somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

সময় পেরিয়ে যায়, সুখস্মৃতি থেকে যায়.....

০৬ ই এপ্রিল, ২০২১ সকাল ৯:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
সময় পেরিয়ে যায়, সুখস্মৃতি থেকে যায়..



স্মৃতি বিবর্ণ হয় না বলেই কি মনে লেগে থাকে।
ঘর, অরণ্য, মেঘ, পাহাড়, সমুদ্র আমাকে বারবার টেনেছে বাইরের দিকে। কত স্মৃতি এমন করেই আমাকে বিবশ করে রেখেছে।
আমার আব্বার বেশ কয়েকটি ঘড়ি ছিলো। সেখান থেকেই ঘড়ির প্রতি ছেলেবেলা থেকে আমার দুর্বলতা। আমি ঘড়ি পরতে চাইতাম। কিন্তু ঘড়ি পরার নাকি মিনিমাম সময় হচ্ছে মাধ‍্যমিকের গন্ডি টপকানো। মানে বড় হয়ে। মাধ‍্যমিক মানে বড় হওয়া। আসলে কেউ কেউ বড় হয়না। অন‍্য কারোর চেয়ে ছোটই থেকে যায়। বড় হওয়াটা আপেক্ষিক‌।

আমার যখন ছেলেবেলা, তখন ঘড়ি হাতে দেওয়া মানুষ খুব বেশী ছিলো না। তারউপর ক্যাডেট কলেজে ঘড়ি হাতে দেওয়া অলিখিত ভাবে নিষিদ্ধ ছিলো। প্রেয়ার, পিটি, ড্রিল, গেম, ক্লাস, রিডিং, ডাইনিং সবকিছুই ঘন্টার শব্দে করতে হয়। তবে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার সময় ঘড়ি হাতে দেওয়া যেতো(যদিও ঘড়ি হাতে দেওয়ার আর্থিক সংগতি সম্পন্ন মানুষ খুব বেশী ছিলো না)। আমি এসএসসি পাশের আগেই বড়ো হয়ে গেলাম! অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষার আগে আব্বার ব্যবহার করা বেশ কয়েকটি মধ্য থেকে আমার হাতের শেপে মানায় তেমন একটা ঘড়ি বুবু আমার হাতে পরিয়ে দিলেন। ঘড়ির ব্রান্ড নাম Favre Leuba Sea King, Ultra Slim,18K Gold. Water Resistance, Made in Switzerland. পুরনো কিন্তু কি তার জৌলস! অনেক দামী ঘড়ি....লাইফটাইম সার্ভিস গ্যারান্টি!
হোক পুরোনো তাতে কি, আমার নতুন হাতে পরে সেতো নতুনই! আমি এখন একটা ঘড়ির মালিক। ঘড়ি আমি হাতছাড়া করিনা‌, প্রায় ফুল টাইম ঘড়ি হাতে পরে থাকি। ঘড়ি হাতে ঘুমাই, কতক্ষণ পরপর হাত উল্টে সময় দেখি। ঘড়িতে চোখ রাখি, মুহুর্তগুলো রঙিন হয়ে আমার 'বড়' হওয়ার চিহ্ন রেখে যায়‌। প্রতিদিন ঘড়িতে দম দেওয়ার আকাংখা তখন দুর্দম কিন্তু একদিন দম দিলে ৫/৭ দিন চলে। ঘড়িতেই সকাল হয়, দুপুর হয়, সন্ধ‍্যে হয়, আর গভীর রাতের অন্ধকারে আমার ঘড়িতে যখন রেডিয়ামের আলো জ্বলে তখন আমার মনেও আলো জ্বলে। বড় হওয়ার আলো। ঘড়ি হাতে যখন হাঁটি তখন যেন মনেহয়- আমি হাঁটি না, সময় হাঁটে। কেউ সময় জিজ্ঞেস করলে ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড বলি!

সময় এখনো হেঁটে চলেছে আমার সাথে অবিরাম। অথচ সময়কে আমি ছুঁতে‌ পারিনি। এখন মনেহয়, হাতের ঘড়ির কাঁটা কতো বার আমাকে সময়ের মূল‍্য টিকটিক করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, আমি তা দেখেছি হাতের কবজি ঘুরিয়ে। আমি ভেবেছি 'অনেক সময় আছে'। অথচ সময় বয়ে গেছে, কতো কাজ 'পরে করবো' বলে ফেলে রেখেছি, পরে সেই কাজই আর শেষ করতে পারিনি‌। ঘড়িটা নিশ্চই তা দেখে নীরব হেসে আমাকে ব‍্যঙ্গ করে গেছে। আমি শুধু ঘড়িতে সময় দেখেছি, কিন্তু ঘড়ি আমার হাতে নিজেকে বেঁধে রেখেও সময় বেঁধে আমাকে দিয়ে কিচ্ছু করাতে পারেনি!

তখন বুঝিনি, এখন বুঝি- ঘড়ি বাঁধা যায়, সময় বাঁধা যায়না। যখন বুঝলাম, সময় তখন অনেক বয়ে গেছে।
এখনো আমার হাতে ঘড়ি বাঁধা থাকে। এখনো আগের মতোই টিকটিক করে এগোয়। আমার মনেহয় ওই কাঁটাগুলো শুধু টিকটিক করেনা, মুচকি হাসে।

এসএসসি পরীক্ষা শেষ। আমরা পাঁচ সহপাঠী ঝিনেদা-যশোর-খুলনা হয়ে ঢাকা ফিরছি গাজী ষ্টীমারে....ভোর রাতে যখন চাঁদপুর স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে তখন অনেক যাত্রীদের মতো আমরাও ষ্টীমারের রেলিং এ দাঁড়িয়ে চাঁদপুর দেখছি। হঠাৎ তরুণ বয়সী এক ছেলে হ্যাচকা টানে আমার হাত থেকে ঘড়িটা ছিড়ে নিয়ে নদীতে ঝাপ দেয়! আমার খালি হাতের দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠলো‌‌। শরীর জুড়ে বেদনার শিহরণ। আমার ঘড়িটা আমার আর হাতে নেই। বুকের ভিতর শুধুই হাহাকার!
কিন্তু ভাগ্যবান আমি। ছিনতাইকারীর হ্যাচকা টানে ঘড়িটা ছিড়ে পড়ে যায় ষ্টীমারের ডেকে.... খালি হাতেই ছিনতাইকারী নদীতে ঝাপ দেয়! আমার প্রিয় ঘড়িটা আমিই ফিরে পাই।

দুই বছর পর, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে বরিশাল বেড়াতে যাই। আমার পৈত্রিক বাড়ি সংলগ্ন অক্সফোর্ড মিশন স্কুলে অসাধারণ সুন্দর বড়ো একটা পুকুর আছে। কাজীনদের সাথে সেই পুকুরে গোসল করতে যেয়ে আমার ঘড়িটা হারিয়ে ফেলি। যে কয়দিন বরিশাল ছিলাম প্রতিদিনই কাজীন এবং বন্ধুদের নিয়ে ঘড়ি খুঁজেছি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ঘড়িটা না পেয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে জানাই।
প্রায় একমাস পর মিশনারী স্কুলের এক ছাত্র ঘড়িটা পুকুরের কাদাপানিতে খুঁজে পেয়ে স্কুলের ফাদার রিগ্যান রিগভীকে জমা দেয়। ঘড়িটা তখনও সচল ছিলো। উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে ওরা আমাদের বাড়িতে ঘড়িটা পৌঁছে দেয়। অপ্রত্যাশিত ভাবে আমি ফিরে পাই আমার প্রিয় ঘড়ি!

পুরোনো মানেই তো কিছু স্মৃতি। যা কখনো ফিকে হয়না‌। তারপর আমার হাতে কতো ঘড়ি এসেছে, গেছে, কিন্তু কোনো ঘড়ির কাঁটাই যেন অমন মসৃণ ভাবে এগোয়নি। আমার অনেকগুলো অভিযাত ব্রান্ড ঘড়ি সংগ্রহে আছে। কিন্তু মাধ‍্যমিক পরীক্ষার আগে পাওয়া ওই পুরোনো Favre Leuba Sea King ঘড়িটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। কারণ, ওটা শুধু ঘড়ি নয়, ওর সংগে লেপটে আছে আমার বাবার ছোঁয়া, বুবুর অসীম ভালোবাসা‌।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৪ সকাল ১০:১৩
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×