বেজে উঠতে অনন্যা বলল, কিরে আমার ফোন থেকে তোর ফোনে রিং হয়ে গেল নাকি? তুই তো বলেছিলি আমার নম্বর বিদিপ্তা নামে সেভ করে রেখেছিস।
না, তোমারটা বিদিপ্তা-২ নামে সেভ করেছি। যাতে শর্মিষ্ঠা দেখে কিছু বুঝতে না পারে। ফোন ধরল আদিত্য। বিদিপ্তা, শর্মিষ্ঠাকে উইশ করার জন্য ফোন করেছে। দাঁড়া, ওকে দিচ্ছি। শর্মিষ্ঠার হাতে ফোন দিল আদিত্য।
হ্যাপি বার্থ ডে। তারপর, শাড়ি পছন্দ হয়েছে?
ভীষণ। দারুণ শাড়ি। তোমার পছন্দটা সত্যি ভাল।
সেটা এতো দিনে বুঝলি? যাক আজকের দিনটা ভালো কাটা। খুব আনন্দ কর। রাখলাম।
শর্মিষ্ঠা ফোন রাখলে আদিত্য বলল, এবার এক রাউন্ড কফি হয়ে যাক। দিদি প্লেন জার্নি করে এসেছে। ক্লান্তি কাটবে। তারপর আমরা বেরবো। আজকে লাঞ্চ, ডিনার সব বাইরে।
এই ডিনারটা আমি তোদের সঙ্গে করব না। আমাকে শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে।
কেন? রাতে আমাদের সাথে থাকবি না?
নারে সোনা। রাতটা তোদের মাঝে আমার না থাকাই ভালো।
অনন্যার কথার ইঙ্গিতটা বুঝে শর্মিষ্ঠা লজ্জা ও খানিকটা ন্যাকামির স্বরে বলল, দিদি তুই না ...
ওরা সবাই তৈরি হতে হতেই আর্য স্কুল থেকে ফিরে এলো। শর্মিষ্ঠা তাড়াতাড়ি ছেলেকে রেডি করে সবাই মিলে বেড়িয়ে পড়ল।
যেখানে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ছিল বজ্রপাতের সঙ্গে ভারি বর্ষণের আশঙ্কা, সেখানে হঠাৎ বসন্তের মৃদু-মন্দ বাতাস বইছে। শর্মিষ্ঠা যেন জেগে স্বপ্ন দেখছে। সারাদিন বেশ আনন্দ করল ওরা। ডিনার সেরে রাত করে বাড়ি ফিরল। সারাদিনের ধকলে সবাই ক্লান্ত। আর্য বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু আদিত্য, শর্মিষ্ঠা মাঝরাত পর্যন্ত একে অপরকে জাগিয়ে রাখল। আর ওদের মাঝরাতের কীর্তি কলাপের কথা? সেটা নাইবা বললাম।
সমাপ্ত

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১০:০৭
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ পুড়বে আর কেউ পোড়াবে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

অনেকদিন নিশ্চুপ আছি কিছুদিনের অপেক্ষায়;
কেউ কেউ বলে কিছুদিন নাকি হারিয়ে গেছে,
অনেকদিনের গর্ভে তাই মেলাতে সরল গণিত।
কিছুদিনের অপেক্ষায় অপেক্ষায়-
ছেটে দিয়েছি কথামালার ডালপালা।
বসে বসে মেলাই কাণ্ডহীন বৃক্ষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Good governance starts with respecting public money....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২১ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



Good governance starts with respecting public money....

গত দুই দশক রাষ্ট্রীয় সফর মানেই ছিল বিশাল বহর, শত শত সঙ্গী, অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক আর জনগণের টাকায় এক শ্রেণির মানুষের বিদেশ ভ্রমণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, ভালোবাসাই যথেষ্ট

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৪৮



চীনের লিংশান পর্বতে শুয়ে আছেন ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর দুই সাহাবী সা-কে-জু (Sa-Ke-Zu) এবং
উউ-কো-শুন (Wu-Ko-Shun)। এই নামেই তাঁদের চিনতো স্থানীয় চীনবাসীরা। অবাক হতে হয়, আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

প্রিয় সহব্লগার,
একসময় সামু ছিল আমাদের ছোট্ট এক মহাবিশ্ব।
দৈনিক গড়ে তিন-চারশ' ব্লগার অনলাইনে থাকতেন। প্রতি মিনিটেই নতুন নতুন পোস্ট আসত। কেউ গল্প লিখছেন, কেউ কবিতা, কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ২২ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭



বাংলাদেশে শেষ কবে সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখেছিলাম মনে নাই। গতকাল সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম, স্টার সিনেপ্লেক্স মুভি থিয়েটারে। এখন আর আগের মতন সিনেমা হল নেই। অনেক কিছু বদলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×