
বরিশাল শহরটি খুব ঝকঝকে বা আধুনিক শহর ছিলনা কোনো সময়ই। কিন্তু প্রচুর গাছপালা, পুকুর, খাল নিয়ে নিরিবিলি মোটামুটি সুন্দর বাসযোগ্য শহর ছিল বরিশাল।
এখন?
শহরের মুল আকর্ষণ বিবির পুকুর অনেকাংশে ভরাট করে কৃতিমতা আনা হয়েছে, হাতেম আলী কলেজের পশ্চিম পাশের বিশাল দীঘিটি মাটি ভরাট করে হাউজিং হয়েছে, সদর রোডস্থ্য পুরাতন হাসপাতালে অস্তিত্ব বিলীণ হবার পথে, কালীবাড়ি রোড, নতুন বাজার, কলেজ রোড, গোরস্থান রোড, সিএন্ডবি রোড, কলেজ এভিনিউর অসংখ্য পুকুর ভরাট করা হয়েছে। সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ, বরিশাল কলেজের সামনে, পাশের বড় বড় পুকুরগুলো ভরাট করে বানানো হয়েছে আবাসিক প্রকল্প। নবগ্রাম রোডের ঐতিহ্যবাহি সেই খালটি এখন আর নেই। সেই খালের বুকের উপর এখন বিশাল পাকা স্ট্রর্ম সুয়ারেজ ড্রেন এবং উপরে আধুনিক রোড! ঝাউতলা, কাউনিয়া, আমানতগঞ্জ -বেলতলা রোডের পাশের পুকুর জলাভুমি এখন ধূলিধূসর বিরানভুমি। সাগরদী, রুপাতলী এলাকা এখন আধুনিক বরিশাল।
শতবর্ষী কাকলী(জগদীশ) সিনেমা, হাসপাতাল রোডস্থ্য সোনালী সিনেমা হল ভেংগে সেখানে এখন শপিং কমপ্লেক্স এবং মাল্টি স্টোর্ড হাউজিং কমপ্লেক্স। সদর রোডের এখন যে অভিসার সিনেমা হল সেই সিনেমা হলটি পাকিস্তান আমলে দীপালি সিনেমা হল নামে আমার সেঝ চাচার মালিকানাধীন ছিলো। যা এখন বন্ধ। শাজাহান চৌধুরীর মালিকানার চকবাজার রোডের অত্যাধুনিক বিউটি সিনেমা হল এখন নাই।
অভিজাত ফজলুল হক এভিনিউর দুই পাসে বারোয়ারী ব্যাবসার নানান কিসিমের দোকানপাট। পোর্ট/বান্দ রোড থেকে বরিশাল লেডিস পার্ক, সাগরদী, রুপাতলী, জেলা স্কুল, পুলিশ লাইন, আলেকান্দা এবং জর্ডন রোডের বিশাল বিশাল ছায়া তরুবৃক্ষ এখন আর নেই। নেই নাবালক জমিদার বাড়ির(হীম নীড়, ফেয়ারী হাউস) পদ্ম পুকুরে ফুটে থাকা বর্ণীল পদ্ম। বাংলাদেশে আমার দেখা শহরগুলোর মধ্যে বরিশাল শহরেই সব থেকে বেশী পুকুর ছিল। কিন্তু এখন বরিশালে পুকুর খাল, ডোবা-জলাশয় খুঁজেও পাওয়া যায়না।
অক্সফোর্ড মিশন ক্যাম্পাস, বিএম স্কুল, বিএম কলেজ ক্যাম্পাসে কিম্বা এর আশে পাশে এখন আর কৃষ্ণচুড়ায় আগুণ লাগেনা। অক্স ফোর্ড মিশন স্কুলের সামনেই আমার দাদা-পিতার আদি নিবাস। পাশাপাশি দুটো ভবন, একসময়ের বরিশাল শহরের অভিজাত ভবন হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন রুগ্ন জীর্ণ অবস্থায় বাড়ির মালিকের জন্য হাহুতাশ করছে। বরিশাল শহরের পশ্চিম প্রান্তে বিশাল এলাকা জুড়ে আমার নানা বাড়ি(হুদা ভিলা, শহীদ কর্ণেল নাজমুল হুদা পরিবার। আমার ৮ জন মামা ছিলেন। চার মামা ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করতেন আর চার মামা থাকতেন বরিশালে। মামা-খালারা কেউ বেঁচে নেই। আমার মামাদের প্রত্যেকের নামের শেষ অংশ "হুদা") এখন পরিত্যক্ত বিরানভূমি। নানা বাড়িতে আমার এক মামা ৭৫ সন পর্যন্ত স্বপরিবারে থাকতেন, আর দাদা বাড়িতে দুরসম্পর্কের এক আত্মীয়। উভয় বাড়ির মুল দ্বায়িত্ব কেয়ার টেকারদের উপর। তারপরেও কোনো এক অজানা আকর্ষনে সেই ছেলে বেলা থেকে ১৯৭৫ সন পর্যন্ত সুযোগ পেলে আমি বারবার চলে যেতাম দুই বাড়ির সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য। ছেলে বেলা দাদার রেলী সাইকেলে কিম্বা ভেসপায় করে বরিশাল শহরে ঘুরতাম এবং সপ্তম শ্রেনীতে পড়ার সময় থেকে আমার মামাত ভাইয়ের ফিফটি সিসি হোন্ডা মটর সাইকেলটি-যা আমার জন্য বরাদ্ধ থাকতো বরিশাল গেলে। এখনও বছরে-দুই বছরে একবার যাওয়া হয়।

বরিশালের একমাত্র সরকারী পার্কটি সিটি কর্পোরেশনের আধুনিকায়নের নামে গাছপালা শুণ্য। যেখানেছিল সুন্দর সুন্দর ইউক্যালিপ্টাস, শিশুগাছ, বকুল,কৃষ্ণচুড়া গাছ-সেখানে এখন বসানো হয়েছে-সিমেন্টের বেঞ্চী আর শিশুদের জন্য কিছু রাইডার।
বিকেলে বরিশালের কীর্তণখোলা নদীর তীর ছিল সবস্তরের মানুষের অন্যতম আকর্ষন। এখন সেখানে জনারণ্য। সেই শিশু কালে যখন বরিশালে যেতাম তখন দেখেছি-কচু পাতায় বৃস্টির ফোঁটা, শীত কালে শিশির বিন্দু, বর্ষায় ব্যাঙ্গের ডাক, ব্যাংগাচি, প্রজাপতি, কলমিলতা, বাবুই পাখির বাসা, পালতোলা নৌকা, স্টীমারের হুইসেল, হাওয়াইমিঠা, কাঠি লজেন্স, কটকটি(বরিশালের ভাষায় কডকডি), হটপেটিস, ঘটি গরম(একটা বহনযোগ্য বাক্সের ভিতরে কাঠকয়লা জ্বালিত চুলায় গরম গরম চানাচুড়, হট পেটিস-যাকে বলা হতো 'ঘডি গ্ড়ড়ড়ড়ম'
সব সময় মিষ্টি প্রিয় আমির বরিশালে অন্যতম আকর্ষন ছিল কোর্ট বিল্ডিং কম্পাউন্ডে "গড়বরান"র মিস্টির দোকানের সুস্বাদু রসগোল্লা। অমন সুস্বাদু রসগোল্লা আমি আজ পর্যন্ত অন্যকোথাও খাইনি। আরোছিল 'শশী মিস্টান্ন ভান্ডার'র মিস্টি! গড়বরান মিস্টির দোকানটি কয়েক হাত বদল হয়ে এখন আর নেই, শশী মিস্টান্ন এর এখন বড়ো ভবন আছে- কিন্তু মিষ্টির সেই স্বাদ আর নেই!
পূর্ব বগুরা রোডে কবি জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি বাড়িটির অস্তিত্ব অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে শেষ স্মৃতিচিনহ ধানসিঁড়ি সাইনবোর্ডটাও ঢাকা পরেছে বিভিন্ন স্থাপনায়।
বরিশাল শহর এখন অটোরিকশার শহর বললে ভুল বলা হবেনা। বিভিন্ন ব্যানারে শহর জুড়ে শুধু রিকশা আর রিকশা। কিছু রিকশার পিছনে কবি জীবনান্দ দাশের ছবিও ব্যবহার করা হচ্ছে।

এভাবেই শেষ হয়ে যাচ্ছে আমার স্বপ্নের শহর। হয়ত আমার এবং আমার থেকে প্রবীণদের মৃত স্বপ্ন থেকেই নতুন প্রজন্মের শিশুদের মনে নতুন স্বপ্নের নির্মাণ হচ্ছে। সেই শিশুটিও হয়ত একদিন তার স্বপ্নের মৃত্যুর কথা লিখবে। এভাবে একপ্রজন্মের মৃত স্বপ্নের মাঝে আরেক প্রজন্মের নতুন স্বপ্নের নামই কি প্রগতি? নাকি প্রগতি হচ্ছে পুরনো স্বপ্নের সাথে নতুন স্বপ্ন যোগ হওয়া.....
(স্টীমারের ছবিটা নিয়েছি ইন্টারনেট থেকে)
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




