আমার লেখা-জোখার দৌড়.....
নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি- ‘ফেসবুক, ব্লগে লিখে তুমি কি নিজেকে লেখক মনে করো?’
আসলে নিজেকে আমার লেখক বলে মনে হয় না- খোলাসা করি আমার কারনগুলোঃ
প্রথমত: প্রকৃত লেখক যিনি, লেখাই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। সংসারের অন্য ক্রিয়া-কর্মও তিনি করেন, কিন্তু তাঁর মনোযোগ, চেতনা আর অভিনিবেশ জুড়ে থাকে লেখালেখির ভাবনা। তাঁর করোটিতে নানান লেখার উপাদান ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা’ কয় বারংবার। লেখারা তাঁকে ঘিরে থাকে। না লিখে তাঁদের শান্তি নেই। লেখার ভাবনার কালে অথবা লেখার সময়ে বিরক্ত করলে সত্যিকারের লেখক অসন্তুষ্ট হন।
আমার ব্যাপারটি একবারেই উল্টো। উপার্জন, খাদ্য, গপ্পো-আড্ডা, বেড়ানো আমার ধ্যান-জ্ঞান। ও সব করতে পারলেই আমি খুশী। ঘর-সংসার, প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো,গান শোনা ওতেই আমার মনোযোগ। কিছুই করার না থাকলে আমি লিখতে বসি। না লিখলেও আমার কোনই অশান্তি নেই। লেখার সময়ে কেউ কথা বলতে চাইলেও আমার কোনই অসুবিধে হয় না - আমার বরং মনে হয় লেখায় বিরতি দেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া গেল।
দ্বিতীয়ত: যারা সত্যিকারের লেখক, তারা কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলেন। এই যেমন, তাঁদের একটি লেখার জায়গা বা টেবিল আছে, একটি নির্দিষ্ট কম্পিউটারে তাঁরা লেখেন। দু’একজন যাঁরা এখনও হাতে লেখেন, তাঁদের একটি প্রিয় খাতা বা কাঙ্খিত কলম আছে। দিন-রাতের নির্দ্দিষ্ট একটি সময়ে তাঁরা লিখতে বসেন, যাঁরা লেখালেখির প্রতি আরো অঙ্গীকারবদ্ধ, তাঁরা ন্যূনতম একটা সময় ধরে লেখেন - কেউ ৩ ঘন্টা, কেউ ৫ ঘন্টা। অন্য যে কাজই তাঁরা করুন না কেন, এই সময়টি তাঁদের লেখার জন্যে বরাদ্দ।
লেখালেখি আমার ধ্যান-জ্ঞান না বলেই আমার লেখার প্রক্রিয়ার কোন নিয়ম কানুন নেই। আমার লেখার কোন নিদ্দিষ্ট জায়গা নেই - আমি যত্রতত্র লিখি। বাসস্টপে- রেলে, মাঠে-ময়দানে, রাস্তার ধারের ক্যাফেতে-পার্কের বেঞ্চিতে। শুয়ে লিখি, বসে লিখি, আধশোয়া হয়ে লিখি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লিখি। আমি মুঠোফোনে লিখি। আমার লেখার না আছে নির্দিষ্ট সময়, না আছে ন্যূনতম সময়। যখন অন্য কোন কাজ খুঁজে পাই না বলে লিখি বিধায় সেটা সকাল, দুপুর, রাত - যাকিছু হতে পারে। আর সময়সীমা? তা সে ধরুন গে, এক বৈঠকে ৫ মিনিটও হতে পারে, আবার ২৫ মিনিটও হতে পারে।
তৃতীয়ত: সত্যিকারের লেখকদের তাঁদের নিজ নিজ লেখার প্রতি ভারী এক মমতা থাকেন। ‘আমার লেখারা আমার সন্তানের মতো’, সত্যিকারের লেখকদের কেউ কেউ বলেন তাই। কতো যত্ন নিয়ে লেখেন তাঁরা - বারবার খসড়া পড়ে সংশোধন করেন, শাণিত করেন তাঁদের গল্প-কবিতা। তাঁদের লেখা বেরুলো কিনা, সেটার খোঁজ তাঁরা করেন, লেখা বেরুল সযত্নে সংরক্ষণ করেন।
খুব মর্মান্তিক হলেও বলি, আমার লেখার প্রতি আমার তেমন কোন বাৎসল্য নেই। আমি একটানে লিখি যা মনে আসে, পরিশীলনের কোন চেষ্টাই করি না, লেখার শেষে পড়িও না। লেখা শেষ হলেই তার সঙ্গে আমার সব দেনা-পাওনা শেষ। আমি আর তার দিকে ফিরে তাকাই না। আমার লেখারা বড়ই অনাথ। যে সব সহৃদয় মানুষ আমার লেখা পড়েন, তাঁরাই আমার লেখার বানান বিভ্রাটের কথা জানান, আমার তথ্যগত বিভ্রান্তি সংশোধন করে দেন, অন্য কোন অসঙ্গতির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ‘আমার লেখারা বড় অনাদারে মানুষ’। কোন সন্দেহ নেই যে, আমার লেখারা অনাদারে বেড়ে ওঠে, কিন্তু আমার মনে হয় না যে তারা মানুষ হয়।
তবে আমার লেখার প্রতি আমার কোন মমতা না থাকলেও, আমার লেখা যাঁরা পড়েন, তাঁদের প্রতি আমার বড় মায়াময় মমতা। আমি মনোযোগ দিয়ে তাঁদের মন্তব্য পড়ি, যত্ন করে প্রায় সব মন্তব্যের নিয়মিত জবাব দেই সময় নিয়ে। আমি মনে করি, যাঁরা আমার লেখা পড়ে মন্তব্য করছেন, তাঁদর প্রত্যুত্তর দেয়া আমার নৈতিক কর্তব্য। তাদের সম্মান করা আমার দায়িত্ব।
বিশ্বাস করুন, প্রকৃত লেখক কি এবং সত্যিকারের লেখক কে, সে আমি জানি। নিজের বুদ্ধি, অনুভব আর পর্যবেক্ষণ দিয়ে বুঝতে পারি, সব কবিই যেমন ‘কবি’ নন, তেমনি সব লেখকও ‘লেখক’ও নন। লিখলেই কেউ ‘লেখক’ হয় না। আমি জানি, আমি লিখলেও, আমার লেখারা এখনো ‘লেখা’ হয়ে ওঠে নি - ‘ভালো লেখা’ হওয়া তো দূরের কথা।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




