কবিতা একটা বিমূর্ত সাহিত্যকর্ম। এমেন অনেক অধরা বোধ আছে যা কবিতার একটি মাত্র লাইনের মধ্যে দিয়ে সহস্র বীণার ঝঙ্কার হয়ে বর্ণিল আলোকছটায় ছড়িয়ে পড়েঅন্তরের নিভৃতকোণে। সেই কবিতার জন্মদাতা অর্থাৎ যিনি কবি তাঁরও কিন্তু দায়িত্ব অনেক। কবি দায়বদ্ধ সমাজের কাছে, দেশের কাছে, জাতির কাছে। তাই কবিকে হতে হয় সত্যানুসন্ধানী, এমনকি প্রয়োজনে প্রতিবাদীও। তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ কাজী নজরুল ইসলাম।
কিন্তু কবি যখন সত্য থেকে বিচু্যত হন তখন কি তাঁর মৃতু্য ঘটে না। অবশ্যই ঘটে। যেমনটি ঘটেছে কবি আল মাহমুদের ক্ষেত্রে। আমি একসময় কবি আল মাহমুদের একনিষ্ঠ ভক্ত, পাঠক ছিলাম। 'পানকৌড়ির রক্ত' গল্পের মধ্যে দিয়ে তাঁর সাহিত্যকর্মের সাথে আমার পরিচয়। এরপর সম্মোহিতের মতো এক এক করে পড়ে গেছি কালের কলস, লোক-লোকান্তর, সোনালি কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে এমন অনেক কবিতা সম্ভার। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী সত্ত্বা, ভিন্ন প্রকাশভঙ্গি, বর্ণনার সাবলীলতা মুগ্ধ করে সবসময়। এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল সোনালি কাবিনের সেই অসাধারণ লাইনগুনি -
সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিনী,
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু'টি,
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি,
আহত বিক্ষত করে চারিদিকের চতুর ভ্রুকুটি;
....................................................
সেই আত্মবিক্রয়ে আপোষহীন কবি আল মাহমুদ একদিন হয়ে গেলেন চরম আস্তিক। তাতে আমার তাঁর প্রতি ভালোবাসার কোন ব্যতয় ঘটেনি। মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হতেই পারে। এতোদিন তিনি যেটা করে এসেছিলেন সেটা হয়তো সময়ের ব্যবধানে তাঁর কাছে ভুল বলে প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু যখন তাঁকে দেখলাম দেশদ্রোহী, রাজাকারদের সাথে একই মঞ্চে তখন আমার বুক ফেটে গেল। আমি সত্যানুসন্ধানী কবির ছায়াও খুঁজে পেলাম না কোথাও। এখন তিনি জামাতের রোল মডেল। এখন তাঁর বক্তব্যে আর সাঈদীর বক্তব্যের মধ্যে বিষয়গত কোন পার্থক্য নেই শুধু প্রকাশভঙ্গির ভিন্নতা ছাড়া। আরো অবাক লাগলো তাঁর এক সাক্ষাতকার পড়ে। তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে অনেক ভুরি ভুরি বিশেষণের আদিখ্যেতায় ভাসিয়ে দিলেন, এমনকি জিয়াউর রহমান যে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তের জন আর্মি অফিসারকে ফাঁসি দিয়েছিলেন সেটাকেও এক বাক্যে জায়েজ করে দিলেন এই বলে, 'জিয়াউর রহমান সাহেব কোন ভুল করেননি তাদের ফাঁসি দিয়ে।' একজন কবির এমন নির্লজ্জ তৈলমর্দন আমাকে চরম বিস্মিত করেছিল। হায়রে আমার এক সময়কার চরম সাহসী, লোকধর্ম আর ভেদাভেদ ঘুচে দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ী কবিও কেমন রাজনীতির তাওয়াতে ভাজা ভাজা হয়ে গেলো। ক্ষমতালিপ্সুরা নিজের স্বার্থে কেবল এপিঠ-ওপিঠ করে ভেজে চলেছে কবির অমৃত বয়ান।
সেই ঘটনার পরেই আমার পাঠক মনে মৃতু্য ঘটলো শৈশব থেকে মুগ্ধ বিস্ময়ে লালন করা কবির যার নাম আল মাহমুদ, তেমন কি আরো অনেকের নয়?
*** এই লেখাটার পিছনে একটা উদ্দেশ্য আছে, নিশ্চয় আমার কথাগুলো তাঁর অন্তরে গিয়ে পৌঁছুবে। আর কোন কবির অপমৃতু্য দেখতে চাই না বলে এক বুক ব্যাথা নিয়ে লিখতে হলো এই পোস্টটা। কবি আপনি সত্যের কথা বলুন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



