somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

স্মৃতিভ্রম....

১৮ ই এপ্রিল, ২০২১ ভোর ৫:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্মৃতিভ্রম....

একদা আমাদের বৃহত্তর যৌথ পরিবারে আমরা ৬ জন ভাইবোন ছিলাম- স্কুল ক্লাসের ব্যবধান ছিলো এক দুই তিন চার ক্লাস সিনিয়র। আমি সর্ব কনিষ্ঠ।
সেই সময় আমাদের একজন ধর্মীয় শিক্ষক ছাড়া আরও দুইজন হিন্দুধর্মাবলম্বী গৃহ শিক্ষক ছিলেন, যাদের কাছে আমাকেও পড়তে হতো। উমেশচন্দ্র পণ্ডিত স্যার পুরনো ঢাকার নবকুমার ইন্সটিটিউটের শিক্ষক। ছাত্র জীবনে তিনি আমার ছোট চাচার সহপাঠী। হোম ডিস্ট্রিক্ট এবং গ্রামের বাড়িও একই এলাকার সুবাদে সবাই আমাদের পারস্পরিক পরিবারের সদস্য হিসেবে একাত্মবোধ করতেন। একই কারণে উমেশ স্যার আমাদের কাছে স্যারের থেকে অনেক বেশী 'উমেশ কাকু' ছিলেন।

উমেশ স্যারের দুই ছেলে, বড়ো জগদীশ দাদা জগন্নাথ কলেজে এইচএসসি’র ছাত্র আর ছোট ছেলে দীনেশ আমার বয়সী, নবকুমার ইন্সটিটিউটে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ওরা ডিএমসি স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতো। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ২৮ মার্চ উমেশ স্যার ও দীনেশকে পাক সেনারা ধরে নিয়ে যায় ওদের কলোনির সামনে থেকে। স্যার ও দীনেশকে অনেক শারীরিক নির্যাতন করে দুই দিন পর দীনেশকে ছেড়ে দিলেও উমেশ স্যারকে ক্যাম্পে রেখে বাথরুম, ড্রেন পরিস্কার, রান্নার কাঠ কাটা ইত্যাদি সব কষ্টের কাজ করাতো। স্যার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পরলে অক্টোবর মাঝামাঝি তাকে ছেড়ে দেয়।
জগদীশ দাদা, দীনেশ ওদের মা(ডিএমসি হাসপাতালের নার্স, আমরা মিনু কাকী ডাকতাম) অনেক কষ্ট করে আমাদের বাড়িতে চলে আসে এবং এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আমাদের পরিবারের সাথে ওরাও গ্রামে চলে যায়। পাক সেনাদের শারীরিক নির্যাতন আর ভয়ে দীনেশের মানষিক সমস্যা দেখা দেয়।

মাইলের পর মেইল হেটে, বাসে, লঞ্চে নৌকায় পথ পাড়ি দিয়ে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে আমিও বাড়ি পৌঁছাতে পারি। যদিও দীনেশ অনেকটাই মানষিক ভারসাম্যহীন তবুও আমাকে চিনতে পারে এবং ওকে পেয়ে দুজনেই খুব খুশী হই। ইতোমধ্যে এলাকার ছাত্র, যুবকদের সংগঠিত করে আমাদের বৃহত্তর পরিবারের অনেকেরই ব্যাক্তিগত লাইসেন্স করা বন্দুক, পয়েন্ট টুটু বোর রাইফেল,রিভলবার, পিস্তল নিয়ে এবং একই সাথে এলাকারআরও যাদের লাইসেন্স করা স্মল আর্মস ছিলো সেগুলো নিয়ে আমার বড়ো ভাই, মামা, চাচাদের নেতৃত্বে মুক্তি যুদ্ধের ট্রেনিং চলছিলো পুরোদমে...
জগদীশ দাদা মুক্তি যুদ্ধে যোগ দেন, সেই ইতিহাস বলছি না.....

জগদীশ দাদা আর দীনেশ দুই ভাইয়ের চেহারায় খুব মিল। সেই ছেলে বেলাতেই বয়স ভেদে দুজনের উচ্চতা ছাড়া তাদের হঠাৎ আলাদা করা বেশ কঠিনই। স্বাধীনতার পর উমেশ স্যারের পরিবার আর ঢাকা শহরে বসবাসের জন্য ফিরে আসেনি। তবে উমেশ স্যার ও দীনেশকে "যুদ্ধাহত মুক্তি যোদ্ধা" হিসাবে চিকিৎসার জন্য সরকার যুগোস্লাভিয়া পাঠিয়েছিলো এবং দুজনেই সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসলেও স্যার বছর খানিক পরে মারা যান। মিনু কাকী মারা গেছেন ২০০০ সনে। তবে ওরা যেকোনো কাজে ঢাকা আসলে আমার বাবা, চাচাদের বাড়িতে এসে অত্যন্ত আপনজনের মতো থাকে। জগদীশ দাদা আর কলেজে ফিরে যাননি, দীনেশ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ পাস করেছে। ওদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে। স্বাধীনতার আগেও অনেক জমিজমা ছিলো। দুই ভাইয়ের সততা আর পরিশ্রমে সমন্বিত বহুমুখী মৎস্য ও পশু পালন করে সফল খামারি হিসেবে দুই বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। জগদীশ দাদা নিঃসন্তান। এলাকায় সমাজ সেবক হিসেবে পরিচিত। লেটা ম্যারেজ দীনেশ দুই মেধাবী সন্তানের জনক। দুই বছর আগে ওর মেয়ে ঢাকায় আমার বাসায় থেকে বুয়েট, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে পড়ছে। ছেলেটা এইসএসসি রেজাল্টের অপেক্ষায়।
সময়ের ব্যবধানে অনেক দুরত্ব বেড়েছে- যারযার ব্যাস্ততায় কে কার খোঁজ রাখে! একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে ১৫ বছর পর সম্প্রতি ছোট ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। যথারীতি প্রতিবেশী গ্রামের অনেকেই দেখা করতে আসেন। জগদীশ দাদা আর দীনেশও এসেছিলেন।

অনেক উচ্ছাসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার কুশলাদি জানতে চায়- আমি সব প্রশ্নের জবাব দেই। আমার গুম হওয়া বিষয় ক্ষোভ, অনুযোগ আর সহানুভূতির আন্তরিক প্রকাশ সবার মধ্যেই। আমিও ওর বিভিন্ন বিষয় খোঁজ নেই, নানান প্রশ্ন করি....আমাদের জন্য এক জগ গরুর দুধ নিয়ে এসেছে, পুকুর থেকে বড়ো কৈ, মাগুর মাছ ধরে নিয়ে এসেছে... কিন্তু আমি লক্ষ্য করি, আমার সাথে আলাপ চারিতায় দীনেশ যেনো ক্রমশ চুপসে যাচ্ছে... হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, "তুই রেস্ট কর, টাইম পাইলে আমাগো বাড়ি যাইস"। আমি বলি, বিকেলে তুই আসিস, তোর সাথেই যাবো"....ও আমার মুখের দিকে একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে চলে যায়.....। আমি অপেক্ষমান অন্যদের সাথে কথা বলি....

একটু পর, দীনেশ ওর মেডিক্যাল কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আর ছেলে নিয়ে আবার এসেছে টিফিন কেরিয়ারে খাবার নিয়ে। ওর মেয়ে আর ছেলে আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে.... আমি আশীর্বাদ করি... দীনেশ আমাকে আবারও জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, "কেমন আছিস? শরীর কেমন? সাজিদ আসছে নাকি? বৌদিদিকে নিয়া আসলি না ক্যান? শুভ, ওর বৌ বাচ্চা নিয়া আসলি না ক্যান?... তুই অনেক শুকাইয়া গেছিস! তোরে কি চুৎমারানির পুতেরা মার্ছে?....."!

....আমি ওর কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারছিনা! ..... যা বোঝার, আমি তা বুঝে গেছি! সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে!! একটু আগে যাকে আমি দীনেশ ভেবে তুই তোকারি করেছিলাম সে দীনেশ ছিলো না, তিনি আমার 'দাদা জগদীশ'! আমার তুই তোকারি সম্বোধনে বিব্রত হয়ে চলে গিয়েছেন....
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:৩০
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×