আমি সংঘে সমুহে নেই বিচ্ছিন্ন একা, গণে গ্রন্থিত নই সঙ্ঘমিতা
--------------------------------------------------------
বাংলা ভাষা এখনও পর্যাপ্ত ভাবনা ধারণ করতে পারে না, মাঝে মাঝেই শব্দসংকটে পড়ে যাই। একটা কারণ হতে পারে যথেষ্ট বাংলা শব্দ আমার জানা নেই, অন্য যেটা হতে পারে বাংলা এখনও ঠিক পোক্ত ভাষা হয়ে উঠে নি- আমি কোনো ভাবেই এসব দিনের ভীড়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি না, এখনও গেয়ো ভুত থেকে গেলাম, সঠিক উপায়ে বাঙ্গারি হয়ে উঠতে পারলাম না।
আমি সে অর্থে সংস্কৃতিবানও না, আমি ২১শে ফেব্র“য়ারি শহীদ মিনারের আশে পাশে যাই না, বসন্ত বরণ উৎসবে গায়ে রং মাখি না, ঠিক তেমন ভাবে পহেলা বৈশাখও পালন করতে পারি না, সেই একই কারণে, আমি অযথা ভীড়ে থাকতে সহজবোধ করি না। বরং আমার নিজের হাশফাঁস লাগে, এখন সংস্কৃতিবান হয়ে উঠার তাড়নায় নিজের স্বাচ্ছন্দ বিসর্জন দিতে পারলাম না।
অথচ ঘরে বসে থাকতেও অস্থির লাগে- এখন আদতে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই- বর্তমানে এমনই বেচাল অবস্থা আমার। তাই নিয়ম মেনেই বের হলাম- একটু দেরি করে, মাছি থকথকে ভীড়ের সামনে এসে একটা শব্দই মাথায় আসে-
“ আই এবহোর দিস ক্রাউড, আই লোথ দেম, সিম্পলি আই লোথ দেম।”
এ সময়টায় বাংলা খুঁজি, ঘৃণা- তবে, এমন প্রচন্ড ঘৃণা যা বিবমিষাকর, এমন একটা বাংলা শব্দ কি আছে?
ভীড় কেটে সামনে হাঁটি, মানুষের চেহারা দেখি , এত এত মানুষ সম্মোহিতের মতো হাঁটছে? শহরের রাস্তা দেখে অন্য একটা শব্দকে যথাযোগ্য মনে হয়, কার্নিভ্যাল- বাংলা দেশের পোশাক সংস্কৃতিতেও বিশেষ দিবস ক্রিয়াশীল। সকল দিবসের নিজস্ব রং, নিজস্ব রূপ, কেউ নির্দিষ্ট করে দেয় নি, তবে প্রথা হয়ে গিয়েছে। বৈশাখের প্রথম দিবসের রং সাদা আর লাল- খোঁপায় বেলী ফুলের মালা জড়ানো। লাল পাড়ের শাড়ী, লাল ব্লাউজ, কানে লাল দুল, খোঁপার সাদা বেলী ফুল-- কোনো ভাবেই কোনো আকর্ষণ জাগে না। ভীড় কেটে সামনে যাই-
রাস্তার উপরে শুয়ে থাকা শীর্ণ মহিলার পাশে হাত পেতে বসে আছে বৃদ্ধা, অবশ্য কেউ ভ্র“পে করছে না, পাশ কাঁটিয়ে হাঁটছে- সবার চোখে সামনে যাওয়ার তাড়া- চোখে উৎসব নেই, উদযাপনের ভাষা নেই- বরং উপাসনার দৃষ্টি চোখে- এটা প্রার্থণার মতো- উদ্দীপ্ত করে না কাউকেই তবে সবাই একটা তাগিদ বোধ করে- আমাকেও থাকতে হবে- নইলে পিছনে পরে যাবো এমন ভীতিও কাজ করতে পারে।
উচ্ছ্বাস উল্লাস নেই চোখে, উৎসাহ নেই বরং কর্তব্য পালনের মতো, রীতিপরায়নতা আছে।
সবাই অংশগ্রহন করছে, সকালে বের হয়েছে- আমি পারছি না কোনো ভাবেই সামিল হতে উৎসবে- নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়- অস্বস্তিবোধ করি ভীষণ রকম- এই অঙ্গীভূত হতে না পারার যাতনা আসলে আমার একার নয় বোধ হয়- এ সেন্স অফ লুজিং ডিরেকশনালিটি- এটা আধুনিক ব্যাধি- পণ্যবাদিতার কুফল- তাই সবাই সবার জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করছে না- বরং সবাই নির্দেশিত পন্থায় অংশগ্রহণের চেষ্টা করছে।
আধুনিক বিজ্ঞানের কথা মনে আসে, সবার সব কিছুই আসলে শরীরের পাপ- কিংবা শাররিকতা, আমার কোষের অতি ুদ্র কোনো অংশে কোনো জৈব রাসায়নিক যৌগগুচ্ছ- যাদের সম্মিলিত ভাবে জীন বলি তাদের মিথঃস্ক্রিয়া বোধ হয়- এই যে আমার কাতরতা বোধ তার রক্তে লিখিত- রক্তের অন্তর্গত প্রহেলিকা- নিত্য নতুন ভাবে জানছি আমি সবই- মানুষ অপরাধপ্রবন কারণ তার রক্তে লিখিত আছে সে অপরাধি হবে।
মানুষের আসলে কোনো রকম দায় নেই, যা ঘটছে তার কোনোটাই ঠিক তার নিজস্ব স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়, বরং তার নিজস্ব শরীরের দাবি এটা-
কোনো ধর্মগ্রন্থে লিখিত নেই এই অভিশাপ- আমরা ক্রমশ অভিশপ্ত হচ্ছি- একেকটা জীনের খোঁজ চলছে- মানুষ খুন করছে- সকল চিহ্নিত খুনির রক্তে একই রকম জৈব রাসায়নিকপুঞ্জ- অতএব সিদ্ধান্ত হলো রক্ত শোধন প্রয়োজন-
মানুষ ধর্ষণ করে- তাদেরও নিজস্ব জীনের প্রভাব সেটা-
মানুষ সমকামি কিংবা বিষমকামি- কিংবা মোটা কিংবা খর্ব- সবই রক্তে লালিত অভিশাপ-
এটা প্রতিষ্ঠিত হলে কোনো আদালতেই কোনো অপরাধের বিচার হবে না- শাররীক ত্র“টি থাকবার জন্য যদি কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় তবে অপরাধ ঈশ্বরের- তিনি বহুপদের মানুষ সৃষ্টি করেছেন- তবে তাদের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা নেই- চাইলেই সে তার জীনের গঠন বদলাতে পারে না-
আমার নিজের কাছেই অসম্ভব মনে হয় ভবিষ্যত- এভাবে যদি রাষ্ট্র নিজে নিজে সব সাম্ভাব্য অপরাধিকে মৃত ঘোষনা করে কিংবা তাদের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে তাহলেও আসলে দোষের কিছু নেই।
পুরোনো বর্ণাশ্রম প্রথা নিন্দনীয় কিছু ছিলো না আদতে-
আমি ক্রমশ বিভ্রান্ত হই -
আসলে সম্পূর্ণ রাস্তায় সম্মোহিত মানুষের মিছিল দেখে এটাই বুঝলাম সবাই আসলে উৎসবের খোঁজে নেমেছে- তারা সবাই খুঁজে পাচ্ছে এমন না- যেসব ভাগ্যবান নিজের রক্তের ভেতরে ভীড়ে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার নির্দিষ্ট রাসায়নিক নিয়ে জন্মেছে তারাই প্রকৃৃত সুখী আজ-
বাকি সবাই আমার মতো প্রান্তিক না হলেও সামান্য পরিমাণে দিশাহীন।
আজ পহেলা বৈশাখ পালিত হচ্ছে- আমি কোনোটার অংশ হতে পারছি না, নিজস্ব ব্যর্থতায়- কাউকে দেখে উত্তেজিত কিংবা আনন্দিতও হতে পারছি না- হঠাৎ করেই শরীর বিদ্রোহ করেছে বোধ হয়- কাউকেই কমনীয়- কামনীয়- রমণীয় লাগছে না-
যেমত শুরুতে ছিলো এখনও তাই
আমি সংঘে সমুহে নেই বিচ্ছিন্ন একা, গণে গ্রন্থিত নই সঙ্ঘমিতা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



