আমি দিন দিন নিশ্চিত হচ্ছি আমাদের লেখকেরা আমাদের নিম্ন পর্যায়ের বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন মানুষ ভাবে কিংবা আদৌ তারা আমাদের মানুষ ভাবে কি না এ নিয়েও আমার সংশয় গাঢ় হচ্ছে প্রতি দিন। আনিসুল হক সাহেব ভালো লিখেন তবে আমার মনে হয় লেখার বিষয়ে তার মনোযোগ এখন শুন্যের কোঠায়, বরং তিনি বাহবা পাওয়ার জন্যই লিখছেন হয়তো। গতকাল তার এক উপন্যাস পড়ছিলাম, অন্ধ এক ছেলেকে নিয়ে লেখা উপন্যাস, বিষয়টা একটু অন্যরকম, উপন্যাস হিসেবে সব রকমের জিনিষ সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা ছিলো। অসহ্য লাগলো যখন পড়লাম সেই অন্ধ যুবক ডেইলি স্টারের ওয়েব পেজে কিছু একটা পড়লো। আমি মোটামুটি নিশ্চিত এখনও বাংলাদেশে এমন সচতনতা আসে নি যে কম্পিউটার স্ক্র ীনে ব্রেইল পদ্ধতিতে ওয়েবপেজ আসবে। এবং সেই ওয়েবপেজ ডেইলিস্টারের কল্যানে পেয়েও গেলো অন্ধ ছেলে। অমনোযোগিতা নয় এটা, এটা ইচ্ছাকৃত ভাবনার সমপ্রসারন। তার মনে হয়েছে এভাবে বললে বিষয়টা আধুনিক হলো। পাঠক শালার বেটা রাম ছাগল। লতা পাতা খায়, ও কি আর বুঝবে ওয়েব পেজ জিনিষটা ব্রেইলে লেখা না কি এমনি স্ক্র ীনে আসে? অপমানিত বোধ করছি আসলে।
এমন ভাবেই অপমানিত বোধ করি যখন অনুভব আর বাস্তবতার ভেতরের ফারাক রাখেন না কোনো আধুনিক কবিকূল। সূর্য গলে গলে পড়ছে, জ্যোৎস্নার বৃষ্টি ঝড়ছে শব্দগুলো একেবারে অপ্রাকৃতিক, তবে অনুভবের জায়গায় গেলে আমি হয়তো এমন অসম্ভব বিষয়টাকে একটা পাশ মার্ক দিয়েও দিতে পারি। শিল্প বাস্তবের অবিকল প্রতিরূপ হতে হবে এমন দোহাই না দিয়েও বলা যায় সাম্ভাব্য সব রকম সমাবেশ আসলে পছন্দনীয় না। কিংবা বাস্তবসম্মত উপমা এবং অবাস্তবঘটনাপ্রবাহ বর্ণনার ভেতরে নু্যনতম একটা ব্যাবধান আছে। আমার অভিমত কিংবা আমার দর্শন এমনটাই যে পাঠক কসরত না করেই বুঝে নিতে পারবে কোনটা আমার অনুভবের জায়গা কোনটা আমার বাস্তবতার ভিত্তি।
ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটা বোধকরি আধুনিক কবিদের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে।ছন্দ অক্ষুন্ন রেখে, ধারাপাত মেনে অন্তঃমিলের ক্লান্তিকর প্রয়াসে কবিতার প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাদের নিষ্ঠুর ব্যাবচ্ছেদশৈলীতে কবিতার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। বিউটিফিকেশনের দূর্বল প্রচেষ্টা অঙ্গসৈষ্ঠব বাড়ানোর বদলে কবিতাকে কদাকার করে। কিংবা কবিতাকে গণিতশাস্ত্রের দোহাই দিয়ে কদাকার করার প্রক্রিয়াটাও শুরু করেছে আধুনিক কবিরা।
অবশেষে ছাপার অক্ষরে সামনে যা আসে তা অক্ষর, জ্যামিতি আর অংকের দুর্বোধ্য মারপ্যাঁচ। সেখানে সাবলীলতা নেই বরং কাঠামো আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরে কবিতার শ্বাসরোধ করে, তাকে সীমাবদ্ধ করতে চায়। অভিনবত্বের খোঁজ হয়তো আছে- সেই চিরপুরাতন কথাকে নতুন আঙ্গিকে বলতে চাওয়ার আন্তরিক বাসনা কাজ করে।
নেহায়েত স্তনবৃন্তকে কিসমিস মনে হয়েছিলো তাই সার সার আঙ্গুর ক্ষেতে কিসমিস ফলে-কিসমিস বাগানে মাছিও বাসে অকারনে। সেই ভাজা বাদাম গাছ থেকে পাড়ছি আমরা- দাঁতে কুট্টুস করে ভাঙ্গছি আর বাদাম তেলের গন্ধে মাতোয়ারা হচ্ছি প্রতিনিয়ত।
অবশ্য উলটা পালটা বুঝ দিয়ে দেওয়া যায়- এটাই আধুনিক রীতি- গাছে মিসাইল ফলবে-সেখান থেকে পাকা ফলের মতো বৃন্তচু্যত স্তন ঝাপিয়ে পড়বে যেনো পাকা দাড়িম্ব-স্তনের ভাব বেলের মতো হলে অনায়াসে বলা যায় তাতে কাক-কবির কি আসে যায়।তবে গুরু সুকুমার -তিনিও বুঝেন নি বয়সকালে- বেলের মাথায় কিসমিস জুড়ে দিলে তা কুমারী স্তন হয়ে যায়।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ অক্ষর মেপে কবিতা লিখেন-তবে অক্ষর মাপতে গিয়ে কবিতার শাড়ী খুলে যায়। বিবস্ত্রা কবিতা করূন সুরে গান করে- দে পানাহ, দে পানাহ-
ছন্দেই লিখতে হবে কেনো? নিজস্ব কল্পনা যেখানে শেষ সেখানে অভিধান খুলে সঠিক অক্ষর দৈর্ঘের শব্দ সংস্থাপন অযৌক্তিক-মুক্তার খাঁজ কাটার মতো অশালীন। তবে গাণিতিক নিয়মের প্যাঁচে সহজাত কবিতা হত্যা প্রথাসিদ্ধ, সবাই কি আর আন্তরিক নজরুল যার সহজাত আবেগ ছন্দে বাধা পড়ে থাকে। অপরূপ চিত্রময়তা যার গানে।
অবশ্য নজরূলের গান নেই সবই সঙ্গীত এবং সংগত কারনেই তা সং দ্্বারা গীত। তবে মাঝে মাঝে অকারণে নজরূল ভর করে আমাকে-সারাদিন গুনগুন মাথার ভেতরে-
" আমার নয়নে নয়ন রাখিয়া পান করিতে চাহো কোন অমিয়
আছে এ আঁখিতে উষ্ণ আঁখিজল, মধুর সুধা নাই পরাণপ্রিয়"
এমন মায়াজাল নজরূলেই সম্ভব
কিংবা যখন গেয়ে উঠে গায়িকা
"হিজল বিছানো বনপথ দিয়া
রাঙ্গায়ে চরণ আসিবে গো প্রিয়া"
বুকের ভেতর উঠালপাথাল করে, নজরূলে বিবশ হয়ে থাকি- এমন ইন্দ্রজাল নজরূলের পক্ষেই সম্ভব হয়তো। ছন্দে আবেগে সাবলীলতায় তর তর বয়ে যায় কবিতার তরনী।
আমার হঠাৎ করেই কোনো কোনো দিন একটা গান হুট করেই মাথার ভেতরে অবিরাম বাজতে থাকে- এবং আমার সীমাবদ্ধ স্মরণশক্তিতে কিছুক্ষণ পর দেখা যায় সুর আছে কথা নেই। এবং কথাহীন সুর মাথার ভেতরে ঘুরছে আর আমাকে অস্থির করছে-
কয়েক দিন আগে কোনো এক কারনে নিলয়ের গাওয়া একটা গান মাথায় ঢুকে পড়লো- 2 দিন খুঁজছি গানটার কথা- সম্ভব- অসম্ভব বিভিন্ন প্রচেষ্টার পর অবশেষে সেই গান খুঁজে পেলাম। শুনলাম একবার, ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেলো।
আজ দুপুর থেকেই মাথায় ঘুরছে শ্র ীকান্ত-
তুমি যে আমারই রাজকন্যা
এটুকু ভেবেই হোক বাসর যাপন-
নয় থাকলে আরও কিছুক্ষণ"
" এখনই বলো না চলে যাই শুধু একটু ভাবতে দাও তুমি যে আপণ"
কোনো কারণ নেই, তাই অকারণ কাতরতা তৈরি হয় ভেতরে। আমার বর্তমানে গান শোনার কোনো ব্যাবস্থা নেই। আমি সুরের সংক্রামণ থেকে বাঁচার তাগিদে এদিকে ওদিকে যাই- নাছোরবান্দা সুর মাথার ভেতরে ঘাঁই মারে।
হয়তো এ জন্য দায়ি আমার গান শোনার ধরণ। একবার কোনো গান মাথার ভেতরে ঢুকে গেলে সারাদিন সেই গান শুনে সবার বিরক্তির কারণ হই। চন্দ্রবিন্দুর
" এইটা তোমার গান
তুমি লোড শেডিংয়ে চাঁদের আলোর সর
তুমি জ্বরের শেষে রৌদ্্রধোয়া ঘর" শুনেছি টানা 6 ঘন্টা।
কোনো একদিন শাহাজান মুন্সি অতর্কিতে হামলা চালানোর পর সেই দিন টানা শুনেছি
" আমায় যতো দাও হে ব্যাথা, হৃদয়ে রাখিব গাঁথা, এক দিন জানি ব্যাথার হবে অবসান"
একদিন সারাদিন শুনলাম " কেনো যামিনী না যেতে ডাকিলে না বেলা হলো মরি লাজে"
তবে গানের সুরের সাথে কথাও আমার কাছে প্রধান বিষয় মনে হয় বলেই গানের গীতিসুধার বদলে কব্যসুধায় আকৃষ্ট হই বেশী। সাধারন শব্দগুলো সুরের পালে উজান পাড়ি দেয় দেখে মুগ্ধ হই প্রতিনিয়ত।
আর আমার মন কেমন করে-এক দিন সারাদিন ভ্রমর কইয়ো গিয়া হাহাকার করেছিলো ভেতরে ভেতরে, কোনো এক রাধারমন( নামটাই ক্যামোন য্যানো, রমণের বিষয়টা গোপনে উপস্থিত থাকলেও তা প্রধান উপজীব্য না এই গানে) সহজ ভাষার গাঁথুনিতে ব্রজপ্রেমের বানী শুনিয়েছেন।
একটা গল্প, একটা আখ্যানের পর্দা উম্মোচিত হতে থাকে- অবশেষে সারাজীবনের হাহাকার বাজে বুকে, আমাদের সবারই অধিকারের সীমানা নির্ধারিত, যে যতটুকু কাছে আসতে দেয় ততটুকুই আমাদের অধিকারের সীমানা
আমরা এইসব ছককাটা ঘরে বাঘবন্দি খেলি- অনবরত রক্তাক্ত হই তবে প্রস্থান থামাতে পারি না- আমাদের এই যাবজ্জ ীবন অঘটনের মর্মপীড়া আক্ষেপ অনুদিত হয় শব্দে
আগে যদি জানতাম রে ভ্রমর যাইবা রে ছাড়িয়া
মাথার কেশ দুই ভাগ করি রাখিতাম বান্ধিয়া
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


