নার্সিসিজম....
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পৃথিবীতে মানুষের প্রিয়তম মুহূর্ত হল আয়নায় নিজের মুখ দেখা। মানুষের নিজের মুখের চেয়ে প্রিয় আর কিচ্ছু নেই যা কোটি কোটি বার দেখেও আশ মেটেনা(যদিও এই কাজটি আমি শেভ করার সময় ছাড়া কদাচিৎ আয়নায় নিজেকে দেখি)।
নার্সিসাস নামে এক গ্রীক দেবতা ছিলেন। নার্সিসাস ছিলেন ভয়ঙ্কর রকমের সুপুরুষ। তিনি এতই সুপুরুষ ছিলেন যে প্রত্যেক গ্রীক রমণী তাকে কামনা করত, তার সান্নিধ্য লাভ করতে চাইত। সে ছিল জলপরি লিরিওপি ও নদী দেবতা সেফিসাসের সন্তান।
এহেন নার্সিসাসের সান্নিধ্য কামনা করলেন বনদেবী অফিউস। তিনি নার্সিসাসের কাছে কাতর আকুতি করলেন, দেবতার সান্নিধ্য লাভের জন্য। এদিকে নার্সিসাস তখন অন্য নারীতে মুগ্ধ। তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন বনদেবীকে। প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাগে, দুঃখে, অপমানে অফিউস ছুটে গেলেন অদৃষ্ট'র দেবতা নেমেসিসের কাছে।
ক্রুদ্ধ নেমেসিস অভিশাপ দিলেন নার্সিসাস কে, 'তোমার এই রূপ'ই তোমার মৃত্যুর কারণ হবে'।
দিন যায় রাত যায়- নার্সিসাসকে প্রেম নিবেদন করে চলে একের পর এক নারী। নার্সিসাস প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় এক নারী থেকে অন্য রমণীতে।
একদিন এক নদীর তীরে হাঁটতে হাঁটতে স্বচ্ছতোয়া পানিতে নার্সিসাস দেখতে পেলেন নিজের প্রতিবিম্ব। দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন নিজের প্রতিবিম্বের দিকে। নিজের রূপে তিনি এতই বিমুগ্ধ হয়ে গেলেন যে ওই স্থান ছেড়ে আর অন্য কোথাও যেতে পারলেন না। অবশেষে আহার নিদ্রাহীন আত্মমুগ্ধ নার্সিসাস ওই স্থানেই প্রাণত্যাগ করলেন।
এই যে আত্মঘাতী আত্মমুগ্ধতা, এই হল নার্সিসিজম।এও একধরণের মানসিক বিকৃতি।
নিজের রূপ শুধু নয়। নিজের কথা, নিজের কাজ, নিজের সঙ্গী, নিজের শখ...এমন অনেক কিছু মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিভোরতাই নার্সিসিজম।
শুধু ব্যক্তিমানসিকতা নয়, এই আগুনে ঘি ঢেলে চলেছে ভোগবাদী ও পুঁজিবাদী আন্তর্জাতিক চক্র।
এই চেষ্টাটা শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই। যৌথ পরিবারগুলো ভাঙতে থাকা দিয়ে শুরু। তারপর নিজের গাড়ি, নিজের ফ্ল্যাট, নিজের ইচ্ছে নিয়ে সমাজকে ভুলে থাকা, সামাজিকতা ভুলে থাকা মানুষের বেড়ে চলা অবসেশন। সামাজিক ভাবে আজ যেটা চূড়ান্ত পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। প্রাথমিক উদ্দেশ্য সোজাসাপটা বাণিজ্যিক। প্রতিটি মানুষ নিজের পৃথকতায় উল্লসিত হতে আরো বেশি ভোগ্যদ্রব্য কিনে বাজার বাড়ায়, ততই বণিকের সুবিধা। যৌথ-সম্পদ নিয়ে তার যেন হীনমন্যতা ও অসন্তোষ তৈরী হয়। সে নিজেকে আলাদা করে যাতে অহেতুক বিজ্ঞাপিত করতে পারে, তার একটা ট্রেন্ড সেটিং। আসল উদ্দেশ্য মানুষকে মানুষের থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা। তাকে একাকীত্বে ঠেলে দিয়ে দুর্বল করা। তাকে ভোগবাদী করে তুলে, শাসকের বিরুদ্ধে সমাজে স্পর্ধিত-প্রতিবাদী ভাবনা কিংবা আচরণকে নিস্তেজ করে রাখা। কারণ বিচ্ছিন্ন, বিভ্রান্ত, বিহ্বল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। তাই পুঁজিবাদী শিকারী কষ্ট করে এখন আর শিকারের পিছনে ছোটে না, তার কাজ শুধু অগভীর দেখনদারিত্বের মানসিকতাটাকে বেশ করে তোল্লাই দিয়ে শিকারকে তিলে তিলে আত্মহত্যাপ্রবণ করে তোলা।
আজকের তরুণ প্রজন্ম সেলফি অ্যাডিক্টেড(আমার ফ্রেন্ড লিস্টের এক শ্রেণীর বুড়ো-বুড়িরাও কম যায়না)। তারা অবিশ্রান্ত ভাবে একের পর এক সেলফি তুলছে।
শুধু মানুষ না, শিম্পাঞ্জিদের মানসিক গঠনও এক- ওরাও আয়নায় নিজেকে দেখতে খুব পছন্দ করে। এই যে অসহায় আত্মমুগ্ধতা, এই যে নিজেকে নিয়ে বিভোর হয়ে থাকার চূড়ান্ত অসামাজিকতা, এই যে সেলফিসের মত সেলফি তোলা- এর মূল কারণ বহুজনের মধ্যে থেকেও একাকীত্ব, নিজের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্টি।
ঠিক এক জায়গা থেকেই শুধু নিজেকে দেখে যাওয়া এবং নিজেকে দেখানো। নিজের সঙ্গে প্রেম করা, নিজেকে নতুন করে খুঁজে বেড়ানোর প্রাণপণ প্রচেষ্টা। এই মানসিক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সর্বত্র। সমস্ত সেলফি অ্যাডিক্টেড মানুষ যেন এক কারাগারে বন্দী, যেখান থেকে তাদের মুক্তি নেই। এটাও নার্সিসিজম। এও একধরণের মানসিক বিকৃতি কিম্বা মানসিক বিকার।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




