নুরু পাগলা। বয়েস এখন তাঁর প্রায় 55 বছর। বিশ বছর বয়েসে তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন দেশকে বর্বর হায়েনাদের হাত থেকে মুক্ত করতে। কি দুর্বার আর দৃঢ়চেতা যোদ্ধা ছিলেন! কতো ব্রিজ-কালভার্ট, পাক বাহিনির দুর্গ উড়িয়ে দিয়েছিলেন মুহুর্তেই, বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলেন পশ্চিমা পিশাচদের বুক- তার হিসেব নেই। তাকে কমান্ডার ডাকতো ইয়াং টাইগার বলে। সেসময় পূর্ব সীমান্তে টাইগার বাহিনি ছিল দুর্ধর্ষ একদল গেরিলা যোদ্ধার নাম। তাদের নিঁখুত পরিকল্পনা আর অবর্ণনীয় সাহসের কাছে বার বার শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে পাকিস্তানি সেনাদল। তারা গ্রামের পর গ্রাম তছনছ করেছে তাঁকে ধরার জন্য- তাঁর বাবা মা ভাই ভাবীকে নৃশংসভাবে হত্য করেছে বায়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে- ছোট বোনকে তুলে নিয়ে গিয়েছে ক্যাম্পে- দিনের পর দিন নিযর্াতন করেছে- শেষে হত্যা করেছে। কিন্তু এসব কিছুই বিচলিত করতে পারেনি নুর উদ্দিনের মুক্তির উদ্দেশ্যে পথ চলাকে । স্বাধীনতার সূর্যকে তিনি ঠিকই হাতের মুঠোয় পুরেছেন। জাতিকে উপহার দিয়েছেন গর্বিত লাল-সবুজের পতাকা আর ছোট্ট শ্যামল ভূ-খন্ড।
সময় অনেক কেটে গেছে। কালের স্্েরাতে একাত্তরের শান্তি বাহিনির সদস্য ফারুক চৌধুরী এখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। জামাতের লেভেলধারী নেতা। ইউনিয়ন পরিষদের বৈঠকখানায় তার ছবির পাশে গোল্ডেন ফ্রেমে বাঁধানো বীর মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র। শুধু নুর উদ্দিনই কোন সরকারের কাছ থেকে কখনো কোন সনদ পেলেন না, পেলেন না মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কিংবা সামান্য সম্মান। এসব নিয়ে তাঁর কোন আক্ষেপও ছিলো না কখনো। তাই তিনি গর্বের সাথে তাঁর ছেলে মেয়েদের বলতেন- আমি যুদ্ধ করছি একটা স্বাধীন দেশের লাইগা, হেইডা পাইছি, এইডাই আমার সবচাইতে বড় পুরষ্কার। আর কিছুর দরকার নাই।
যুদ্ধের পর তিনি গঞ্জে একটা কাপড়ের দোকান তুলেছিলেন অনেক কষ্ট করে। সেটার আয় দিয়ে তাঁর খেয়ে পড়ে দিন যাচ্ছিল। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন একটু ভালো ঘর দেখে। কিন্তু সুখ সইলো না। এ জগতে রবি বাবুর সেই কথাটাই বার বার সত্যি হয়ে আসে সবসময়- সেই বেশি চায় যার আছে ভুরি ভুরি। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় দেড় বছরের বেশি স্বামীর ঘর করা হয়নি আসমার। এখন সে তার শিশুকন্যাসহ বাবার বাড়িতে আশ্রিতা। ছোট মেয়েটা মোটামুটি স্বামী সংসার নিয়ে ভালোই আছে। কিন্তু এখন আর যোগাযোগ নেই। পাগল-ছাগল বাবার সাথে কে আর যোগাযোগ রাখে! ছোট ছেলে খসরুর ঘটনাটাই খুব মর্মান্তিক।
অনেক কষ্ট করে ছেলেটাকে ভর্তি করিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো। কিন্তু কারো সাতে পাঁচে না থাকা সেই শান্ত ছেলেটা ভার্সিটিতে গিয়ে কিভাবে জানি বাম রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গেল। সেবার কি এক গন্ডগোলে ভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেলো। তিনমাস গ্রামে এসে ছিল একটানা। তখন গ্রামের মানুষদের বিপ্লবের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো। ধর্মের নামে ব্যবসা আর ধর্মান্ধদের কুসংস্কার অন্ধবিশ্বাস সম্পর্কে গ্রামের মানুষদের সচেতন করার চেষ্টা করছিলো। সেটাই হলো কাল। কারণ এসব একেবারেই পছন্দ হয়নি চেয়ারম্যান সাহেবের। গ্রামের মানুষের ভালো মন্দ দেখার জন্য তিনিই তো আছেন। সেখানে কিনা সেদিনের ছোকরা- মুখ থেকে যার এখনো দুধের ঘ্রাণ যায়নি সে এসেছে ধর্ম সম্পর্কেজ্ঞান দিতে! এটা কি কোনভাবে বরদাশ্ত করা যায়? চৌধুরী সাহেবের তরফ থেকে তার পোষা কুত্তারা বেশ কয়েকবার সতর্ক করে দিয়েছিলো খসরুকে এসব নিয়ে মাথা না ঘামাতে। কিন্তু খসরুর শরীরে যে বইছে তার দু:সাহসী বাবার বিশুদ্ধ রক্ত। সে কি মানবে এসব রক্তচক্ষুর শাসানী?
(পরের পর্বে সমাপ্তি.....)
** গল্প লেখা আমার ধাতে নেই। শুধু একজন বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর সমবেদনা আর আমার অক্ষমতা থেকেই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০০৬ দুপুর ১২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



