টিপাইমুখ ইস্যুতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই ব্যস্ততা দেখিয়ে কেটে পড়েন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। অন্যদিকে রীতিমত সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস। পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের অধিকাংশ প্রশ্নেরই কোনো উত্তর দেননি। তবে তিনি ভারতের পক্ষে ওকালতি করার ভঙ্গিতেই বলেছেন, টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারত যে আশ্বাস দিয়েছে তার ওপর বাংলাদেশ সরকার পূর্ণ আস্থাশীল। আমাদের চিন্তা করার কিছু নেই। ভারতের সঙ্গে কথাবার্তা যা হয়েছে তাতে উদ্বেগের কারণ নেই। বাংলাদেশকে কোনো কিছু না জানিয়ে টিপাইমুখ জলবিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দুটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়ার পরও ভারত এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য দেয়নি। এর পরও ভারতের ওপর কিসের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার এতটা আস্থাশীল, তার কোনো জবাব অবশ্য দিতে পারেননি পররাষ্ট্র সচিব।
উল্লেখ্য, গত মাসের ২২ তারিখে টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারত সরকার চুক্তি সই করে। গত ৩০ অক্টোবর ওই চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ করে সর্বপ্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় আমার দেশ পত্রিকায়। এক সপ্তাহ আগে এই ব্যাপারে বিবিসিসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ জানিয়ে এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা হতে থাকে। রহস্যজনকভাবে নীরব থাকে সরকার। গত রোববার থেকে সাংবাদিকরা সরকারের বক্তব্য জানার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গত মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি পুরনো বক্তব্য নতুন করে দেয়া হয়। ওই বক্তব্যে বলা হয়, টিপাইমুখ প্রকল্পে ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের মারাত্মক কোনো ক্ষতি হয়। অর্থাত্ ভারতও স্বীকার করছে ক্ষতি হবে, ‘মারাত্মক’ ক্ষতি হবে না। ভারতের পক্ষ থেকে ওই বক্তব্য দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যই মূলত তুলে ধরা হয়, যা অবাক করার মতো ঘটনা।
গতকাল বিশ্ব মার্কেটিং সম্মেলন আয়োজন উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে ব্যাপক সংখ্যক সাংবাদিক উপস্থিত হন মূলত টিপাইমুখ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য জানার জন্য। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব মার্কেটিং সম্মেলন আয়োজন সম্পর্কে একটি লিখিত বক্তব্য পড়েই উঠে পড়েন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় সাংবাদিকরা বলেন, টিপাইমুখসহ অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রশ্ন রয়েছে। ‘আমাকে অন্য একটি মিটিংয়ে যেতে হবে, সময় নেই। আগামীকাল কোনো এক সময়ে এ ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা করব।’—এ কথা বলেই কেটে পড়েন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন পররাষ্ট্র সচিব। সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান পররাষ্ট্র সচিব। একপর্যায়ে সচিব বলেন, একই প্রশ্ন কেন বারবার আপনারা করছেন। সাংবাদিকরা এ সময় বলেন, উত্তর পাচ্ছি না বলেই প্রশ্ন করা হচ্ছে।
টিপাইমুখ প্রকল্প সম্পর্কে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রেস রিপোর্টে টিপাইমুখ নিয়ে কিছু শঙ্কার কথা প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে ভারতের কাছে জানতে চেয়েছি। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত মঙ্গলবার জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছু করবে না ভারত।
মিডিয়ায় শঙ্কার কথা বলা হয়েছে। টিপাইমুখ নিয়ে এই মুহূর্তে আপনারা কি শতভাগ শঙ্কামুক্ত—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাদের বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে। ভারতের ওই আশ্বাসের ওপর সরকার পূর্ণ আস্থাশীল।
আপনাদের না জানিয়ে ভারত সরকার চুক্তি সই করেছে। এর পরও এতটা আস্থাশীল কীভাবে হলেন—এই প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব শুধু বলেন, আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এর বাইরে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশ চায় কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এই ধরনের প্রশ্নের আমি উত্তর দিতে পারি না।
টিপাইমুখ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারত সরকার যে চুক্তি করেছে, তা আপনারা কখন এবং কীভাবে জেনেছেন—এই প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এ ব্যাপারে আমাকে খোঁজ নিতে হবে।
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন বা কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশন থেকে এ ব্যাপারে কিছু জানানো হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এটা একটা ইস্যু। তারা কিছু জানিয়েছে কিনা তা দেখতে হবে।
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া টিপাইমুখ ইস্যুতে যৌথ জরিপের দাবি জানিয়ে মনমোহন সিংকে চিঠি দিয়েছেন। সরকার এটা সমর্থন করে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারি না।
এভাবে একের পর এক সাংবাদিকের প্রশ্নে জর্জরিত পররাষ্ট্র সচিব একপর্যায়ে বলেন, এসব প্রশ্ন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য থাক। তিনি এসব প্রশ্নের উত্তর দেবেন।
পররাষ্ট্র সচিবের এই মন্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় সংবাদ সম্মেলন
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


