
স্মৃতি বিবর্ণ হয় না বলেই কি মনে লেগে থাকে।
ঘর, অরণ্য, মেঘ, পাহাড়, সমুদ্র আমাকে বারবার টেনেছে বাইরের দিকে। কত স্মৃতি এমন করেই আমাকে বিবশ করে রেখেছে।
আমার আব্বার বেশ কয়েকটি ঘড়ি ছিলো। সেখান থেকেই ঘড়ির প্রতি ছেলেবেলা থেকে আমার দুর্বলতা। আমি ঘড়ি পরতে চাইতাম। কিন্তু ঘড়ি পরার নাকি মিনিমাম সময় হচ্ছে মাধ্যমিকের গন্ডি টপকানো। মানে বড় হয়ে। মাধ্যমিক মানে বড় হওয়া। আসলে কেউ কেউ বড় হয়না। অন্য কারোর চেয়ে ছোটই থেকে যায়। বড় হওয়াটা আপেক্ষিক।
আমার যখন ছেলেবেলা, তখন ঘড়ি হাতে দেওয়া মানুষ খুব বেশী ছিলো না। তারউপর ক্যাডেট কলেজে ঘড়ি হাতে দেওয়া অলিখিত ভাবে নিষিদ্ধ ছিলো। প্রেয়ার, পিটি, ড্রিল, গেম, ক্লাস, রিডিং, ডাইনিং সবকিছুই ঘন্টার শব্দে করতে হয়। তবে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার সময় ঘড়ি হাতে দেওয়া যেতো(যদিও ঘড়ি হাতে দেওয়ার আর্থিক সংগতি সম্পন্ন মানুষ খুব বেশী ছিলো না)। আমি এসএসসি পাশের আগেই বড়ো হয়ে গেলাম! অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষার আগে আব্বার ব্যবহার করা বেশ কয়েকটি মধ্য থেকে আমার হাতের শেপে মানায় তেমন একটা ঘড়ি বুবু আমার হাতে পরিয়ে দিলেন। ঘড়ির ব্রান্ড নাম Favre Leuba Sea King, Ultra Slim,18K Gold. Water Resistance, Made in Switzerland. পুরনো কিন্তু কি তার জৌলস! অনেক দামী ঘড়ি....লাইফটাইম সার্ভিস গ্যারান্টি!
হোক পুরোনো তাতে কি, আমার নতুন হাতে পরে সেতো নতুনই! আমি এখন একটা ঘড়ির মালিক। ঘড়ি আমি হাতছাড়া করিনা, প্রায় ফুল টাইম ঘড়ি হাতে পরে থাকি। ঘড়ি হাতে ঘুমাই, কতক্ষণ পরপর হাত উল্টে সময় দেখি। ঘড়িতে চোখ রাখি, মুহুর্তগুলো রঙিন হয়ে আমার 'বড়' হওয়ার চিহ্ন রেখে যায়। প্রতিদিন ঘড়িতে দম দেওয়ার আকাংখা তখন দুর্দম কিন্তু একদিন দম দিলে ৫/৭ দিন চলে। ঘড়িতেই সকাল হয়, দুপুর হয়, সন্ধ্যে হয়, আর গভীর রাতের অন্ধকারে আমার ঘড়িতে যখন রেডিয়ামের আলো জ্বলে তখন আমার মনেও আলো জ্বলে। বড় হওয়ার আলো। ঘড়ি হাতে যখন হাঁটি তখন যেন মনেহয়- আমি হাঁটি না, সময় হাঁটে। কেউ সময় জিজ্ঞেস করলে ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড বলি!
সময় এখনো হেঁটে চলেছে আমার সাথে অবিরাম। অথচ সময়কে আমি ছুঁতে পারিনি। এখন মনেহয়, হাতের ঘড়ির কাঁটা কতো বার আমাকে সময়ের মূল্য টিকটিক করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, আমি তা দেখেছি হাতের কবজি ঘুরিয়ে। আমি ভেবেছি 'অনেক সময় আছে'। অথচ সময় বয়ে গেছে, কতো কাজ 'পরে করবো' বলে ফেলে রেখেছি, পরে সেই কাজই আর শেষ করতে পারিনি। ঘড়িটা নিশ্চই তা দেখে নীরব হেসে আমাকে ব্যঙ্গ করে গেছে। আমি শুধু ঘড়িতে সময় দেখেছি, কিন্তু ঘড়ি আমার হাতে নিজেকে বেঁধে রেখেও সময় বেঁধে আমাকে দিয়ে কিচ্ছু করাতে পারেনি!
তখন বুঝিনি, এখন বুঝি- ঘড়ি বাঁধা যায়, সময় বাঁধা যায়না। যখন বুঝলাম, সময় তখন অনেক বয়ে গেছে।
এখনো আমার হাতে ঘড়ি বাঁধা থাকে। এখনো আগের মতোই টিকটিক করে এগোয়। আমার মনেহয় ওই কাঁটাগুলো শুধু টিকটিক করেনা, মুচকি হাসে।
এসএসসি পরীক্ষা শেষ। আমরা পাঁচ সহপাঠী ঝিনেদা-যশোর-খুলনা হয়ে ঢাকা ফিরছি গাজী ষ্টীমারে....ভোর রাতে যখন চাঁদপুর স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে তখন অনেক যাত্রীদের মতো আমরাও ষ্টীমারের রেলিং এ দাঁড়িয়ে চাঁদপুর দেখছি। হঠাৎ তরুণ বয়সী এক ছেলে হ্যাচকা টানে আমার হাত থেকে ঘড়িটা ছিড়ে নিয়ে নদীতে ঝাপ দেয়! আমার খালি হাতের দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠলো। শরীর জুড়ে বেদনার শিহরণ। আমার ঘড়িটা আমার আর হাতে নেই। বুকের ভিতর শুধুই হাহাকার!
কিন্তু ভাগ্যবান আমি। ছিনতাইকারীর হ্যাচকা টানে ঘড়িটা ছিড়ে পড়ে যায় ষ্টীমারের ডেকে.... খালি হাতেই ছিনতাইকারী নদীতে ঝাপ দেয়! আমার প্রিয় ঘড়িটা আমিই ফিরে পাই।
দুই বছর পর, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে বরিশাল বেড়াতে যাই। আমার পৈত্রিক বাড়ি সংলগ্ন অক্সফোর্ড মিশন স্কুলে অসাধারণ সুন্দর বড়ো একটা পুকুর আছে। কাজীনদের সাথে সেই পুকুরে গোসল করতে যেয়ে আমার ঘড়িটা হারিয়ে ফেলি। যে কয়দিন বরিশাল ছিলাম প্রতিদিনই কাজীন এবং বন্ধুদের নিয়ে ঘড়ি খুঁজেছি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ঘড়িটা না পেয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে জানাই।
প্রায় একমাস পর মিশনারী স্কুলের এক ছাত্র ঘড়িটা পুকুরের কাদাপানিতে খুঁজে পেয়ে স্কুলের ফাদার রিগ্যান রিগভীকে জমা দেয়। ঘড়িটা তখনও সচল ছিলো। উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে ওরা আমাদের বাড়িতে ঘড়িটা পৌঁছে দেয়। অপ্রত্যাশিত ভাবে আমি ফিরে পাই আমার প্রিয় ঘড়ি!
পুরোনো মানেই তো কিছু স্মৃতি। যা কখনো ফিকে হয়না। তারপর আমার হাতে কতো ঘড়ি এসেছে, গেছে, কিন্তু কোনো ঘড়ির কাঁটাই যেন অমন মসৃণ ভাবে এগোয়নি। আমার অনেকগুলো অভিযাত ব্রান্ড ঘড়ি সংগ্রহে আছে। কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে পাওয়া ওই পুরোনো Favre Leuba Sea King ঘড়িটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়। কারণ, ওটা শুধু ঘড়ি নয়, ওর সংগে লেপটে আছে আমার বাবার ছোঁয়া, বুবুর অসীম ভালোবাসা।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৪ সকাল ১০:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




