"জোছনা করেছে আড়ি আসে না আমার বাড়ি"…গানটির কথায় এবং সুরে বাঙালি মজে আছে কয়েক দশক। আমরা জানি গানটি আখতারি বাঈর।

আখতারি বাঈর গানের ভালোমন্দ ব্যাখ্যা করার দুঃসাহস আমার নেই। গানের জগতে আমি শ্রোতা মাত্র। তিনি কী অসীম জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছেন… তারই একটুখানি বলার চেষ্টা করব এই পরিসরে।
পদে পদে বঞ্চনা, প্রতিবন্ধকতা, রক্ষকের লালসা, বাঈজী হিসেবে পরিচয়ের পথ বেয়ে আখতারি বাঈ ফৈজাবাদী হয়েছেন গজল সম্রাজ্ঞী "মল্লিকা-ই-গজল" বেগম আখতার।
শিশু শ্রেণীতে ফৈজাবাদের মিশন স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। ওখানকার বিখ্যাত মার্গসংগীতজ্ঞ এবং নৃত্যশিল্পী গওহরজান বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে তাঁর কণ্ঠে আমীর খশরুর ‘আম্মা মোরি ভেইয়া কো ভেজো রি কে শাওন আয়্যা’ গানটি শুনে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন…তালিম পেলে এ মেয়ে একদিন "মালিকা-এ-গজল" হবে। আশীর্বাদ বিফলে যায়নি।
আখতারির জীবনে মা মুশতারি বাঈ-এর প্রভাব অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন তাওয়ায়িক, নাচে গানে দক্ষ। আইনজীবী সৈয়দ আসগর হুসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী হলেন মুশতারি বাঈ। স্বামী সাহিত্য এবং সংগীতে অনুরাগী। প্রথম স্ত্রী থাকায় দ্বিতীয়বার বিয়ে করায় যা হয়! স্বামীর বাড়িতে মুশতারি বাঈয়ের স্থান হয়নি। উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদের গোলাপবাগের একটি বাড়িতে থাকেন। একসময় স্বামীর আসা যাওয়া বন্ধ হয়েযায়। মাসোহারা হয়েছে অনিয়মিত এবং প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অল্প। ১৯১৪ তে বিয়ের বছরই জন্মেছে যমজ দুই কন্যা। সতীনের আত্মীয়দের চক্রান্তে চার বছর বয়সে বিষ খাইয়ে মারা হয় এক সন্তানকে। ঘরেও আগুন লাগিয়ে দেয় মা মেয়েকে পুড়িয়ে মারার জন্য। প্রাণ বাঁচাতে গয়াতে পালিয়ে আসেন মুশতারি বাঈ। শিশু আখতারির লেখা পড়ার চেয়ে গানেই আগ্রহী। রাস্তার ভিখারীদের গাওয়া গান অনায়াসে কণ্ঠে তুলে নিয়ে আপন মনে গাইত। মা মুশতারির ইচ্ছায় ওস্তাদ ইমদাদ খানের কাছে ৭ বছর বয়সে গান শেখা শুরু।
১৯২৩ সনে আবার ফিরে এলেন ফৈজাবাদে। এখানে পাতিয়ালার ওস্তাদ আতা মোহাম্মদ খাঁ-কে পেলেন গুরু হিসেবে। দশ বছর তাঁর কাছে রেওয়াজ করেছেন। তাঁরই প্রেরণায় সংস্কৃতির শহর কোলকাতায় আসা আর জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়া। কোলকাতা চিরকালের সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থান।
যমজ বোনের মৃত্যু আখতারিকে ধাক্কা দিয়েছিল খুব। ১১ বছর বয়সে নিজেও শিকার হন এক গুরুজীর লালসার। তেরো বছর বয়সে বিহারের এক রাজার লালসায় একটি কন্যার জননী হলেন আখতারি। মা মুশতারি বাঈ সেই মেয়েকে নিজ আত্মজার স্বীকৃতি দিলেন। আজীবন বেগম আখতার আত্মজার পরিচয় দিয়েছেন সহোদরা বলে।
কোলকাতায়ও সুখের জীবন ছিল না। অভাব অভিযোগ পিছু ছাড়ে না। তবে গুরু আতা মোহম্মদ খাঁ আর মায়ের আশীর্বাদ ছিল। ১৯৩৪ সনে বিহারের ভূমিকম্পে সাহায্যের জন্য কোলকাতার আলফ্রেড থিয়েটার একটি সংগীতানুষ্ঠান করে। ওস্তাদ আমান আলী খাঁ এবং তাঁর শিষ্য ওস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করলেন। একজন ধ্রুপদী শিল্পী না আসায় ওস্তাদ আতা মোহাম্মদ খাঁ শিষ্যাকে এগিয়ে দিলেন। ভীরু পায়ে মঞ্চে উঠে পরিবেশন করলেন…'তুম্ না হোতে হরজাই কুছ য়্যায়সি আদা পায়ি/ত্যক্তা হ্যায় তেরি আউর এক্ তামাশায়ি'...
মুগ্ধ দর্শককুলের অনুরোধে গেয়ে চললেন একের পর এক গান। নিজের লেখা উর্দু কবিতা পাঠ করলেন। উপস্থিত ছিলেন সরোজনী নাইডু। অভিভূত তিনি আশীর্বাদ করলেন নিজের খাদি উত্তরীয় পরিয়ে। জীবনের প্রথম সম্মাননা এবং স্বীকৃতি।
আর ফিরে তাকাতে হয়নি নিজের কেরিয়ারের দিকে। বিয়ে করলেন লখনৌয়ের প্রসিদ্ধ ব্যারিষ্টার নবাব ইস্তিয়াক আহম্মদ আব্বাসিকে। বাঈজী থেকে বেগমে উত্তরণ ঘটল। কিন্তু গান চলে গেল জীবন থেকে। কেননা বিয়ের অন্যতম শর্ত ছিল সেটাই। গান ছাড়া বেগম আখতারকে ভাবাই যায় না। ফলে মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ফলে আবার ফিরে এলেন সংগীতের জগতে।
কোলকাতার মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির জিতেন ঘোষ পিতৃতুল্য স্নেহ করতেন তাঁকে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানিতে কাজী নজরুল ইসলাম, কাননদেবী, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, বড়ে গোলাম আলি খাঁ, কমলা ঝরিয়া, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি তাবড় তাবড় শিল্পীদের সঙ্গে আখতারি বাঈও ছিলেন।
জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের রচনা ও সুরে বেগম আখতার গেয়েছেন…'পিয়া ভোল অভিমান', 'কোয়েলিয়া গান থামা' - ইত্যাদি। বাংলা গানেরও রেকর্ড করেছেন। 'জোছনা করেছে আড়ি', 'এ মৌসুমে পরদেশে', 'চুপি চুপি চলে না গিয়ে', 'ফিরে কেন এলে না' …ইত্যাদি।
চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। "রোটি" তে নায়িকার ভূমিকায় এবং সত্যজিৎ রায়ের "জলসাঘর"-এ অভিনয় করেছেন আখতারি বাঈ। প্লে ব্যাক করেছেন ছায়াছবিতে। যদিও মা এবং গুরুদেবের বারণ ছিল। কেননা এর ঝলকানি প্রকৃত মার্গসংগীতে বাধা হবে। তবু দারিদ্র রুখতে এছাড়া আর উপায় কী!
অল ইন্ডিয়া রেডিও তে লখনৌ, কোলকাতা, দিল্লী ও আমেদাবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দিল্লী দূরদর্শনে জন্মলগ্ন থেকেই যুক্ত ছিলেন।
৩০ বছরের দাম্পত্য জীবনে করাচি, কাবুল, তেহরান, লন্ডন, রাশিয়ায় বিরামহীন ছুটে চলা ছিল তাঁর। ১৯৭৪ এ ২৬ অক্টোবর পাবলিক অনুষ্ঠানে মাঝপথে থেমে যেতে হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। শেষ অসমাপ্ত গান…"আয়ে মোহব্বত তেরে আনজাম পে রোনা আয়া"- গানটি শেষ করতে পারেননি।
পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর নিজ আত্মজীবনীতে আকতারি বাঈ সম্পর্কে বললেন…"One of the greatest! Not only in India, but in the world caliber.……She had a great capacity to be able to reach the depth of the heart of the listener." এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে কি!
বেগম আখতার সম্মাননা পেয়েছেন অনেক। সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, ভারত সরকারের থেকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ।
আজীবন প্রেমের কাঙাল ছিলেন। একাকীত্ববোধ ছিল প্রবল। পথে কাঁটা দেখে পথ থেকে পিছিয়ে আসেননি কখনো। অভাবকে দেখেছেন নিত্য, পাপকে দেখেছেন নানা ছলে। পথের কাঁটা দু পায়ে মাড়িয়ে চলেছেন। রক্তাক্ত হয়েছেন কতবার, তারপরেও চলা থামেনি। তবেই তিনি আজ পৃথিবীতে পরিচিত হয়েছেন গজল সম্রাজ্ঞী নামে।গানটির কথায় এবং সুরে বাঙালি মজে আছে কয়েক দশক। আমরা জানি গানটি আখতারি বাঈর।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৫:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




