ছুটিতে দেশে যাবার মাস কয়েক আগে থেকেই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে হনুফার সঙ্গে আমার ফোন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ সব সময় সে আমাকে কয়েকবার মিসকল করলেই আমি কলব্যাক করতাম। একেক সময় একেক নাম্বারে ফোন করতো বলে পুরোনো নাম্বার সংরক্ষণের চেষ্টা করিনি। তো দেশে গিয়ে শুরুতেই আমার পরিবারের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। যখন যোগাযোগ করলাম, আমার কল রিসিভ করলেই সবার মুখে একটি জিজ্ঞাসাই শুনতে পাই- কিরে হনুফায় বলে তরে এয়ারপোর্ট থাইক্যা আনছে? তরা বলে বিয়া করছস?
যাই হোক সেই গল্পে না গিয়ে আসল কথায় আসি। শেষ-পর্যন্ত হনুফার খোঁজ পেয়ে বাপ-বেটায় চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে টিকেট পকেটে নিয়ে পাহাড়ীকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় সময় দুই নাম্বার লাইনে একটা ঝকঝকে তকতকে বুলেট বা রকেট ট্রেনের মাথার মতন মাথাওয়ালা একটি ট্রেন এসে থামতেই আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেল। সাদা রঙ করা লাল বর্ডারও আছে। আবার ডিজিটাল ডিসপ্লেতে দেখাচ্ছে নেক্সট স্টেশন লাকসাম। এমনিতে জীবনের যতবার ট্রেনে উঠেছি সিট একবার কি দুবার মাত্র পেয়েছিলাম। পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম- এইডা কোন ট্রেন?
-ডেম্বু।
ডেমু ট্রেনের সংবাদ প্রবাসে থাকতেই অনলাইন পত্রিকার কল্যাণে জেনে গিয়েছিলাম। তাই মনে মনে ঠিক করে রাখলাম যে, আরেকদিন ডেমু ট্রেনে না চড়তে পারলে আমার বাংলাদেশে আসাটাই সার্বিক ভাবে ব্যর্থ ইতিহাস হয়ে থাকবে। তো ফিরে আসবার সময় আগাম টিকেট কাটতে গিয়ে ডেমুর টিকেটের কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন বলল, পুরান
ইশটিশন পাইবেন।
তারপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবার জানতে চাইলো, হন্ডে যাইতেন ডেমুত গরি?
-কুমিল্লা।
আমার ঝটপট জবাব শুনে লোকটা বলল, ডেমুত গরম খুব, টয়লেটও নাই।
মনেমনে ভাবি, তাতে কি? চিটাগাং থেকে কুমিল্লা আর কতক্ষণ লাগবে? একা একা একবার চান্স লাগানো যাবে। পুত্র সঙ্গে যাবে ভেবে সেই ঝামেলায় আর যেতে চাই না। কিন্তু ঠিকই খোঁজ খবর নিয়ে জেনে যাই প্রতিদিন বিকেল ৫টায় ডেমু ছাড়ে। ভাড়া ৭০টাকা। তাহলে তো সস্তাই। কিন্তু সস্তার যে তিন অবস্থা তা টের পেয়ে গিয়েছিলাম কদিন পরই।
ঘরে ফিরে ডেমুর কথা বলতেই হনুফা আঁতকে উঠে বলল, ডেমুর নাম লইও না!
-কি, কোনো ঘটনা আছে নি?
সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। কোনো রকমে বলতে পারে- তোমার ভাই ফেনি এস্টেশান নাইম্যা টেরেইন মিস কইরালাইসে টয়লেটের লাইগ্যা। নামতে নামতে কইসলো, ট্রেন গেলেগা যাইবো, আমার চিন্তা করবা না। দরকারে পরের ট্রেনে আয়াম!
কিন্তু হনুফার গল্পে আমি মোটেও ভীত হই না বা সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটি না। আমাকে একবার হলেও ডেমুতে চড়তে হবে। কিন্তু ডেমু যে আমাকে এমন করেই ভোগাবে বা অন্যকে বলবার মতো কাহিনী হয়ে যাবে তা তো আর ভাবনায় আসেনি।
শেষবার আমার ছুটি ফুরিয়ে যাবার আগে আগে হনুফার সঙ্গে একবার চোরা সাক্ষাৎ করে আসবার ইচ্ছায় সকালের নাস্তা সেরে কুমিল্লা থেকে ১১টার ট্রেনে চলে যাই চিটাগাং। হনুফা আর তার বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করে বিকেলের ডেমুতে ফিরবো জানাতেই হনুফা বলল যে, সেও কুমিল্লা আসবে।
আমি সম্মত হই না। আরো জানাই, অন্য কোনো ট্রেন নাই। আওনের সময় খোঁজ নিসি।
-ট্রেইন নাই তোমারে ক্যাডায় কইলো? ৩টা ১০এর নাসিরাবাদ থাইক্যা শুরু কইরা ঘণ্টায় ঘণ্টায় ট্রেইন আছে। তুমি কিচ্ছু জানো না!
যেহেতু সত্যিই জানি না, আমি আর বিতর্কে যাই না। সে সঙ্গে যাবে বলে ডেমুর আশা ছেড়ে দেই মনে মনে। খেয়ে দেয়ে তাই দুটোর দিকেই তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি তিনটার ট্রেন ধরবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু হায়, ৩টা বেজে গেলেও পুরোনো স্টেশনের টিকেট কাউন্টার খোলে না। বহির্গমন গেটের কাছে বসে থাকা ৩জন সিকিউরিটির একজন আমার কাছ থেকে লাইটার চেয়ে সিগারেট ধরিয়ে ফেরত দিতে দিতে বলল, আংকেল, কোনখানে যাইবেন?
-কুমিল্লা। কিন্তু ট্রেনের তো খবর নাই?
-ঢাকায় গণ্ডগোল হইতাছে জানেন না?
-কিসের গণ্ডগোল?
-আজকের পত্রিকা পড়েন নাই?
-না।
-নারানগঞ্জে ৭জন মার্ডার হইছে। এই নিয়া ঢাকা তো খুব গরম। কোনো গাড়ি ঢুকতে দিতেসে না।
-তো? কুমিল্লা যাইতে তো সমস্যা না।
-ডেমু আছে ৫টায়। আজকে আর কোনো ট্রেন ছাড়বে না।
হনুফাকে বললাম, তুমি যাওগা বাসায়। আমি ডেমু দিয়া যাই।
-না, আম্মারে দেহি না কত মাস!
-টয়লেট নাই। চিপায় পড়লে করবা কী?
-আমার দরকার পড়তো না।
-চিন্তা কইরা কইও কইলাম!
-চিন্তা করছি।
আমি যতবার ট্রেনে যাতায়াত করেছি কোনোবারই টয়লেটে যাবার প্রয়োজন হয়নি।
শেষটায় ডেমুর টিকেট ছাড়ে চারটার কিছু পরে। কিন্তু ডেমুর দেখা নেই। সময় কাটে হাঁটাহাঁটি আর আমাদের নিয়ে নানা জনের বলা নানা মন্তব্যের বিশ্লেষণে। অবশেষে ডেমুতে উঠে সিটও পেলাম। পুরোনো আমলের মুড়িট্টিন বা লঞ্চের সিটের মতো লম্বালম্বি।
প্রথম ধাক্কাটা খেলাম পাহাড়তলী স্টেশনেই যখন আধঘণ্টার বেশি থেমে রইলো ট্রেন। তারপর প্রতিটা স্টেশানেই থামতে আরম্ভ করলে গরমের তাণ্ডবে আমার রক্তচাপ বেড়ে গেল। আমি আর সিটে বসে থাকতে পারি না। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সেটা এক সময় এমন চপচপে হয়ে উঠলো যে, চিপতেই বেশ কয়েক ফোঁটা পানি ঝরে পড়ল। জানালার ওপরকার অর্ধাংশ দিয়ে মাথা বের করে রাখি। মুখে বাতাস লাগলেও শরীর ঘামতে থাকে। বগির ছাদের কাছে যে ফ্যান আছে তার হাওয়াও বগির ভেতরকার গরম দূর করতে পারে না, পারে না আমার মাথার তালু ঠাণ্ডা করতে।
গরম খুব বেশি থাকলে আমার পেট খারাপ হয়ে যায়। সেদিন তাপমাত্রা বেশিই ছিল নয়তো বা ডেমুর হাফ জানালার কারণে গরম অনুভূত হচ্ছিল বেশি। বগির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি হাওয়ার শীতল পরশ পেতে। কিন্তু সেখানেও অকাজের লোকজনের ভিড়। চিনকি আস্তানা এসে যে ডেমু স্থির হলো আর নড়াচড়া নেই।
ট্রেন থেকে নেমে হাঁটাহাঁটি করি। দেহের ঘাম মুছি। হকারের কাছ থেকে ঠাণ্ডা পানি কিনে খাই। রুমাল ভেজাই। মাথা আর ঘাড়েও পানির ছোঁয়া লাগাই। হঠাৎ করেই পেটের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। সেই সঙ্গে নাভির চারপাশে এক রকম মৃদু খামচে ধরে রাখার অনুভূতি।
ট্রেন ছেড়ে দিলে অপেক্ষা করি পরবর্তী স্টেশনে পৌঁছাবার। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে ট্রেন থেমে যায়। লোকজনের মুখে শুনতে পাই ক্রসিং আছে। পাহাড়ীকা, নিশীথা।
হায় হায়! কখন তাহলে পৌঁছুবো কুমিল্লা! রাত কি তাহলে ১২টা বাজবে?
ওদিকে আমার পেটের অবস্থা খারাপের দিকে। আমার অস্থিরতা দেখে হনুফা বলল, কি, তোমারে এমন লাগতাসে কিয়ারে? প্যাশার বাড়সে?
-হেইডা তো আছেই। লগে আরেকটা নয়া যন্ত্রণাও শুরু অইসে!
-প্যাট্টা...।
আমি কথা শেষ করতে পারি না। তার আগেই মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে কাত হয়ে পড়ে।
আমার মেজাজ খারাপ হয়। বলি, আমার জান যায় আর তুমি হাসতাছ?
তারপর কোনো রকমে ফেনী আসি। ভেবেছিলাম, ফেনী কিছুটা বেশি সময় থামবে ট্রেনটা। আমি নেমে টয়লেটের খোঁজে গেলাম। অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। হাতের সেল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে অবস্থা যা দেখি, আমার পেটের ভেতরকার মোচড় বন্ধ হয়ে যায় আর তখনই ট্রেনের হুইসেল বেজে ওঠে। ছুটে এসে ট্রেনে উঠে পড়তেই হনুফা জানতে চায়, কিছু ব্যবস্থা অইলো?
আমি মাথা নাড়ি। বলি, কী যে অবস্থা, দেইখ্যাই আমার সারসে!
সময় তখন রাত আটটা হয়ে গেছে। কখন গিয়ে কুমিল্লা পৌঁছুবো। এদিকে আমার অবস্থাও করুণ হতে চলেছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ঘামের পরিমাণ বাড়তে থাকে। হঠাৎ আমার মনের জোর বেড়ে যায় এ কথা ভেবে যে, আরে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় বা কোনো বড় এক ম্যাচের সময় কোনো বিখ্যাত ফুটবলার দিনের বেলায় মাঠের মাঝেই হাজার হাজার দর্শকের সামনে পশ্চাদ্দেশ উন্মুক্ত করে বসে পড়েছিলেন। আমি তো তেমন অবস্থায় কিছু করতে যাচ্ছি না। একে তো রাতের বেলা আবার ট্রেনের আশপাশ অন্ধকার। তাহলে চান্সটা কেন নিচ্ছি না? যেই ভাবা সেই কাজ। কিন্তু অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে যে কোনো সময় বেগ চেপে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে গিয়ে কাপড় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আমার মনে পড়ে হেফাজতি বাবু নাগরীর কথা।
গুণবতীর আগে ফের ট্রেন থামে। আরেকটা ট্রেন পাস করে গেলে তারপর ডেমু ছাড়বে। আমি চট করে হনুফার পাশ থেকে পানির বোতলটা তুলে নিয়ে উঠে পড়ি। যতটা দ্রুত পারি নেমে যাই পুব দিকের দরজা দিয়ে। দুটো বগির মাঝামাঝি ঘন অন্ধকারে প্যান্ট খুলে বসে যাই। আহা, জগতটা কত শান্তি আর সুখ সমৃদ্ধ হয়ে উঠলো। সেই সঙ্গে মনে পড়ে ছিলিমপুর যখন ছিলাম, সেখানকার এক জাহাজ ব্যবসায়ী নিজের গাড়ি করে প্রতিদিন অফিসে গেলেও খুব ভোরবেলা রেল লাইনের ওপর বসে তাকে বাহ্য কর্মটা সারতে দেখেছি অনেক দিন।
বোতলের পানিতে কতটা আর কাজ হয়? হাতের রুমালটাও কাজে লাগিয়ে ফেলি পরিচ্ছন্নতার নামে। আর রেলওয়ে বিভাগকে শাপ-শাপান্ত করতে করতে বলি- বালের ডেমু। শালারা আর কিছু পাইলো না!
নির্ভার হয়ে ফিরে আসি। হনুফার পাশে বসতেই ট্রেন ছেড়ে দেয় আবার। বড্ড কাহিল হয়ে গেছিলাম। হাত-পা আর চলতে চাইছিল না। সেই সঙ্গে আবার ঘাম। কিন্তু আমাকে নিঃস্পৃহ থাকতে দেখে সে আবার বলল, রুমালডা কই, ক্যামনে আবার ঘামতাসে!
আমি বলি, রুমাল নাই।
-হারাইয়া গেলুগগা নি?
সার্টের কলার উঁচিয়ে ধরে অন্যদিকে তাকিয়ে বলি- কামে লাগাইয়ালাইসি!
-কোন সময়? কই?
তার কণ্ঠস্বরে কৌতুক ঝমঝম করে।
-দুই বগির ফাঁকে।
আমার কথা শুনে সে আবার মুখ চেপে ধরে হাসতে হাসতে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর তা দেখে আমার মেজাজ আরো খারাপ হয়। হাত দিয়ে কপাল, গলার ঘাম মুছতে মুছতে বলি- হালার ডেমু, খ্যাতা পুড়ি তর!
(সমাপ্ত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


