
অন্ধের হাতি দেখার একটা গল্প শুনেছিলাম স্কুল জীবনে। অনেকদিন পর আজ সেই গল্পটা মনে পড়লো। অন্ধরা কিছু দেখতে পায় না বিধায় যেখানে যা কিছু অনুভব করে তা-ই বিশ্বাস করে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাড়াও সমাজে কিছু অন্ধমানুষ থাকেন। একসময় যারা পড়তে পারতো না, তাদেরকে আক্ষেপ করে বলতে শুনতাম, “চোখ থাকিতে অন্ধ”। আজকাল দেশে দেশে পড়তে পারা শিক্ষিত জনগোষ্ঠির মাঝেও দেখি সেই “চোখ থাকিতে অন্ধ”দের। ওরা প্রচুর পড়াশুনা করে ডিগ্রীর পর ডিগ্রী অর্জন করেও কিছু কুপমুন্ডুকতা থেকে বের হতে না পেরে চোখে ঠুলি এটে অন্ধ হয়ে বন্ধ ঘরে বসে থাকেন। এটাও ভাবে না, অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। মরুর উটের মতো ঝড় ওঠলেই বালিতে মাথা ঢুকিয়ে দেন। এই শ্রেণির মানুষকে আবার একটা শ্রেণির মানুষ খুব সহজেই কাজে লাগিয়ে নেন। ওরা মূলতঃ মেন্টরের কাজটা করে থাকেন। অন্ধ বিশ্বাসটাকে কাজে লাগিয়ে তাদের নানামুখী প্রলোভন দিতে থাকেন। সরল বিশ্বাসীরা অনেক সময়ই লোভী হয়ে থাকেন, অল্প কিছুর লোভে তারা অনেক কিছুই ভুলে যান। ব্রেইন ওয়াশ এমন ভাবে করা হয়, ওরা সারাক্ষণ একটা মোহের ভিতর পরে থাকেন।

একটা গল্প আছে, সত্যি কিনা জানি না। আত্মঘাতী হামলা চালাতে গিয়ে এক জঙ্গী মারত্বক আহত হলেও কোন ক্রমে বেঁচে যায়। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর সে সুন্দরী একজন নার্সকে দেখে খুব হতাশ হয়ে বললো, একজন কেন, বাকি ঊনসত্তুরজন কোথায়? . . . . . . . . . . .
বাস্তব বা বিজ্ঞানকে এরা বুঝেন না, বা বুঝতে চান না, এবং বুঝার চেষ্টাও করেন না। কেউ বিজ্ঞান নিয়ে কথা বললে, যুক্তির কথা বললে ক্ষেপে যান, তেড়ে আসেন। বুদ্ধি দিয়ে বুদ্ধি কিংবা যুক্তি দিয়ে যুক্তি খণ্ডনের লড়াইয়ে ওরা খুব দুর্বল। তাই কখনো ফতোয়া, কখনোবা চাপাতিই তাদের সম্বল হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞান সব সময় চলে যুক্তি আর প্রমাণে, ধর্ম চলে বিশ্বাসের জোরে। বিজ্ঞানের চর্চা এবং আবিষ্কারের কোন শেষ সীমা পরিসীমা নেই। এখনো অনেক কিছু নিয়ে গবেষণা চলছে, অনেক কিছুই রহস্যের বেড়াজালে আটকে আছে। বিজ্ঞান রহস্য উন্মোচনে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। অজানাকে জানার, অজেয়কে জয় করার অবিচল প্রচেষ্টা বিজ্ঞানের। সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো সম্পর্কে সজাগ, অতিক্রমের সংগ্রাম তাই সর্বদা।
আমার জানামতে প্রায় প্রতিটি ধর্ম প্রবক্তাই তাঁর নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ, স্বয়ং সম্পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় বলে গেছেন। ধর্মে যুক্তির স্থান অত্যন্ত সংকীর্ণ। সেখানে বিশ্বাসের দৌরাত্ব প্রবল, হোক সেটা অযুক্তির বা অন্ধ ভাবনার।
ধর্মবিশ্বাস আর বিজ্ঞানপ্রমাণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিজ্ঞান বিশ্বাস করে সম্পূর্ণ প্রমানের পর। যুক্তিতর্ক ও গবেষণায় সঠিক প্রমাণিত হলেই বিজ্ঞানে বিশ্বাস স্থাপিত হয়। তারপরও অনেক বিষয় আপেক্ষিক থেকে যায়। যুক্তির পর নতুন যুক্তি আসে, পরিবর্তনকে মেনে নেয় এবং স্বাগত জানায় বিজ্ঞান। আর ধর্মে বিশ্বাসটা রাখতে হয় প্রমাণের অপেক্ষা না করেই। ধর্মের বাণী অনড়, পরিবর্তন বা পরবর্ধনের কোন সুযোগ এতে নেই। যুক্তিতর্ক ধর্মে মুখ্য না কখনোই, বরং ক্ষেত্রবিশেষে নিষিদ্ধও। চোখ বন্ধ করে মেনে নেওয়া বা সমর্পিত হওয়াই মূখ্য। ধর্ম স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অপরিবর্তনশীল অর্থাৎ স্থবির।
ভালমন্দের হিসেব বিজ্ঞান করে বিবেক, যুক্তি আর মানবিক কল্যানের ভাবনায়। আর ধর্ম তা করে থাকে প্রবর্তিত নিজস্ব গ্রন্থের বানীর আলোকে। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে বিবেকবোধ ও মানবতা পর্যুদস্ত হয়।
সুতরাং ধর্মকে বিশ্বাসের মর্যাদায় বিশেষ স্থানে রাখাই শ্রেয়। আর বিজ্ঞানকে গবেষণা, যুক্তিতর্ক, পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে, মানবতাকে সমুন্নত রেখে সভ্যতা বিকাশে এগিয়ে নিয়ে যাবার হাতিয়ার হিসেবেই দেখি। অকারণে অযথা ধর্মকে বিজ্ঞানের যুক্তিদণ্ডে পরিমাপ বা বিজ্ঞানকে ধর্মের খাঁচায় বন্দীর পাঁয়তারা না করাটাই কি শ্রেয় নয়?
(ছবি নেট থেকে সংগৃহীত)
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০১৮ বিকাল ৫:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


