নিজের ঘরের খেয়াল রাখার চেয়ে পরের বাড়িতে কি হল সে বিষয়ে আমাদের কৌতুহলটা সবসময় একটু বেশিই থাকে। তাই অনেক সময় নিজ দেশের খবর রাখার চেয়ে অন্যান্য দেশ সম্পর্কে আমাদের আগ্রহটাও যেন একটু বেশি। পৃথিবীর মধ্যে আমরাই মনে হয় একমাত্র জাতি যারা অন্যদের নিয়ে এতটা বেশি মাতামাতি করি। ফুটবলের সময় আমরা বাড়ির ছাদে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল এর পতাকা ওড়াই ,ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ফেভারিটের তালিকায় এখনো আমরা অনেকে ইন্ডিয়া পাকিস্তান বা অস্ট্রেলিয়ার নাম বলি, হিন্দি মুভি আর টিভি সিরিয়াল না দেখলে তো অনেকের আবার রাতে ঘুম হয় না। সাদ্দাম লাদেন মোবারক আর গাদ্দাফি সম্পর্কে অবশ্য জ্ঞান থাকা ভাল কিন্তু আমরা মনে হয় তাদের জন্য একটু বেশিই উদ্বিগ্ন। এছাড়াও কোন কোন দেশের পররাস্ট্রনীতি থেকে শুরু করে তাদের নায়ক নায়িকার সাংসারিক খবরাখবর রাখাটা যেন আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পরে। সে যাই হোক , আমরা কিন্তু খুব কম সময়ই চিন্তা করি যে আমাদের সম্পর্কে অন্যদের ধারনাটা কেমন ,বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান কতটুকু। হয়ত জানার প্রয়োজন মনে করিনা , আর প্রয়োজন মনে করলেও অনেকের ক্ষেত্রেই তার সুযোগ হয়না।
এক্ষেত্রে আমি অবশ্য নিজেকে অনেকটা ভাগ্যবান মনে করি, কারন দেশের বাইরে কাজ করার সুবাদে পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। আমার সাথে এখানে বিশ্বের প্রায় ২০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি আছে। তাই অন্যান্য দেশের মানুষের প্রতি কৌতুহল এর পাশাপাশি আমার দেশ সম্পর্কে তাদের কার কি ধারনা সেটা জানারও সুযোগ হয়েছে বিভিন্ন সময় । অবশ্য কখনই কাউকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে হয়নি যে বাংলাদেশ সম্পর্কে তুমি কি জান? নিজেদের মধ্যে আড্ডা দেয়ার সময় এই প্রসংটা আপনা আপনিই চলে আসে। কারন বেশিরভাগ সময়ই আড্ডার মুল বিষয়বস্তু থাকে যার যার দেশের গুণকীর্তন আর বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের শ্রেঠ্যত্ব প্রমান করা। যাই হোক, আসলে অন্যান্য দেশের মানুষ বাংলাদেশকে কি চোখে দেখে বা আমাদের সম্পর্কে কতটুকু জানে সে বিষয়ে বলতে চাচ্ছিলাম। আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ কলিগের সাথে কথা বলে তাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে যা জানতে পারলামঃ
বাংলাদেশে চাইনিজ খাবারের জনপ্রিয়তার কথা শুনে প্রথমে বেশ অবাকই হল মিঃ ঝাও জি চ্যাং, আর যখন জানল যে আমাদের দেশে চায়নার তৈরি ইলেকট্রিক সামগ্রীর দাম তার নিজ দেশের চেয়েও অনেক সস্তা তখন সে আরও বেশি বিস্মিত । কিন্তু তার চেয়ে আরও বেশি অবাক হলাম আমি নিজে যখন সে আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমি বিয়ে করেছি কিনা। আমি বললাম না এখনো করিনি। ব্যাটা বলে কিনা সে নাকি জানত যে আমাদের দেশের লোকেরা বিয়ে করে খুব কম বয়সে আর সবাই নাকি বিয়ে করে কমসে কম দুই থেকে তিনটা। এই জন্যেই আমাদের জনসংখ্যা বেশী। সে নাকি কোন আর্টিকেল এ পড়সে। খুব মজা পাইসিলাম হালার কথা শুইন্যা। এই তথ্য যে সঠিক না সেটা তাকে বুঝালাম। সে অবশ্য খুবই আফসোস করতেসিল। কারন তার দেশে নাকি দুইটা বিয়া তো দুরের কথা একটার বেশি বাচ্চা হলে জেল জরিমানা পর্যন্ত হয় । তাই তারে একটু সান্তনা দিলাম। বললাম, তুমি তো ভাগ্যবান, বিয়া একটা কইরা ফালাইস, তোমাগো দেশে জনসংখ্যার যে অবস্থা কয়দিন পর হয়ত দেখা যাবে বিয়ে করার দায়ে জেল খাটতে হচ্ছে। আর একদিন তার মুখে অবশ্য ডঃ ইউনুস এর নাম শুনে খুব ভাল লাগল। মনে মনে ভাবলাম শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে যেহেতু ডঃ ইউনুস এর নাম জানে তাই বাংলাদেশকে হয়ত শান্তির দেশ হিসেবেই ভাবছে সে। তাই দুর্নীতিতে পরপর পাচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবগাঁথা তার সামনে আর তুললাম না। হঠাত সে একদিন আমার কাছে বাংলাদেশে ট্যুরিজম সম্পর্কে জানতে চাইল। আমিও সুযোগ বুঝে “School of Life” এর ভিডিও টা দেখায় দিলাম। আমি নিজেও আশা করিনি সে ভিডিও দেখে সে এতটা মুগ্ধ হবে। এই ভিডিওটা দেখে নাকি বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ধারনাই পালটে গেছে। তাকে বললাম শুধু ভিডিও দেখলেই কি সব বোঝা যায় ? একবার আস বাংলাদেশে, শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য না মানুষের মনের সৌন্দেযেরও দেখা পাবে আমার দেশে!
খুব ইচ্ছা ছিল আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল এর কারো সাথে পরিচয় হওয়ার। বিশ্বকাপের সময় আমাদের দেশে নিজেদের চাইতে তাদের দেশের পতাকা যে বেশি উড়ে এই কথাটা তারা জানে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করার সখ ছিল, সে সুযোগ এখনো হয়নি। কিন্তু উরুগুয়ের জোসে নেলসন মন্টানো কাজ করে আমাদের সাথে। তাই দুধের সাধ ঘোলে মেটানো বলা চলে। হাজার হলেও লাতিন আমেরিকা তো। কিন্তু তার সমস্যা একটাই, স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে ইংলিশ পারে খুব সামান্যই। বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তার কথা নাকি সে জানে, কিন্তু কেন আমরা উন্নতি করতে পারছিনা সে বিষয়েও আমার কাছে জানতে চাইল। একমাত্র তার সাথে কথা বলেই আমার মনে হয়েছে যে উরুগুয়ে সম্পর্কে আমি যতটা না জানি সে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি জানে। এর অবশ্য একটা কারন আছে। আফ্রিকাতে জাতিসংঘের একটি সংস্থায় সে অনেকদিন কাজ করেছে। সেখানে বাংলাদেশের অনেক সদস্যের সাথে তার পরিচয় ছিল। বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কেও তাই তার ধারনা অনেক উচু। তার কাছে নাকি মনে হয়েছে বাংলাদেশিরা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি বন্ধুবাৎসল আর মিশুক। সবসময় বাংলাদেশিদের প্রশংসা করে সে। অন্যদেরকে তাই বলি বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে জানতে হলে যাও মন্টানোর কাছে গিয়ে শোন।
ইউক্রেনের সোবিন এলেক্সি এর কাছে আজব এক কথা শুনলাম একদিন। সে নাকি মনে করেছিল যে বাংলাদশের ভাষা হল ইংলিশ। ওর মত ছাগল আমি আর এ জন্মে দেখিনি। আমার দেখা সেই প্রথম মানুষ যে কিনা ইসলাম ছেড়ে খ্রীস্টান হয়েছে। সেনসেটিভ বিষয় তাই এ নিয়ে ওর সাথে বেশি আলোচনা করিনি। বাংলাদেশের ভাষা ইংলিশ এ ধারনা তার কেমন করে হল জিজ্ঞেস করাতে সে বলল, সে নাকি যত বাংলাদেশীর সাথে কথা বলেছে সবাই খুব ভাল ইংলিশ বলে, এ থেকে তার মনে হয়েছে যে আমাদের ভাষা হয়ত ইংলিশ। যাই হোক সে নিজে ইংলিশ কম পারে তাই হয়ত আমাদের ইংলিশ ওর কাছে খুব ভাল মনে হয়েছে। সারাদিন আনন্দ ফুর্তি করাতেই ব্যাস্ত সে। এক মিনিটে দশবার fuck শব্দটা উচ্চারন না করলে তার চলেই না। তার কাছে তাই আমাদের ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের গল্প করার সাহস পেলাম না। খুব সিম্পল ভাবেই বললাম যে আমাদের ভাষা বাংলা তবে শিক্ষিত লোকজন ইংলিশটাও মোটামোটি ভালই জানে।
সাগর মানি ঝা ,নেপালী ডাক্তার। শুধু ডাক্তার না তাকে একজন ভাষাবিদ বললেও ভুল হবেনা। সাতটা দেশের ভাষায় সে পারদর্শী। বাংলা টা ঠিকমত বলতে না পারলেও ভালই বোঝে। বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে গেলে সে মোটামোটি সব কিছুই জানে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রী সহ আরও কয়েকজন মন্ত্রী মিনিস্টারের নামও তার জানা। আমাদের দেশে সরকার পাচ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশের নানান উন্নতি করছে আর সেখানে নেপালে কোন সরকার ই এক বছরের বেশী টিকতে পারেনা এ নিয়েও তার আক্ষেপ। আর টেলিভিশনে ঢাকার চিত্র দেখে সেত রাজনীতিবিদদের মত সবার সামনে বলেই ফেলল যে “বাংলাদেশ আসলেই উন্নতির জোয়ারে ভাসছে।’’
দেশের প্রশংসা শুনলে যেমন ভাল লাগে তেমনি খুব খারাপ লাগে যখন দেখি কেউ বাংলাদেশ আর ইন্ডিয়াকে এক করে ফেলে। অবশ্য তাদের দোষ দেয়ারও কিছু নাই। কারন উন্নত দেশগুলোর লোকজন তাদের নিজেদের ছাড়া অন্য দেশের খোজখবর খুব একটা রাখেনা। আর সেখানে বাংলাদেশের মত দেশ সম্পর্কে না জানাটা তারা নিজেদের অজ্ঞতা হিসেবে কখনই মনে করেনা। বেলজিয়াম এর ভদ্রলোক মিঃ বোর্নফেস এর সাথে যেদিন প্রথম দেখা হল, নাম পরিচয় দেয়ার সময় যখন বললাম, "I am from Bangladesh” সে ভালমত শোনার আগেই উত্তরে বলল- “yaap...Indian?” আমি বললাম “No, No...Bangladeshi” সে বলে “ya that is what i mean.” বুঝলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে তার জ্ঞান কতটুকু। সে ভেবেছিল পাঞ্জাব বা গুজ্রাট এর মত বাংলাদেশও ইন্ডায়ারই একটা পার্ট। পরে তাকে বেশ সময় নিয়ে বুঝালাম যে বাংলাদেশি আর ইন্ডিয়ান এক কথা নয়। বোঝার পর সে অবশ্য আমাকে থ্যাঙ্ক ইউ জানাল কিন্তু বিন্দুমাত্র লজ্জিতও হল না- এই যা আক্ষেপ।
এছাড়াও আরো অনেকেই আছে যারা বাংলাদেশকে শুধুমাত্র ইন্ডিয়ার পাশের একটা ছোট্ট দেশ হিসেবেই চেনে। বাংলাদেশ সম্পর্কে ভাল মন্দ আর কিছুই জানেনা। জানবেই বা কিভাবে , আমরা নিজেরাই তো নিজেদের পরিচয় দিতে দ্বিধা বোধ করি। আমি নিজেই দেখেছি ইন্ডিয়ানদের সাথে হিন্দিতে আর পাকিস্তানীদের সাথে উর্দুতে কথা বলতে পারলে অনেক বাংলাদেশীই নিজেকে ধন্য মনে করে। ইউক্রেনের ওই ভদ্রলোকের দোষ দিয়ে লাভ কি, সে যে আমার ভাষা ইংলিশ মনে করছে এত আমার ভাগ্য, উর্দু তো আর মনে করেনি। লন্ডনে বেড়াতে গিয়ে দেখেছি অনেক বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট এর সামনে লেখা ‘Delicious indian cousine’, বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা অনেক বাংলাদেশী বিদেশে গিয়ে নিজেদের ইন্ডিয়ান হিসেবে পরিচয় দেয় বলেও শুনেছি। তাই আমাকে বাংলাদেশী শুনেও ইন্ডিয়ান মনে করাটা অস্বাভাবিক কিছুনা।
কি আর বলব, গর্ব অহংকার করার মত এত কিছু থাকতেও কেন যে আমরা নিজেদের নিয়ে গর্বিত হতে পারিনা তা নিয়ে সংশয় হয়ত কখনই যাবেনা। ‘School of life’ এর মত একটা ভিডিও দেখেই যদি কারও ধারনা পালটে যেতে পারে সেখানে আমরা কি পারিনা আমাদের ভাষা ,ইতিহাস, সংস্কৃতি, মেধা আর পরিশ্রমকে পুজি করে আমাদের সম্পর্কে বিশ্বের সবার ধারনা পালটে দিতে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

