সীমান্ত এলাকায় লাখ লাখ বাংলাদেশির প্রতিটি দিন কাটে আতঙ্কে। বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষাবাহিনী বিএসএফ-এর রক্তাক্ত সন্ত্রাস দুঃসহ পর্যায়ে পেঁছেছে। গত দুই বছরে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায় ২০০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে বিএসএফ এর গুলিতে। গত ১০ বছরে এই সংখ্যা প্রায় হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
এছাড়া ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৯২৩ জন, অপহৃত ৯৩৩ জন, নিখোঁজ ১৮৬ জন, পুশইনের ঘটনা ২৩৫টি বলে জানায় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। ২০১০ সালে ইংরেজি বর্ষশেষের শেষ দুই সপ্তাহে সিলেট, সাতক্ষীরা, যশোর, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় সীমান্তে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিন জন করে নির্বিচারে সাধারণ মানুষের লাশ পড়েছে বিএসএফের গুলিতে। বিএসএফ ধরে নিয়ে যাচ্ছে যাকে খুশি তাকে কাঁটাতারের বেড়ার এপার থেকে।
তাদের বেধড়ক মারধর করেছে নানা ধরনের 'সংবাদ' সংগ্রহের অজুহাতে, আহত আধমরাদের ফেরত পাঠিয়েছে। কেউ কেউ এখনো নিখোঁজ। শুধু উত্তরাঞ্চলেই গত এক বছরে গুলিতে নিহত ছত্রিশ, আহত শতাধিক। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার' এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'হিউম্যান রাইটসওয়াচ' এক যৌথ প্রকাশনায় বলেছে : ভারতের বিএসএফ প্রতি চারদিনে একজন বাংলাদেশিকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটসওয়াচের তরফে বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, এভাবে বিনাবিচারে নিরস্ত্র যাত্রী বা সন্দেহভাজনক কাউকে হত্যা করা মৌলিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইন কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক আইন বা বিধি মোতাবেক বিএসএফ সশস্ত্র সীমাবল ইত্যাদি
ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব সদস্য বাংলাদেশ সীমান্তে কর্মরত, তাদের দায়মুক্তি বিধি প্রত্যাহার এবং আইন মোতাবেক সীমান্তে প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য দায়ী
বিএসএফ বা অন্য নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যকে আদালতে ন্যায়বিচারের আওতায় আনার জন্য ভারত সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটসওয়াচ। এই সংগঠনের হিসাব মোতাবেক ২০০০ সালের জানুয়ারির শুরু থেকে ২০১০ সালের আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত ৮৭৫ জন বাংলাদেশি বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে। আহতের সংখ্যা ৯২৩ জন, অপহৃতের সংখ্যা ৯৩৩ ।
২০১১ সালে সীমান্ত মৃত্যুহার আরও বেড়ে গেছে। বছরের প্রথম সপ্তাহে চারজনের লাশ পড়েছে। বছরের প্রথম দিনেই খুঁজে পাওয়া গেল যশোরের বেনাপোল সীমান্তে একটি লাশ।
বিগত বছরের শেষ রাতে সে বাড়ি ফিরছিল। তারপর সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে আরও দুই গুলিবিদ্ধ গরু ব্যবসায়ীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে রাজশাহীর খানপুর সীমান্তে। তাদের একজনের বয়স মাত্র বিশ বছর।
সবচেয়ে করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে সপ্তাহান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য দেশে ফেরার পথে কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে গুলিতে নিহত এক কিশোরীর। ৭ জানুয়ারি সকাল সোয়া ৬টার দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতের চৌধুরীহাট সীমান্ত ফাঁড়ির বিএসএফ গুলি করে ফেলানী (১৫) নামে বাংলাদেশি এই কিশোরীকে হত্যা করে লাশ নিয়ে যায়।
নিহত কিশোরী নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা বানারভিটা গ্রামের নুরু মিয়ার বাবার পিছে পিছে ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তের ৯৪৭ আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের ৩ ও ৪ সাবপিলারের কাছ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিএসএফের ১৮১ নম্বর ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের টহল দল অতর্কিত গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই ফেলানীর মৃত্যু হয়।
এ সময় কিশোরীর সঙ্গে তার পিতা নুরু মিয়া, মা, ১ বোন ও ১ ভাই ছিল।তাদের মধ্যে নুরু মিয়াসহ ৩ জন পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারলেও মই দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হতে গিয়ে ফেলানির জামা-কাপড় আটকে যায়। এ সময় সে ভয়ে চিৎকার শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিএসএফের বুলেট তার বুক ঝাঁজরা করে দেয়।
মৃত্যুর পরও দীর্ঘ সময় ফেলানীর লাশ সীমান্তে কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলতে থাকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে সীমান্তের মানুষ। বেলা সাড়ে ১১টায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশ সরিয়ে নেয় বিএসএফ।
গুলি করে হত্যার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লাশ ফেরত চেয়ে বিএসএফকে চিঠি দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। দুই দেশের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৫ জানুয়ারি লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৫:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



