somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যমজ ভাই বাংলাদেশ ও একজন মুক্তিযোদ্ধার গল্প

২৮ শে নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যমজ ভাই বাংলাদেশ ও একজন মুক্তিযোদ্ধার গল্প

জুলফিকার শাহাদাৎ





১৯৭১।উত্তাল পূর্ববঙ্গ।চারিদিকে গোলাগুলি।মানুষ পালাচ্ছে।কেউ বন্দুক তুলে নিচ্ছে হাতে।নিরাপত্তাহীন পুরো দেশ।এমন এক সময়ে আমি মায়ের পেটে আসি।হয়তো মায়ের পেটেই আরেক যুদ্ধ শুরু করেছিলাম,আমি পৃথিবীতে আসব,নাকি আসব না? আমি কি নতুন দেশ পাব? স্বাধীনতা পাব? না পরাধীন কোন দেশে জন্ম নেব-এ ধরনের প্রশ্ন হয়ত সেদিন অঙ্কুরেই আমার মনের ভেতর ছিল।



যাহোক।আমার জন্ম গ্রামে,সুদূর মফস্বলে।চট্টগাম জেলার ফটিকছড়ি থানার(বর্তমান ভুজপুর থানা)নারায়ণ হাটে।মুক্তিযুদ্ধ শুরুকালীন সময়ে আমি আমার মায়ের পেটে ভ্রুন মাত্র।

তখন আমার বাবার ৫টি কন্যা সন্তান।একটি পুত্র সন্তানের আশায় তিনি বার বার সন্তান নিচ্ছেন।অনেকেই বাবাকে বলতেন,আমার মায়ের পেটে পুত্র সন্তান হবে না।এ নিয়ে বাবা মার সংসারে অনেক ঝড় গেছে।পুত্র সন্তানের জন্য মা লুকিয়ে লুকিয়ে নিভৃতে চোখের পানি ফেলতেন।দরগায় মানত করতেন।মার ইচ্ছে,খোদা তাকে যেন একটি পুত্র সন্তান দান করে সকলের ধারণা মিথ্যা করে দেয়।



১৯৭১ সালে মা দুটি যুদ্ধ করেছেন।একটি দেশের জন্য,আরেকটি অনাগত সন্তানের জন্য।দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ।দুটিই মুক্তির।একটি দেশরক্ষার,অন্যটি ছেলে সন্তান প্রসব করে সকলের অবজ্ঞা থেকে নিজেকে রক্ষার।



বাবা ছিলেন উদ্যোমী যুবক।তাই মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

একদিন বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে স্থানীয় নারায়ণ হাট বাজারে যাচ্ছিলেন।পথে একদল পাকবাহিনী বাবাকে ঘেরাও করেন।বাবার সাথে আরো অনেকেই ছিলেন। সবাই নিরস্ত্র।সাধারণ পোষাকে।এবং সংখ্যায় এরা প্রায় ৪০ জন। এদের সকলকে একটা লম্বা রাস্তায় দাঁড় করালেন পাকবাহিনী।একে একে সকলকে চেক করছিলেন তারা।বাবা বাঁচার জন্য প্রায় সকলের পেছনে দাঁড়ালেন।বিধিবাম।সকলকে ছেড়ে দিলেও বাবাকে ছাড়লেন না তারা।তাকে আলাদা করে একপাশে নিয়ে গেলেন পাকবাহিনী।

এরপর বাবাকে কলেমা জিজ্ঞেস করলেন ওরা।বাবা কলেমা বললেন।অতপরঃলুঙ্গি খুলে বাবাকে প্রমাণ দিতে হল,তিনি মুসলিম কি না? এরপর পাকবাহিনী বাবাকে শত্রুজ্ঞানে নিঃশ্চিত হয়ে জুজখোলা স্কুলের পাশের শ্রীমতি ছড়ায় গুলি করার জন্য নিয়ে গেলেন।এ খবর দ্রুত মায়ের কাছে পৌঁছার সাথে সাথে বাড়িতে কারবালা শুরু হয়ে যায়।মা বার বার মুর্ছা যাচ্ছিলেন তখন। আর ভাবছিলেন, ৫ টি মেয়ে ও তার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত কী হবে ?

এদিকে পাকবাহিনী বাবাকে শ্রীমতি ছড়ার মাঝখানে নামিয়ে কেবলামুখি করে দাঁড় করালেন ।বাবা সটান দাঁড়িয়ে থেকে বার বার কলেমা পড়ছিলেন,আর মৃত্যুর প্রাক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।



অনেক্ষন হয়ে যায়।কেউ গুলি করছেন না দেখে বাবাও অধ্যৈর্য হয়ে উঠলেন,মৃত্যুর আর কত দেরী?

তিনি পেছনে তাকালেন এবার।দেখলেন,পাকবাহিনীর মধ্যে দুটি ভাগ হয়ে গেছে।একভাগ বলছেন গুলি করতে,আরেকভাগ বলছে্ন,না করতে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে একজন বাবাকে চলে যেতে নির্দেশ করলে বাবা ওখান থেকে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলেন ,আর আড় চোখে পেছনে তাকাচ্ছিলেন,ওরা বুঝি এই গুলি করছেন।

বাবা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এলেন সেদিন।এ এক অলৌকিক বেঁচে আসা।

বাবার সাথে যারা ছিলেন তারা অদূরে গুলির আওয়াজের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।যাতে লাশটা বাড়িতে পৌঁছানো যায়।না,বাবা লাশ হয়ে এলেন না,তবে জিন্দা লাশের মত ওখান থেকে ফিরে এলেন।

বাবার এ ফিরে আসায় আমারও পৃথিবীতে আসার পথ সুগম হল।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের পরিবারে দুটি বিজয় আসে।একটি মুক্তিযুদ্ধে,অন্যটি আমার জন্মে।

কারণ, এই দিন আমি মায়ের কোল আলো করে পৃথিবীতে এসেছিলাম।আমার জন্মে মায়ের সংসার হয়ত টিকে যায়।আমার বয়স আর বাংলাদেশের বয়স তাই সমান-সমান।আমরা যমজ।

আমি বড় হলে একদিন বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম,

পাকবাহিনী যখন তোমাকে ধরে নিয়ে যায় তখন তোমার কার কার কথা মনে পড়েছিল বাবা?

বাবা বললেন,তোর কথা।

বাবা তখন নাকি ভেবেছিলেন,এবার তার পুত্রসন্তান হবে। তিনি তাকে আর দেখে যেতে পারবেন না।

আমি একই প্রশ্ন মাকেও করেছিলাম,

আব্বু যদি যুদ্ধে শহীদ হতেন আমি কি পৃথিবীতে আসতাম?না,অনাগত সন্তানকে বোঝা ভেবে গোপনে একা একা কাঁদতেন?

মা কোন জবাব না দিয়ে শুধু হেসেছেন।

১৬ ডিসেম্বর এলে আমার আনন্দ অন্যদের চেয়ে আলাদা।কারণ,আমার জন্মদিনে সরকারী ছুটি।চারিদিকে উৎসব।কত কোলাহল।

১৬ডিসেম্বর আমার যমজ ভাইয়েরও জন্মদিন। এদিন তাকেও আমি অভিনন্দিত করি।কারণ,তার কারণে আমি এত বিখ্যাত,আলোচিত।

১৬ ডিসেম্বর,বিজয় দিবস ,তুমি অমর হও।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভূমি-দেবতা

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৩


জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভাইয়ে ভাইয়ে
মারামারি-কাটাকাটি-খুনোখুনি হয়;
শুধু কি তাই? নিজের বোনকে ঠকিয়ে
পৈতৃক সম্পত্তি নিজ নামে করে লয়।
অন্যদের জমির আইল কেটে নিয়ে
নিজেরটুকু প্রশস্ত সময় সময়;
অন্যদের বাড়ি কব্জা- তাদের হটিয়ে
সেখানে বানায় নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে জুলাইযোদ্ধাদের উপর পুলিশের ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:১৪

জুলাই যারা ঘটিয়েছে, তাদের উপর পুলিশের কী পরিমাণে ক্ষোভ, এটা ইলেকশনে যাস্ট বিএনপি জেতার পরই টের পাবেন।
আমি বলছি না, বিএনপির ক্ষোভ আছে।
বিএনপি দল হিসেবে অকৃতজ্ঞ হতে পারে, কিন্তু জুলাইয়ের উপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুইটি প্রশ্ন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪০

১) জাতিসংঘ কি হাদী হত্যার বিচার এনে দিতে পারবে? ফিলিস্তিনি গণহত্যার বিচার কি জাতিসংঘ করতে পেরেছে?

২) আজকের পুলিশি হামলায় ছাত্র নেতারা ডঃ ইউনুসকে যেভাবে গালি দিচ্ছেন, তাতে কি জাতিসংঘ খুশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাশা : বাংলাদেশের নতুন জাতীয় খেলা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯


"ও শ্যামরে, তোমার সনে একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম, এই নিঠুর বনে। আজ পাশা খেলব রে শ্যাম।" প্রয়াত হুমায়ূন ফরীদির কণ্ঠে ছবিতে যখন এই গান শুনেছিলাম ,তখন কেউ ভাবেনি যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা যেন পারষ্পরিক সম্মান আর ভালোবাসায় বাঁচি....

লিখেছেন জানা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪২



প্রিয় ব্লগার,

শুভেচ্ছা। প্রায় বছর দুয়েক হতে চললো, আমি সর্বশেষ আপনাদের সাথে এখানে কথা বলেছি। এর মধ্যে কতবার ভেবেছি, চলমান কঠিন সব চিকিৎসার ফলে একটা আনন্দের খবর পেলে এখানে সবার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×