এই জয়ে কোনো পরিবর্তন হবে বাস্তবতার? অধঃপতিত মানবতার উত্থান হবে? যে ছেলেটা খালি গায়ে কাগজের পতাকা হাতে ছুটছে, এরশাদের শালীন ভাষায় যার নাম পথকলি- সে ছেলেটার ভবিষ্যত বদলে যাবে এই বিজয়ে? এসবের কোনো কিছুই ঘটবে না। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র বদলাবে না। রাস্তায় ঠেলা গাড়ীতে পসরা সাজিয়ে দুঃসহ গরমে হাঁটতে থাকা মধ্য বয়স্ক মানুষটাও একই ভাবে পরদিন এর পরের দিন গাড়ী ঠেলতে ঠেলতে সামনে আগাবে। আইন প্রতিষ্ঠার নামে তার এই ছিন্নমূল ব্যবসাকেন্দ্রের খোঁজও থামবে না।
প্রায় প্রতি দিন যেসব পরাজিত মানুষের মুখ দেখে রাস্তায় হাঁটি তাদের বাস্তব জীবনের কোনো পরিবর্তন হবে না। আমার নিজের কাছে এসব অর্থহীন- এমন কি সন্ধ্যায় ফুটপাতে প্লাস্টিক বিছিয়ে বসে থাকা সিগারেটের বিক্রেতা আর তার পাশের চায়ের দোকানীর খুনসুটিও তেমন ভাবে স্পর্শ করে না। তাদের ভেতরে অরক্তজ সম্পর্ক হয়ে গেছে। জীবনযাপনের প্রয়োজনে এমন নানাবিধ সম্পর্ক গড়ে তোলে মানুষ। বড় বড় রাষ্ট্রগুলো ছোটো রাষ্ট্রের উপর প্রভাব খাটাতে নিজেদের সংঘ গড়ে তোলে, এসব প্রাতিষ্ঠানিক সম্পকের্র সাথে এইসব ছিন্নমূল মানুষের জীবনের প্রয়োজনে নেওয়া সম্পকের্র সমিল এটুকুই সবাই অথের্র প্রয়োজনে এসব সম্পর্ক গড়ে তুলছে। বড় বড় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সামান্য সুবিধা দিতে এসব করছে আর আমাদের ছিন্নমূল মানুষের বিপদের সঙ্গি খুঁজতে এসব সম্পর্ক গড়েছে।
আমার কাছে এদের কারোই কোনো নাম নেই। এরা সবাই আমার কাছে নামবিহীন জীবনপুঞ্জ। প্রয়োজনে দরিয়া বিবি, বাদশাহ মিয়া, মজনু ফকির, বিভিন্ন নাম লাগিয়ে দেওয়া যায়। উন্নাসিক মধ্যবিত্তের মতো এদের নামের সাথে সুললিত বিশেষণ আশা করে না কেউ। আমি নিজেও মধ্যবিত্ত পটভূমিতে থেকে ভাবতে পারি না এইসব নিম্ম বিত্ত মানুষের নাম হবে সুজাতা- সুলেখা, ফাহিবা, ফরিবা, আহামাদ কিংবা মাহমেদ নামও এরা গ্রহন করবে না। এসব নাম আমার গল্পের মধ্যবিত্ত খানিকটা বিলাসী মানুষের জন্য বরাদ্দ।
তাই সিগারেট কেনার সময় সামান্য যেটুকু সময় লাগে সেই টুকু সময়েই খুঁজে পাই উজ্জ্বল বক্তব্য-
ঘটনা সামান্য- মধ্যবয়স্ক মহিলা তার পাশের যুবক বয়সী সিগারেটের দোকানীকে এক কাপ চা দিয়েছে- যুবক মহিলাকে মামী ডাকে।
মামী ভাইগনাকে চা দিছে- ভাইগনা চায়ের দাম দিয়া দিবো।
মহিলা মারমুখী, পাশের দোকান থেকে লাফ দিয়ে সিগারেটের দোকানের সামনে আসলো। এসে বললো ইনসাল করো মামিকে। মামি ভালোবাসে দিছে, মামীর ভালোবাসার দাম দাও। ইনসাল করো মামীকে।
এসব সহজ সরল কথায় আসলে দৃশ্যটা প্রকাশিত হয় না। প্রকাশিত হয় না সম্পকের্র গভীরতা। প্রশাসন আইন করেছে ফুটপাত দখল মুক্ত করতে হবে। সেখানে ডার্টি পিপল থাকবে না। নিয়মিত ধোয়া মুছা করছে ওয়াসার পানি দিয়ে রাস্তা আর ফুটপাত। সেখানেই পুলিশের হামলার ঝুঁকি নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে থাকে এসব দোকানী। বিশেষত সন্ধ্যার পর, যখন আমাদের সুবেশ, সুবোধ মধ্যবিত্ত মানুষেরা যেহেতু 7টার পর মার্কেট বন্ধ তাই নেতান্ত বাধ্য হয়ে ঘরে ফিরে আসে। এই ঘরে ফেরার সময়টার আশে পাশে কিংবা এর পরে যখন আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজ নোংরা ফুটপাতে তাদের পবিত্র পদ স্থাপন করবেন না ঠিক তখনই এরা একে একে ফুটপাতে পসরা সাজায়।
এদের ক্রেতা শ্রেনীও নির্দিষ্ট। মাঝে মাঝে পথ চলতি আমার মতো কিছু মধ্যবিত্ত বাদ দিলে এদের মূল ক্রেতা সমাজ হলো রিকশাওয়ালা দিনমজুর। এবং সেই সব অসংখ্য মানুষ যারা আসলে ফুটপাতেই রাত কাটায়। আগেও কাটাতো কিছু কিছু তবে বস্তি উচ্ছেদ করে আইন শৃঙ্খলা পরিবেশ উন্নয়ন আর দূর্নীতি দমন শুরু হওয়ার পর সেই সব বস্তিবাসীদেরও এখানে উঠে আসতে হয়েছে।
সরকারী রাস্তায় পড়ে থাকলে তেমন ক্ষতি নেই। ভবঘুরে আইনে এদের ধরে নিয়ে যাবে থানায় এমন মুর্খ না বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন। তাছাড়াও থানায় লক আপ জেলখানায় তীব্র স্থান সংকট। নামীদামি মানুষেরা জেলখানার তারকা হয়ে যাওয়ার পর তাদের বিলাসী জীবনের জন্য আলাদা বন্দোবস্ত করতে হওয়ায় কয়েদিদের স্থান সংকুলানে সমস্যা হবে। তাই এখন সরকারী রাস্তায় কাটানো অনেক সুবিধা জনক।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এসে বাস্তবতা বিনির্মাণের অভিপ্রায়ে আমাদের নাক উঁচু বিকল্প ধারার চলচিত্র নির্মাতাদের ভঙ্গি মনে পড়ে। আমাদের বাস্তবতা নির্মাণ করতে গিয়ে তাদের বিষয়বস্তুর নির্বাচন এবং নির্মাণশৈলিতে একটা করূণ বিষন্নত ভাব আছে। একটা পরাজিত মানসিকতা উর্ধে তুলে ধরার প্রবণতা আছে।
মানুষ মাত্রই পরাজিত হচ্ছে, বাস্তবতা নিঙরে ফেলছে মানুষগুলোকে। এইসব নিয়ে আমাদের মধ্যবিত্ত অপরাধবোধও আছে। আমরা, যেভাবে আমাদের চিত্রিত করা হয়, পরলৌকিকতার গ্রাসে চলে গেছি। আমাদের ইহজাগতিক সুখবোধ খানিকটা অপরাধ প্রবণ করে তোলে আমাদের। তাই সেইসব তথাকথিত বিকল্প ধারার ছবিতে মানুষ ক্রমাগত ধারাবাহিক পরাজিত হয়। পরিস্থিতির কাছে, পরিবেশের কাছে তারা শুধু মাত্র পরাজিতই হয়।
কোনো রকম বিলাসিতা বিবর্জিত ম্লান অন্ধকার জীবন নির্মানে তারা সফল। এইসব বিকল্প ধারার বালছাল নির্মাতারা আসলে তাদের ভোক্তা শ্রেনীর মানসিকতাও বুঝে। এইসব বিকল্প ধারার চলচিত্রের দর্শক বাংলাদেশে কারা। সংস্কৃতিসেবী বলতে আমরা যাদের এখানে পাই এইসব ছবির দর্শক হিসেবে তারা সবাই কোনো না কোনো ভাবে উচ্চ মধ্যবিত্ত বলয়ে বসবাস করে। আর আরও একশ্রেনী আছে যারা বামধারার আন্দোলন করে। মূলত এদেরই দাক্ষিণ্যে চলছে বিকল্পধারা চলচিত্র উৎসব। এদের মানসিক চাহিদা পূরণের জন্য এসব করুণ পরাজয়ের গল্পই ভালো। তারা মৃদু দুঃখবোধ নিয়ে বাসা ফিরে যাবে। তারা আরও একটা করুণ কবিতা লিখবে। আরও একটা এনজিও সাহিত্য লিখে ফেলবে আমার মতো- অনেক কিছুর প্রণোদনা পেয়ে যাবে তারা এর ভেতর থেকে। বামধারার লোকজন আশ্বস্ত হবে- আহা বিপ্লবের কাল সমাগত প্রায়- এমন নিস্করূণ জীবনযাপন করে একদিন নিরন্ন প্রতিবাদমূখর হয়ে উঠবে।
তবে এই জয় সেইসব মধ্যবিত্ত আবেগকে ছুতে পারবে না। আমাদের বিজয়ের বোধটা সেখানেই স্থাপিত। আসার পথে দেখলাম প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা বিশাল একটা পতাকা নিয়ে রাস্তায় রং ছিটাচ্ছে। তাদের আনন্দের প্রকাশ এমনই- একদিন হলো- ছেলেবুড়ো সবাইকে রাঙ্গিয়ে দাও। যদিও এটাতে সেই ব্যক্তির সম্মতি আছে কিনা এটাও জানা জরুরি তবে এই একটা সুযোগে একটা প্রেম এনে দাও ভগবান ভাবা মোবাইলে রং নাম্বারে প্রেমখোঁজা যুবকেরা তরুনীতে ভাবতরনীতে দোলা দেওয়ার সামান্য সুযোগ পায়।
আমি এটাকেও নিন্দনীয় ভাবছি না। উল্লাসের প্রকাশ উচ্ছ্বাসের প্রকাশ এমনই হওয়া ভালো হয়তো। আমি বেশী মাত্রায় খুঁতখুঁতে হয়ে গেছি।
এই বিজয়ের আনন্দ পরাজিত মেরুদন্ডে যে ধাক্কা দেয় সেটাই আসল প্রাপ্তি। এমরাও দাঁড়াতে পারি মাথা উঁচু করে। আমরাও দেখিয়ে দিতে পারি। এই বিজয়ের বোধটাই আসলে আমাদের সম্মিলিত প্রাপ্তি।
যদিও আমি নিশ্চিত ভাবে বাশারের দলচ্যুতি চাই- সেই লোকটার শরীরের ভাষায় এখন শুধুই ভীতি- এমন ভয় নিয়ে খেলতে গিয়ে বাজে আউট হওয়া আর ফিল্ডিংএর সময় বল চার্জ না করে নির্বিবাদে রান উপহার দেওয়াটা আমার পছন্দ না।
পছন্দ না তার দল পরিচালনা- বাংলাদেশের জয় আসলে বাকি দশজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। যদি বাংলাদেশ পরাজিত হতো তবে শুধুমাত্র বাংলাদেশের অধিনায়কের জন্যই পরাজিত হতো।
একটা সময় সেই 80-90 বছর আগে ইংল্যান্ড থেকে জাহাজ ভাসিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ খেলতে যেতো খেলোয়াররা। তখন একটা নীতি ছিলো- দল মনোনীত করে একটা ক্যাপ্টেন বাছাই করা হতো। সেই লোকের যোগ্যতা বিবেচনা না করে তাকে ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতো। বাংলাদেশ দলে বাশারের অবস্থাও তাই। সে কোনো ভাবেই এই দলের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে না এর পরও বোর্ড তাকে ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব দিয়ে দলে রেখেছে।
যাই হোক আশরাফুল আর আফতাবের কোনো রকম প্রশংসা না করলে সেটা রীতিমতো অন্যায় হবে।
মূলত বাংলাদেশ দল 200 করার পর বিপক্ষ দলের শরীরের ভাষা দেখে আমি নিশ্চিত ছিলাম বাংলাদেশ জিতছে। সেসময়েই গ্রায়েম স্মিথের চেহারায় কোনো ঝলক নেই- মৃত আত্মা নিয়ে মাঠে ঘুরছে এমন একটা ভঙ্গি ছিলো তার শরীরে।
ধন্যবাদ আশরাফুলকে এজন্যই- টেনিস বলে চামুচ মারের প্রবণতা বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এমন বল তুলে উইকেটের পেছনে তুলে দেওয়া কোনো ভাবেই ব্যকরণ সম্মত খেলা না। তবে ওয়ান ডে ক্রিকেটের নিয়ম হলো রান যেভাবেই আসুক আসলেই হলো- তবে আফতাবের ভেতরের রাজসিক ভঙ্গি, আশরাফুলের নির্বিষ ব্যাট ক্রমশ তলোয়ার হয়ে কচু কাটা করছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে দেখে সঙ্গমের মতো আনন্দ লাভ করলাম।
পরিপূর্ণ সঙ্গমের মতো তড়িয়ে তড়িয়ে উপভোগ্য মনে হচ্ছিলো সময়টা। তবে অর্গাজমের সময়সীমা ছিলো অসীম।
এইসময়েই দক্ষিণ আফ্রিকা পরাজিত হয়েছে। বাকিটা শুধু প্রকাশিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা। রফিক বুড়ো হাড়ে দেখিয়েছে কিভাবে নির্ভাবানায় কোনো রকম উইকেটের প্রত্যাশা না করে বল করে যেতে হয়। ব্যটসম্যানদের ক্রীজে বেধে রাখতে হয়। তার বোলিং বিশ্লেষণ দেখে কিংবা বাংলাদেশের 3 স্পীনারের বোলিং বিশ্লেষণ দেখে আনন্দে চিৎকার করতে হয়। তিন বামহাতি স্পীনার বলে কেউ কেউ বলছিলো এতে ভ্যারিয়েশন নেই কোনো। তবে সেটা ভূল। 3 জনে 90 রানে 6 উইকেট নেওয়ার পর আর কিছু বলার থাকে না।
শুধু ভুতের মতো বাশার ঘুরছে। মিড অন থেকে নিজেকে দায়িত্ব থেকে সরানোর জন্য মিড উইকেটে চলে যাওয়া। মাশরাফির বলে কোনো স্লীপ না রাখার মতো অমার্জনীয় রক্ষণশীলতার দায়ভার বহন করতে হয় নি কারন রাসেল ক্যালিসকে সময়মতোই ফিরিয়ে দিয়েছে।
আর তখনই বন্ধুর ফোন। শুয়োরের বাচ্চা সুমনের কাজটা দেখছস। ঐ শালারে আরও আগেই বাদ দেওয়া উচিত আছিলো।
কি মনে হয় আইজকা হবে।
আমি সেই 200 হওয়ার সময় ওকে ফোন দিয়া বলছিলাম আইজকা বাংলাদেশ জিততেছে। ওর আশা ছিলো 250 আমার আশা ছিলো 270- তবে 260 হলেও আনন্দিত হতাম- হলো না কারণ আশরাফুল একই শটে ডিপ ফাইন লেগের ফিল্ডারের হাতে ধরা পড়লো।
এইসব বিজয় আমাদের নিজ্ব জীবনের অনেক অপ্রাপ্তি ভুলিয়ে দেয়। যা আমাদের বিকল্প ধারার চলচিত্র নির্মাতারা বুঝেন না। মানুষ যায় বিনোদিত হতে। নিজস্ব জীবনের অসহায় পরাজয়ের জায়গা থেকে মুক্তি পেতে তারা পর্দায় ক্ষনিক বিজয় দেখতে চায়।
আজকে সকালে যেসব হাসিমুখ দেখলাম। যাদের দেখলাম বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে গলা ফাটাতে তাদের নিজস্ব বাস্তবতার শেকল তাদের আরও পিছিয়ে দিতেও পারে- তবে এই বিজয়ে তারা নিজস্ব বিজয়ের অনুভব পেলো এটুকু দেওয়ার জন্যই বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন।
সাবাশ বাংলাদেশ দল-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



