যদি হয় সুজন তো তেঁতুলপাতায় ডজন! প্রচলিত প্রবচনকে এ ভাবেই পাল্টে নিচ্ছেন ঝাড়খণ্ডবাসী বাঙালিদের কেউ কেউ।
আসলে এ হল রাজ্যের নয়া ভাষা-নীতি নিয়ে টিপ্পনি। ঝাড়খণ্ড গঠনের পর থেকেই বাংলাকে দ্বিতীয় ভাষা করার দাবি উঠেছিল। বাঙালিদের সেই আশা আজ মিটেছে। কিন্তু একক ভাবে নয়, এ রাজ্যে আরও ১১টি ভাষার সঙ্গে দ্বিতীয় ভাষার তালিকায় ঢুকছে বাংলা। গোটা ভারতে এমন নজির নেই আর একটিও। রাজ্যের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ একে তাঁদের মাতৃভাষা প্রসারের ‘অস্ত্র’ হিসেবে দেখলেও একযোগে এক ডজন ভাষার অন্তর্ভুক্তি পুরো বিষয়টিকেই কার্যত গুরুত্বহীন করে তুলল বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলার মতো সাঁওতালি ভাষার অধিকারের দাবিতেও আন্দোলন চলছিল প্রায় এক দশক ধরেই। রাজ্যের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চাও তদ্বির করছিল বাংলা ও সাঁওতালির জন্য। কিন্তু এর পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠী ও ওড়িয়ারাও ঝাঁপিয়ে পড়েন নিজ-নিজ ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে। মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন মুন্ডার সরকার কোনও ঝামেলায় না গিয়ে এক কলমের খোঁচায় জল ঢেলে দিয়েছে যাবতীয় বিতর্কে। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাংলা, সাঁওতালি, ওড়িয়ার সঙ্গে আঞ্চলিক ও স্থানীয় জনজাতির ভাষা কুর্মালি, পাঁচপরগনি, খোরঠা, হো, মুন্ডারি, কুড়ুক, খাড়িয়া ও নাগপুরীকেও দ্বিতীয় ভাষা করার পক্ষে সায় দেওয়া হয়। সাবেক বিহারের দ্বিতীয় ভাষা উর্দুও বঞ্চিত হয়নি। আজ বিধানসভার বাদল অধিবেশনের শেষ দিনে নতুন রাজভাষা বিল পাশ করার মাধ্যমে একযোগে ওই এক ডজন ভাষার অধিকারেই সিলমোহর পড়ল।
তবে এত করেও সবার মন ওঠেনি। সাবেক বিহার থেকে ঝাড়খণ্ডে আসা কয়েকটি গোষ্ঠীও সরব রয়েছেন নিজেদের ভাষা নিয়ে। ভোজপুরি, মৈথিলি, মাগধী এবং অঙ্গিকা ভাষাভাষীদের গোঁসা, ‘আমরা কী দোষে বাদ পড়লাম?’ সুযোগ পেয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন রাজনৈতিক নেতারাও। ভোটব্যাঙ্কের কথা মাথায় রেখে ১২টি ভাষার পরে আরও ৪টি ভাষার হয়ে তাঁরা সওয়াল করেছেন বিধানসভায়। খোদ সরকারপক্ষে জামশেদপুরের বিজেপি বিধায়ক প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস এ দিন বিধানসভায় ওই ৪টি ভাষার প্রসঙ্গ তোলেন। আপাতত অবশ্য তারা তালিকায় ঢুকছে না।
একসঙ্গে ১২টি ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষার স্বীকৃতি দিলেও রাজ্যে সেগুলির পঠনপাঠনের হাল কিন্তু ‘অত্যন্ত করুণ’ বলে অভিযোগ। রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনজাতি ও আঞ্চলিক ভাষা বিভাগের প্রধান গিরিধারীরাম গঞ্জু বলেন, “ঝাড়খণ্ডের স্থানীয় ভাষাগুলি স্কুলে পড়ানোর লক্ষ্যে ’৮০-র দশক থেকেই এমএ কোর্স চালু হয়। ভাবা হয়েছিল এমএ ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক করে স্কুলে ভাষাগুলি পড়ানো হবে। এত দিন পরেও তা হয়নি। অথচ, বছর-বছর কত জন এমএ পাশ করছেন। নতুন ভাষা-নীতিতে রার আদিবাসী ও মূলবাসীরা স্কুলে মাতৃভাষা পড়ার সুযোগ পাবে তো?”
বঙ্গভাষী সমন্বয় সমিতি-র সভাপতি বিকাশ মুখোপাধ্যায়েরও প্রশ্ন, “রাজ্যের বহু বাংলা স্কুলকে হিন্দি স্কুল করা হয়েছে, সেগুলি ফের বাংলায় ফিরবে তো?” বাংলা-সহ বিভিন্ন ভাষার অ্যাকাডেমি গড়ার দাবিও উঠছে। বিকাশবাবু চান স্বশাসিত বাংলা অ্যাকাডেমি গড়ে অরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের হাতে তার দায়িত্ব দেওয়া হোক। এবং বাংলা পঠনপাঠনের নীতি ঠিক করুক তাঁরাই।
সূত্রের খবর, রাজ্যের যে অঞ্চলে যে ভাষাভাষীর সংখ্যা বেশি, সেখানে সেই ভাষা পড়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। বর্তমান পরিকাঠামোয় মাতৃভাষার প্রসার বাস্তবে কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিভিন্ন ভাষা-গোষ্ঠীর আন্দোলন কিন্তু বেশ জমে উঠেছে ঝাড়খণ্ডে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


