"জল-বনের কাব্য"....
অনেক দিন পর কোনো বইয়ের পাতায় এমন সরল, মায়াময় গদ্য পড়লাম- বলতে পারিনা।পড়া শেষ করে এখনও ঘোর কাটছে না। বইয়ের নাম 'জল-বনের কাব্য', লেখিকাঃ সরলা বসু। বইটির প্রকাশ ১৯৫৭ সন।
লেখিকা সরলা বসু বিয়ের পর যখন তাঁর ফরেস্ট অফিসার স্বামীর কর্মস্থল সুন্দরবন বিট অফিসের বাসস্থানে আসেন, তখন তাঁর বয়স এগারো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাহেবদের আন্ডারে তাঁর স্বামীর বদলির চাকরি; বছর পাঁচেক তিনি কাটিয়েছেন ঐ অঞ্চলের নানা জায়গায়। সেই সব দিনের স্মৃতিকথার সংকলনই হল "জল-বনের কাব্য"।
কাব্যই বটে। বিভূতিভূষণকে উৎসর্গ করা বইটি বিভূতিভূষণের প্রভাব এ লেখায় স্পষ্ট; লেখিকাও সেকথা অস্বীকার করেননি। সুন্দরবনের নদীনালা, গাছপালা, জন্তুজানোয়ার আর মানুষ - সবাই যেন এ কাব্যের এক একটি অনবদ্য পংক্তি। এগারো থেকে ষোলো এই পাঁচ বছরে কিশোরী বঁধুর দৃষ্টিতে দেখা এ অঞ্চলের মানুষের জীবনচর্যা, তার অযাচিতভাবে পাওয়া স্নেহ-আদর-ভালবাসা, তার ছোট্ট সংসার - সবকিছু যেন সুন্দরবনের শ্যামল শোভায় সুন্দর হয়ে উঠেছে। লেখিকার বর্ণনাগুণ অসাধারণ! সাত-নদীর মোহানা, লতামন্ডপ, কপোতাক্ষী, পাখিদের গ্রাম, আলেতম-জলেতম - এক একটি অধ্যায় যেন এক একটি নিটোল মুক্তো - স্বচ্ছ অশ্রুবিন্দু।
এমন দরদী গদ্যের সাথে বাড়তি পাওনা এর মেয়েলী রচনাশৈলী। আছে একটি ছোট মেয়ের সংসার করার গল্প, দুচোখ ভরে প্রকৃতিকে দেখার গল্প। সংসারের খুঁটিনাটির সাথে বহিঃপ্রকৃতি যে এইভাবে মিশে যেতে পারে, এ লেখা না পড়লে জানা হত না কোনোদিন। এই অসাধারণ স্বাদের লেখা বোধহয় কোনো মেয়ের হাত ছাড়া বেরোনো অসম্ভবই ছিল।
শুধু স্মৃতিকথা নয়; এ যেন এক নিঃশব্দ আত্মোপলব্ধির গদ্যরূপ। সুন্দরবনের বহুনদীর বহতা জলের মতই আমাদের এই যে জীবন, এর যে মুহূর্তগুলি নিয়ে আমাদের আয়ু, সেগুলি ধীরে ধীরে সরে যায় আমাদের অজান্তে। যা কিছু প্রিয়, যা কিছুকে জেনেছি আমাদের 'নিকট' বলে, সবকিছুকে একদিন বিদায় দিতে হয় বিষাদক্লিষ্ট মনে। আমাদের আজ যে আগামীদিনে বিসর্জন যাবে অতীতের অতলে, সেই সত্যের মূর্তরূপ জেগে থাকে এ লেখার গভীরে। কত মানুষ জীবনে আসে আমাদের, হয়ে ওঠে বড় কাছের জন, অথচ একবার দূরে গেলে তাদের সংগে আর দেখা হয় না কোনোদিন। সেইসব মানুষেরাই তো ভরে রাখে স্মৃতির আঙিনা, বার্ধক্যে এসে যৌবনের নস্টালজিয়া।
বালিকা বঁধুর নিজ বর্ণনায় একটা মজার ঘটনাঃ এগারো বছর বয়সে যশোর জেলা থেকে নৌকায় প্রথমবারের মতো যখন স্বামীর কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তখন বাপের বাড়ি থেকে জামাইর জন্য শাশুড়ী একহাড়ী রসগোল্লা দিয়েছিলেন। নৌকায় যেতে যেতে নদীতে অনেক মাছ দেখতে পেয়ে রসগোল্লার রস চিপে ফেলে দিয়ে ছানাটুকু মাছদের ছুড়ে দিচ্ছিলেন। মাছ দের রসগোল্লা খাওয়া দেখে মুগ্ধ হয়ে সব রসগোল্লা মাছ দের খাইয়ে স্বামীর জন্য খালি হাড়ী নিয়ে হাজির হন সাত দিনের মাথায়!
সুন্দরবনকে উপজীব্য করে তৈরি আধুনিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে সরলা বসুর "জল বনের কাব্য" অনন্য এবং স্বতন্ত্র। বন কর্মকর্তা স্বামীর সঙ্গে থেকেছেন বাদাবনের সুপতি, চাঁদপাই, কপোতাক্ষী, বুড়ি গোয়ালিনী, নলগোড়া ফরেস্ট রেঞ্জে(উল্লেখিত স্থানগুলো আমি ব্যাক্তিগত ভাবে একসময় ঘুরে বেরিয়েছি বলেই বইয়ের প্রতিটি ঘটনাকে পড়ার সময় নিজেকেই সেইসব স্থানে উপস্থিত মনে হয়েছে)। উপন্যাসকে অবশ্য লেখিকা নিজেই সাহিত্যকর্ম বলতে রাজি নন। এ তার মনের রঙের তুলিতে আঁকা কৈশোরের ছবি, স্মৃতির রেখায় সে ছবিরই দাঁগ- জল বনের কাব্য। সপ্তাহখানেক ধরে সাত নদীর মোহনা হয়ে নদীপথে প্রথম পৌঁছেছিলেন বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। কয়েক দিনের যাত্রাপথে দেখা মাতন লাগা নদী, ন-বেকীর হাঁট, গাঘেঁষা বন, নোনা জলে জন্মানো সদ্য চেনা গাছের বাতাস, বন ও নদীনির্ভর মায়া বিবির মতো নানা গ্রামের হাটের নতুন খাবারের স্বাদ, বদলে যাওয়া টানে পরিবর্তিত ধারার আঞ্চলিক ভাষা সবই মনে রেখেছিলেন ছবির মতো। যার প্রমাণ, ছোট ছোট ঘটনাগুলোর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন অন্তরের অন্তস্থল থেকে।
এই বই আমি বারবার পড়ব, আরণ্যকের মতই। জীবনে পড়া খুব ভাললাগা বইগুলির একটি হয়ে রইল-"জল-বনের কাব্য"।
আর বলার কিছু নেই।।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৫:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




